কুয়াশা : উপল মুখোপাধ্যায়

fail

ওরা খাওয়া দাওয়া করবে বলে তড়কা ও রুটি এনেছিল। আমরাও খেলাম তড়কায় পনিরের টুকরো দেখে আমাদের ভালো লেগেছিল। গাড়ি করে যাবার সময় পনির খেতে ভালো লাগে আরো নানান জিনিস খেতে ভালো লাগে। তাই বললাম, ”তড়কায় মাংসের টুকরোগুলো দারুণ।” বিষমতা বলল, ”ওগুলো পনির, মাংস নয়।”

— মাংস নয় ?

— না।

— মাংসই তো মনে হল।

— অন্ধকারে বুঝতে পারো নি।

— অন্ধকার কোথায় এই তো বেশ ভালো হ্যালোজেন আছে। বেশ আলো ও নিরাপদ।

— ঠিকই।

— নিরাপদ না হলে গাড়ি দাঁড় করানো ঠিক নয় – রাতে।

— ঠিকই।

— তবে পনিরই বলছ।

— হ্যাঁ, মাংস নয়।

আমরা মালদার কোন এক টোল প্লাজার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ি কারণ রাতে একটা নিরাপদ জায়গা দরকার ছিল গাড়ি থামানো ও খাওয়া দাওয়ার জন্য। আবার সঙ্গে একজন মহিলাও আছে আর আছে তার বর। বিষমতা ও প্রাচুর্য। ওরা পেছনে বসেছিল। আমি ও সংকেত সামনে। আমরা দুজনে পালা করে চালাচ্ছিলাম আর কুয়াশা খুঁজলাম। এখন খুব কুয়াশা পড়ার কথা অথচ তেমন পড়েনি। খাওয়া দাওয়া করে আরো এগোলাম। এখন সংকেত চালাচ্ছে। এখনো কুয়াশার কোন জোগাড় নেই দেখে চা খেতে ইচ্ছে করল। চা খেয়ে আরো এগোন যেতে পারে। এক ধাবা দেখে থামলাম। সে এলাহি বন্দোবস্ত ছিল। গাড়ি রাখার জায়গা ছিল। ধাবার সামনে বিশাল লম্বা চত্বর ছিল তা ততটা চওড়া না হলেও ধাবার মতোই লম্বা আর এখানে ওখানে সুন্দর বসার জায়গা, ময়লা টয়লা ফেলার জায়গা ছিল। সেখানের চা ও জল খেতে গিয়ে দেখি নানা মিস্টিও সাজানো রয়েছে। রাতে মিস্টি খাওয়া যেতে পারে তবে তা খেলে চা খাওয়া যাবে না। প্রাচুর্য খুব গম্ভীর প্রকৃতির লোক আর বিষমতা কথাবার্তা বলে জমিয়ে রাখছিল। চা খেতে খেতে আমরা কুয়াশা নিয়ে ঠাট্টা তামাসা করছিলাম কারণ কুয়াশা থাকার কথা অথচ রাস্তা একদম পরিষ্কার হওয়ায় প্রথমে আমি ও তারপর সংকেত বেশ চালিয়েছিলাম। এই কথা বলতে বলতে আমি একটু দূরে সরে গিয়ে সবাইকে দেখছিলাম।

প্রথমে একজন দুজন তিনজন চারজন পাঁচ করে সংখ্যাটা বাড়ল কারণ আমি আমি আরো দূরে দূরে সরে গিয়ে তবে সবাই ও সব জিনিস লক্ষ্য করছিলাম আর দেখলাম ধাবার নাম বেশ জ্বলজ্বল করে জ্বলছে, আলোতে আমাদের গাড়িও দেখা যাচ্ছে। লোকজন ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছে বটে তার মধ্যে বিষমতা ও প্রাচুর্যকে দেখা যাচ্ছে খুবই কাছাকাছি রয়েছে, তাদের একটু দূরে সংকেত। চারপাশটা আস্তে আস্তে কুয়াশায় ছেয়ে আসছে। তবে সে কুয়াশা ঘন হয়ে জমছে না। স্থির হয়ে এক জায়গায় না থেকে ধাবার সামনের সব লোক ও দোকানের আলো ক্রমেই আবছায়া হচ্ছে আবার পরিষ্কার করে বোঝা যাচ্ছে।ধাবার বিশাল সাইনবোর্ডের আলো অনেক দূর এলিয়ে পড়ে রয়েছে- সেটা এই ম্রিয়মাণ হচ্ছে তো আবার দেখা যাচ্ছে আগের মতোই নাম টাম সহ। আশ্চর্যের ব্যাপার এটা কী কেউ লক্ষ্য করছে না। বুঝতে পারছে না যে আস্তে আস্তে এলিয়ে এলিয়ে কুয়াশা ঘিরে ধরবে আর কেউ টের পাওয়ার আগেই তা স্থির হয়ে, ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে যাবেই তখন দেখা যাবে না কিছুই। গাড়িও আর এগোবে না। সংকেতকে তাড়া দিলাম,“চল চল।”

—— তাড়া করছিস কেন? রাস্তা তো পরিষ্কার।

—— রাস্তা পরিষ্কার থাকবে না।

বিষমতা বলল,“কেন রাস্তা পরিষ্কার থাকবে না কেন? রাস্তা তো রাস্তাই থাকবে নাকি সে অন্য কিছু হয়ে যাবে?” শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

আমি বুঝলাম এরা বুঝতে পারছে না রাস্তা অন্যরকম হতে বেশি সময় লাগে না। আর একবার তা হতে শুরু করলে রাস্তা আর রাস্তার মতো থাকে না এ কথা সবাই জানে কিন্তু একটু আগে থেকে বুঝতে না পারলে বিপদ। তারপর আমরা ধাবা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। কিছু দূর যাবার পর আমি আগে যা লক্ষ্য করেছিলাম সেরকমই সব ঘটতে শুরু করল। কুয়াশার চলমান অঞ্চলের মধ্যে আমরা প্রায়ই পড়তে লাগলাম। আমি সংকেতকে বললাম,“দেখলি তো।” ও বলল,“কী দেখব।” আমি বললাম,“কুয়াশা এসে গেছে।” সংকেত বলল,“কিন্তু খুব বেশি পড়ছে না তো।”

—— পড়ছে।

—— কই?

—— দেখবি আরো পড়বে।
প্রাচুর্য বলল,“একে আপনি সে রকম করে কুয়াশা বলতে পারেন কি?” আমি কোন উত্তর দিলাম না। এরপর যখন সত্যি সত্যি কুয়াশার ঘন অঞ্চল সমস্ত রাস্তা, তার ওপর নীচ সব কিছুকে চেপে ধরবে আর সামনে একটা ট্রাকের পেছনের ইন্ডিকেটার জ্বল জ্বল করবে অথবা একটা বড়সড় বাসের পেছনের একগাদা উজ্জ্বল আলোকে অনুসরণ করে করে গাড়ি চালাতে হবে। তখন একটা আশ্চর্য নৈঃশব্দ্য গাড়ির ভেতর ও বাইরে থেকে কোন কথা শুনতে দেবে না। আমি আর সংকেত দুজনে একমনে মিলিয়ে যেতে যেতে না মিলিয়ে যাওয়া সেই আলো আর যানদের পেছন পেছন একমনে ছুটতে থাকব তখন সেই নৈঃশব্দ্যের ভেতর থেকে গাড়ির পেছনের সিট থেকে, পেছনের টায়ারের সঙ্গে রাস্তার মসৃণ ঘর্ষণের আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে চুমুর অস্ফুট আওয়াজ ভেসে আসছিল।এইরকম বহু বহু দূর গিয়ে শেষ পর্যন্ত যখন পাখিদের আওয়াজ ছাড়া আর কোন শব্দ শোনা যাচ্ছিল না — একটা দুটো তিনটে চারটে পাঁচটা পাখির আওয়াজ, যত নিস্তব্ধতা ততো পাখির আওয়াজ, যত সময় ততো পাখির আওয়াজ – দেখা গেল সামনের মহানন্দা অভয়ারণ্যের ওপরের টিলা থেকে আমরা দেখছি তিস্তা নদীকে, বোঝা গেল যাত্রা শেষ হয়েছে। বিষমতা বলল,“আমি তিনটে পাখির আওয়াজ শুনেছি।” প্রাচুর্য বলল,“কথা বল না তাহলে বুঝতেই পারবে না কত রকম ডাক আসছে।” বিষমতা আমাকে বলেছে,“আমাদের একটা ছবি তুলে দেবেন।” ছবি তুলতে গিয়ে দেখলাম প্রাচুর্যের হাতে একটা ঢাউস ক্যামেরা সে তার মধ্যে পটাপট ছবি ভরছে ক্লাশশ্ ক্লাশশ্ ক্লাশশ্ আর সংকেত ইতিমধ্যে ঘরে গিয়ে দোর দিল কি? বুঝলাম ঘুমের দরকার। দরজা ধাক্কা দিতে সংকেত খুলে দিল। চান টান সেরেছে, ফ্রেশ লাগছে । আমিও চান করতে শুরু করলাম।

টিলার ওপর থেকে সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয় দেখার জন্য মোটেই আসি নি – এসেছি কুয়াশার ভেতর দিয়ে শব্দ শুনতে। এখন বেশির ভাগ শব্দ পাখির । চান করে উঠে দেখি সংকেত ঘুমিয়ে পড়েছে। ওকে বললাম,“ব্রেকফাস্ট খাবি না?” ও কিছু বলল না। ঘরের ভেতর থেকে চারপাশে যে সব শব্দেরা আছে তাদের দেখতে দেখতে পোশাক বদলে বাইরে এলাম। এসে দেখেছি শব্দেরা ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে তবে তাদের শুনতে চাইলে চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে হয়। এখন হাওয়া দেবে না। হাওয়া দেবে রাতে। রাতের কিছু হাওয়া নিয়ে বসে রইলাম। টিলার তলা থেকে বিষমতা ও প্রাচুর্য উঠে এলো। ওরা কি চান টান করে নিয়েছে? ফ্রেশ হয়েছে? আমি জিজ্ঞেস করলাম,“তোমাদের চান সারা?” বিষমতা বলল,“ একদম।” প্রাচুর্য বলল,“শুধু যা পার্টিটাই হল না।” আমি বললাম,“তলায় নেমেছিলে?”
—— পাখির ডাক শুনছিলাম।
—— পাখির ডাক শোনা যায়?
—— যায়।
—— আমি তো শব্দ দেখতে পাচ্ছি।
—— দেখছ?
—— হ্যাঁ।
—— কিসের?
—— হাওয়ার।
—— হাওয়ার শব্দ?
—— হ্যাঁ, দেখছি হাওয়ারা শব্দ করছে। রাতে আরো শব্দ করবে।
—— কী করে জানলে?
—— আগে এসেছিলাম তো।
—— এসেছিলে?
—— তখন শব্দ শুনেছি। হাওয়ার।
—— আমরা অনেক পাখির শব্দ শুনছিলাম।
—— টিলার তলায় কি অন্ধকার ?
—— না।
—— তবে?
——টিলার তলায় সব দেখা যাচ্ছিল।
—— আর?
প্রাচুর্য বলল,“আর একটু কুয়াশা ছিল ওখানে, নাকি বেশিই ছিল কুয়াশা?” বিষমতা বলল,“তবু সব দেখা যাচ্ছিল।” প্রাচুর্য বলল,“তা ঠিক তবে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল এটা বলা যাবে না।” আমি বললাম,“ওই জন্য তোমরা শব্দ দেখতে পাও নি।” প্রাচুর্য বলল,“ দেখতে পেলে কি শুনতে পেতাম না?” আমি বলেছিলাম,“কী জানি।”

এখানে বারবার এসেছি। কেন এসেছি কী জানি,দেখতে এসেছি কি? এখানে সব দেখা যেতে পারে আর তা সময়ান্তে বদলে বদলে যাচ্ছে। বদলানো মানে রং বদলানো । বদলানো মানে শব্দ বদলানো। বদলানো মানে দেখাও বদলাবদলি হওয়া। বিষমতাকে বললাম,“বদলাবদলি করবে?”
—— কী?
—— দেখা বদলাবে ?
প্রাচুর্য বলল,“কী ভাবে?” আমি বললাম,“সংকেত এখন ঘুমচ্ছে।”
—— তাতে?
—— ও কী কী দেখছে?
—— জানি না।
—— জানব।
—— কী ভাবে?
—— বদলাবদলি করে। বিষমতা যা দেখছে সব আমি দেখব। আমি যা দেখছি সব বিষমতা দেখবে। সংকেত যা দেখছে সব প্রাচুর্য দেখবে। প্রাচুর্য যা দেখছে সব সংকেত দেখবে।
—— আর শুনবে না।
—— হ্যাঁ, শোনাটাও বদলাবদলি হবে।
প্রাচুর্য বলল,“আমি নেই।” আমি জিজ্ঞেস করলাম,“কেন?” প্রাচুর্য ক্যামেরায় চোখ রেখেছে।

এইভাবে আমরা মনের ভেতর ঢুকেছি, বেরিয়েছি আর ঘুমের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে টিলার তলায় কুয়াশার ভেতর দিয়ে যেতে আস্তে আস্তে নদীর ধারে পৌঁছেছিলাম। ফেরার পথে রাত হয়ে হয়ে এসেছিল, সূর্য ডুবতে আরম্ভ করে দিয়েছিল। আমি সূর্য ডোবার আওয়াজ বুঝতে আরম্ভ করতেই সংকেত ঘুমের মধ্যে নড়েচড়ে উঠল – বুঝলাম ও প্রাচুর্যকে ওর দেখা ও শোনা দিতে চাইছে অথচ প্রাচুর্য নেয় নি।ও ঘুমের মধ্যে বলছে,“এক দুই তিন চার পাঁচ ….. . . ..।” প্রাচুর্য বলল,“আগেই তো বললাম তোমার শোনা পাখির আওয়াজ আমার ভালো নাও লাগতে পারে।” বিষমতা আমার শোনা সূর্য ডোবার আওয়াজ শুনে অস্ফুটে বলল,“এইমাত্র শুনলাম।” প্রাচুর্য তাকে জিজ্ঞেস করতে গেল,“কী শুনলি?” কিন্তু তার চোখে আবার ঘনিয়ে এলো কুয়াশা – যা ঘনিয়ে আসছে আসছে আর রাস্তাকে আঁধার করে দিচ্ছে। তখন আলো জ্বললে কুয়াশা দেখা যাচ্ছে। আলো পড়লে কুয়াশা দেখা ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। সংকেত গাড়ি থামিয়ে দিচ্ছে। আমি বলছি,“এইরে!” বাইরে মসৃণ রাস্তায় চাকার ঘর্ষণ থেমে আসছে। কুয়াশা ভিজিয়ে দিচ্ছে গাড়ির কাচ। সেখানে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠছে। পেছনের সিট অন্ধকার।পেছনের সিটের তলায় কুয়াশা। টিলার তলায় কুয়াশা।পেছনের সিটের মধ্যে থেকে অস্ফুটে চুমুর শব্দ শোনা যাচ্ছে। ভিজে ভিজে হয়ে আসছে ঠোঁট – গাঢ় হয়ে আসছে – কুয়াশার ভেতর দিয়ে সামনে একটা লরি বা গাড়ির ইন্ডিকৈটর জ্বলে উঠছে। তার পেছু নিয়ে ভেজা ভেজা শব্দের ভেতর দিয়ে, অদেখা না-দেখার ভিতর দিয়ে দিয়ে আবার আমরা এগোতে শুরু করছি। প্রাচুর্য কোন বদলাবদলি করে নি যদিও সংকেত তার সব জেনে যাচ্ছে কিন্তু সংকেত তো ঘুমচ্ছে।

প্রাচুর্য বলল,“কবে থেকে খুঁজছিলাম একদম গাঢ় নীল রঙের ফ্লাই ক্যাচারটা। সেই কবে যেন কল্যাণীতে দেখে এসেছিলাম – পেয়ে গিয়েছিলাম। এতদূর থেকে কল্যাণী গিয়েছিল।” আমি যা যা শুনছিলাম সব বিষমতা শুনতে পেয়েছিল। তার মধ্যে গাঢ় নীল ফ্লাইক্যাচারটা থাকবে এমন কোন কথা নেই যদিও প্রাচুর্য তার সুন্দর ছবি তুলেছে। সে বলল, “সেই বুক- সাদা মাছরাঙাটার শব্দ শুনতে পেয়েছি।” প্রাচুর্য বলল,“কই? কোথায়?” ওরা খুঁজতে গেছে। আমি দেখলাম প্রাচুর্য মাছরাঙাটার ছবি তুলেছে আর বিষমতা দেখেছে বলে আমিও দেখতে পেলাম।

Facebook Comments

Posted in: August 2021, STORY

Tagged as: ,

Leave a Reply