এক মৃত্যুহীন প্রাণ দান করে যাওয়ার গল্প : অলকেশ দাস

fail

ক্রোধ তুমি ক্ষমাহীন ক্রোধ হও,
অশ্রু তুমি দধীচির পাঁজরভাঙ্গা অস্ত্র হও,
মৃত্যু তুমি অমৃতের মন্ত্র হও……….

স্তানিস্লস লর্ডুসামি হয়তো এখন বলতেন- আমাকে পোড়াতে গিয়ে এই প্রথম আগুন নিজেও পুড়ছে, ‘এখন ডানায়’, প্রত্যেক পালকে তার আগুন। যারা তাকে মৃত্যু উপহার দিতে চেয়েছে তাদেরই সৌজন্যে তিনি আজ ‘মৃত্যুহীন’। যারা তাকে চুপ করিয়ে দিতে চেয়েছিল, তারাই সারা পৃথিবীকে প্রতিবাদী বাঙ্ময় করে তুলেছে।

তুকারাম যাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল, তাকে খুন করেছিল তারাই। নাৎসিরা আইনস্টাইনের বই পুড়িয়েছিল, বাড়ি আক্রমণ করেছিল, এবং শেষ অবধি তাকে দেশছাড়া করিয়েছিল। ৩৮ বছরের কবি লোরকাকে ফ্যাসিস্তরা খুন করেছিল সমাজতন্ত্রের পক্ষে খোলাখুলি দৃঢ় মতপ্রকাশের জন্য। ‘রোমান্টিক কমিউনিস্ট’ তুর্কি কবি নাজিম হিকমতকেও জেলের মধ্যে পচতে হয়েছে দীর্ঘকাল। অভিযুক্ত যারা তাদের নাজিমের চোখের দিকে তাকানোর সাহস ছিল না‌। সারা বিশ্বে এ’রকম নামের তালিকা দীর্ঘ। এবার স্ট্যান স্বামীও যুক্ত হলেন সেই তালিকায়। একজন মানুষ যে তার সারাজীবন উৎসর্গ করে দিলো হতদরিদ্র মানুষের জন্য, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, সমাজের পিছিয়ে রাখা মানুষের ন্যায়বিচারের জন্য। দুর্ভাগ্য যে সেই দৃষ্টিভঙ্গিগত কারণেই তাকে ‘খুন’ হতে হলো চালু ব্যবস্থার হাতে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে এর কি কোন সদুত্তর আছে? ফাদার স্ট্যান স্বামীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল কেন? স্ট্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ যে তিনি ভীমা কোরেগাঁও ঘটনায় এমন উত্তেজক সব বক্তব্য রেখেছিলেন যে হিংসা মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু এফ আই আর-এ তার নাম ছিল না! আর ভীমা কোরেগাঁও-এর ঐ জায়গায় উনি কখনো যাননি। অথচ দেশদ্রোহের লেবেল লাগানো হয়েছিল, কুখ্যাত বেআইনি কার্যকলাপ নিরোধক আইন (ইউ এ পি এ) প্রয়োগ করা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে। জেলে ঢোকানো জেসুইট ফাদারের বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদেছিল। ফাদার স্ট্যান স্বামী জামিনের আবেদন করেছিলেন। এন আই এ কোর্টে সরকার পক্ষের আইনজীবী জামিনের বিরোধিতা করেছিল। বলেছিল- যদি স্বামী ছাড়া পায় তাহলে সে আবার চেষ্টা করবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে হত্যা করতে। আদালত সরকারের কথাই শুনেছিল। না হলে জামিনের আবেদন খারিজ করবে কেন? বিচারকের একবারও মনে হয়নি, যাকে হত্যাকারী আখ্যা দেওয়া হচ্ছে সেই লোকটা আশিউর্ধ, অশীতিপর, দুই কানে ভালো শোনেন না। ক্যান্সারে আক্রান্ত। অতিমারিও তাকে ছাড়েনি। দু’বার হার্নিয়া অপারেশন হয়েছে। ভুগছিলেন অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে লাম্বার স্পন্ডিলোসিসে। বার্ধক্যজনিত রোগগুলো এক এক করে গ্রাস করছিল তাকে। তারপর ছিল হাত-পা কাঁপা পারকিনসন ডিজিজ। নিউরো ডিজেনারেটিভ ডিজিজ। এহেন এক ব্যক্তি খুন করবে? খুনের পরিকল্পনা করবে? তাও প্রধানমন্ত্রীকে? যার বর্ম বেষ্টিত নিরাপত্তা! প্রধানমন্ত্রী এবং তার মোসাহেবরা ছাড়া সারা পৃথিবী এখন জানে স্ট্যান স্বামী এক গভীর চক্রান্তের শিকার, যে চক্রান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে দেশের সরকার।

জেসুইট এই পুরোহিত ত্রিশ বছর ধরে ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী মানুষের পাশে নিবিড় ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভয়ঙ্কর সমালোচক ছিলেন। ক্ষোভে ফেটে পড়তেন এই প্রশ্ন তুলে যে কেন সংবিধানের পঞ্চম তফসিলের প্রয়োগ হচ্ছে না? আদিবাসীদের ভালো থাকা চাই, উন্নয়ন চাই, নিরাপত্তা চাই। সেই জন্য চাই ট্রাইবাল অ্যাডভাইজারি কাউন্সিল। যার সদস্যরা সবাই হবেন আদিবাসী। এই ছিল তার অন্যতম কেন্দ্রীয় দাবি। মাটির নিচের খনিগুলো মুনাফার কব্জায় আনার জন্য মাটির উপরে থাকা আদিবাসীদের ঝুপড়ি, তাঁর শিকারের জায়গা জঙ্গল সরানো দরকার। তার জন্য আইন শিথিল করা দরকার। আর জোর করে সম্মতি ছাড়া আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা থেকে ছুঁড়ে ফেলার জন্য সরকারকে বশীভূত করা দরকার। এইসব দেখে, বুঝে ফাদার স্ট্যান স্বামী অসংখ্য আদিবাসীদের পক্ষে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ধান্দার ধনতন্ত্রের মুনাফা লিপ্সার সামনে পাহাড় হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। সরকারও তার চরিত্র অনুযায়ী ঠিক পথেই চলছিল। কর্পোরেট কে খুশি করার পথ। সেইজন্যে জল-জমি-জঙ্গলে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের বিরুদ্ধে সরকার পুলিশকে ব্যবহার করেছিল। পুলিশ আদিবাসীদের, বিশেষত আদিবাসী যুবকদের গ্রেফতার করছিল ‘নকশাল’ তকমা লাগিয়ে। পাল্টা জনস্বার্থ মামলা রুজু করেছিলেন স্ট্যান স্বামী। তথাকথিত ‘নকশাল’ যুবক ছেলেগুলোকে ব্যক্তিগত বন্ডে জামিনে মুক্তির জন্য। ষড়যন্ত্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এসব কার্যকলাপ রুখবার জন্য বিচার বিভাগীয় কমিশন গড়ার আর্জিও তিনি জানিয়েছিলেন। পিতামহসম এই ব্যক্তিত্বকে বিনা বিচারে জেলের মধ্যে নয় মাস ধরে আটকে রাখার পিছনে এই হল আসল কারণ।

বুদবুদের মত অসংখ্য প্রশ্নাবলী উঠে আসছে।কেন তাকে এন আই এর হেফাজতে নেওয়া হলো? কেনই বা ইউএপিএ তার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করতে হলো? এখন জলের মত পরিস্কার যে এন আই এ তার কম্পিউটারে বাইরে থেকে নথিপত্র ঢুকিয়েছে। তাকে মাওবাদী সাজানোর জন্য। আবেগতাড়িত লোকটা আদিবাসীদের পাশে সামাজিক ন্যায় বিচারের প্রশ্নে মুক্তিদূতের মত ভূমিকা নিয়েছে সারা জীবন। অথচ সরকার তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে অমানবিকতা। তার চিকিৎসা করে নি। কোভিড আক্রান্ত হওয়ার পরও যে যত্ন তার শরীর দাবি করেছিল সেই দিকে ফিরেও তাকায় নি । সুপ্রিম কোর্ট কোভিড পরিস্থিতিতে জেলের মধ্যে আটক বন্দির সংখ্যা কমানোর পরামর্শ দিয়েছিল। যাদের অপরাধের শাস্তির মেয়াদ সাত বছরের নীচে তাদের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন এর ব্যবস্থা করা যায় কিনা তা ভাবতে বলেছিল। দেশের সর্বত্র তার প্রয়োগও হয়েছিল। হয়নি স্ট্যান স্বামীর ক্ষেত্রে। চশমা খুললে যিনি অন্ধ হয়ে যেতেন তার চশমাটাও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। শাসক তার চোখকেও ইদানিং বড় ভয় করতে শুরু করেছিল। পারকিনসন ডিজিজে হাত পা বড় কাঁপত তার। জলের গেলাস, চায়ের কাপ ,খাবারের ডিস ইদনীং পড়ে যেত তার কম্পমান হাত থেকে। চুমুক দিয়ে খাবার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে শিপার আর স্ট্র চেয়েছিলেন। মেলে নি। এন আই এর ২০ দিন সময় লেগেছে শিপার আর স্ট্র এর এর আবেদনের উত্তর দিতে। তার বয়স এবং স্বাস্থ্য দেখে জামিন দেওয়ার যথেষ্ট ক্ষমতা তদন্তকারী আধিকারিকের হাতে ছিল । বিশেষ করে ৮৪বছরের বৃদ্ধর জেলের বাইরে এসে নতুন করে কেসকে প্রভাবিত করার আর কি থাকতে পারে? মাইকেল বেসলেট এমনি উদ্বেগ প্রকাশ করেননি। রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার প্রধান শুধু নয়, ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন ফর ইন্টার্নেশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডোম কটাক্ষ করেছে ভারতে মানবাধিকার এর গুণগত নিম্নগামী মানের। এনআইএ কোর্ট কি অন্ধ ,পক্ষপাত দুষ্ট, অসংবেদনশীল, অনুভবহীন ছিলো? ঘৃণায় পরিপূর্ণ ক্ষমতার রাষ্ট্রযন্ত্র ফাদারকে সন্ত্রাসের রক্তচক্ষু দেখিয়েছিল। তাকে নতজানু করাতে চেয়েছিলো। কিন্তু মৃত্যুর আগে অবধি কেউ স্ট্যান স্বামির মাথা ঝোঁকাতে পারেনি। ‘প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা ‘বা ‘রাজনৈতিক হত্যা’ কথাগুলো হাওয়ায় ভেসে আসে নি।

চিকিৎসকরা আদালতকে বলেছিল যে তার মৃত্যু হয়েছে ফুসফুসের ব্যবস্থাগত জটিলতা এবং পারকিনসনস ডিজিজ এর জন্য। তার শরীরে বিষক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। ডাক্তারি পরিভাষায় যা সেপটিসেমিয়া। চিকিৎসকরা যেভাবেই ব্যাখ্যা দিন না কেন আমাদের মত সাধারণ মানুষ এই মৃত্যুকে ‘রাজনৈতিক হত্যা’ বলেই জানে। স্ট্যানের রক্ত লেগে আছে আরএসএস এর হাতে, এন আই এ’র হাতে, বিচারব্যবস্থার হাতে, প্রচার মাধ্যমের হাতে।

‘শহুরে নকশাল’ বলে দোষারোপ করে বা তাদেরকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসাবে অভিযুক্ত করে তাদের গ্রেপ্তার করে মানুষের অসন্তুষ্টির কণ্ঠকে চেপে ধরতে বা তাকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করছে সরকার। আরএসএসের আদর্শ সম্ভবত স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুর সাথে সাথে ‘কমপক্ষে প্রতিবাদের একটি কণ্ঠস্বর তো কমলো’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। কি বোকা! সারা দেশে মনুবাদী নীতিগুলির বিরুদ্ধে বিক্ষোভগুলি এবং বিক্ষোভকারীরা একত্রিত হচ্ছে। সামাজিক, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রাখা মানুষের উপর আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে ভীম-কোরেগাঁও মামলার মত হাজার হাজার হামলা আর মিথ্যা মামলার নকশা তৈরি করতে পারে এবং তাদের ‘সহিংস’ বলে মিথ্যা আখ্যা দিতে পারে সরকার । স্ট্যানের মৃত্যুর পরও বোঝা যাচ্ছে সেইসব বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে। দমন করার আইন, স্বৈরতন্ত্রের হাতুড়ি তাদের প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট নয়। ‘প্রাতিষ্ঠানিক’, ‘পূর্ব পরিকল্পিত’ ফাদার স্ট্যান স্বামীর হত্যাকাণ্ড তাদের লড়াইয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিয়েছে।

সন্ত্রাসবাদী কে? কিভাবেই বা ঠিক করা হবে একজন দেশদ্রোহী ,রাষ্ট্রদ্রোহী? ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি বা এন আই এ’র একজন আধিকারিক গিয়েছিল দেশদ্রোহী খুঁজতে একজনের বাড়িতে। পেয়েছিল ভগৎ সিং এর লেখা বই। ভগৎ সিংকে তো চিনতো না আধিকারিক। অবশ্য না চেনার বার্তাই পাঠাচ্ছে সরকারের চিন্তা প্রকোষ্ঠ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। সঙ্গে সঙ্গে দেশদ্রোহীর দাগ পড়ে গেল সেই ব্যক্তির গায়ে।আর তা যদি একবার হয়, তার চাকরি যাবে,জমি যাবে। এইভাবে বাড়িতে মাও সে তুং এর বই পেলেও গৃহকর্তা হয়ে যাচ্ছে মাওবাদী। বেআইনি মাওবাদী। বিখ্যাত সুধা ভরদ্বাজকেও এইভাবে ‘Urban Maoists’ সাজিয়ে ফেলেছে সরকার। ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে জেলের ভিতরে।আসলে দেশদ্রোহী বা রাষ্ট্রদ্রোহীর কোন সংজ্ঞা, কোন সূচক সরকার তৈরি করেনি। তাতেই অবশ্য সরকারের সুবিধা। যাকে খুশি ধরা যায় আর জেলের মধ্যে ঢোকানো যায়। কানামাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাবি তাকে ছোঁ। আগে বিচারের ক্ষেত্রে অভিযুক্তর জন্য জামিন ছিল স্বাভাবিকতা, জেল ছিল ব্যতিক্রমী। ধর্মে গুলিয়ে দেওয়া ফ্যাসিবাদী মুখের সরকারের কাছে এখন ব্যতিক্রমই নিয়ম।গণতান্ত্রিক অধিকার, নাগরিকের স্বাধীনতা-সরকার তার ধার কাছ দিয়ে যেতে চায়না। সরকার চায় প্রশ্নহীন আনুগত্য। যে প্রশ্ন করবে, যে বিরোধিতা করবে তার জন্যেই চোখা চোখা আইন, যা মাঝে মাঝেই ধারালো করা হয় জনগণকে আরো তীক্ষ্ণ বিদ্ধ করার জন্য। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য লোকসভায় সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে তার উদ্দেশ্য খোলসা করেছেন। বলেছেন সন্ত্রাসবাদীদের কাজ হচ্ছে সন্ত্রাসবাদী সাহিত্য, সন্ত্রাসবাদী তত্ত্ব যুবমনে প্রবিষ্ট করানো। বন্দুক নাকি সন্ত্রাসবাদকে জন্ম দেয় না। সন্ত্রাসবাদের মূল হচ্ছে তার প্রচার। এই প্রচারই বিস্তৃত করে সন্ত্রাসবাদকে। আর তারপরই হুমকি দিয়েছেন-তাই বলে ‘শহুরে মাওবাদী’দের কোনোভাবেই ছেড়ে দেওয়া হবে না। তারমানে বিনা বিচারে জেলে ভরা এবং তাদের জেলের মধ্যে পচিয়ে রাখার এই অভ্যাস আগামীতে আরো বাড়বে। চার দশক আগে একজন বিচারক তার রায়ে লিখেছিলেন-একজন মানুষকে কারাগারে নিক্ষেপ করা এবং তারপর তার কারাগারের জীবন ভুলে যাওয়া আসলে একজন মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং তাকে বঞ্চনা করা। একজন মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে জেল হেফাজতে রাখা মানে ন্যায় বিচার, বিশ্বাস, চিন্তার প্রক্রিয়া থেকে অমনোযোগী হওয়া। এইগুলিই আইনের শাসনের ওপর বিশ্বাস টলিয়ে দেয়। চার দশক পূর্বের লেখা বিচারকের এই রায় পড়ে মনে হয় যেন ফাদার স্ট্যান স্বামীর ঘটনাকে দেখেই দেওয়া রায়।

১৮০০ কিলোমিটার দূরে ভীমা কোরেগাঁও। অন্তত ফাদার স্ট্যান স্বামী যেখানে থাকতেন তার থেকে। সেখানকার ঘটনার জন্যই গ্রেপ্তার ফাদার। ঘটনা ২০১৮ সালের পয়লা জানুয়ারির। মহারাষ্ট্রের ভীমা কোরেগাঁও এর। মেলা আর উৎসব চলছিল বিজয়স্তম্ভকে ঘিরে। মূলত দলিতদের মেলা। মাহারদের মেলা। সেই বিজয় স্তম্ভ যা তৈরি হয়েছিল প্রায় দুশো বছর আগে। আসলে দু’শো বছর আগে দলিত মাহারদের অস্পৃশ্যতার চক্রব্যূহে অবস্থা ছিল প্রাণান্তকর। চতুর্বর্ণের শেষ সিঁড়িতে একটু এগুনো দূরে থাক তেল মাখা পিচ্ছিল বংশদন্ডে পশ্চাৎগতিই সমাজ তার নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। এই বংশেই জন্মেছিলেন আম্বেদকার। ব্রাহ্মণত্ববাদ জেঁকে বসেছিল। অত্যাচারে জর্জরিত ছিল মাহারেরা। সেসময় ব্রাহ্মণ রাজা পেশোয়া বাজিরাও। যুদ্ধে দক্ষ গায়ে-গতরে খাটা পরিশ্রমী মাহারেরা প্রথমে বাজিরাও এর সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে গিয়েছিল। বলা চলে জীবিকার স্বার্থে,অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে এবং খানিকটা সম্মানে উত্তীর্ণ হতে। যার মুখদর্শন এবং গায়ের ছোঁয়া ধর্মবিরুদ্ধ ,তাকে কেন নেবে সেনাবাহিনীতে ব্রাহ্মণ বাজিরাও? অগত্যা ব্রিটিশদের রেজিমেন্টে যোগ দিয়েছিল মাহারেরা। মাহারদের যুদ্ধ দক্ষতা দেখে পৃথক মাহার রেজিমেন্ট গড়ে তুলেছিল ব্রিটিশ। ১৮১৮ সালের ১লা জানুয়ারি ব্রিটিশ এবং পেশোয়া বাজিরাও দের মধ্যে ভীমা কোরেগাঁও যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হয়। যুদ্ধ ছিল অসম। পেশোয়া বাজিরাও এর সেনা সংখ্যা ছিল ২৮,০০০। অথচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনা সংখ্যা ছিল ৮৩৪, যাদের মধ্যে মাহাররা ছিল পাঁচ শতাধিক। যুদ্ধে ইংরেজদেরই জয় হয়। যুদ্ধে যে ৪৯ জন হত হয় তাদের মধ্যে ২২ জন ছিল দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত। তাদেরই স্মরণে বিজয়স্তম্ভ গড়ে ওঠে। প্রতিবছর ৩১শে ডিসেম্বর ওই বিজয়ের দিনেই দলিত মানুষেরা সমবেত হয় লক্ষাধিক। ২৬০ টি ছোট বড় সংগঠনের আহ্বানে পুনের শানিওয়ারওয়াদা কেল্লায় প্রাণের যোগ তৈরি হয়। এই হলো এলগার পরিষদ। এলগার মানে জোরে, হেঁকে, চেঁচিয়ে মানুষকে আমন্ত্রণ করা। সমাজের চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা কটু কথা, বঞ্চনা, সামাজিক বৈষম্য থেকে দূরে এসে প্রাণের উৎসবে যোগ দেওয়া। যে বর্ণভেদ এখনো জাঁকিয়ে বসে আছে আমাদের দেশে তার পোষকরা কেনই বা সহ্য করবে সমাজের পায়ের তলার এই মানুষদের নিজস্ব বিনোদনের নির্মাণ? ২০০ বছর আগের যুদ্ধে পরাজয়কে তারা দেখেছে নিচু জাত মাহারদের জয়, ব্রাহ্মণ পেশোয়াদের পরাজয় হিসাবে। প্রতিশোধের আগুন তাদের মধ্যে ধিকি ধিকি জ্বলছে। হিন্দুত্বের জ্বালানি দিয়ে তাকেই উস্কে দেয় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। ২০১৮ সালে ১লা জানুয়ারি সঙ্ঘীরাই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল গেরুয়া পতাকা নিয়ে দলিতদের উপর। মৃত্যু হয়েছিল এক জনের। পুলিশ যে দু’জনকে আক্রমণের জন্য গ্রেপ্তার করেছিল তাদের অন্যতম সম্ভাজি ভিদে। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ। ‘শিব প্রতিষ্ঠান হিন্দুস্থান’র প্রধান। প্রভাবশালী না হলে রাজ্যের সরকার ছ-ছ’টা মামলা তার নামে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তুলে নেবে কেন? কেনইবা ভীমা কোরেগাঁও ঘটনায় তার বিরুদ্ধে এফআইআর হবে না?
হয় কে নয় করা পুনে পুলিশ ২০১৮’র মার্চ মাসে গেরুয়া বাহিনী থেকে পুরো বিষয়টা ঘুরিয়ে দেয় এলগার পরিষদের দিকে। তারা বলে এরা প্রধানমন্ত্রীকে খুনের চক্রান্ত করেছে। সরকারের পতন ঘটানোও এদের একটা বড় উদ্দেশ্য। মহারাষ্ট্রে নিজেদের অনুগত সরকার বদল হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার মামলা রাজ্য সরকারের হাত থেকে নিয়ে এন আই এ’র হাতে তুলে দেয় খুবই তৎপরতার সাথে। এই ঘটনায় যারা গ্রেপ্তার হয়ে রয়েছে তারা কেউ সমাজকর্মী, লেখক, বুদ্ধিজীবী-সমাজে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। এদেরই ১৬ নম্বরে ছিলেন স্ট্যান স্বামী। ঘটনার বহু বর্ণীয় বিশ্লেষণের অন্যতম বর্ণ বিভাজন। আমাদের সমাজের শ্রেণী শোষণের এক অন্যতম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উপাদান। দেগে দেওয়া জাতির দাগ মোছা যাবে না শত চেষ্টাতেও। তাই দিয়েই ঠিক হবে সমাজের উঁচু- নিচ। মনে নেই কর্ণের বিলাপ মহাভারতে? ‘কোন বিদ্যা অর্জন করতে বল তা করতে পারি। কোন রাজ্য জয় করতে বল তাও করতে পারি। কিন্তু গায়ের রক্ত? তা যদি ছোট জাতের হয়ে থাকে। তাকে পাল্টাবো কি করে?’।সত্তর বছর আগে ড.বি আর আম্বেদকর সংবিধানে অস্পৃশ্যতা, বর্ণ বিভাজনকে নির্বাসনে দিলেও ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতিতে আজো তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। এরই মধ্যবর্তী শিকার স্ট্যান স্বামীরা।
রাষ্ট্রের শক্তপোক্ত থাবা, অসার বিচার ব্যবস্থা, ভঙ্গুর কয়েদি ব্যবস্থার ত্রিফলা আক্রমণে ছিলেন স্ট্যান স্বামীরা।নয় মাস জেলে ছিলেন। তার উকিল ছিলেন মিহির দেশাই। চারবার জামিন আবেদন করেছিলেন। করোনার প্রাদুর্ভাব তখন মধ্য গগনে। সাত মাসের কম যাদের সর্বোচ্চ শাস্তি সেই অভিযুক্তদের অন্তর্বর্তী জামিন দেওয়ার কথা বলছে সুপ্রিম কোর্ট। তারই ভিত্তিতে স্বামীর পক্ষ থেকে যখন আবেদন হল তখন এন আই এর পক্ষ থেকে শ্লেষ করে বলা হলো-সুযোগের অপব্যবহার করবেন না। বোম্বে উচ্চ আদালতে এন আই এ জামিনের বিরোধিতা করল। বলল অভিযুক্তর সঙ্গে অনেক আলোচনা বাকি আছে। যথারীতি বেল হলো না। কিন্তু ফাদার স্ট্যান স্বামীর সঙ্গে তারপরে একদিনও দেখা বা আলোচনা করতে এলো না এন আই এ’র কোন আধিকারিক।

স্ট্যান স্বামীর শেষ ভিডিও বার্তা ছিল মুম্বাই হাইকোর্টের সঙ্গে। মেডিকেল বেলের শুনানি। সেই ভিডিও বার্তাতেই তার আক্ষেপ ছিল-“আমি বোধহয় মরেই যাবো”। তাতেও টনক নড়েনি বিচারব্যবস্থার। স্বামী রাঁচিতে ফিরতে চেয়েছিলেন। অনুমতি মেলেনি। একে বলা হয়েছিল-Judicial reluctance to stand for liberty of citizens. রাষ্ট্রের চাপের তাড়নাকে রূপ দেওয়ার জন্য অনেক সময় ছলের ব্যবস্থা করতে হয়। একেবারে মুমূর্ষু চলৎশক্তিহীন ফাদারের জামিন বাতিল করার কারণ স্পেশাল ট্রায়াল কোর্ট দিয়েছিলো–it has no hesitation in concluding that the collective interests of the community world outweigh the applicant’s right to personal liberty. শরীর যখন খুব খারাপ তখন জেল হাসপাতালে যেতে চাননি ফাদার। বলেছিলেন ওখানে গেলে আমি আর বাঁচবো না। অ্যাসিস্ট্যান্ট পাবলিক প্রসিকিউটর তাকে জেল হাসপাতালেই নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এনআইএ প্রাইভেট হাসপাতালে স্ট্যান স্বামীকে নিয়ে যাওয়ার বিরোধিতা করেছিল। ৬ই জুলাই, ঘড়িতে সময় তখন বেলা আড়াইটে। বোম্বে হাইকোর্টে এস এস সিনধে, এন জে জমাদার খুললেন ফাদার স্ট্যান স্বামীর জামিন আবেদনের মামলা। ছুটে এলেন মিহির দেসাই। বললেন হোলি ফ্যামিলি মুম্বাই হসপিটালের ডক্টর ডিসুজা যিনি স্বামীকে চিকিৎসা করছেন তিনি একটি বিবৃতি দিতে চান। দিলেনও বিবৃতি। ‘গভীর বেদনাহত হৃদয়ে জানাচ্ছি ফাদার স্ট্যান স্বামী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন’। ফাদারের লিগেল কাউন্সেল মিহির দেশাই বললেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। অভিযোগ আছে এনআইএ নিয়ে, অভিযোগ আছে জেল নিয়ে। জুডিশিয়াল তদন্ত চাই। কেন ১০ দিন দেরি হলো জেল থেকে হাসপাতালে নিতে ফাদার স্ট্যান স্বামীকে? যে সময়ে ফাদারের আর্তি ছিল-আমাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাও। না হলে আমার শরীরের ক্ষয়ের গতি হারিয়ে দেবে ছোট, ছোট ট্যাবলেটের গতিকে। নিখুঁত অংকের সিঁড়ি বেয়ে এগিয়েছে ঘটনাপ্রবাহ। প্রতিবাদীকে যুক্তিহীনভাবে দানবীয় আইনে সোপর্দ করো। ঠিকমতো বিচার হলে সাজা হবে না। তাই জেলে ফেলে রেখে দাও। জামিনের কথা একদম ভেবোনা। বিচারকে প্রলম্বিত করো। সাক্ষীর সংখ্যা বাড়াও। কোন অসুবিধার দিকে তাকিয়ো না। কিছু না করেই বন্দীদশার সাজাতো পেয়েই গেল। যদি জেলে এমনি এমনিই মরে যায় তাহলেও প্রতিবাদীদের কাছে একটা বার্তা যেতে পারে-তোমার ভবিষ্যৎ এমন হতে পারে।

বাঘে ছুঁলে যেমন আঠারো ঘা ঠিক তেমনি ইউ এ পি এ ছুঁলেও তাই। ইউ এ পি এ- মানে ‘আনলফুল এক্টিভিটিস প্রিভেনশন অ্যাক্ট’। সন্ত্রাসবাদ দমনে দেশের প্রথম আইন। জাতীয় সংহতি পরিষদ সেই সময়ে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং সংহতি রক্ষার্থে এই ধরনের আইনের বাস্তবায়নের সুপারিশ করে। জহরলাল নেহেরু তখন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৬৩ সালে এই সংক্রান্ত এক সংবিধান সংশোধনী হয়। ১৯৬৭-২০০৪ সাল পর্যন্ত ইউ এ পি এ সেই অর্থে সন্ত্রাসদমন সংক্রান্ত আইন ছিল না। বরং এই সময়কালের মধ্যে দেশের প্রথম সন্ত্রাস দমনমূলক আইন TADA চালু হয় ১৯৮৭ সালে। The Terrorist and Disruptive Activities (Prevention )Act, 1987. তদানীন্তন সরকার পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী খালিস্তানি আন্দোলন, সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ দমনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আইন আনে এবং প্রয়োগ করে। ১৯৯৩ সালের ১২ই মার্চ বোম্বের ১২টি জায়গায় সিরিজ বম্বিং হয়। ২৫৭ জন মারা যায়, ১৪০০ জন আহত হয়। এই সময়ে টাডার বহুল প্রয়োগ হয়। সমালোচনার ঝড় ওঠে। বলা হয় অপব্যবহারের সংখ্যাই বেশি। প্রটেকশন অফ ইকোয়ালিটির চেয়ে বৈষম্যের কথা ওঠে। ১৯৯৫ সালে এই আইন প্রত্যাহৃত হয়। ২০০২ সালে বাজপেয়ি মন্ত্রিসভা Prevention of Terrorism Act 2002 প্রণয়ন করে। ঠিক তার আগেই সন্ত্রাসবাদীরা লোকসভার প্রাঙ্গণে ঢুকে তান্ডব চালিয়েছে। ২০০৪ সালে প্রথম ইউপিএ সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঐ আইন বাতিল করেন। কিন্তু ওই বছরই মনমোহন মন্ত্রিসভা ডিসেম্বর মাসে ইউএপিএ আইনে এক অধ্যায় যুক্ত করে। বলা হয় সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপীদের শাস্তি দেওয়ার জন্যই তা করা হচ্ছে। কার্যত POTA বাতিল করলেও তার কুখ্যাত দিকগুলো ইউএপিএতে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়।

২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সন্ত্রাসবাদীরা হানা দেয়। দেশের ১৩৯ জন, বিদেশের ২৬ জনের মৃত্যু হয়। ৩০৪ জন আহত হয়। সেই প্রেক্ষিতেই ১৫ই ডিসেম্বর লোকসভায় একদিনের বিতর্কের পর ইউএপিএকে শক্তিশালী করা হয়। TADA-র কুখ্যাত অধ্যায়গুলোও সন্ত্রাসে দিশাহারা অবস্থায় ইউএপিএ-র মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। রাষ্ট্রসংঘর নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাবিত (১৪৫৬) হয়েছিল-“States must ensure that any measure taken to combat terrorism must comply with all the obligations under international law ….in particular international human rights, refugee and humanitarian law.” এ কথা বলা বাহুল্য যে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেই সতর্কবাণী মান্যতা পায়নি। সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে মৌলিক অধিকার আক্রান্ত হয়েছে, সম্প্রদায়ের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে, যে ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে ঘোলা জলে মাছ ধরেছে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং সন্ত্রাসবাদী শক্তিগুলি।

এই সংশোধনে এই সন্ত্রাস দমন আইনে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে অপরিসীম ক্ষমতা চলে আসে যাকে খুশি সন্ত্রাসবাদী বলার এবং তাকে সহজে আদালতের অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার। এই সংশোধনে সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞায় বিষয়গত বহির্মুখী প্রাধান্য দেখা যায়। যেমন-“Likely to threaten unity, integrity, security or sovereignty of India.” এই সংজ্ঞা থেকেই বোঝা যায় এই আইনের পরবর্তীতে কি হতে চলেছে। সংশোধিত আইনের ৪৩এ তে বলা হয় মোটামুটি ‘বিশ্বাস’ এর উপর দাঁড়িয়ে সন্ত্রাসবাদী বলে একজনকে গ্রেপ্তার করা যাবে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কি তখন না বলে পরে বললেও চলবে। চার্জশিট গঠনের আগে ৯০ দিন পর্যন্ত আটক করে রাখার যে সুযোগ এখানে ছিল, সেটাকেও বাড়িয়ে ১৮০ দিন করা হলো। আইন যখন দানবীয় রূপ পাচ্ছে তার প্রতিটি পদক্ষেপে সেই সময় বাংলা প্রতিবাদ জানিয়েছিল। যা যা সংশোধনী এসেছিল, বিলের ক্লজ ধরে ধরে তার প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। বামেদের ঘোষিত নীতি যে তারা এই ধরনের দানবীয় নীতি বাতিলের পক্ষে প্রকাশ্যভাবে।

ইউএপিএকে সবচেয়ে খারাপভাবে ব্যবহার করার জন্য তাকে পরিবর্তিত করার উদাহরণ ২০১৯ এর সংশোধনীতে। ওই বছরের মে মাসে নির্বাচন, জুন মাসের সরকার গঠন, জুলাই মাসে দানবীয় আইনের আরো দানবীয় পরিবর্তন। কণ্ঠরোধের পদক্ষেপগুলো দরকার ছিল পরবর্তী কার্যক্রমের দিকে তাকিয়ে। রাম মন্দির, তিন তালাক, সি এ এ, কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ, কাশ্মীরকে টুকরো টুকরো করা, সি এ এ, কৃষক আন্দোলন-বিরোধী আন্দোলনের উপর দমন-পীড়ন নামিয়ে আনা ইত্যাদি। এগুলোকে দমন করার জন্য একটা হিংস্র আইনের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল আরএসএসের মাথাওয়ালা বিজেপি সরকারের। ২০১৯-এর সংশোধনীতে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে সংগঠন চিহ্নিত করার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি চিহ্নিত করার পর্ব যুক্ত হয়। যে সংগঠন বা ব্যক্তি সন্ত্রাস করে, সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করে, সন্ত্রাসের প্রস্তুতি গ্রহণ করে, সন্ত্রাসকে উৎসাহিত করে, সন্ত্রাসের সঙ্গে অন্যদের যুক্ত করে, সরকার তাদের চিহ্নিত করতে পারবে।
এই সংশোধনীতেই সরকার Code of criminal procedure-কে নিজের মতো সাজিয়ে নিয়েছে। Remand-এর অর্ডারে আগের ১৫ দিন সময়কে বাড়িয়ে ৩০ দিন করা হয়েছে। এই আইনে আগে ছিল কোন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে গেলে সেই রাজ্যের ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশের প্রাক অনুমতি নিতে হবে। সংশোধনীতে বলা হলো ন্যাশানাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির কোন অফিসার যদি তদন্ত পরিচালনা করে তাহলে কেবলমাত্র সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পর এনআইএ-র ডিরেক্টার জেনারেলের অনুমতি থাকলেই চলবে। আগে ছিল ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অথবা অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অফ পুলিশ স্তরের কেউ তদন্ত পরিচালনা করবেন। সংশোধনীতে বলা হলো এনআইএ-র ইন্সপেক্টর স্তরের আধিকারিক তদন্ত পরিচালনা করতে পারবেন।

আসলে এই সংশোধনী যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর এক ধরনের আস্থাহীনতাকে প্রকাশ করেছে। পুলিশ রাজ্যের এক্তিয়ারভূক্ত। সংবিধানের সপ্তম তফসিল অনুযায়ী। অথচ তাকে পুরোপুরি এড়িয়ে এনআইএ-কে খোলাখুলি অক্ষ দিয়ে এক আইনবহির্ভূত শাস্তি দানের প্রক্রিয়া তৈরি করা হয়েছে। এই সংশোধনীতেই অভিযুক্তকে ‘innocent until proven guilty’-র পরিবর্তে প্রথম থেকেই দোষী ধরে নেওয়া হয়েছে। সন্ত্রাস দমনের পরিবর্তে এই আইনে গণতন্ত্রের উপর, মানবিক অধিকারের উপর, নাগরিকের স্বাধীনতার উপর আক্রমণের ঝোঁকটাই বেশি। সন্ত্রাসবাদী কে?-তার সংজ্ঞা সম্পর্কে কোনো আলোচনা করা হয়নি। সন্ত্রাস দমনের আইন উল্টে জনগণকে সন্ত্রস্ত করেছে।

মৃত্যুর দু’দিন আগে (৩রা জুলাই,’২১) স্ট্যান স্বামী বোম্বে হাইকোর্টে আনলফুল অ্যাকটিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট(ইউ এ পি এ)এর ৪৩ডি(৫)কে চ্যালেঞ্জ করেন। বলেন ধারাটি আসলে একটি অলীক স্বপ্ন। এই ধারাতে একজন অভিযুক্তর জামিন পাওয়া বিচারের যুক্তিগ্রাহ্যতায় প্রায় অসম্ভব বললেই চলে। এই ধারা একজন ব্যক্তির সংবিধান প্রদত্ত জীবন আর স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারকে হরণ করে।

২০১৫-২০১৯ এই চার বছরে ইউএপিএতে গ্রেপ্তার হয় ৭৮৪০ জন। আদালতে বিচারে সাজা পায় ১৫৫জন। অর্থাৎ ২ শতাংশের নিচে। ২০১৫ এর তুলনায় ২০১৯এ ইউ এ পি এ তে রেজিস্টার্ড কেসের সংখ্যা বেড়েছে ৭২ শতাংশ। গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৯৪৮ জন, মামলা হয়েছে ১২২৬ টি। এন আই এ-এর স্পেশাল কোর্টে এখন ৪৮টি মামলা চলছে। ইতিমধ্যেই ৪২টি সংগঠনকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মানবাধিকার লুটোপুটি খাচ্ছে ধুলোয়।

ব্রিটেনের করিওয়ালে জি-৭ সামিট হয়ে গেল। দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত ছিল বিশেষ আমন্ত্রিত সদস্য। সেখানেই সই হলো- ওপেন সোসাইটিজ স্টেটমেন্টে। সই করলেন নরেন্দ্র মোদি। যেখানে সই করলেন, সেখানে লেখা আছে- “we are at a critical juncture facing threats to freedom and democracy”। সই হলো উত্থিত স্বৈরাচারকে একত্রিত মোকাবিলার জন্য। সই হলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ইন্টারনেট শাটডাউনের বিরুদ্ধে। মোদি এবং মানবাধিকার! অনেকটা ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’-এর মত। বিশ্বের ৭০ শতাংশ ইন্টারনেট শাটডাউনের ঘটনা এবং অবশ্যই তা রাজনৈতিক কারণে ঘটেছে আমাদের দেশে।

সম্প্রতি সমীক্ষায় প্রকাশিত হয়েছে প্রেসের স্বাধীনতা সম্পর্কে প্রতিবেদন। আমাদের দেশের অবস্থান ১৮০ দেশের মধ্যে ১৪২। ইনফরমেশন এন্ড টেকনোলজি, সংক্ষেপে আইটি রুলস্সে এখন অনেক সরকারি নিষেধাজ্ঞা। সেন্সরশিপে চলছে খেয়ালী অভিযান এবং রাজনৈতিক স্বজনপোষণ। অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ওয়েবসাইটগুলোর উপরে চলছে খুললাম খুল্লা নজরদারি। সাম্প্রতিক অতীতে ২৭ বছর বয়সী গর্ভবতী সাফুরা জারগারকে ইউ এ পি এ তে গ্রেফতার করা হয়েছে। সরকারের লজ্জা হয়নি। আমাদের লজ্জা হয়েছে। দিল্লির সংখ্যালঘুর কমিশনের চেয়ারম্যান জাফরুল ইসলাম খান, তাকেও দেশদ্রোহী বানানো হয়েছে। ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪ এ ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। The Wire-এর চিফ এডিটর রাজরোষে পড়েছেন।

প্রথম লকডাউনের ঠিক আগে মোদি ডেকেছিলেন সব মিডিয়া হাউজের এডিটর এবং মালিকদের। মোদি তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন- ভালো থাকুন, পজিটিভ খবর করুন, নেগেটিভ খবর করবেন না। ইশারা হি কাফি হ্যায়। কাগজের এডিটররা এতক্ষণে বুঝে নিয়েছেন মোদী কি বলতে চান, আর তাদেরই বা কি করতে হবে। মোদিরা বহুগুণা। তাদের বাঙালি নেতা শ্যামাপ্রসাদের জেল হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিবাদে ‘আত্ম-বলিদান দিবস’ পালন করেন, আর নিজেরা সরকারে থেকে জেলে পচিয়ে মানুষ মারেন। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে আদালতের নিরপেক্ষতার জায়গাটা তৈরি করা খুবই জরুরী। আলোচনা এটাও চলছে যে এক্সজিকিউটিভের পদানুসারী হওয়াটা জুডিশিয়ালের খুব একটা প্রয়োজনীয় নয়।

এ বছরের জুলাই এর ৫ তারিখে স্ট্যানকে ‘খুন’ করা হয়েছে। সে ছিল দেশদ্রোহী -অন্তত মৃত্যুর আগে সরকার, এন আই এ, আদালত বারবার তাই বোঝানোর চেষ্টা করেছে। ১৯ শে জুলাই মুম্বাই হাইকোর্টের সেই দুই বিচারপতি এস এস সিন্ধে, এন জে জমাদার ফাদার স্ট্যান স্বামীকে মরণোত্তর জামিন দেওয়া যাবে কিনা সেই নিয়ে শুনানি করেন। এর আগে তারা চারবার ফাদারের জামিন নামঞ্জুর করেছেন। সেই দিন তারা সেই রাষ্ট্রদ্রোহী সম্পর্কে ঠিক কি বলল শুনুন—“তার শেষকৃত্য দেখেছি। তিনি ভালোমানুষ ছিলেন। তার শোক শেষযাত্রা দেখেছি। সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতা মুগ্ধ করে। তার কাজের প্রতি আমাদের অগাধ শ্রদ্ধা। আইনত যা বিষয় -তা অবশ্য আলাদা।” Reason has always existed, but not always in a reasonable form – কার্ল মার্কসের কথা।

[লেখক – সমাজকর্মী, প্রাক্তন সাংসদ।]

Facebook Comments

Leave a Reply