স্বাধীনতা ও ইউএপিএ : অরূপ বৈশ্য

ভারতবর্ষ যখন ব্রিটিশ উপনিবেশ শক্তির প্রত্যক্ষ শাসন থেকে মুক্ত হয়, সেই ভারত ছিল অত্যন্ত অনুন্নত। সামাজিক উৎপাদনী সম্পর্কও ছিল পিছপড়া। মাথা পিছু আয় ছিল খুবই নগণ্য, অর্থনীতি বিধ্বস্ত। ভারতীয়দের গরিষ্ঠাংশ ছিল দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টিতে জর্জরিত। সেরকম একটি দেশে সাংবিধানিক গণতন্ত্র কায়েম হয়। সাংবিধানিক গণতন্ত্রকে অনেকে বুর্জোয়া গণতন্ত্র বলেও অভিহিত করেন। এই বুর্জোয়া গণতন্ত্র বলার মধ্যে কিছুটা সত্যতা রয়েছে, কিন্তু তাতে বাস্তবের সম্পূর্ণ দিক সম্পর্কে ধারণা করা যায় না। কারণ সাংবিধানিক গণতন্ত্র এমন একটি দেশেই পূর্ণাঙ্গ বিকশিত হতে পারে যেখানে আধুনিক পণ্যের বিনিময়ের সম্পর্ক এবং আধুনিক শ্রমিক শ্রেণি বাস্তবের প্রধান দিক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। অর্থাৎ শ্রম-শোষণের মাধ্যম হিসাবে বলপ্রয়োগ একটি ধারা হিসাবে থাকলেও প্রধান দিক নয়। মূল্যের সৃষ্টি ও মূল্যের নিয়ম উদ্বৃত্ত শ্রম আত্মসাৎকে সুনিশ্চিত করেছে। বলপ্রয়োগের জন্য শুধু রয়েছে পুলিশী ব্যবস্থা, কিন্তু সেই ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক আইনের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের কাছে জবাবদিহি। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের চূড়ান্ত রূপকে নির্ধারণ করে যে সমাজ সেখানে প্রকৃত উৎপাদককে উৎপাদনের উপকরণ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে, উৎপাদককে করেছে উপভোক্তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন, ছিন্ন করেছে মানসিক শ্রম থেকে কায়িক শ্রম, ছিন্ন করেছে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক। সমগ্র পণ্যের সর্বজনীন সমতুল্য রূপ ‘মুদ্রার’ সাথে পণ্যের বিনিময়ের যে ক্রিয়া, পণ্য সঞ্চালনের এই ক্রিয়ার সাথে সামঞ্জস্য রেখে রয়েছে আইন, সংবিধান – বিনিময়ের এই ক্রিয়ায় পণ্যের ব্যবহারের মনের ইচ্ছা অব্যক্ত ও অচেতন। এটা এমন এক অবস্থা যেখানে পণ্য-উৎপাদনে শ্রমিককে তার জীবন্ত শ্রম শুষে নিয়ে পুঁজির অন্তর্নিহিত অপর উপাঙ্গ করে নিয়েছে এবং ‘কমোডিটি ফেটিশ’ তৈরি করেছে অচেতন ‘ভ্যাম্পায়ার’। মার্কসীয় ব্যাখ্যায় পুঁজির আধিপত্য প্রতিষ্ঠায়ও শ্রেণিসংগ্রামের তাৎপর্য এখানেই নিহিত। আবার এই শ্রেণিসংগ্রামের ধারাবাহিকতায় এই অচেতন যখন চেতনের স্তরে উন্নীত হতে সচেষ্ট হয়, তখনই শুধু প্রয়োজন রাষ্ট্রের ও তার বল-প্রয়োগের হাতিয়ার ব্যবহারের – অন্যথায় সেই হাতিয়ারগুলি শুধুমাত্র মনোজগতে ভীতির একটি অস্পষ্ট অবয়ব হিসাবে বিরাজমান।

স্বাধীন ভারতের জন্মলগ্নে তাহলে কী এমন ঘটল যা এক সাংবিধানিক গণতন্ত্রের সূচনা করতে সক্ষম হলো? সাধারণভাবে একথা নিশ্চয়ই বলা যায় যে আইন ও সংবিধানের মত উপরিকাঠামো সামাজিক সম্পর্কের কাঠামো দিয়ে নির্ধারিত। কিন্তু যেহেতু সামাজিক সম্পর্ক নিয়ত পরিবর্তনশীল, তাই কাঠামো ও উপরিকাঠামোর সম্বন্ধ কোন সমীকরণ বা গণিতের ঐকিক নিয়ম দিয়ে ব্যক্ত করা যায় না। বরঞ্চ এই সম্বন্ধকে ব্যক্ত করার জন্য জ্যামিতিক মডেলের এক স্থির চিত্রের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। যদি সামাজিক সম্পর্ককে কেন্দ্র হিসাবে ধরে নেই, তাহলে এই কেন্দ্র এমন এক বৃত্ত তৈরি করে যার ব্যাসার্ধের যে কোন স্থানে কিংবা পরিধিতে উপরিকাঠামো অবস্থান করতে পারে। তার বাইরে যেতে হলে বৃত্ত ভাঙতে হয় অর্থাৎ সামাজিক সম্পর্কের আমূল পরিবর্তন করতে হয়। বৃত্তের এই স্থির চিত্রে অবস্থিত দু’টি বিষয়ই জীবন্ত – কেন্দ্রাতিগ ও কেন্দ্রাভিগ পরস্পর বিপরীত টানে পরিবর্তনশীল এবং একে অপরকে প্রভাবান্বিত করে – কিন্তু কেন্দ্রের দ্বারা সর্বদা নির্ধারিত হয়। স্বাধীন ভারতের জন্মলগ্নে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ইউরোপীয় রেনেসাঁয় আলোকপ্রাপ্ত ছিলেন, প্রভাবিত হয়েছিলেন সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজবাদ গঠন প্রক্রিয়ায়। এই দু’য়ের সংমিশ্রণে ভারতের মত পিছিয়ে পড়া সামাজিক সম্পর্কে সর্বাধিক যতটুকু সাংবিধানিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব তা করায় ব্রতী হয়েছিলেন। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কোন গণ-মিলিশিয়া গড়ে ওঠেনি যাকে ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, আজাদ হিন্দ ফৌজের বাহিনীকেও ভারতের স্থায়ী সৈন্য বাহিনীর সাথে যুক্ত করার ইচ্ছা তাদের ছিল না। ফলে ব্যবস্থাগতভাবে গণতন্ত্রকে বিকশিত করার বিশেষ নির্ধারক কোন শক্তি ছিল না। যা ছিল তা হলো স্বাধীনতা সংগ্রামের গর্ভে জন্ম নেওয়া ভাষিক আঞ্চলিক আকাঙ্খাগুলি বা বলা যায় ভাষিক বৈচিত্র্যকে মেনে নিয়ে ব্যবস্থার একটি সুস্থির কাঠামো তৈরির বাধ্যবাধকতা। এই বাস্তবতায় ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের উপযোগী বহু আইনকে রেখে দেওয়া এবং সে ধরনের আরও আইন তৈরি করার ক্ষেত্রে কোন বাধা ছিল না কিংবা এগুলিকে নাকচ করার কোন সচেতন উপলব্ধি গণ-মানসে জেগে ওঠারও কোন কারণ ছিল না। সেডিশন আইন বা ইউএপিএ এই উপনিবেশিক লিগেসির প্রতিফলন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে কেন যে সশস্ত্র বাহিনী বিশেষ ক্ষমতা আইন বা এএফএসপিএ বলবৎ রয়েছে তা বোঝা মুস্কিল, কারণ প্রচলিত আইনই সরকার ঘোষিত সন্ত্রাস দমনের জন্য যথেষ্ট। কেউ কেউ মনে করেন,এই আইনের অধীনে যে ব্যয় হয় তা যেহেতু অডিটের আওতায় আসে না, তাই এই আইন বলবৎ রাখার পক্ষে এক শক্তিশালী লবি রয়েছে। এই আইনগুলি বাতিলের বিষয় মানব অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে সমাজকর্মীদের মধ্যে আলোচিত হলেও সাধারণ কিংবা সচেতন নাগরিক সমাজকে এগুলি নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাতে দেখা যায়নি।

বর্তমান সময়ে রাষ্ট্র যেমনি এই আইনগুলির বেশি বেশি প্রয়োগ শুরু করেছে, ঠিক তেমনি এই আইনগুলির বিরুদ্ধে জনমত গঠনের প্রচেষ্টাও বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ঘটনাগুলি ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণকে সূচিত করে। ইউএপিএ আইন চালু হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। কেন সেই সময় চালু হলো সেব্যাপারে একটি ধারণা করা যায়। সেই সময়কাল ছিল বিশ্ব-পুঁজিবাদের নতুন করে কাঠামোগত দীর্ঘকালীন সংকটের মধ্যে প্রবেশের সময়। মানুষের জীবনধারণ সুনিশ্চিত করতে ব্যর্থ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী গণ-বিক্ষোভের সময় সেটা। ভারতেও নকশাল বাড়ি বিদ্রোহে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ – চেনা সবকিছুকেই, স্থবিরতার সমস্ত আয়োজনকেই ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার পণ করেছে একদল বিপ্লবী স্বপ্নদ্রষ্টা – সাধারণ মানুষও সেই স্বপ্নের সাথে একাত্ম হওয়ার খোঁজ নিতে শুরু করেছে। তাতে ছিল পুরো ব্যবস্থাকেই বদলে দেওয়ার অঙ্গিকার, দমনই ছিল শাসক শ্রেণির একমাত্র উপায়। এই বিদ্রোহ সীমিত ছিল না আইন বাতিলের বা আইন সংশোধনের রিফর্মিস্ট এজেন্ডার মধ্যে – এই বিদ্রোহ ছিল মূলগতভাবে সামন্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে কষকদের বিদ্রোহ – কৃষি বিপ্লব বুর্জোয়া গণতন্ত্রের ঘাটতি নিয়ে সচেতন ছিল না। ফলে এই বিদ্রোহ যখন বিফল হয় – শাসকশ্রেণির যুগপৎ সীমিত ভূমিসংস্কার ও দমনমূলক আইন প্রয়োগ যখন সফলতার মুখ দেখে, তখন বিদ্রোহের ধারাবাহিকতায় এক কদম পিছু হঠে ব্যবস্থার অভ্যন্তরে এই আইন বাতিলের সচেতন গণ-আওয়াজের আর কোন অবকাশ থাকে না। বিদ্রোহের পরাজয় ছিল নির্ণায়ক, এটা শুধু ভারতে নয়, উনিশ আশির দশকের মধ্যে সমগ্র বিশ্বজুড়েই প্রতিস্পর্ধী শক্তির পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে শাসকশ্রেণির পুরনো বোতলে নতুন নিয়মের কাছে আত্মসমর্পণের যাত্রা শুরু হয়। আবার শুরু হয় স্থিতাবস্থার এক দীর্ঘ পর্যায়।

নয়া-উদারবাদী নীতির সাফল্যের যে কাহিনীগুলি প্রথম পর্যায়ে নির্মিত হচ্ছিল, তা দ্রুত মুখ থুবড়ে পড়ে। পুঁজিবাদের পথিকদের থেকে নয়া-উদারবাদের সাফল্যের গালগল্প এখন আর বিশেষ শোনা যায় না। এই নীতি যে পুঁজিবাদের গভীর সংকট নিরাময়ের কোন পথ নয় সেটা আজকাল প্রায় সবাই প্রকাশ্যে বা গোপনে মেনে নিয়েছেন। পুঁজিবাদী পুনর্গঠনের বিকল্প পথটিও ভীষণ কণ্টকাকীর্ণ, তাতে যে কাঁটা বিঁধবে – রক্ত ঝরবে, তা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে কিনা এব্যাপারেও পুঁজিবাদের পথিকরা নিশ্চিত নন। তাই একধরনের নীতি-পক্ষাঘাতে ভুগছে পুঁজিবাদী দুনিয়া। যে কালাকানুনগুলি সংবিধানে সন্নিবিষ্ট করা হয় কিংবা নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়, তার প্রয়োগের কথা ভাবা হয় আপৎকালীন পরিস্থিতিতে। একটি শোষণমূলক সমাজে শাসকশ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী দলসমূহ যে আপৎকালীন পরিস্থিতির কথা ভেবে সর্বদাই শঙ্কিত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এই আপৎকালীন পরিস্থিতিটি কি? মার্কস বলেছিলেন, একটি সমাজের আধিপত্যকারী মূল্যবোধ হচ্ছে শাসকশ্রেণির মূল্যবোধ। মার্কসের এই বক্তব্যকে প্রসারিত করে বলা যায় প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা ও সামাজিক সম্পর্কও শাসকশ্রেণির অনুকূল। সেই আধিপত্য যতক্ষণ যুগপৎ ব্যবস্থা ও মূল্যবোধের উপর কায়েম থাকে ততক্ষণ এই কালাকানুনগুলির প্রয়োগ নিয়ে শাসকশ্রেণি মাথা ঘামায় না।

কিন্তু তাদের সর্বদা সতর্ক থাকতে হয় শাসকশ্রেণির নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার পরিণতি নিয়ে। এখানেও মার্কসকে স্মরণ করা যায়। মার্কস বলেছিলেন পুঁজির গতিকে নির্ধারণ করে পুঁজিপতিদের মধ্যেকার প্রতিযোগিতা। বর্তমান যুগের ‘সিজাররা’ ব্রুটাসের শেষ ছুরিকাঘাতের জন্য অপেক্ষা করে থাকে না, ছুরির ফলা ভেদ করে যখন দেহে প্রবেশ করে তখনই শুধু চিনতে পেরে বলে ওঠে না, “ব্রুটাস তুমিও”। কারণ পুঁজিবাদের এই যুগে শাসকশ্রেণিও পরস্পর পরস্পরের সাথে একটি সাধারণ স্বার্থে এক হয়ে থাকে। এই স্বার্থটি হচ্ছে মুনাফা, আরও মুনাফা – পুঁজির সঞ্চয়, আরও সঞ্চয় – সঞ্চয়ই হচ্ছে ঈশ্বর, আল্লাহ ও গড। সেই স্বার্থই যখন চূড়ান্ত রূপ নেয় – সংকট যখন ঘনীভূত হয় – তখনই বর্তমান যুগের অ্যান্টোনিওরা জেগে ওঠে – এই অ্যান্টোনিওরা আজকের শ্রমিকশ্রেণি যারা জনগণকে উজ্জীবিত করে তোলে অতীত শাসনের দিকে তাকিয়ে নয়, ভবিষ্যৎ সমাজ ব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে – সিজার, ব্রুটাসরা পালিয়ে বাঁচে।

স্বাভাবিক স্থিতিশীল স্থবির পরিবেশে যে শাসকশ্রেণি নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে, তখন এই কালাকানুন ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। ১৯৬৯ সালের জারি করা ইএউপিএ’র সময়ের অভ্যন্তরে শাসকশ্রেণির যে সংকট ঘনীভূত হচ্ছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ইমার্জেন্সি। শ্রমিকশ্রেণি তথা জনগণের যে জাগরণ শাসকশ্রেণিকে উৎখাত করতে পারত, শাসকশ্রেণির সৌভাগ্য যে সেই জাগরণ এক সম্পূর্ণ বিকশিত রূপ ধারণ করেনি। আশির দশকের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রাথমিক সাফল্য রং বেরং-এর শাসকশ্রেণির দলগুলিকে এক ঘাটে জল খাওয়ার সুযোগ করে দিল। কিন্তু তাদের এই সুদিন খুব বেশি স্থায়িত্ব পেলো না, ফলে বাবরি ধ্বংসের মত ফ্যাসিবাদী গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শাসকশ্রেণির একাংশের সাথে মিলে সঙ্ঘ পরিবার ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ গড়ার লক্ষ্যে সাংবিধানিক গণতন্ত্রের সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। সঙ্ঘ পরিবারের এই সর্বগ্রাসী পরিকল্পনার রাজনৈতিক মুখ হচ্ছে বিজেপি যে দল রয়েছে বর্তমানে কেন্দ্রের শাসন ক্ষমতায়। কিন্তু ফ্যাসিবাদী ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ গড়ার জন্য শুধুমাত্র ‘হিন্দু গ্রোথ রেটের’ গল্প শোনানোই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন জনগণের অন্তত বেঁচে থাকার গ্যারান্টি থাকা একটি সুস্থির অর্থ-ব্যবস্থা। সেই অর্থ-ব্যবস্থাটি নড়বড়েই শুধু নয়, ক্রমাগত গভীর খাদের দিকে ধাবমান। সেখানেই তৈরি হয়ে যায় সেই বাস্তবতাটি যেখানে শ্রমিক-কৃষক বিদ্রোহ করতে পারে, গড়ে তুলতে পারে শ্রেণি মৈত্রী যে শ্রেণি মৈত্রী নির্ণায়ক রূপে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম দলিত-সংখ্যালঘু সহ সকল ধরনের প্রাক-পুঁজিবাদী নিপীড়নের বিরুদ্ধে, কেড়ে আনতে পারে নাগরিকত্বের নির্ণায়ক সাংবিধানিক অধিকার।

এই পরিস্থিতিকে মার্কসীয় ধারণা থেকেও বিচার করা যায়। ‘স্বাধীনতার’ পর থেকে সবুজ বিপ্লবের পথ বেয়ে এবং বিশেষ করে বিগত কয়েক দশক ধরে উৎপাদিকা শক্তির প্রভূত বিকাশ হয়েছে, উৎপাদনের উপকরণে আমূল আধুনিকীকরণ ও মজুরি শ্রমিকের সংখ্যাধিক্য নির্ধারিত করেছে এই উৎপাদিকা শক্তিকে। এই বিকাশ এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে পুরনো উৎপাদনী সম্পর্ক তাকে আর ধারণ করতে পারছে না। ফলে যে সংঘাতের সৃষ্টি হচ্ছে সেই সংঘাতের বিকাশ বিপ্লবী রূপান্তর দাবি করে। ভারতের মাটিতে বিপ্লবের এই সোঁদা গন্ধ সমগ্র শাসকশ্রেণিই শুঁকছে। এটা যে এক মস্ত বিপদ – এ প্রশ্নে বিজেপির পরম মিত্র আদানি আম্বানীদের সাথে টাটা বিড়লাদেরও কোন বিরোধ নেই। এই বিপদের সম্ভাবনাই বিজেপি বিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী সমীকরণ ছাড়া ইমার্জেন্সির সময়ের মত কোন গণ-আন্দোলন গড়ার উদ্যোগ থেকে বিরত রাখছে। কালাকানুন বাতিলের দাবির প্রতি বিজেপি-বিরোধী শক্তিরও তেমন কোন আগ্রহ নেই।

এই বিপদ কখন কোথা থেকে যে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে, তার কোন পূর্বানুমান লাগানো যে দুঃসাধ্য, শাসকশ্রেণি সেটা বোঝে। ইতিমধ্যে নাগরিকত্ব আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, উচ্ছেদ বিরোধী প্রতিরোধ ইত্যাদি থেকে শাসকদল তটস্থ হয়ে রয়েছে, বিরোধী দলগুলি এগুলিকে নির্বাচনী রণনীতিতে আত্মস্থ করার প্রহর গুনছে। তাই শাসকদল অতি সতর্ক, মানবাধিকার তথা নিপীড়িত মানুষের অধিকারের প্রশ্নে যেসব সমাজকর্মী আন্তরিক এবং সাম্যবাদী না হয়েও যারা এক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ চান তাদের দিক থেকেও শাসকদল বিপদের আঁচ করছে। তার পরিণতিই হচ্ছে কালাকানুনগুলির যথেচ্ছ ব্যবহার।

অন্যান্য সবার মত প্রয়াত ফাদার স্ট্যান স্বামীর সামাজিক ভূমিকাও ভীত সন্ত্রস্ত শাসকদলকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। কারণ ফাদার স্ট্যান জেল ও আইন ব্যবস্থাকে বিদ্ধ করেছেন শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করে – তিনি বলেছেন যত বেশি গরিব ততো বেশি ‘কাস্টোডিয়্যাল টর্চার” এবং তা বলেই শুধু ক্ষান্ত থাকেননি – ঝাড়খণ্ডের গরিব জনজাতি জনগোষ্ঠীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার তালিকা প্রস্তুত করেছেন এবং এই মামলা থেকে তাদের মুক্ত করতে আইনি লড়াই লড়েছেন। কর্পোরেট স্বার্থে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের পক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি লড়েছেন আপসহীন লড়াই। ফাদার স্ট্যান ছিলেন ‘লিবারেশন থিওলজিস্ট’, মার্কসকেও তাঁর জ্ঞানতত্ত্বের জার্নির শুরুতে অনুরূপ চিন্তার অধীন হিসাবে আমরা আবিষ্কার করতে পারি। ফাদার স্ট্যান নিজেই বলেছেন যে তিনি ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা এবং পুনের ঘটনার সাথে তাঁর কোন সম্পর্ক নেই – ‘ভীমা কোরেগাঁও’ অছিলা মাত্র, আসলে বৃদ্ধ অসুস্থ ফাদার কেন যে বিপদজনক হয়ে উঠলেন কর্পোরেট সেবাদাসদের কাছে তার কারণ দ্বিতীয় পরিপূরক চার্জশিট থেকে ধারণা করা যায়, এবং ফাদার স্ট্যান স্বামী যাতে জেলেই বেঁচে থাকেন অথবা মৃত্যু বরণ করেন তা সুনিশ্চিত করতেই তাঁর বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেওয়া হল ইউএপিএ। পরিমাণগত ভাবে আলাদা হলেও গুণগত ভাবে অন্যান্য বিরোধী দলগুলির এ প্রশ্নে অন্তত আলাদা কোন ভূমিকা নেই, কারণ শেষবিচারে তারাও শাসকশ্রেণিরই আরেকটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এরকম সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক কর্মীরা যারা জেলবন্দী রয়েছেন তার তালিকা নিশ্চয় বানিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে, যতদিন এই সংকট থাকবে এবং প্রতিনিয়ত গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকবে, ততদিন শাসকদল সমাজকর্মীদের মধ্যেও দেশদ্রোহীদের ছায়া দেখে চমকে উঠবে। চমকে গিয়ে যেদিন ভেঙে পড়বে সেদিনই ভারতবাসী পাবে বুর্জোয়া স্বাধীনতার অর্থে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ, মানুষ হিসাবে প্রকৃতির অঙ্গ হিসাবে সৃজনশীল উপলব্ধিতে স্বাধীন হতে করতে হবে আরো অনেক দূরের ভ্রমণ, সেটা স্বপ্ন হলেও সত্যি।

[লেখক – কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, পিসিসি-সিপিআই(এম-এল)]

Facebook Comments

Leave a Reply