রাষ্ট্রদ্রোহঃ দুটো আইন, কিছু কথা : রঞ্জন রায়

fail

গৌরচন্দ্রিকা

রাষ্ট্রদ্রোহ বা ইংরেজি সিডিশন কাকে বলে তা আজকাল বোঝা মুশকিল। কার্টুন আঁকা, প্রবন্ধ লেখা, কবিতা বা জনসভায় বক্তৃতা দেওয়া– কোনটা যে রাষ্ট্রদ্রোহ হয়ে যাবে কেউ বলতে পারে না। কারও আঁতে ঘা লাগলেই সে থানায় একটা কমপ্লেইন ঠুকে দেবে যে অমুক দ্বারা কৃত তমুক কার্যটি আমাদের দেশপ্রেমকে আহত করিয়াছে বা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করিতে পারে বা ইহা আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রনেতা অথবা সাংসদ অথবা সংবিধানের মর্য্যাদা হানি করিয়াছে অতএব স্পষ্টতঃই দেশের অখন্ডতা বা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা বিঘ্নিত করিতে পারে অথবা সেই লক্ষ্যে বা সেই উদ্দেশে কৃত এবং বিধ প্রতীত হইতেছে। অতএব, এই কৃত্যটি রাষ্ট্রদ্রোহের পর্যায়বাচী।

ব্যস্‌ , অমনই কোন থানার কোন ইন্সপেক্টর এটা নিয়ে হয় ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের (আইপিসি) ১২৪(এ) ধারায় অথবা আনলফুল অ্যাক্টিভিটিজ (প্রিভেনশন) অ্যাক্টের (ইউএপিএ) কোন ধারায় (অথবা একসঙ্গে দুটোতেই) ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট রেজিস্টার করে দেবে। তারপর সে এই অভিযোগের ভিত্তিতে যে কোন নাগরিককে বন্দী করতে পারে এবং তার ঘর বিনা ওয়ারেন্টে তল্লাসি করতে পারে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে থানায় ৩০ দিন পর্য্যন্ত আটকে রাখতে পারে এবং চার্জশীট না দিয়ে বিনা বিচারে জেলে ১৮০ দিন পর্য্যন্ত রেখে দিতে পারে।

এতদিন সিডিশন অ্যাক্ট বা ১২৪(এ) ধারাই যথেষ্ট আতংকের কারণ ছিল, এখন গোদের উপর বিষফোঁড়া জুটেছে ইউএপিএ ১৯৬৭ এবং তার ২০১৯ এর সংশোধন। একা রামে রক্ষে নেই, সুগ্রীব তার মিতে!

আপনি বলতেই পারেন যে ভারতের ক্রিমিনাল জুরিসপ্রুডেন্স বৃটিশ ট্র্যাডিশনে তৈরি ; যাতে বলা হয় (ক) যতক্ষণ অপরাধ বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে চুড়ান্ত ভাবে প্রমাণিত না হয় ততদিন সবাইকে নিরপরাধ ধরে নিতে হবে। (খ) অভিযোগের প্রমাণ জোটানোর এবং আদালতে পেশ করার দায়িত্ব অভিযোগকর্তার, অভিযুক্তের নয়। (গ) এর পেছনের দর্শনটি হোল প্রমাণ না করতে পারলে শত অপরাধী ছাড়া পায় তো পাক, কিন্তু একজন নির্দোষও যেন শাস্তি না পায়।

তাহলে আজকাল এসব কী হচ্ছে?

যেন শত নির্দোষ জেলে যায় তো যাক, একজন অপরাধীও যেন বাইরে না থাকে!

আমরা তো শুনেছিলাম যে কারও বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা শুরু করতে সরকারের অনুমতি লাগে, রাষ্ট্রদ্রোহের এফ আই আর করতে অন্ততঃ ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট অফ পুলিস র‍্যাঙ্কের নির্দেশ লাগে? কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে?

সেদিন সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান প্রধান বিচারপতি জাস্টিস রমন্না বলেছেন “Why does section 124A continue in statute book even after 75 years of Independence”?[১]

কিন্তু যেটা বলেননি তাহল আজকাল ওই ঔপনিবেশিক আইন মানে ভারতীয় দণ্ডবিধির (আইপিসি) ধারা ১২৪(এ)র সঙ্গে স্বাধীন ভারতে তৈরি আরও একটা আইন, আন-লফুল অ্যাক্টিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট, ১৯৬৭ (ইউএপিএ) একসাথে প্রয়োগ করা হচ্ছে নির্বিচারে ।
সরকারের নীতির সমালোচনা করার অপরাধে ওই দুই আইনে গ্রেফতার হচ্ছেন সাংবাদিক (সিদ্দিক কাপ্পন),[২] উকিল (সুরেন্দ্র গ্যাডলিং, রোনা উইলসন), দলিত বুদ্ধিজীবি (আনন্দ তেলতুম্বে) সামাজিক ও মানবাধিকার কার্যকর্তা (সুধা ভারদ্বাজ) , ছাত্র, শিক্ষক, তাদের বয়েস ২৩ হোক বা ৮৩, তাঁরা পঙ্গু হোন (দিল্লির অধ্যাপক হানিবাবু) বা বৃদ্ধ এবং অসুস্থ (ভারভারা রাও এবং ফাদার স্ট্যান স্বামী),[৩] গর্ভবতী হোন (সফুরা জারগর)[৪] বা কুমারী। অভিযোগ হতে পারে রাষ্ট্রদ্রোহ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্র (ভীমা কোরেগাঁও, এলগার পরিষদ মামলা), প্রধানমন্ত্রীকে খোলা চিঠি লিখে নিজেদের আশংকার কথা ব্যক্ত করা (রামচন্দ্র গুহ, আদুর গোপালকৃষ্ণন, শ্যাম বেনেগাল, অপর্ণা সেন, শুভা মুদগল ও আরো ৪৪ জন)[৫], খালিস্তানী উগ্রবাদীদের সঙ্গে যোগসাজস (টুলকিট কান্ডে ২২ বছরের পরিবেশকর্মী দিশা রবি)[৬], শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদেও দাঙ্গায় প্ররোচনা দেয়া বা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈমনস্য সৃষ্টির চেষ্টা (দেবাঙ্গনা কলিতা, আসিফ ইকবাল তনহা) অথবা আফগানিস্তানে তালিবানের কাবুল দখল এবং মার্কিন সৈন্যের আমেরিকায় ফিরে যাওয়ার খবরে উল্লাস প্রকাশ (আসামে ১৪ জন সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে গ্রেফতার)[৭]।

সিডিশন অ্যাক্ট ও আন-ল’ফুল অ্যাক্টিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট (ইউএপিএ) এবং ল’ কমিশন কেন এতদিন ধরে এই আইন বহাল রয়েছে? আর আরেকটি দমনমূলক আইন কোত্থেকে এবং কেন এল? তাহলে একটু ইতিহাস ঘাঁটতে হবে।

ভারতের সিডিশন অ্যাক্টের জননী বৃটিশ কমন ল অফ সিডিশন বা করোনার্স অ্যান্ড জাস্টিস অ্যাক্টের ৭৩ নং ধারা গত ২০০৯ সালে ব্রিটেন যুক্তরাজ্যের জন্য বাতিল হয়ে যায়। তখন আইন মন্ত্রী ক্লেয়ার ওয়ার্ড বলেন,’এই আইনগুলো সেই সব বিগত দিনের অবশেষ যখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আজকের মত অধিকার বলে ধরা হত না। আজ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গণতন্ত্রের কষ্টিপাথর মনে করা হয় এবং সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করার জন্যে ব্যক্তির রাষ্ট্রকে সমালোচনা করার অধিকার হল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ’।[৮]

ভারতে সিডিশন অ্যাক্ট বা আইপিসি ১২৪(এ) বলে যে এর ব্যবহার শুধু খুব ‘জরুরী অবস্থা’য় করা হবে। কিন্তু ভারত-চীন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৩ সালের ১৬তম সংবিধান সংশোধনের অনুপালনে সংসদ ১৯৬৭ সালে পাশ করে আনলফুল অ্যাক্টিভিটিজ (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট, ১৯৬৭ বা ইউএপিএ যাতে ভারতের সার্বভৌমত্ব এবং অখন্ডতা রক্ষার স্বার্থে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর কিছু “যুক্তিযুক্ত” নিয়ন্ত্রণ রাখার কথা বলা হয়েছে।

এই নতুন আইনে বে-আইনি কাজকম্মের সংজ্ঞা বা পরিভাষাটি কী?

কোন ব্যক্তি বা সংগঠন যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে মৌখিক বা লিখিত শব্দের দ্বারা অথবা ইশারা বা চিত্রের মাধ্যমে (ক) ভারতের কোন অংশকে বিচ্ছিন্ন করা বা আলাদা করার প্রচেষ্টা করে বা অমন কোন দাবিকে সমর্থন করে বা অন্যদের অনুরূপ কাজের জন্যে উস্কানি দেয়; (খ) ভারতের সার্বভৌমত্ব বা অখন্ডতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, নিষেধ করে অথবা বিঘ্ন ঘটায়; (গ) ভারতের প্রতি অবহেলা বা তাচ্ছিল্য করে অথবা এমন কাজ করার জন্যে উস্কানি দেয়, তখন এই কাজগুলো ‘বে-আইনি কাজকর্মে’র আওতায় আসবে।
স্পষ্টতঃ এই আইনের পরিধি ধারা ১২৪(এ)-র তুলনায় অনেক বিস্তৃত। ইউএপিএ’র ধারা ১৩ অনুযায়ী যে কেউ এই আইন ভঙ্গের অপরাধ করবে বা করার জন্য প্রচার, সহায়তা, পরামর্শ বা উস্কানি দেবে, তার শাস্তি হবে সাত বছরের কারাবাস অথবা অর্থদন্ড অথবা একসঙ্গে দুটোই।

কথা হল, যখন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্পেশাল ক্যাটেগরির অপরাধ ঠেকাতে ইউপিএ’র মত কড়া আইন রয়েছে, তখন পেনাল কোডের ধারা ১২৪(এ)-র মত পুরনো হেজে যাওয়া ঔপনিবেশিক আইনকে টিঁকিয়ে রাখার কোন যুক্তি আছে কি? বিশেষ করে ইউএপিএ যখন ‘বে-আইনি কাজকর্মে’র সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তাতে কোন রাজনৈতিক প্রশ্ন বা ইস্যু’র পক্ষে কথা বলা বা নিষ্ক্রিয় সমর্থনকেও দন্ডনীয় অপরাধ করে তুলেছে?

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরে আজ আমাদের গণতন্ত্রের ভিত এমন নড়বড়ে হয়নি যে দুটো বিরুদ্ধ সমালোচনা বা বর্তমান সরকার পরিবর্তনের দাবি উঠলেই তাতে ফাটল ধরবে।

উপরের প্রেক্ষিতেই ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা এবং রাজ্যসভার সাংসদ ডি রাজা ২০১১ সালে সংসদে একটি প্রাইভেট মেম্বার বিল পেশ করে বলেছিলেন —
২০১১ সালে রাজ্যসভায় কমিউনিস্ট নেতা ডি রাজা প্রশ্ন তুলেছিলেনঃ স্বাধীন দেশের সরকার নিজেদের নাগরিকের বিরুদ্ধে ইংরেজ জমানার সিডিশন অ্যাক্টের প্রয়োগ কেন করবে?
উত্তরে গৃহ রাজ্যমন্ত্রী বলেনঃ গণতন্ত্র রক্ষার জন্য এক মজবুত রাষ্ট্র দরকার। ল’ কমিশনের ৪২ তম রিপোর্ট (১৯৭১) এই আইন রাখার পক্ষে, যদিও পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে এই ধারার প্রয়োগ কমে আসছে, এবং ভবিষ্যতে আরও কমতে পারে।[৯]

এরপর ২০১৪ সালে বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ সরকার ক্ষমতায় এল। তার চার বছর পরে ৩০ অগাস্ট, ২০১৮ তারিখে ভারতের ২১তম ল’ কমিশন ধারা ১২৪(এ)র ব্যাপারে জনসাধারণের মতামত চেয়ে একটি কসাল্টেশন পেপার প্রকাশ করল।

কমিশনের মতেঃ একটি গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের অবাধ অধিকারের দায়িত্বহীন প্রয়োগ হলেই তাকে সিডিশন বা রাষ্ট্রদ্রোহ ঠাউরে নেওয়া উচিত নয়। রাষ্ট্র যদি একটু সমালোচনা সহ্য করতে না পারে তাহলে স্বাধীনতার আগের ভারত আর স্বাধীনতার পরের ভারতের মধ্যে ফারাক কী থাকল? নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ও ঐক্যের রক্ষা করাও খুব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার জন্য সিডিশন আইন প্রয়োগ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা উচিত হবে না। কারণ, মতভেদ ব্যক্ত করার এবং সমালোচনার অধিকার হল একটি সজীব ও প্রাণময় গণতন্ত্রের আবশ্যিক শর্ত।

কমিশন প্রশ্ন তুললঃ পরাধীন ভারতের জনতাকে দমনের জন্য ব্যবহৃত ধারা ১২৪(এ)-কে স্বাধীন ভারতে জারি রাখা কতটা যুক্তিযুক্ত?

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশঃ কমিশনের কার্যকাল অগাস্ট ২০১৮তেই সমাপ্ত হয়। আমরা ২২তম ল’ কমিশনের প্রতীক্ষায়।

ইতিমধ্যে কী হচ্ছে? সিডিশন অ্যাক্ট ও ইউএপিএ’র অধীনে কেস কমা তো দূর অস্ত্‌ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

দুটো আইন; একটা ঔপনিবেশিক আমলের, অন্যটি স্বাধীন ভারতের

ভারত সরকারের ন্যাশনাল ক্রাইম রিসার্চ ব্যুরোর (এনসিআরবি) ২০১৯ সাল পর্য্যন্ত ডেটা দেখাচ্ছে যে ২০১৪ থেকে ২০১৯—এই পাঁচ বছরে দেশে সিডিশন অ্যাক্টের কেসে ১৬৫% বৃদ্ধি হয়েছে এবং ইউএপিএ আইনে ৩৩% বেড়ে গিয়েছে।[১০]

২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ অব্দি সিডিশনের কেস লাগানো হয়েছে ১৯১টি, তাতে বিচার শেষ হয়েছে ৪৩টিতে আর শাস্তি হয়েছে মাত্র ৪টিতে। ২০১৫ সালের যে ৪টি কেসে মামলা শেষ হয়েছে তাতে একজনকেও আদালত শাস্তি দেয়নি। অর্থাৎ রাজনৈতিক কারণে যাকে তাকে ধরে সিডিশনের চার্জ লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে।

এই তালিকাটি দেখুনঃ[১১]
সাল                    ২০১৬      ২০১৭      ২০১৮
বিচার শুরু           ৩৪           ৫৮          ৯০
বিচার শেষ           ৩             ৬            ১৩
বিচার অসমাপ্ত     ৩১           ৫২          ৭৭
শাস্তি পেল           ১              ১             ২
ছাড়া পেল           ২              ৫            ১১
গ্রেফতার            ৪৮            ২২৮       ৫৬
চার্জশীট             ২৬            ১৬০       ৪৬
শাস্তি পেল          ১              ৪            ২
ছাড়া পেল           ১             ৭            ২১

সাল                ২০১৬               ২০১৯              বৃদ্ধি (%)
সিডিশন            ৩৫                     ৯৩                ১৬৫
ইউএপিএ           ৯২২               ১২২৬               ৩৩

২০১৯ অব্দি রাষ্ট্রদ্রোহের আইনে শাস্তি?

সিডিশনের কেসের থেকে পুলিশ ৯% কে বন্ধ করেছে কারণ হয় কেস চালানোর মত প্রমাণ নেই বা অভিযুক্তকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

ইউএপিএ কেসের ১১% কে একই কারণে বন্ধ করতে হয়েছে।

চার্জশীট দেওয়া হয়েছে সিডিশনের ১৭% কেসে এবং

ইউএপিএর অধীন ৯% কেসে।

সন ২০১৯শে সাজা ঘোষণা করা হয়েছে সিডিশনের ৩.৩% কেসে এবং

ইউএপিএ’র অধীন ২৯.২% কেসে।

মানছি, ভারতে আইন চলে ঢিমে তেতালায়, তবু ওই ২০১৯ সালেই ইন্ডিয়ান পেনাল কোড বা আইপিসির অধীনে সাজার সংখ্যা মোট কেসের ৫০.৪%, অথচ সিডিশন বা আইপিসি ১২৪(এ)র মাত্র ৩.৩%? অর্থাৎ কেস লাগানো হয়েছে যেমন্ তেমন করে খেয়াল খুশি মত। রাজনৈতিক হোমরাচোমরাদের ইশারায়।

সিডিশন আইন ও তার চ্যালেঞ্জ এবং ইউএপিএ’র আবির্ভাবঃ

সিডিশন অ্যাক্ট বা পেনাল কোডের ধারা ১২৪(এ) ১৮৬০ এর কিছু কিছু পরিবর্তন ১৯৩৭, ১৯৪৮, ১৯৫১ ও ১৯৫৫ সালে হয়েছে। কিন্তু তারপর আর কোন সংশোধন হয়নি।

পঞ্চাশের দশকে কয়েকটি আদালত ১২৪(এ) ধারাকে অসংবিধানিক আখ্যা দেয়। যেমন তারাসিং গোপীচান্দ বনাম রাষ্ট্র প্রকরণে (১৯৫০) পাঞ্জাব হাইকোর্ট বলেছিলঃ বলেছিল যে এই ধারা সংবিধানে আর্টিকল ১৯শে প্রদত্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী, অতএব বাতিল ধরা হোক।[১২]

সুপ্রিম কোর্টের রমেশ থাপার বনাম মাদ্রাজ রাজ্য ও ব্রিজভূষণ বনাম দিল্লি রাজ্য মামলার রায়ে বলা হয় ধারা ১২৪(এ) অসাংবিধানিক কারণ আর্টিকল ১৩ (যা পরে ১৯ হয়) তাতে সিডিশন শব্দটি বাদ দেয়া হয়েছে।[১৩]

এসব রায় তৎকালীন সংসদের পছন্দ হয়নি। তাই ভারতে সংবিধানের প্রথম সংশোধন হোল আর্টিকল ১৯(২)কে আরও বদলে রাষ্ট্রকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের উপর দরকারমত ‘যুক্তিসংগত’ লাগাম দেয়ার অধিকার দিয়ে।[১৪]

যদিও সংসদে বিতর্কের সময় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন ১২৪(এ) ধারায় বর্ণিত সিডিশনের অপরাধ highly objectionable and obnoxious. উনি এটাও বলেছিলেন যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই ধারাটির থেকে আমাদের মুক্তি পাওয়া উচিত।[১৫]

কিন্তু এতসব ভালো ভালো কথা বলেও নেহেরু সরকার ধারা ১২৪(এ) বা সিডিশন অ্যাক্ট খারিজের চেষ্টা করেনি।

কেদার নাথ সিং বনাম বিহার রাজ্য মামলাঃ[১৬] সিডিশন চার্জের কষ্টিপাথর

বিহারের মুঙ্গের জেলার বারাউনিতে ১৯৫৩ সালের মে মাসের ২৬ তারিখে ফরওয়ার্ড কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কেদারনাথ সিং এক জনসভায় বলেন যে ওঁরা ভোটে বিশ্বাস করেন না। সিআইডির কুত্তা ও গদীতে বসা কংগ্রেসি গুন্ডাদের একইভাবে নিকেশ করতে হবে।
ট্রায়াল কোর্ট এবং পাটনা হাইকোর্ট এই বক্তৃতাকে ধারা ১২৪(এ) অনুযায়ী ‘সিডিশাস’ বা রাষ্ট্রদ্রোহী মনে করে এবং কেদারনাথের এক বছর সশ্রম কারাদন্ডের রায় বহাল থাকে।

তারপর সাংবিধানিকতার প্রশ্নে আপীলের ফয়সালা করে সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের এক সাংবিধানিক বেঞ্চ । তারা রায় দেয়ঃ সরকারের সমালোচনা, যত কঠোরই হোক, যদি জনতাকে হিংসার জন্য প্ররোচিত না করে এবং ‘পাবলিক অর্ডার’ বিঘ্নিত না করে তবে তা রাষ্ট্রদ্রোহ হবে না। এভাবে দেখলে ১২৪(এ) ধারার ‘মিস ইউজ’ হবে না এবং সেটা বাকস্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের হিতের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখবে। তাই ধারাটি অসাংবিধানিক নয় এবং মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে আর্টিকল ১৯(২)এ বলা আবশ্যকতা অনুযায়ী সরকারের যুক্তিপূর্ণ হস্তক্ষেপের অধিকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

জানুয়ারি ১৯৬২তে চীন-ভারত যুদ্ধের সময় জারি এই রায় আজও সিডিশন অ্যাক্টের বিরুদ্ধে শেষ কথা। একে বদলাতে হলে সাত সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চের শুনানি দরকার । ১৯৬৩তে সংবিধানের ১৬তম সংশোধনে মৌলিক অধিকারের আর্টিকল ১৯ এর ধারা ২, ৩ এবং ৪ কিছুটা বদলে যায়। যার ফলে সরকার ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডত্ব রক্ষার জন্যে মতপ্রকাশের অবাধ অধিকারকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্যে আরও ক্ষমতা হাতে পায়।[১৭]

খেয়াল করার ব্যাপার, এই অধিকারের উপর ভিত্তি করেই ভারত সরকার বিভিন্ন সময়ে ভারত রক্ষা আইন, মিসা, টাডা এবং ইউএপিএ আইন পাশ করিয়েছে।

কিন্তু সিডিশন প্রশ্নে কেদারনাথ মামলার রায়ের ভিত্তিতে অ্যাসিড টেস্ট ঠিক হোল—দেখতে হবে যে কোন বক্তৃতা বা কাজ পাবলিককে হিংসার জন্যে খোলাখুলি উস্কানি দিয়েছে বা বাস্তবে প্ররোচিত করেছে কিনা।

এরপর সুপ্রীম কোর্ট একই ভাবে অন্ধ্রে কিছু বোমা বিস্ফোরণের পর দেশি পিস্তল সমেত গ্রেফতার হওয়া বিলাল আহমেদ কাল্লুকেও মুক্তি দেয়। এবং ট্রায়াল কোর্ট ও পুলিশকে ভর্ৎসনা করে বলেঃ ধারা ১৫৩ এ) ১২৪ (এ) এবং ৫০৫(২) এর প্রয়োগ হচ্ছে অত্যন্ত দায়সারা ভাবে, যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই। আশা করা যায় যে যত গম্ভীর অপরাধ তত সাবধানে খুঁটিয়ে সিডিশনের ধারার প্রয়োগ করতে হবে। কারণ নাগরিকের স্বাধীনতা নিয়ে ছেলেখেলা করা উচিত নয়।[১৮]

ভাবা হয়েছিল যে নিম্ন আদালত ও থানাগুলো সুপ্রীম কোর্টের এই গাইডলাইন মেনে চলবে। কিন্তু তা’ হয়নি। শাসক দলের যে কেউ কারও নামে নালিশ করলেই যেকোন থানায় কোন মানবাধিকার কার্যকর্তা, সাংবাদিক বা সরকারের সমালোচনা করা নাগরিকের বিরুদ্ধে এফ আই আর দায়ের হচ্ছে এবং নিম্ন আদালত সমন জারি করছে।

ইউপিএ ও ২০১৯শের সংশোধন

Unlawful Activities (Prevention) Act, 1967 বেশ কয়েকবার সংশোধিত হয়েছে, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনটি হয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে, ৮ আগস্ট ২০১৯শে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেয়ে।

আগে এই আইনে শুধু কোন সংগঠনকে ‘টেররিস্ট’ বলে দেগে দেওয়া যেত। এখন এই আইনের চ্যাপ্টার ৬য়ে উল্লিখিত ধারা ৩৫ ও ৩৬ অনুযায়ী টেররিস্টের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করে একজন ব্যক্তিকেও ‘টেররিস্ট’ বলে ঘোষণা করা যায়। এবং ধারা ২৫ অনুযায়ী ডায়রেক্টর জেনারেল, ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেটিং এজেন্সি (এন আই এ) কথিত টেররিস্টের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করাতে পারে। ধারা ৪৩ অনুযায়ী ইন্সপেক্টর পদের একজন পুলিশ অফিসারও এই আইনের অন্তর্গত এফ আই আর বানিয়ে কথিত অফিসারের তদন্ত করতে পারে।

তাই শ্যাম বেনেগাল, আদুর গোপালকৃষ্ণন, মনিরত্নম, অপর্ণা সেন, রামচন্দ্র গুহদের বিরুদ্ধে এই আইনে এফ এই আর করেছিলেন বিহারের মজঃফরপুরের একটি থানার ইন্সপেক্টর। কিন্তু এভাবে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে এফ আই আর করার ভিত্তিটি ঠিক কী ছিল? সেটা হোল জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রীকে মব লিঞ্চিং এর ব্যাপারে আশংকা প্রকাশ করে হস্তক্ষেপের জন্যে অনুরোধ করা।[১৯]

আবার যে রিভিউ কমিটি কেসগুলোর সমীক্ষা করে কাউকে টেররিস্ট লেবেল থেকেমুক্ত করতে পারে সেটিও শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের আমলাদের নিয়ে গঠিত হবে। অর্থাৎ জুডিশিয়াল রিভিউ হবে না।

ইউএপিএ আইনের বিরুদ্ধে প্রধান আপত্তিগুলো কী কী?

প্রধান আপত্তি হোল সংগঠনের জায়গায় কোন ব্যক্তিকে কেবল সন্দেহের বশে বিনা বিচারে টেররিস্ট আখ্যা দিয়ে তাকে ১৮০দিন পর্য্যন্ত বন্দী করে রাখার অবাধ অধিকার। এই সংশোধন আমাদের ক্রিমিনাল জুরিসপ্রুডেন্সের মূল নীতি’ কোন অভিযুক্ত যতক্ষণ দোষী প্রমাণিত না হচ্ছে ততক্ষণ নিরপরাধ” নীতির পরিপন্থী।

ইউপিএ আইনে সন্দেহের বশে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে কাউকে পুলিশ কাস্টডিতে ১৪ দিনের জায়গায় ৩০ দিন পর্য্যন্ত আটকে রাখা যায়।

এই আইনের ধারা ৪৫ডি(৫) এর অনুযায়ী জামিন পাওয়া খুব কঠিন, ব্যতিক্রম বললেই হয়। “ আইনে বাকি যাই বলা হোক, পাবলিক প্রসিকিউটরের বক্তব্য না শুনে অভিযুক্ত কাউকেই জামিনে বা ব্যক্তিগত মুচলেকায় ছাড়া হবে না। আর পুলিশের কেস ডায়েরি দেখে যদি আদালতের এক নজরে (প্রাইমা ফেসি) মনে হয় যে অভিযোগে কিছু সত্যি আছে, তাহলেও জামিন হবে না”।

এটি একই সঙ্গে International Covenant on Civil and Political Rights, 1967 এর উল্লংঘন করছে কারণ আন্তর্জাতিক স্তরে প্রমাণ না হওয়া পর্য্যন্ত ‘নিরপরাধ’ ধরে নেওয়ার নীতিকে সার্বজনিক মানবাধিকার বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে

আবার কাউকে বিনা প্রমাণে বিনা বিচারে টেররিস্ট ঘোষণা করলে ধারাটি ব্যক্তিকে দমন করার কাজে আসবে, কিন্তু সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় নয়। কারণ ওই আইনে কাউকে টেররিস্ট বলে দেগে দিলেই তাকে কোন দন্ড দেয়া যায় না, শুধু বিনাবিচারে লম্বা সময় আটকে রাখা যায়।

কাউকে ‘টেররিস্ট’ বলার জন্য কোন বস্তুনিষ্ঠ (অবজেক্টিভ) নিরপেক্ষ মাপদন্ড এই আইনে নির্ধারিত করা হয়নি। এর ফলে সরকার কাউকে ‘টেররিস্ট’ ট্যাগ লাগানোর ‘অসীমিত ক্ষমতা’ পেয়ে গেছে।

দুটো উদাহরণঃ এক, ছত্তিশগড়ে মানবাধিকার কার্যকর্তা ও বিশিষ্ট সমাজসেবী এবং চিকিৎসক বিনায়ক সেনকে রায়পুর জেলে মাওবাদী নেতা নারায়ণ সান্যালের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে ২০১০ সালে সশ্রম কারাদন্ডের আদেশ দেওয়া এবং হাইকোর্টের জামিন দিতে অস্বীকার করা। শেষে সুপ্রীম কোর্ট থেকে এপ্রিল ২০১১ সালে জামিন পাওয়া।[২০]

সরকারের সমালোচনা করার কথিত অপরাধে প্রবীণ সাংবাদিক বিনোদ দুয়ার বিরুদ্ধে দিল্লি এবং হিমাচল প্রদেশে কোভিডের মধ্যেও হাজির হতে বলা।

এটি পরোক্ষভাবে সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের হনন করছে। যেমন নাগরিকের অসহমতির অধিকারকে এর মাধ্যমে খন্ডিত করা হচ্ছে। এটি স্পষ্টতঃ সমতার অধিকারের( আর্টিকল ১৪) এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারের (আর্টিকল ১৯) পরিপন্থী। এছাড়া ব্যক্তিকে টেররিস্ট ট্যাগ লেগে গ্রেফতার হওয়ার আগে নিজের পক্ষ রাখার কোন সুযোগ দেয় না।[২১]

সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার আর্টিকল ২১এর ‘রাইট টু লাইফ’ নামের মৌলিক অধিকারের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। বিচারের আগেই কাউকে ‘টেররিস্ট’ বলে দেগে দিয়ে সামাজিক পরিবেশে তার সম্মানটুকু ছিনিয়ে নেওয়া আদৌ আইনের স্বীকৃত পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খায়না।

যাইহোক, এই আইনে তড়িঘড়ি করে সাজানো মামলায় কম কেসেই সাজা হচ্ছে দেখে খুব খুশি হওয়ার কিছু নেই। বর্তমান ভারতে যেভাবে সিডিশন চার্জে এলোপাথাড়ি অ্যরেস্ট হয়ে কয়েক বছর বিনা বিচারে জেলে থাকার পর ছাড়া পাওয়ার আগে অভিযুক্তদের ২৪ ঘন্টা ধরে মিডিয়া ট্রায়াল হয়ে যায়। তারা পাড়াপড়শির মাঝে এবং চাকরিস্থলে তাদের মর্য্যাদা ও সম্মানের স্থানটুকু খুইয়ে বসে। সেই ভোগান্তিটাই বড় সাজা। আসলে এই আইনের উদ্দেশ্য সমালোচনার মুখ ভয় দেখিয়ে বন্ধ করা।

উপসংহার

ইউএপিএ আইন , বিশেষ করে ২০১৯শের সংশোধনের পর দেশের সুরক্ষার অজুহাতে নাগরিকের ‘মতপ্রকাশের অধিকারের’ (আর্টিকল ১৯) দমনের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এক, এটি রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষে ‘অসুবিধে’ বা ‘অসন্তোষজনক’ কাজ এবং বিকল্প চিন্তাকেও অপরাধের এক্তিয়ারে এনে নাগরিক সমাজের চিন্তা ও প্রতিবাদের স্থানটুকু ক্রমাগত আরও সংকুচিত করে চলেছে।

দুই, এই আইন সহজেই শাসনতন্ত্রকে মৌলিক অধিকারের এক্তিয়ারকে পাশ কাটিয়ে যেতে সাহায্য করে। যেমন কাউকে চার্জশীট না দিয়ে ৯০ দিনের বদলে ১৮০ দিন পর্য্যন্ত আটকে রাখা যা আর্টিকল ২১এর রাইট টু লাইফের উল্লঙ্ঘন।

তিন, এই আইন সরকারকে স্পেশাল কোর্ট নিযুক্ত করে বন্ধ ঘরে গোপন সাক্ষীর মাধ্যমে মামলা চালানোর বিশেষ অনুমতি দেয়।

১৯৯২ সালের ১০ই ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরিপ্রেক্ষিতে আর এস এস সংগঠনকে ইউএপিএ আইনের প্রয়োগ করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, কিন্তু তার জন্য সংশ্লিষ্ট কার্যকর্তা ও সদস্যদের ধরপাকড় শুরু করেনি । যদিও বাজপেয়ীজি ১৯৯৩ সালে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাবের বিতর্কে আশংকা প্রকাশ করেছিলেন যে ‘সরকার সম্ভবতঃ সমস্ত বিরোধীদের ’বেআইনি’ বলে দাগিয়ে দেবে।[২২]

কিন্তু আজ যখন সিডিশন অ্যাক্ট ও ইউএপিএ’র যথেচ্ছ প্রয়োগের চোটে সুস্থ বিতর্ক ও নাগরিক স্বাধীনতার ক্ষেত্র আক্রান্ত, তখন এই সাংবিধানিক প্রশ্ন তোলা জরুরি যে সংসদ কি সরকারকে যে কোন পরিস্থিতিতে, মাত্র সন্দেহের বশে বিনা বিচারে কোন নাগরিককে টেররিস্ট বলার অধিকার দিতে পারে?

তবু আশা জাগে যখন বরিষ্ঠ সাংবাদিক বিনোদ দুয়াকে প্রধানমন্ত্রীকে সমালোচনা করার অপরাধে সিডিশনের চার্জ সুপ্রীম কোর্ট এককথায় খারিজ করে বলে সরকারের কাজকর্মের সমালোচনা আদৌ সিডিশন নয়, বরং গণতান্ত্রিক অধিকার।[২৩]

আবার দিল্লি দাঙ্গার সঙ্গে যুক্ত থাকার মিথ্যে অভিযোগে ইউএপিএ আইনের একাধিক ধারায় অভিযুক্ত হয়ে একবছর ধরে জেলে বন্দী ‘পিঁজরা তোড়’ (খাঁচা ভাঙো ) নারী অধিকারের আন্দোলনের নাতাশা নারওয়াল, দেবাঙ্গনা কলিতা এবং জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা আসিফ ইকবাল তনহাদের মুক্তি দিয়ে যখন হাইকোর্ট বলেন—প্রতিবাদের অধিকার বৈধ[২৪], তখন আশা জাগে বৈকি!

আর স্ট্যান স্বামী বলতেন যে তিনি সম্ভবতঃ জেলেই মারা যাবেন; তাই হোল। কিন্তু তাঁর ইউপিএ আইনের ধারা ৪৫ডি(৫) বা সামান্যতঃ জামিন না দেওয়ার নির্দেশটিকে ‘অসংবিধানিক” বলে খারিজ করার পিটিশন সুপ্রীম কোর্টে এখনও বিচারাধীন রয়েছে।

_____________________________________________________________________
তথ্যসূত্রঃ-
[১] The Hindu, July 17, 2021.

[২] ঐ, ৭ অক্টোবর, ২০২০।

[৩] ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২৩ অগাস্ট, ২০২১।

[৪] দ্য প্রিন্ট ডট ইন, ৪ মে, ২০২০।

[৫] দি হিন্দু, ৪ অক্টোবর, ২০১৯।

[৬] দি হিন্দু, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১।

[৭] দি হিন্দু, ২১ অগাস্ট, ২০২১।

[৮] ঐ, পৃঃ ২১৫।

[৯] চিত্রাংশুল সিনহা, দ্য গ্রেট রিপ্রেশন, পৃঃ ২২০।

[১০] দ্য প্রিন্ট, ১২ অক্টোবর, ২০১০।

[১১] ডেকান হেরাল্ড, ১০ই জানুয়ারি, ২০২০।

[১২] চিত্রাংশুল সিনহা, দ্য গ্রেট রিপ্রেসন, পৃঃ ১৭০।

[১৩] AIR 1950 SC 124 & 129.

[১৪] Constitution (First Amendment) Act, 1951.

[১৫] Extracted from Ram Nandan vs. State, AIR 1959, All 101.

[১৬] AIR 1962 SC 955.

[১৭] The Constitution 16th Amendment Act, 1963.

[১৮] চিত্রাংশুল সিনহা, দ্য গ্রেট রিপ্রেসন, পৃঃ ১৮৬।

[১৯] দি হিন্দু, ৪ অক্টোবর, ২০১৯।

[২০] ঐ, পৃঃ ১৮৭।

[২১] দ্য মিন্ট, ১৭ অগাস্ট, ২০১৯। (সজল অবস্থীর সুপ্রীম কোর্টের কাছে এই আইনকে ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করার প্রার্থনা করে পি আই এল)।

[২২] www.jurist.org  2nd June, 2020 and The Hindu,  21 August, 2019.

[২৩] SCC online, 7 June, 2021.

[২৪] ইন্ডিয়া টুডে, ১৫ জুন, ২০২১।

____________________________________________________________________
[লেখক – জন্ম কোলকাতায়; গ্রামীণ ব্যাংকের চাকরিসূত্রে ছত্তিশগড়ের গাঁয়ে-গঞ্জে বনেবাদাড়ে কয়েক দশক ধরে ঘুরে বেড়ানো। অবসর জীবন কাটে বই পড়ে, লেখালিখি করে।
প্রকাশিত বই: বাঙাল জীবনের চালচিত্র (গাঙচিল); রমণীয় দ্রোহকাল (লিরিক্যাল); দেকার্তঃ জীবন ও দর্শন (অনুষ্টুপ); যে আঁধার আলোর অধিক (সৃষ্টিসুখ); ফেরারী ফৌজ (ঋতবাক); ছত্তিশগড়ের রূপকথা (ঋতবাক); শহুরে ছত্তিশগড়ের গল্পগুচ্ছ (ঋতবাক); ছত্তিশগড়ের চালচিত্র (সুন্দরবন প্রকাশন); আহিরণ নদী সব জানে (জয়ঢাক প্রকাশন); তিনটি রহস্য গল্প (জয়ঢাক প্রকাশন)।]

Facebook Comments

Leave a Reply