অপ্রকাশিত কবি

[বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি, বহু প্রতিভাশালী কবিই অপ্রকাশিত অপ্রচারিত থাকেন – কখনও বা তাঁদের ভাষা আঙ্গিক শৈলীর বিশেষত্বের কারণে, কখনও জনসংযোগ করতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক ব’লে, আবার কখনও হয়ত কেবলমাত্র তাঁর ভৌগোলিক অবস্থান বা পরিবেশের কারণে। এমন কত কারণই ঘুরে বেড়ায়। একজন প্রকৃত কবির কাজ লুকিয়ে থাকে অপ্রকাশের আড়ালে।

“অপ্রকাশিত কবি” – অপরজন পত্রিকার একটি প্রয়াস, এমন কবিদের কাজকে সামনে আনার, যাঁরা ব্যপকভাবে প্রকাশিত বা প্রচারিত নন। যাঁদের লেখা হয় এর আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি, অথবা কেবলমাত্র দু’ একটি পত্রিকাতেই প্রকাশ পেয়েছে। অথচ যাঁরা লেখার মাধ্যমে আমাদের দেখাতে পারেন ভবিষ্যত বাংলা কবিতার বাঁক।

বিভাগ সম্পাদনা করছেন, রাহেবুল।]

প্রিয়াঙ্কা ভট্টাচার্য্য

জন্ম: ২৫ শে জুন, ১৯৯৮

জন্মস্থান: ফাটাপুকুর, জলপাইগুড়ি

কবিতা লেখার উদ্দেশ্য-বিধেয়: “আমার একটা জিনিস তোমাদের ঘরকন্নার বাইরে ছিল, সেটা কেউ তোমরা জান নি। আমি লুকিয়ে কবিতা লিখতুম। সে ছাইপাঁশ যাই হোক-না, সেখানে তোমাদের অন্দরমহলের পাঁচিল ওঠে নি। সেইখানে আমার মুক্তি; সেইখানে আমি আমি।” (কবিগুরু, ‘স্ত্রীর পত্র’)—মৃণালের এই চিঠি আমার কাছে পৌঁছানোর আগেই ওই চিঠিতে যে আমিও মিশে ছিলাম তা অনেকটা সময় পর জানলাম। আসলে কোনোদিন কবিতা লিখব করে লেখা হয়নি, সবটাই যেন আমার মুক্তি হয়ে পালানোর পথকে আরও প্রশস্ত করে গেছে। ওইটুকুতে আমি শান্তি খুঁজে পাই। যা কিছুই লিখি তার সবটাই হয়তো আবিষ্কৃত কিন্তু অনাবিল স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ, দুঃখদের মেটামরফোসিস হয়ে ভালো থাকার খোরাক হয়ে ওঠা, জীবন-যাপনের দর্শন, সমমায়য়িক সময় ও স্মৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা, কল্পনার উন্মুক্ত বিকাশ, মুক্তি, আরও অনেক অনেক অনেক উপলব্ধি—এই সবকিছু হয়ে কবিতা নিজে এসে ধরা দিলে তাকে দূরে সরিয়ে রাখা আমার কাছে সম্ভব হয়নি। তাই কীবোর্ডের সাথে আঙুলের কিংবা কলমের সাথে খাতার গভীর প্রেম হয়ে উঠে ‘সে’। সবারই হয়তো একটা স্বস্তির জায়গা থাকে, যেখানে সে নিজেকে নিরাপদ মনে করে, উন্মুক্ত করতে পারে নিজের সবকটা ছবি, একটা আশ্রয় পায় যা কখনো তাকে দূরে ঠেলে দেয় না, কবিতা হচ্ছে সেই আশ্রয় আমার কাছে। আঁতুড়ঘরে যেমন বেশি কেউ প্রবেশ করে না, তেমনি এই ঘরের ঠিকানা জানে না বেশি কেউ, এমনকি জানলেও আসা-যাওয়া করে না সেভাবে। এইখানে আমি একা নই, বরং সবার সাথে এক হয়ে যাই অনায়াসে, নিমেষে।

প্রথম প্রকাশ: অপরজনের এ সংখ্যাতেই আত্মপ্রকাশ

একেবারে নতুন এক কবির কবিতা। অনেক তরতাজা। সমাজে মহিলা হিসাবে চিহ্নিত একজন কবির কবিতায় নারী-ঘটিত ক্রাইসিস থাকার সম্ভাবনা থাকে অনেক বেশি, এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু একইসঙ্গে এও বলার যে কেবল পিরিয়ড, সেক্স এইসবেই প্রিয়াঙ্কার লেখা আটকে নেই, আরও বহু বহু ক্ষেত্রকে ছুঁয়ে বর্ণময় হয়েছে ওর অনুভূতি, ওর লেখার জগত। আরও হবে সমৃদ্ধ নিশ্চয়। পাঠক, চলুন নবাগতকে স্বাগত জানাই।

প্রিয়াঙ্কা ভট্টাচার্য্যের কবিতা

কুক্ষির ভেতর ভেতর

ঠ্যাঙের ফাঁকফোকর দিয়ে যেটুকু পৃথিবী দেখা যায়,
ওখানেই মনে হয় বিশ্বব্রহ্মাণ্ড লুকিয়ে রাখো তুমি।
আঙুলে ভর করে জানতে চাই ইতিহাসের খুঁটিনাটি।

সহস্রাব্দের পর সহস্রাব্দ কেটে গেলো কিন্তু খোঁজা হলো না ভৌগোলিক অবস্থান,
মহাদেশ সঞ্চরণের মতোই তিলে তিলে সরে আসা তাই,
তারপর আঙুল থেকে চাপ সরিয়ে তলিয়ে যাই অনেক গভীরে।

সরতে সরতে সেই ফাঁকফোকরে তুমি আরেক বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জন্ম দিলে,
জানা হলো না সেই ইতিহাস—এবার শুধু ভূগোল পাওয়া গেলো,
আর আমি জৈবিক বিশ্লেষণে শুধুই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করি।

______________

লিপ্সা

চিমনির ধোঁয়ার দিকে একপানে চেয়ে আছে একটা শকুন,
যে মৃতদেহ খুঁটে খাবে করে এতগুলো যুগ অপেক্ষা করে গেলো,
তারা আজ ধোঁয়া হয়ে বাতাসে ছড়াচ্ছে।
এখন ওদের অচ্ছুত করে রাখতে পারেনা এই বিশ্বসংসার,
মেথরের হাত ছুঁয়ে বামুনের পৈতা বেয়ে মিশে গেছে অক্সিজেনের সিলিন্ডারে।
এবার বুঝি জাত যায় না কারোরই।

শকুন তো অপেক্ষা করেছিলো যুগের পর যুগ;
আর আমাদের লালসায় চিমনির কালো ধোঁয়ায় ভেসে গেল ছোট্ট ভেড়ার পাল,
কচি হাত শালকাঠ হয়ে ছাঁই হয়ে পরে রইলো পাকের পারে।
ওরাও অপেক্ষা জানে, মরার পর খায়; আর আমরা মেরে নিজের প্রাসাদ বানাই।

________________

সহজ— সহজ নয়

বাঁচতে বাঁচতে ক্লান্ত হয়ে উঠলে মরে যেতে ইচ্ছে হয়
কিন্তু সাহস হয়না।
মনেহয় যাওয়ার আগে অনেক কাজ আছে সেরে যাবার
অথচ সময় নেই ভাবলেই ভয় হয় খুব।
আমার সমস্ত ভয় আমার ইচ্ছাটুকুকে গিলে খায়
বোধ করি, ছেড়ে যাওয়া সহজ কিছু নয়।

প্রিয় বইটা কিংবা সেই আয়না—
যা বারবার মুছে রাখি ধুলো জমতে দেব না করে,
আর বিছানার সাথে বেঁধে রাখা সেই ফোন কিংবা কিছু বদ্ধ স্মৃতি,
জানালার ফাঁকে লুকিয়ে রাখা কিছু স্বপ্ন;
উঠোনের সেই রোদ
সবকিছু ছেড়ে যাওয়া সহজ নয়।
প্রিয়জনের অপেক্ষা; চায়ের চুমুক, চেনা কিছু মুখ আর গলার স্বর
একটু একটু করে জমিয়ে রাখা অভিমানের বারুদ
এই আকাশ-আলো-ঘাস সব মায়া ত্যাগ করতে হবে ভেবে ভয় হয়

কিন্তু জানো সবচেয়ে বেশি ভয় হয় কখন?
তোমরা সবাই আমায় ভুলে যাবে ভাবলে!

চোখের জল হয়ে ভেসে যাওয়া আমার লাশ দেখে আমি আঁতকে উঠি
আমি বেঁচে উঠি
তাই আমি বেঁচে উঠি।

___________________

গ্রীষ্মের বৃষ্টি

আরও একটা রাত কেটে যায় শুকনো গলায়
তৃষ্ণার্ত ক্ষুধার্ত প্যাঁচা ঘুরে বেড়ায় এদিক ওদিক
কথা জড়িয়ে আসে ভেজা সুরে
মেকি কান্নায় রাত ভাসায়।

তুমি দূরে দাঁড়িয়ে থাক ভোরের অপেক্ষায়
রাতের বৃষ্টির সব চিহ্ন মুছে যাওয়ার।
ন্যাকা স্বরে বোকা বোকা কথা তোমার কাছে ঘ্যানঘ্যানানি,
তাই শুকনো রোদে শীতল ছায়ায় বিশ্রাম নাও
কোনো খবর রাখো না অন্য পাড়ার।

_________________

আরও একটা দিগন্তরেখা

ছুটতে ছুটতে দিগন্তরেখায় পৌঁছালে আরও একটা দিগন্তরেখা দেখা যায়
পালানোর পথ প্রশস্ত হয়।

ক্লান্ত হয়ে পড়লে একটা আকাশ দেখা যায়। সাথে কিছু মেঘ।।
দু’চোখ বেয়ে বৃষ্টি নামলে প্রায়শ্চিত্ত সম্পন্ন হয়
টানাপোড়েনে ছুটে চলেছি দিনের পর দিন
দু-দণ্ড জিরিয়ে নেওয়া হয়নি।

দিগন্তরেখার পর দিগন্তরেখা পালিয়ে গেছি
আদৌ কি পেরেছি পালাতে?

_______________

সারমেয়

তাদের দেখলে আমার করুণা হয়
তবে তার চেয়েও বেশি যা হয় তা হিংসা
যে হিংস্রতা নিয়ে জন্মেছি আর জন্ম দিয়েছি আরও কিছু হিংস্র প্রাণীর
তা পরিস্ফুটিত হয়ে ওঠে তাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেখলে।

ছ’ঋতুর পরিক্রমা ছ’বাবের বেশি দেখেছি
কিন্তু চেখে দেখিনি নরম দুটি কথা আর একটু আদর,
অনাদরে পরে থাকা মণ্ডা-মিঠাই যেন গরল হয়ে গলা বেয়ে পড়েছে জঠরে
কেঁপে ওঠা শরীরে প্রাচীন বৃক্ষের ন্যায় খুঁজে বেড়াই যৌবন।

ওরা বেশ সুখেই আছে লোহার শেকল গলায় নিয়ে
সকাল-বিকাল স্বাধীন হয় নিয়মমাফিক
শুধু আমিই মায়ার শেকল পায়ে পড়ে
নাড়ির টান খণ্ডাতে পারি না!

____________

কনীনিকার ভেতর

এলোকেশী চুল দৃষ্টিগোচর হবার আগেই তোমার কনীনিকা খুঁজে নিয়েছে উন্মুক্ত বুক
তুমি মুখ ডুবিয়ে স্বর্গসুখ হাতড়ে বেড়াও
অম্বিকা বিচ্ছিন্নতার সমস্ত আখুটি খুঁজে নাও আরেকটা নারী শরীরে
কুক্ষির মধ্য দিয়ে উন্মোচন করতে চাও সৃষ্টি রহস্য।

প্রবল ঝড়ে উড়তে থাকা কেশে বিভ্রান্তি দলাদলি করে জট বাঁধায়
তুমি ব্যস্ত থাক গভীর থেকে গভীরতম রহস্যভেদে

আর

সে জট ধূসর হয়ে চুইয়ে চুইয়ে সমুদ্রে মেশে।

______________

ওই কটা দিন

মাসের ওই কটা দিন যেন বাজ পড়ে শরীরে
থেকে থেকে জ্বলে ওঠে আর পুড়িয়ে মারে মন।
অস্থিমজ্জা গতিময়তা হারিয়ে শূন্যে ভেসে বেড়ায়
ফিমার, টিবিয়া-ফিবুউলা যেন বইয়ের পাতায় আশ্রয় নেয় শরীর ছেড়ে।
ব্যাস্তানুপাতে শরীরের ওজন কমতে থাকে আর মনের বাড়তে থাকে।

শুচি-অশুচির হিসেক কষতে থাকে হোমোস্যাপিয়েন্স জনজাতি
আর ওদিকে নেতিয়ে পড়া সমুদ্রে ঢেউ আসে আর যায়,
কিন্তু নিয়ে যায় না তাকে।
মনে হয় কীটপতঙ্গ গোপনে খাবলে খায় রক্ত মাংস

হেজহগের ডিলেমায় চারপাশ ভরে ওঠে।

বৃষ্টি নামে অসময়ে। সব কিছু অন্ধকারে ঢেকে দেয়।

মাসের সে কটা দিন যেন সমস্ত শীত-বর্ষা-গ্রীষ্ম একসাথে নিয়ে আসে
শুকনো পাতার মতো মচমচে শব্দে ঘুরে বেড়ায় যৌবন
উথলে পড়া পরিপূর্ণতার স্বাদ ভোলাতে চায় সকল যন্ত্রণা।
যন্ত্রপাতিগুলো খুলে খুলে পড়ে।

আওয়াজ হয়না।

বিছানার চাদর জানে শুধু ছটফটানোর তেজ।

___________

ফিরে দেখি

যেটুকু সময় হয় আমি ফিরে দেখি। মাঝেমধ্যে তোমরাও আমাকে ফিরে দেখতে হাত বাড়িয়ে সাহায্য করো।
এই ফিরে দেখাটুকু আমাকে চেনায়।

চলতে চলতে স্টেশনের পর স্টেশন পার করি— কামরা বদলাই
ভুলে যাই ফিরে আসতে।
তখন ফিরে দেখি।

একটা দুপুর, একটা সন্ধ্যা আর একটা সকাল কীভাবে লুকিয়ে রাখে কিছু ভোর আর কালো রাতকে
সেই কালো রাতের আলোয় ফিরে তাকালে নিজেকে দেখতে পাই।

দেওয়াল জুড়ে একটু একটু ছেড়ে আসা বর্তমানরা আজ অতীতের বেশে সেজে উঠেছে
ফিরে দেখলে বুঝি শুধু সময়ই নয় আমিও কতটা ভঙ্গুর।
কীভাবে ভেঙেচুড়ে আজ চূড়ায় পা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি একা
কীভাবে ভেসে বেড়াই নীল জলে, ডুব মারি অতলে
সব যেন লেখা আছে।
ছোটো ছোটো রাগ, পাথর চাপা কষ্ট ফুলেফেঁপে লাশ হয়ে উঠেছে সেই নদীতে
দেখি দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাছে ফুল ফুটেছে আজ
চারপাশ বসন্ত বর্ষায় সেজে উঠেছে সবুজ কচি পাতায়

আমি ফিরে ফিরে দেখি আর প্রশ্ন করি— কোনটা আমি? কোনটা আমি?

Facebook Comments

Posted in: July 2021 - Serial, POETRY

Tagged as:

Leave a Reply