প্রতিবাদে লাল, প্রতিরোধে নীল: স্ট্যান স্বামীর স্মৃতিতে ইউ.এ.পি.এ আইন হোক বাতিল : ড: প্রতীপ চট্টোপাধ্যায়

fail

হঠাৎ করেই চলে গেলেন স্ট্যান স্বামী ভারতের স্বাধীনতার ৭৫তম উদযাপনের মুলে প্রশ্নচিহ্ন তুলে ভারতে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের স্বাধীনতার মাত্রা নিয়ে| নিজের মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিনের আগেই যখন জামিনের আবেদন করেছিলেন তখন জানতেনই না যে তার অন্তিম সময় আসন্ন| আসলে এই মৃত্যু ব্যক্তির মৃত্যু নয়, এই মৃত্যু একটি ব্যবস্থার বেঁচে থাকার ইঙ্গিত, যে ব্যবস্থা ‘প্রতিবাদ’-কে ‘মাওবাদ’ বলে, আর ‘প্রতিরোধের’ কণ্ঠ রোধ করে স্বাধীনতার প্রণালীতে রক্ত চলাচল বন্ধ করে নীল করে দেয়| স্ট্যান স্বামী নীলকণ্ঠের মতন সব যন্ত্রণা নিজের মধ্যে নিয়ে চলে গেলেন আর কিছুদিনের মধ্যেই সবাই ভুলেও যাবে কি তার নাম আর তিনি কে ছিলেন| এই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান নিবন্ধ ভারতে আগামী কয়েক প্রজন্মের জন্য কিছু প্রশ্ন তুলে ধরতে চায় যা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে|

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর পদাতিক কবিতার বইতে লিখেছিলেন ‘লোক টা জানলই না’ শিরোনামের একটি কবিতা| যেখানে লেখা “বা দিকের বুক পকেটটা সামলাতে সামলাতে হায় হায়, কখন তার ইহকাল পরকাল চলে গেল, লোকটা জানলই না| কিন্তু আর একটু নিচে হাত দিলেই সে পেতো আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ, তার হৃদয়”| স্ট্যান স্বামী কিন্তু “আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ” (পড়ুন হৃদয়) পেয়েছিলেন খুঁজে আদিবাসীদের মাঝে, আদিবাসীদের সাথে, আদিবাসীদের মুক্তি ও আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে সরব হয়ে| কিন্তু সরকারে যারা আছেন, যে কোনো স্তরেই, কেন্দ্র হোক বা রাজ্যে, দলমত নির্বিশেষে সবাই শুধু বা-দিকের বুক পকেটটাই হাতড়ে বেড়ায় (পড়ুন ক্ষমতা কাঠামোর লোভ)আর তাই প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের ভাষা তাদের কাছে অর্থহীন লাগে| ভারতের ইতিহাসে রয়েছে জরুরি অবস্থার মতো স্বাধীনতার কণ্ঠ রোধ করা অধ্যায় কিন্তু তবু সেই সময়ে অস্থির উত্তাল পরিবেশের(সম্পূর্ণ ক্রান্তি আন্দোলন) ওপর নিয়ন্ত্রণ স্বরূপ এই পদক্ষেপ কিছুটা হলেও মেনে নেওয়া যেতে পারে আর ভারতীয় সংবিধানে সেই সময়েই ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দ দুটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল সেটাও মনে রাখা দরকার| কিন্তু আজকের সময়টা ভারতবর্ষে খুবই কঠিন সময়ে যেখানে ‘গণতন্ত্রে’-র নাম নিয়ে চলছে ‘সংখাগরিষ্ঠতন্ত্র’ আর ‘উন্নয়নের’ নাম নিয়ে চলছে ‘সার্বভৌমত্বের নিদর্শন স্থাপন’ সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বা পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর অভাব অভিযোগ অনুযোগ নিয়ে ভাবার সময় কোথায় ? স্ট্যান স্বামী আসলে প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন একটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আর যে প্রশ্নগুলি তিনি তুলে দিয়ে গেলেন সেগুলো হলো:

(১) রাষ্ট্র তার একদম প্রান্তিক নাগরিকদের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করে কিন্তু তার সঠিক সহজ বাস্তবায়নের কথা ভাবে কি?

(২)রাষ্ট্র ইউ.এ.পি.এ-র মতন কালা আইনকে কিভাবে খেয়াল খুশী মতো ব্যবহার করতে পারে? (৩) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক বলেই কি স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু অনিবার্য হয়ে গেল যেখানে একই “দোষে” দুষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা ছাড়া পেয়ে গেলেন?

(৪) স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুর পরেও ৭৫তম স্বাধীনতা দিবস এত ধুমধাম করে উদযাপন করে সারা দেশ মেতে ওঠে আনন্দে? এমনকি যে গণমাধ্যম স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু নিয়ে কদিন আগেই সরব হয়েছিল বা যে নাগরিকেরা দুঃখ প্রকাশ করলেন তারাও ভুলে গেলেন? তাহলে আমরা কি বাস করছি ‘কৃত্রিম আবেগের’ যুগে?

(৫)প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মধ্যে রাষ্ট্রের মূল ধারাকে প্রশ্ন করলেই মাওবাদী বলে দমিয়ে রাখাই কি স্বাধীনতার ৭৫তম বছরে আমাদের প্রাপ্তি?আসলে স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুর ঘটনা একটি মৃত্যু নয়, এটি একটি হত্যা| আর হত্যার বিচার হওয়ার আশু প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা কি হতে পারে?

(৬)বামপন্থীরা হয়ত সঠিক অর্থেই ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’ বলে এতদিন জাতীয় পতাকা তুলতেন না তারা এবারে যখন স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুর মর্মে সত্যি ভারতের পতাকা অর্ধনমিত রাখার কথা, সেই সময়ে বামপন্থীরা রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় ভারতে জাতীয় পতাকা স্বাধীনতা দিবসে ওড়ালেন তাহলে নিপীড়িতদের পাশে কে থাকবে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে যদি সবাই একই স্রোতে গা ভাষায়? এই নিবন্ধে এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার প্রচেষ্টা করবে|

স্ট্যান স্বামী আদিবাসীদের জন্য তৈরি হওয়া কর্মসূচীগুলি বাস্তবায়ন করার জন্য আদিবাসীদের অংশগ্রহণের ওপর জোর দিতে চেয়েছিলেন| আজ স্বাধীনতার ৭৫তম বছর পেরিয়েও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসূচিগুলো রূপায়ণের ক্ষেত্রে জনগোষ্ঠীদের অংশগ্রহণের অভাবটাই সব থেকে বেশি চোখে পরে| স্ট্যান স্বামী সেই জায়গাটাতেই আঘাত হানতে চেয়েছিলেন| কিন্তু রাষ্ট্র তার নিজস্ব অভ্যস্ত কাঠামোর বাইরে যেতে চায়নি বলেই তাঁর কণ্ঠরোধ করার সর্বোচ্চ প্রয়াস রাষ্ট্র করেছে ইউ.এ.পি.এ-র মতন আইনকে লালন পালন করে| আসলে ‘মাওবাদী’ বা ‘দেশদ্রোহী’ বলে আটক করে নিলেই অন্যদের মধ্যে একটা ভীতি তৈরি হয়ে যায়| স্ট্যান স্বামীর সাথে একই কাজেই আটক করা হলেও শারীরিক অসুবিধার কারণে ‘ভারভারা রাও’-কে ছেড়ে দেওয়া হলেও স্ট্যান স্বামীকে কেন ছাড়া হলোনা সেই প্রশ্নটা আজ তোলা খুবই জরুরি| যখন ‘ভারভারা রাও’-কে ছাড়া হয় তখন স্ট্যান স্বামীর কৌশলীরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন যে এই ঘটনা একটা নজির তৈরি করবে ইউ.এ.পি.এ আইনের শারীরিকভাবে অসক্ষম ব্যক্তিদের জন্য| স্ট্যান স্বামী ৮৪ বছরে বয়সে ২০২১ সালের মে মাসে যখন সশরীরে আদালতে দাঁড়িয়ে জামিনের আবেদনে সকলকে বলছেন তাঁর স্নায়ুতন্ত্রের অসুবিধার কথা. তখন আদালত তার কথা শোনেনি এবং তার কথা-মতন জীবনের শেষ কটাদিন নিজের কর্মস্থলে রাঁচি-তে গিয়ে থাকার অনুমতি দেননি| প্রশ্ন হলো এই দ্বিচারিতা কেন? তবে কি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হয়ে রাষ্ট্রের খামতিগুলো তুলে ধরার দুঃসাহসের মাসুল দিতে হলে স্ট্যান স্বামীকে? খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী হয়ে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী রাষ্ট্রের ওপর প্রশ্ন তোলা আইনের মারপ্যাঁচের দ্বারাই থামানো যাবে, আলাপ আলোচনার পথে নয়| আসলে যেখানে রাম-লালার মন্দির স্থাপনার সময় রাষ্ট্রপ্রধান মন্ত্র উচ্চারণ করে ভীত-পূজা করে সেখানে মানবতার মন্ত্র ম্রিয়মান করে তোলাই একমাত্র ধর্ম হয়ে ওঠে রাজনৈতিক স্তরে| তাই কোনো প্রশ্ন নয়, এমনকি আনুগত্য নয়, শুধু নির্বাক নাগরিকরাই আত্মনির্ভর দেশের ভিত্তি|

ইউ.এ.পি.এ আইন ঐতিহাসিক ভাবে ২০০৪ সালে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইন পো.টা থেকে গৃহীত যেখানে কোনরকম আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই সন্ত্রাসবাদী সন্দেহে কোনো গোষ্ঠীর নেতৃত্ব স্থানীয়কে আটক করা যেতে পারে| কিন্তু এর পরেই ২০০৮ সালে সন্ত্রাসবাদী হামলায় আক্রান্ত হওয়ার পর ভারতীয় রাষ্ট্র আরো কঠোর ভাবে বলবৎ করার চেষ্টা করে এই আইনকে| কিন্তু ২০১৯ সালে বি.জে.পি সরকার ব্যক্তিকেও এই আইনের অন্তর্ভুক্ত করেছে| তাই এ কথা বলা যায় যে বর্তমান সরকার স্বৈরাচারী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ইউ.এ.পি.এ আইন সংশোধন করে, ব্যক্তিকে গোষ্ঠীর থেকে আলাদা করে আটক করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয় এই আইনে| এমন ভাবে দেওয়া হয় যে কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রের পরিকল্পনা বা কর্মসূচি বা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শুধুমাত্র প্রশ্ন নয় কোনোরকম অপ্রীতিকর প্রস্তাবনাও রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়| আর তাই ২০১৯-এর পর ইউ.এ.পি.এ আইন আরো বেশি কঠোর এবং গণতন্ত্র বিরোধী| এখানেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কিভাবে রাষ্ট্র নিজের ইচ্ছে মতন একটি আইনকে দুমড়ে মুচড়ে ব্যক্তির অধিকারকে নস্যাৎ করতে উদ্যত হতে পারে? আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠতন্ত্র ও ধনতান্ত্রিক কাঠামের মধ্যে থেকে কাজ করার ফলে সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিগত ভাবে পার্থক্য রয়েছে মোদী সরকারের আমলে| এভাবেই রাষ্ট্র তার ক্ষমতা বলবৎ করার চেষ্টা করে কোনধরনের প্রশ্ন তোলার অধিকারকে বিনষ্ট করে দিয়ে| এখানেই প্রয়োজন আপোষহীন প্রশ্ন তোলা জনগণের সমস্ত স্তর থেকে নির্ভীকভাবে যাতে চাপের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয় কেন্দ্রীয় সরকার| এই কাজটাই আগামী প্রজন্মের জন্য স্ট্যান স্বামী রেখে গেলেন|

একই অপরাধ| ভীমা-করেগাঁও মামলা| নয় নয় করে ১৭ জনকে আটক করা হয় ইউ.এ.পি.এ আইনে| সব শেষে গ্রেফতার করা হয় স্ট্যান স্বামীকে| কিন্তু বেশ কিছু গ্রেফতার করা অভিযুক্ত শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ছাড়া পেলেও, স্ট্যান স্বামীর ক্ষেত্রে সেটা হল না যেখানে তাঁর শারীরিক অসুস্থতা সম্পর্কে বিচারালয়ের নিযুক্ত ডাক্তারের প্যানেল নিশ্চয়তা প্রদান করেছিলেন| করোনাকালে হাসপাতালে নিয়ে গেলে যেখানে বয়স্ক মানুষদের করনা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল সেখানে বাড়িতে না থাকার অনুমতি দিয়ে সরকারী হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে করনা আক্রান্ত করিয়ে স্ট্যান স্বামীকে প্রায় মেরে ফেলা হলো| কেন এই দ্বিচারিতা? আসলে এই দেশের বর্তমান শাসকদলের সংখ্যালঘুদের প্রতি অনীহা, অনিচ্ছা এবং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার প্রবণতাই বেশি করে প্রকট হয়ে ওঠে স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায়| যারা বিরোধিতা করছেন ২০২৪এর জাতীয় নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে তাদের উচিত এই জায়গাটা তুলে ধরা জনগণের সামনে|

আজকের দিনে স্বাধীনতা দিবসে প্রত্যেকে দেখছি উদযাপন করছে| একে অপরকে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠাচ্ছে| অথচ স্বাধীনতা দিবসে স্বাধীনতার লড়াইয়ে ব্রতী শহীদ মানুষদের চিন্তা, আবেগ এবং কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে না| যেন স্বাধীনতা দিবস একটা উৎসব অন্যান্য উৎসবের মতন| আলোকসজ্জা আতশবাজি| কিন্তু অন্ধকারসম পরাধীনতার দিনগুলো মনে রাখার কথা কথাও দেখা যাচ্ছে| ভারতীয় দার্শনিক কৃষ্ণ চন্দ্র ভট্টাচার্য বলেছিলেন ‘স্বরাজ ইন আইডিয়াস’ বা ‘চিন্তার স্বকীয়তা বা স্বাধীনতার কথা’| একই বার্তা প্রতিফলিত হয় জন প্রশাসনবিদ জান কৈনমান-এর কথায় জন-পরিচালনের সঠিক প্রয়োগ-পদ্ধতি প্রতিটি সমাজের নিজস্ব সাংস্কৃতিক কাঠামো অনুযায়ী সুনিশ্চিত করা|এই দুই বার্তার প্রতিফলন দেখি স্ট্যান স্বামীর ভাবনায় যখন তিনি অংশগ্রহণমূলক ভারতীয় গণতন্ত্র সঠিক ভাবে তৈরি করার জন্য পরিকল্পনা রূপায়নে জন-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের থাকার কথা বলেন| কিন্তু তাঁর মৃত্যু যে এই ভাবনার ওপরে একটা আঘাত, স্বকীয় স্বাধীন ভাবনার ওপর একটা আঘাত এটা স্বাধীনতার ৭৫তম বার্ষিকী পালনের ধুমে কারুর মনেই থাকলো না| অথচ কদিন আগেই সবাই আন্দোলন করছিলেন, স্মারকলিপি দিচ্ছিলেন| কিন্তু প্রতীকী পরাধীনতা দিবস পালনের সুবর্ণ সুযোগ যা কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর গত দেশবাসীর অনাস্থা ফুটিয়ে তুলতে পারতো সেই সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে গেলো| ‘স্বাধীনতা কা অমৃত মহোত্সব’ পালনের সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে মনে হচ্ছে আজকের প্রজন্ম ক্ষণিকের আবেগে ভাসমান, সেখানে কৃত্রিমতা বেশি, ভাবনা কম| ভারতীয় গণতন্ত্রকে সঠিক ভাবে ‘ভারৈত্য’ করে তুলতে হলে আমাদের এই খামতি কাটিয়ে তুলতেই হবে| স্ট্যান স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হবে সেটাই|
রাষ্ট্র-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ভারতবর্ষে বামপন্থীরা সবসময়ে থেকেছেন সামনের সারিতে| রাষ্ট্রের জন-বিরোধী কর্মসূচির বিরুদ্ধে গর্জেও উঠেছেন তারা স্বাধীন ভারতের বিভিন্ন সময়ে| স্বর্ণালী অতীত পেরিয়ে এসে বামপন্থীরা আজ ক্ষমতাহীন অবস্থায় নির্বাচনী ময়দানে ক্ষয়িষ্ণু| কিন্তু সামাজিক ভাবে তাদের উপস্থিতি প্রবল| সেই বামপন্থী দলের পুরোধা সি.পি.আই(এম) দল এতদিন জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকতো স্বাধীনতা দিবসে কারণ তারা মনে করতো প্রকৃত স্বাধীনতা খেটে-খাওয়া শ্রমজীবী গরিব মানুষেরা আজও পায়নি| কিন্তু এবছর স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো সেখানে বামপন্থীদের পতাকা অর্ধনমিত রাখাটা ছিল আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক| কিন্তু রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা| বি.জে.পি-র প্রগাঢ় জাতীয়তাবাদের জিগিরকে স্তিমিত রাখতে এবং তারাও যে জাতীয়বাদী দল সেটাকে প্রমাণ করতে বামপন্থী দলের পুরোধা সি.পি.আই(এম) দল এবারে জাতীয় পতাকা তুললো স্বাধীনতা দিবসে| এর ফলে স্বাধীনতার বেঠিক প্রয়োগকে বেঠিক বলে স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি সেই লজ্জা প্রদর্শনের আর কোনো রাজনৈতিক দল রইলো না ভারতীয় নির্বাচনী গণতন্ত্রে|তাহলে স্ট্যান স্বামীর মতন প্রতিবাদী নায়কদের মনে রাখার মতন রাজনৈতিক আশ্রয় কথায়? এখানেই আবার পৌর সমাজকে বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব নিতেই হবে এই মনে করিয়ে দেওয়ার কাজটা করার|
স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুকে অনেকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যার মধ্যে বিচারবিভাগের ওপর শাসনবিভাগের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বেশি করে উঠে আসে| কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে একথা মনে রাখা দরকার যে কোনো ঘটনা স্বকীয় নয়, সব ঘটনাই কোনো কিছুর দ্বারা প্রভাবিত এবং অন্য কোনো ঘটনাকে প্রভাবিত করে| স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুর ঘটনা আসলে রাষ্ট্রের চরিত্রের একটা গভীর প্রকৃতি উপলব্ধি করায়| সমাজতাত্ত্বিক হানাহ আরেনদত তাঁর গ্রন্থ অন ডি অরিজিন অফ টোটালিটারিয়ানিসম(১৯৫১) সালে দেখিয়েছেন যে নিঃসঙ্গতা থেকেই স্বৈরতন্ত্রের জন্ম হয়| আজকের ভারতবর্ষের কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠীর মধ্যেও স্বৈরচারী মনোভাব ফুটে উঠছে তাঁর কারণ তারা বাজছে যে নির্বাচনী পাটিগণিতে তারা যতই সিট পাক না কেন শতাংশের হিসেবে তারা অর্ধেক জনসমষ্টির সমর্থন লাভ করেনি| ক্রমশ তাদের জনসমর্থন হ্রাস পাচ্ছে বিভিন্ন রাজ্যে| আর তাই তারা কোনো ধরনের ‘শিক্ষা’ যা মাটি থেকে উঠে আসে (যেমন স্ট্যান স্বামীর অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রকে মজবুত করার স্থানীয় প্রচেষ্টা) তা মেনে নিতে পারেনা|রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন করা এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করা কিন্তু সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কেমন হবে সে বিষয়ে কর্তৃত্ব আরোপ না করে আলোচনা করা ও জনগোষ্ঠীর ওপরে দায়িত্ব অর্পণ করাই অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের বীজ মন্ত্র|

পরিশেষে বলা যেতে পারে আজ ভারতীয় রাজনীতি বিরোধী ঐক্য খুঁজছে জাতীয় স্তরে আর সেখানে লাল(বামপন্থীদের প্রতীকী রং) আর নীল(তৃনমূল কংগ্রেসের প্রতীকী রং)মিলেমিশে একাকার|প্রতিবাদ যদি হয় বামপন্থীদের প্রকৃতি তাহলে ২০২১এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর বলা যেতেই পারে বি.জে.পি-কে প্রতিরোধ করা তৃনমূল কংগ্রেসের প্রকৃতি| স্ট্যান স্বামী তাঁর মৃত্যুতেও প্রতিবাদ ও প্রতিরোধকে মিলিয়েছেন| তাই স্ট্যান স্বামী যদি হয় ভারতীয় রাজনীতির এই সময়ের বিরোধী রাজনীতির সমন্বয়, তাহলে ইউ.এ.পি.এ কালা আইন যা ২০১৯এর সংশোধনীর পর আরো স্বাধীনতা খর্বকামী হয়ে উঠেছে সেই আইন হলো কেন্দ্রীয় বি.জে.পি- সরকারের প্রতীক| তাই স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুকে গৌরবান্বিত করতে বিরোধী ঐক্যকে মজবুত করে ২০২৪-এর জাতীয় নির্বাচনে বি.জে.পি সরকার ও তার সমস্ত কালা আইন(যার মধ্যে সংশোধিত ইউ.এ.পি.এ আইন অন্যতম)বাতিল হোক| স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু নিয়ে মামলা চলবে সুবিচারের আশায় কিন্তু সেই মামলা আর পাঁচটা মামলার মতোই হারিয়ে যাবে অনেক মামলার আড়ালে| তাই স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুর সুবিচার আদালত থেকে আসবে না, আসবে পৌর সমাজ থেকে, শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের কাছ থেকে বি.জে.পি সরকার ও বি.জে.পি-র ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অবসানের মধ্য দিয়ে| জয় হোক স্বাধীনতার, জয় হোক প্রতিবাদের ও প্রতিরোধের| জয় হোক পিছিয়ে পড়া জনজাতিদের আদিবাসীদের| জয় স্ট্যান স্বামীর জয়| জয় ভারতের ‘মাটিতন্ত্রের’(মাটির শিক্ষায় শিক্ষিত গণতন্ত্র) জয়|

[লেখক – কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।]

Facebook Comments

Leave a Reply