শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং আজকের আফগানিস্তান : অভিজিৎ সাহা

“আফগানিস্তান যেন একটি নধর ভেড়া, যার ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ার জন্য একটি সিংহ এবং একটি ভাল্লুক সব সময় উদ্যত। কিন্তু ভাল্লুক এর চেয়েও সিংহ অনেক বেশি ক্ষিপ্র, তাই আফগানিস্তানে আমির ব্রিটিশ সিংয়ের সঙ্গে আপোষ-রফায় থাকতে চান, কিন্তু সিংহ এক-এক সময় ধৈর্য ধরতে পারে না……… প্রমাণিত হলো যে আফগানিস্তান একটি নধর ভেড়া নয়, বরং বলা যায়, সর্বাঙ্গে কাটা ভর্তি শজারু”। প্রথম আলো, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৩১২-৩১৩,২০১০।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র আফগানিস্তান তার নিজগুণে স্বকীয়তায়, স্বভঙ্গিমায়, অতীত ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে আপাত স্থিতিশীলতাকে ভঙ্গ করে আবার পুনরায় এক নতুন বিভীষিকাময়, অন্ধকারাচ্ছন্ন, ভবিষ্যৎহীন ভবিষ্যতের দিকপানে/অভিমুখে নিজের যাত্রাকে যথার্থভাবেই নির্দিষ্ট করেছে। এই নব্য পরিস্থিতির জন্য আফগান জনগণের দায় কতটা বা তাদেরকে কতটাই বা ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে, মূল্য চোকাতে (মানবাধিকার রক্ষা, নারী স্বাধীনতা, সুষম উন্নয়ন প্রভৃতি প্রশ্নে) হবে, আর জাতিগোষ্ঠীতে বহুধা বিভক্ত শাসকের ভূমিকা আগামী দিনে কী হবে, শাসন পরিচালনায় তালিবানের নীতি কী হবে, আর এই সবের প্রভাব প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে আমাদেরকে কতটা পরিমাণে প্রভাবিত করবে, আবার বিশ্ব রাজনীতিতে এই ঘটনার প্রভাবই কী, বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা কেমনতর হবে-এগুলিকে নতুন করে নিরীক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা আজকের দিনে আরও বেশী করে অনুভূত হচ্ছে।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানের প্রেক্ষাপটে শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, এই সব বিষয়গুলিকে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করা। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশেষজ্ঞগণ আফগানিস্তানে আমেরিকার এই অবস্থানকে আমেরিকার স্বেচ্ছায় পলায়ন বা আমেরিকার আফগানিস্তানের এই জটিল আবর্ত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার প্রবল আকুতি রূপে চিহ্নিত করেছেন। এই ব্যাপারে আমেরিকাও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে যেভাবে সারা দুনিয়া জুড়ে সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ করেছে ক্ষেত্র বিশেষে ধর্মীয় মৌলবাদকে ব্যবহার করে আমেরিকা এর দ্বারা এতদিন পর্যন্ত নানাভাবে নিজের স্বার্থসিদ্ধি ঘটিয়েছে। কিন্তু আফগানিস্তানে আমেরিকার এই পরাজয় সার্বিকভাবে দুটি জিনিসকে স্পষ্ট করেছে –
এক, আফগানিস্তান সম্বন্ধে এক বহুল পরিচিত উক্তি রয়েছে সেটা হল আফগানিস্তানের মাটিতে খুব সহজেই নিজের ইচ্ছায় প্রবেশ করা যায় এনমকি যুদ্ধেও জেতা যায়, কিন্তু সময় যত অতিবাহিত হয় অতি কষ্ট করেও এইখান থেকে বেরানো যায় না। শেষ দুশো বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে এই সত্যটি আমাদের সামনে আসবে যেখানে গ্রেট ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সকলেই ভেবেছিলেন আফগানিস্তানে যাবেন, দেখবেন এবং জয় করবেন। কিন্তু শেষমেশে সকলেই মুখ লুকিয়ে, পিঠ বাঁচিয়ে ফিরে এসেছিলেন। এর মধ্যে গ্রেট ব্রিটেনের অবস্থা সবথেকে শোচনীয় হয়েছিল।

দুই, সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকা যেখানে যেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমেরিকা পর্যুদস্ত হয়েছে, আফগানিস্তানেও এটার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এর ফলে তালিবানদের হাতে আফগানিস্তানের পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এই পুরো বিষয়টিকে বুঝে নেওয়ার জন্য আমরা আমাদের আলোচনাকে কতগুলি ভাগে বিভক্ত করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব। আধুনিককাল থেকে শুরু করে বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থা চরিত্র, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকার পরিস্থিতি, নারীর অধিকার এগুলিকে পর্যায়ক্রমে বুঝে নিতে হলে আমাদের মোটের ওপর তিনটি বিষয়ে আলোকপাত করতে হবে। এগুলি হল- ১) আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিবর্তন এবং এই পরিবর্তন/বিবর্তনগুলির মধ্য দিয়ে নতুনত্বের যে বাঁকগুলি আমাদের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে সেগুলোকে সংক্ষেপে বুঝে নেওয়া; ২) শান্তি ও সুস্থিতি থেকে শত যোজন দূরে অবস্থিত আফগানিস্তানে নানান পর্বের শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াসগুলিকে চিহ্নিত করা, তবে এটা মনে রাখতে হবে অদ্যাবধি আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার অধিকাংশ প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে; ৩) আফগানিস্তানের মানবাধিকার, বিশেষ করে নারী অধিকার বিষয়গুলিকে নানান পর্যায়ে কতটা পরিমাণে সুরক্ষিত ছিল সেগুলো উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করার চেষ্টা করা।

আফগানিস্তানে রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিবর্তন:-

অতীত ইতিহাসকে বাদ দিলে আমরা যদি খুব অল্প সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিবর্তনকে বুঝতে চাই তাহলে এর কতগুলি সুস্পষ্ট পর্যায় রয়েছে। আফগানিস্তানের এমন একটি দেশ যেটা অধিকাংশ সময়ই বৈদেশিক শক্তি এবং তার অভ্যন্তরস্থ নানাবিধ গোষ্ঠী ধারা শাসিত হয়েছে। ভৌগলিক দিক থেকে আফগানিস্তান হল এশিয়া এবং ইউরোপ মহাদেশের প্রবেশপথ। পুরাণে কথিত গান্ধার প্রদেশ হল আজকের কান্দাহার। পুরাণে গান্ধার কে একটি দেশ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আজকের আফগানিস্তান গান্ধার প্রদেশের অনেকখানি অংশ নিয়ে গঠিত। পৌরাণিক যুগ থেকে বেরিয়ে এসে ইতিহাসের যুগে প্রবেশ করলে দেখা যাবে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ শতাব্দীতে ব্যাবিলনের প্রথম দারুওয়াস আফগানিস্তান দখল করেছিল। পরবর্তীতে আলেকজান্ডার ৩২৯ খ্রিস্টপূর্ব সময়কালে আফগানিস্তান দখল করেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩০৪-এ মৌর্যরা হিন্দুকুশ পর্বতের দক্ষিণ অংশকে নিজেদের সাম্রাজ্যভুক্ত করেছিল। এরপরে আরব সাম্রাজ্যবাদ আফগানিস্তানে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু এদের শাসন কার্যকালের মেয়াদ কোনোভাবেই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। গজনীর মামুদ ১১ শতাব্দীতে ইরান থেকে ভারত অবধি একটি সুবিস্তৃত সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। এর মধ্যে আফগানিস্তানও ছিল। অবশ্য এর পূর্বে হিন্দু শাহী সাম্রাজ্য কাবুল শাসন করেছে। চেঙ্গিস খাঁ ১২০৯ সালে আফগানিস্তান দখল করেছিল। মোঘল সম্রাট বাবর ভারত বিজয়ের আগেই দীর্ঘ দুই দশক আফগানিস্তান শাসন করেছিলেন। ১৭৩৮ সাল অবধি হিন্দুকুশের বেশিরভাগ অঞ্চলে মোগল সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে ছিল।মুঘল সাম্রাজ্যের পরে আসে নাদির শাহর রাজত্ব। নাদির শাহর মৃত্যু হলে ১৭৪৭ সালে আহমেদ শাহ দুরানি আধুনিক আফগানিস্তানের প্রতিষ্ঠা করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৭০০ সাল অবধি আফগানিস্তান কোনো একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ রূপে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেনি। উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আফগানিস্তানের মোট তিনটে যুদ্ধ হয়েছিল। এই যুদ্ধের সময়কাল ছিল ১৮৩২-৪২, ১৮৭৮-৮০, ১৯১৯-২১। এই তিনটি যুদ্ধেই ব্রিটিশদের শোচনীয় পরাজয় ঘটেছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে, এই তিনটি যুদ্ধের মধ্যে ১৯২১ সালের যুদ্ধে জয়লাভের পরেই একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আফগানিস্তানের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল।আমির আমানুল্লাহ খান আফগানিস্তানে আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক সংস্কারে উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আমানুল্লাহ খান নিজেকে রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন। আর্থসামাজিক অবস্থা উন্নয়নের জন্য আমানুল্লাহ খান একগুচ্ছ আধুনিকরণের কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় আমানুল্লাহ শাসনকাল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি ১৯২৮ সালে আমানুল্লাহ সমালোচকরা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল এবং ১৯২৯ তিনি সিংহাসন থেকে সরে দাঁড়ান এবং দেশ ছেড়ে চলে যান। ১৯৩৩ জাহির শাহ আফগানিস্তানের রাজা হন। জাহির শাহ প্রায় ৪০ বছর টানা একটানা আফগানিস্তানের রাজা ছিলেন।এখনো পর্যন্ত শাসক হিসেবে জাহির শাহ সবথেকে বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক স্থায়িত্ব বজায় রাখতে পেরেছিলেন। ১৯৩৪ সালে আমেরিকা-আফগানিস্তানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছিল।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের মধ্যে দিয়ে ব্রিটিশরা ভারত এবং পাকিস্তান নামক দুটি পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছিলেন এবং পৃথক রাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির সাথে আফগানিস্তানের এক দীর্ঘ অনিয়ন্ত্রিত অমীমাংসিত সীমান্তও সৃষ্টি হয়। ইতিহাসে এটা ডুরান্ড লাইন নামে খ্যাত। ১৯৫৩ সোভিয়েতপন্থী রাজনৈতিক নেতা দাউদ খান আফগানিস্তানের প্রধানমন্ত্রী রূপে নিযুক্ত হন এবং তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের মতন একটি কমিউনিস্ট দেশ থেকে আর্থিক এবং সামরিক সহায়তা লাভের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে সক্রিয় ছিলেন। এই কথা অস্বীকার করলে চলবে না আফগানিস্তান ইতিহাসে দাউদ খানই সর্বপ্রথম নানাবিধ মানবিক সংস্কার মূলক কার্যকলাপ এবং কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন যার মধ্যে অন্যতম হল সমাজের সর্বস্তরে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি করা। দাউদ খানের আমলেই আফগান নারীরা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় অবধি নির্বিঘ্নে পড়তে পারত। ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত প্রধান নিকিতা ক্রুশ্চেভ আফগানিস্তানকে সবরকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিলেন এবং এই সাহায্য প্রদানের বিষয়টি আফগানিস্তান থেকে যতদিন না সোভিয়েত বাহিনী গেছে ততদিন অবধি বজায় ছিল। ১৯৫৭ সালে দাউদের সংস্কার কর্মসূচির ফলে এই প্রথম আফগান মহিলারা বিশ্ববিদ্যালয় স্তর অবধি যেমন পৌঁছাতে পেরেছিল তেমনি ভাবে উৎপাদন ক্ষেত্রেও নিজেদেরকে যুক্ত করতে পেরেছিল।

১৯৬৫ সালে আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বারবাক কারমাল, নূর মোহাম্মদ তারাকি এরা দু’জনে ছিলেন আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান নেতা। ১৯৭৩ সালে আফগানিস্তানের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসে। দাউদ খান শেষ রাজা জাহির শাহকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এর ফলে আফগানিস্তানে দাউদ খানের জামানা শুরু হয় এবং দাউদ খানের পার্টি যার নাম People’s Democratic Party of Afghanistan সর্বোচ্চ ক্ষমতা দখল করে। দাউদ খান আফগানিস্তানে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটান এবং নিজেকে আফগানিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। মুখ্যত ১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতাতেই প্রজাতান্ত্রিক আফগানিস্তান (The Republic of Afghanistan) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৭৫-৭৭ এই সময়কালের মধ্যে দাউদ খান আফগানিস্তানে নতুন সংবিধান চালু করার প্রস্তাব দেন যেখানে নারীদের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করার দাবি করা হয়েছিল। এছাড়াও এই সংবিধানে মধ্য দিয়ে আধুনিকরণের এমন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল যাতে করে আফগানিস্তান একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে এবং বিশেষজ্ঞদের মত হিসেবে আফগানিস্তান কিছু পরিমাণে এই কাজটা করতে পেরেছিল। যদিও দাউদ খান একজন স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন। কিন্তু এই ধরনের সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ এবং তাকে বাস্তবায়ন–এই পুরো প্রক্রিয়াটি আফগানিস্তানের সকল অংশের জনগণের মধ্যে একই রকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। আফগানিস্তানের শহুরে জনগণ সমাজতান্ত্রিক ধরনের কর্মসূচিসমূহকে স্বীকৃতি জানিয়েছিল আর অন্যদিকে গ্রামীণ আফগান জনগণ মনে করত এই ধরনের সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শাসকরা শেষ পর্যন্ত আফগান সংস্কৃতি, ইসলামিক মূল্যবোধ থেকে তাদেরকে বিযুক্ত করতে চাইছে।

১৯৭৮ সালে দাউদ খান একটি কমিউনিস্ট অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নিহত হন এবং এই পর্বে আফগানিস্তান আফগানিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নূর মোহাম্মদ তারাকি নিজেকে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন এবং বারবাক কারমাল উপপ্রধানমন্ত্রী রূপে নিযুক্ত হন। এই নব্য শাসক গোষ্ঠীটি দাবি করে যে এরা সোভিয়েত প্রভাবমুক্ত, কমিউনিস্ট ধ্যান-ধারণা সম্পূর্ণ বিরোধী এবং শাসনকার্যের নীতি হিসেবে এখন থেকে ইসলামিক রীতিনীতি, আফগান জাতীয়তাবাদ, আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার, বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে জোট নিরপেক্ষতা নীতি এইগুলিকে প্রাধান্য দেবে। তবে নূর মোহাম্মদ তারাকি সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে এক বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক স্থাপন করেন, যদিও অপর এক আফগান কমিউনিস্ট নেতা হাফিজুল্লাহ আমিনের সাথে তারাকির বিরোধ লক্ষ্য করা গিয়েছিল। এই পর্বেই রক্ষণশীল মুসলিম ও এথনিক আফগান নেতাগন দাউদ খানের দ্বারা শুরু করা সংস্কার কার্যকলাপগুলো বিরোধিতা করতে শুরু করেছিল। এদেরই নেতৃত্বে গ্রামীণ আফগানিস্তানে বেশ কিছু অঞ্চলে সশস্ত্র বিদ্রোহ ও বিপ্লব শুরু হয়। এদের মূল লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত সৈন্য বাহিনীর বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করা। আর এই উদ্দেশ্যেই ১৯৭৮ সালের জুন মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থনপুষ্ট সরকারে বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য গেরিলা যুদ্ধ করতে সক্ষম একটি সশস্ত্র বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে এই বাহিনী মুজাহিদিন (যারা নিজেদেরকে জেহাদের সাথে যুক্ত রাখেন তাদেরকেই মুজাহিদিন বলা হয়) নামে খ্যাত হয়।

১৯৭৯ সালে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত অ্যাডলফ ডাবসের (Adolph Dubs) হত্যা করা হয়, এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা আফগানিস্তান এখন অবধি যে সাহায্য করেছিল সে পুরো প্রক্রিয়া থেকে হাত গুটিয়ে নেয়। তারাকি ও হাফিজুল্লাহ আমিনের মধ্যেকার বিরোধ চূড়ান্ত আকার ধারণ করে এবং এরই পরিণতিতে আমিনের সমর্থকদের দ্বারা ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯ সালে তারাকির মৃত্যু ঘটে। ১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনী প্রবেশ করে। সোভিয়েত বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল পুনরায় আফগানিস্তানের ওপর নিজেদের দুর্বল হয়ে পড়া কর্তৃত্বকে স্থাপন করা এবং নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। ঐ বছরের ২৭ ডিসেম্বর হাফিজউল্লাহ আমিন ও তার অনুগামীদের হত্যা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বারবাক কারমাল আফগানিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী রূপে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৮০ সালের শুরুতেই আফগানিস্তানে গ্রামীণ অঞ্চলগুলিতে মুজাহিদিনরা আরো বেশি শক্তি সঞ্চয় করতে শুরু করে এই পর্বে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত সেনাবাহিনী এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনাবাহিনীর সাহায্যপ্রাপ্ত আফগান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং তাদের ওপর পাল্টা আঘাত হানা।

সোভিয়েত বাহিনী এবং মুজাহিদিনদের মধ্যে যুদ্ধের পরিণতিতে প্রায় ২.৮ মিলিয়ন আফগান নাগরিক পাকিস্তানে ১.৫ মিলিয়ন ইরানে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিলো, সালটা তখন ১৯৮২। যুদ্ধের পরিণতিতে মুজাহিদিনরা গ্রামীণ আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে নেয়, কিন্তু শহুরে আফগানিস্তানের ওপর সোভিয়েত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত রইল। ১৯৮৬ সাল থেকেই মুজাহিদিনরা পাকিস্তান মারফত আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেন এবং চীনের কাছ থেকে অস্ত্র পেতে শুরু করেছিল। ১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লাদেন এবং তার অন্যান্য ১৫ জন সহযোগী মিলে আল-কায়দা নামক একটি জঙ্গি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। প্রাথমিক পর্বে সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা এবং আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনাবাহিনীদের বিতাড়িত করে একটি প্রকৃত ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই কথাটি স্পষ্ট করে উল্লেখ করা দরকার যে প্রাথমিক পর্বে আল-কায়েদা বা মুজাহিদিনদের একটা অংশ শুধুমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে তাদের প্রথম শত্রু বলে চিহ্নিত করেছিল কিন্তু এর পাশাপাশি তারা এটাও মনে করতেন যে শুধু সোভিয়েত বাহিনীকে সরালে হবে না আগামী দিনে আফগানিস্তান সহ গোটা পৃথিবীতে ইসলাম ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাধা হিসেবে আবির্ভূত হবে।

এই বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে তারা পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গনের পর একমাত্রিক দুনিয়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। মুজাহিদিনদের তীব্র আক্রমণের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে একটি পারস্পরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং সেই চুক্তি অনুযায়ী সোভিয়েত ইউনিয়ন এই প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা আগামী দিনে এক লক্ষ সোভিয়েত সেনা আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করবে এই চুক্তিটি ১৯৮৯ সালে সম্পাদিত হয়েছিল। একদিকে ধারাবাহিকভাবে সোভিয়েত সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের সাথে সাথে মুজাহিদিনরাও আফগানিস্তানের শেষ কমিউনিস্ট রাষ্ট্রপতি নাজিবুল্লাহ সরকারের ওপর আক্রমণের তীব্রতা বর্ধিত করেছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নাজিবুল্লাহ যিনি কিনা আফগানিস্তানের শেষ রাষ্ট্রপতি ছিলেন ১৯৮৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ক্ষমতা পেয়েছিলেন। ১৯৯২ সালে মুজাহিদিন ও অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীরা কাবুলে ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নাজিবুল্লাহকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে অর্থাৎ ক্ষমতাচ্যুত হয়ে প্রায় এক প্রকার বাধ্য হয়েই নাজিবুল্লাহ রাষ্ট্র সংঘের সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং কাবুলের রাষ্ট্র সংঘের ক্যাম্পাসে আশ্রয় গ্রহণ করেন। বিখ্যাত গেরিলা নেতা মাসুদ আহমেদ সা মাসুদ এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন এবং সাফল্য লাভ করেন। ১৯৯২-৯৬ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে মুজাহিদিনদের সাথে তালিবানদের (পাশতুন ভাষায় তালিবানের অর্থ হল ছাত্র। আফগানিস্তানের একটি দেওবন্দি ইসলামি আন্দোলন এবং সামরিক সংগঠন, এরা মূলত মোল্লা ওমরের ছাত্র) সংঘর্ষ চলছিল। ১৯৯৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তালিবানরা আফগানিস্তানের বৃহৎ অংশের ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সমর্থ হন। ক্ষমতা পেয়ে তালিবানরা শরীয়তী আইন কার্যকর করে সর্বপ্রথম মহিলাদের শিক্ষার অধিকার, বাড়ির বাইরে বেরোনোর অধিকার সমস্ত কিছুকে সংকুচিত করে। তালিবানি জমানার এই পরিস্থিতিতে মহিলাদের স্থান হয় বাড়ির ভেতরে, এমনকি এরকম বিধান দেওয়া হয়েছিল যে কোনো মহিলা এককভাবে পুরুষ ছাড়া বাড়ি থেকে বের হতে পারবে না যদিও বা কোনো মহিলা বাড়ির বাইরে পা রাখেন তাহলে তাদের হাঁটা-চলার শব্দ যেন কেউ শুনতে না পায় ইত্যাদি ধরনের অদ্ভুত মধ্যযুগীয় বর্বরতা মহিলাদের ওপর নামিয়ে আনা হয়েছিল। স্বভাবতই পশ্চিমি দুনিয়া তালিবানদের এই ধরনের কার্যকলাপকে স্বীকৃতি জানায়নি।

১৯৯৬-২০০১ অবধি আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ অংশে তালিবানরা তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই আফগানিস্তানের মাটিকেই ওসামা বিন লাদেন তার সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের মূল চারণভূমি হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, এরই পরিণতিতে ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে ৯/১১, ২০০১ সালে আমেরিকা স্থিত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে দুটি টাওয়ারে সরাসরি বিমানের দ্বারা আঘাত চালানো হয়। আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে এটা আজও সর্ববৃহৎ সন্ত্রাসবাদী হামলার হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। আমেরিকা এই ঘটনার পিছনে প্রধান ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে ওসামা বিন লাদেনকে চিহ্নিত করেছিলেন এবং আমেরিকা তালিবানদের কাছে এই দাবি করে যে আমেরিকার ওপর সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের মূল ষড়যন্ত্রকারী ওসামা বিন লাদেন তাদের আশ্রয়ে রয়েছে এবং তাদের উচিত ওসামা বিন লাদেনকে আমেরিকার হাতে তুলে দেওয়া। কিন্তু তালিবানরা লাদেনকে আমেরিকার হাতে সমর্পণ করতে তাদের অপারগতা ব্যক্ত করলে আমেরিকা তাদের ঘোষিত শত্রু ওসামা বিন লাদেনকে নিকেশ করার জন্য আফগানিস্তানের উপর বিশেষত তালিবানদের ওপর আক্রমণ নামিয়ে এনেছিল।

আমেরিকার এই অতর্কিত আক্রমণ তালিবানরা খুব বেশীদিন সহ্য করতে পারেনি, ফলে অল্পদিনের মধ্যেই আফগানিস্তান থেকে তালিবানরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং তাদের নেতৃত্বের একটা বড় অংশ পাকিস্তান, কুয়েত এবং ইরানে আশ্রয় গ্রহণ করে। ২০০১ সালের ২২ ডিসেম্বর তালিবান-উত্তর আফগানিস্তানে যে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল হামিদ কারজাই (যিনি কিনা একজন পশতুন নেতা ছিলেন এবং যার তালিবানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, এবং পাকিস্তানের দীর্ঘদিন নির্বাসিত ছিলেন) সেই নতুন সরকারের প্রধান শাসক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। ২০০২ সালে লয়া জিগরা/ গ্র্যান্ড কাউন্সিল( Loya Jigra) হামিদ কারজাইকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান রূপে নির্বাচন নির্বাচিত করেছিল। ২০০৪ সালে এই লয়া জিগরা আফগানিস্তানের নতুন সংবিধান গ্রহণ করে এবং প্রায় পাঁচ লক্ষ জনগণের মতামতের ভিত্তিতে। নয়া সংবিধানে রাষ্ট্রপতি এবং উপরাষ্ট্রপতি এই দুটি পথ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তালিবান জামানার অবসানের পর এই প্রথম আফগানিস্তানের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল।

২০০৪ সালের অক্টোবর মাসে নয়া সংবিধান অনুযায়ী আফগানিস্তানে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আর এই নির্বাচনে ১৮ জন প্রার্থী রাষ্ট্রপতি পদে জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল এদের মধ্যে প্রায় ৫৫% শতাংশ ভোট পেয়ে হামিদ কারজাই আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি রূপে নিযুক্ত হন। ২০০৫ সালে ৩০ মে আফগানিস্তানে পার্লামেন্টারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এত কিছুর মধ্যেও আফগানিস্তানে কিন্তু কোনোভাবেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তালিবান আল-কায়েদার সাথে আফগান ও ন্যাটো বাহিনীর বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ চলছিল, প্রাণহানি হচ্ছিল দুই তরফেই। আমেরিকার সেনাবাহিনী তালিবান ও জঙ্গিদের নিকেশ করতে করতেই বেশ কিছু নিরীহ অসামরিক গ্রামীণ আফগান নাগরিকদের ওপর অত্যাচার আক্রমণ নামিয়ে এনেছিল। এরই প্রতিবাদে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই বলেন আফগানিস্তানের গ্রামাঞ্চল থেকে আমেরিকার সৈন্যবাহিনীকে সরে আসতে হবে। ২০১২ সালের আমেরিকার সেনাবাহিনী ১২ জন নিরীহ আফগান নাগরিককে হত্যা করেছিল।

২০১৩ সালে আফগান সৈন্যবাহিনী ন্যাটোর সকল ধরনের সামরিক ক্ষমতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিজের হাতে তুলে নেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ওবামা ঘোষণা করেন ২০১৪ সালের মধ্যে আমেরিকা আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা ও পরিমাণ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমিয়ে আনবে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হামিদ কারজাইয়ের পরিবর্তে আফগানিস্তানের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন আশরাফ গনি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন হামিদ কারজাই মার্কিন নীতি বিরোধিতা করার জন্য মার্কিন প্রশাসন হামিদ কারজাইকে সরিয়ে দিয়ে আশরাফ গনিকে আফগানিস্তানের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে সামনে নিয়ে আসে। এইসবের মধ্যে ন্যাটো সরকারিভাবে আফগানিস্তানে সামরিক কার্যকলাপ বন্ধ করে দেবে এমন ঘোষণাও করে। যদিও মার্কিন বাহিনী সেখান থেকে যায় এবং আফগান বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত রেখেছিল। যদিও এই কথাটি বলা দরকার যে যতই মার্কিন প্রশাসন বলুক না কেন যে তারা অতিসত্বর আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সৈন্যের পরিহার করে নেবে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল আমেরিকা মোটেও আফগানিস্তান থেকে তার সৈন্য সম্পূর্ণরূপে পরিহার করেনি।
আমেরিকান নতুন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭ সালে ঘোষণা করেন যে আফগানিস্তান থেকে তারা এখনই সৈন্য সম্পূর্ণরূপে সরাবেন না কারণ এর ফলে এই অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের গতি বৃদ্ধি পাবে। ২০১৯ সালের মে মাসে আমেরিকা ও তালিবানের মধ্যে শান্তি চুক্তি স্থাপিত হয়েছিল যার মূল লক্ষ্য ছিল আমেরিকা ধাপে ধাপে ২০২১ সালের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে। এই ঘটনা থেকে এটা প্রমাণ হয় যে আমেরিকা ২০১৭ সাল থেকে বুঝতে পারছিল যে যতই সেখানে তাদের স্নেহধন্য গনি সরকার থাকুক না কেন আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে তালিবানরা দ্রুত উঠে আসছে। তাই তারা তালিবানদের সঙ্গে নানাভাবে নানা স্তরে বোঝাপড়া শুরু করে দিয়েছিল যাতে করে নির্বিঘ্নেই সৈন্য প্রত্যাহার করা যায়। এই প্রক্রিয়াতে ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি দুই হাতে তালিবান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চার পাতার একটি সমঝোতা পত্র স্বাক্ষরিত হয়। এতে বলা হয়েছিল হয়েছে যে আমেরিকা ২০২১সালের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে তাদের সমস্ত সামরিক বাহিনী ও অসামরিক ব্যক্তিগণকে আগামী ১৪ মাসের মধ্যে প্রত্যাহার করবে। ২০২১ সালে এপ্রিল মাসে জো বাইডেন ঘোষণা করেন যে ৯/১১ এর পূর্বে আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে তাদের সমস্ত সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে।

২০২১ জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই তালিবানরা আফগানিস্তানের গ্রামাঞ্চল ও অনেক বড় শহরগুলি দখল করতে শুরু করেছিল এবং একথা স্পষ্ট যে হচ্ছিল আফগানিস্তানে গনি সরকারের পড়ে যাওয়াটা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। ১৫ আগস্ট ২০২১ সালে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল তালিবানরা দখল করে নেয় এবং আশরাফ গনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং আমেরিকার মধ্যে তার সমস্ত সেনাবাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। এইভাবে একদিকে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাবাহিনীর কুড়ি বছরের দীর্ঘ একটি ব্যর্থ, অপ্রয়োজনীয্‌ সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ, মানবতাবিরোধী অবস্থা শেষমেশে কীভাবে পুঁজিবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদের মিশেল ঘটিয়ে এক বিষাক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্ম দিতে পারল তার সাক্ষী হয়ে রইল একবিংশ শতাব্দীতে ফেসবুক, ট্যুইটার, হোয়াটসঅ্যাপে অভ্যস্ত আপাত সভ্য সমাজের অতি সভ্য মানুষেরা। অপরদিকে আফগানিস্তান দ্বিতীয়বার তালিবান জমানায় প্রবেশের মধ্য দিয়ে তার অন্ধকারময় অতীতকেই পুনরায় আঁকড়ে ধরল বা বলা ভাল ধরতে বাধ্য হল। এই পুরো ঘটনা পরম্পরা আমাদেরকে এই শিক্ষা দেয় যে ইতিহাস সবসময় প্রগতিমুখী, পূর্বেকার থেকে উন্নত অবস্থার দিকে ধাবিত হয় না বরং সময়ের প্রেক্ষিতে কোনো এক অদৃশ্য হ্যাঁচকা টানে প্রয়োজন মনে করলে ইতিহাস কোনো একটা জাতিকে, রাষ্ট্রকে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে আবার মধ্যযুগীয় বর্বরতা ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে এক লহমায়।

আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ: –

আফগানিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থা বিবর্তনের দিকে তাকালে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয় এক, একটি রাষ্ট্র হিসাবে আফগানিস্তান নিজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে যেমন ব্যর্থ তেমনই এক শাসকের অধীনে দীর্ঘকালীন থাকার অনভ্যাস এই রাষ্ট্রের অন্যতম একটা বৈশিষ্ট্যও বটে। দুই, এর ফলে আফগানিস্তান স্থায়িত্বের অভাব আফগানিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থা অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য রূপে পরিলক্ষিত হয়। এর ফলে আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মানবাধিকার রক্ষা, নারীর অধিকার রক্ষা, সুষম উন্নয়ন, জনগণের পুষ্টি, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, প্রভৃতি বিষয়গুলি সার্বিকভাবেই উপেক্ষিত হয়েছে। আফগানিস্তানের জনবিন্যাস চরিত্রটিকে যদি
বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে দেখা যাবে এখানে মোট সাত রকমের নৃগোষ্ঠী রয়েছে। এরা হলো পশতুন (৪২%), তাজিক (২৭%), উজবেক (৯%), হাজারা (৯%), আইমাক (৪%), তুর্কমেন (৩%), বালুচ (২%), অন্যান্য (৪%)। আর ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যার বিচারে সুন্নি মুসলিম ৮০%, শিয়া মুসলিম ১৯%, এবং অন্যান্য ১%। আফগানিস্তানের ইতিহাস যদি পর্যালোচনা করা যায় তাহলে দেখা যাবে এই দেশটির সর্ববৃহৎ জনসংখ্যা পশতুনরা কখনোই বিদেশিদের শাসনকে তাদের ভূমিতে পছন্দ করে না। আফগানদের বিদেশিদের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা ইংরেজ আমল থেকে শুরু করে সোভিয়েত বাহিনী হয়ে সদ্য আমেরিকার সৈন্যবাহিনী পর্যন্ত বজায় ছিল। আফগানরা আজকের দিন অবধি এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পেরেছে। আফগানরা বিদেশিদের যেকোনো মূল্যে নিজেদের দেশ বিতাড়িত করবে, কারণ আফগানরা অনন্ত কাল ধরে যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত। এটা যেমন একদিকে সত্য তেমনি বিদেশীরা চলে যাওয়ার পর তারা নিজেদের মধ্যেও আদি অনন্তকাল ধরে লড়াই করবে এটাও একটা সত্য।

কাজেই, আফগানিস্তানের সকল ধরনের আফগান জনগণকে নিয়ে বিদেশিদের প্রভাবমুক্ত হয়ে যদি একটি জাতীয় আফগান সরকার প্রতিষ্ঠা করা যায় তাহলে কিন্তু আফগানিস্তান শাসন জনিত সংকটকে অনেকটা অতিক্রম করা যাবে। এই ভাবনা থেকেই আফগানিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নাজিবুল্লাহ এই ধরনের উদ্যোগের কথা ভেবেছিলেন যেটাকে আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। এই উদ্যোগটির নাম ছিল National Reconciliation Policy। নাজিবুল্লাহ সরকার এবং তার রাজনৈতিক দল People’s Democratic Party of Afghanistan (PDPA) ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। তৎকালীন আফগান প্রেসিডেন্ট নাজিবুল্লাহ এটা বুঝতে পারছিলেন যে আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান থেকে তার সৈন্য প্রত্যাহার করছে, অপরদিকে মুজাহিদিনরা সরকারের ওপর যেভাবে আক্রমণ নামিয়ে আনছে তাতে করে আফগানিস্তানের সকল রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং মুজাহিদিনদের সাথে সমঝোতা করে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো অপরিহার্য উঠেছিল। National Reconciliation Policy–শান্তি প্রতিষ্ঠার এই নীতিটি একাধারে আফগানিস্তানের বার্তালাপের সনাতনী সামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনীতি মূল্যবোধসমূহের সাথে যেমন মানানসই ছিল, অন্যদিকে শান্তি প্রতিষ্ঠার এই নীতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন এক বাস্তবোচিত নকশা প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিল যেটা একই সাথে আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বিরোধী গোষ্ঠী সমূহের সমর্থন পাবে ও অন্যদিকে আন্তর্জাতিক দুনিয়া দ্বারা বৈধ ব্যবস্থা রূপে স্বীকৃত এবং সমর্থিত হবে।
আরও একটু এগিয়ে বললে এই কথা বলা যায় National Reconciliation Policy নামক নীতিটির উৎসমুখ আফগানিস্তানের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যেই নিহিত ছিল। ফলত এই নীতির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আফগান সংস্কৃতিতে জারিত কতগুলি সনাতনী পন্থা এবং পদ্ধতি ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল এগুলি হল টিগা, নানাবতী, লয়া জিগরা। টিগার অর্থ হল একটা পাথর নামিয়ে রেখে একটা দাগ অংকিত করে এটা নিশ্চিত করা দ্বন্দ্ব-সংঘাতের যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে এবং বেশকিছু অগ্রিম টাকা জমা রেখে শান্তির পরবর্তী ধাপ সমূহ মীমাংসিত হয়েছে তা নিশ্চিত করা। নানাবতীর অর্থ হল আশ্রয়দাতাকে সুরক্ষা দেওয়া যদি সে শত্রু হয় তাহলেও তাকে সুরক্ষা প্রদান করতে হবে। লয়া জিগরা এর অর্থ হল একটি পরিষদ যেটা অংশগ্রহণমূলক কাঠামোযুক্ত যেখানে জনগণ একত্রিত হয়ে বিতর্কমূলক বিষয়গুলো সমাধান করে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত উপনীত হওয়ার চেষ্টা করে।

National Reconciliation Policy-তে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল সেগুলি হল, ক) আফগানিস্তানের নিয়োজিত সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনাবাহিনী প্রত্যাহার; খ) মুজাহিদিনদের সাথে সংঘাত বা দ্বন্দ্বকে শেষ করা।এই উদ্দেশ্যে মুজাহিদিনদেরকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আরও বেশি পরিমাণে যুক্ত করা; গ) সংবিধানকে নতুন করে সংশোধিত করা যাতে করে আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সমর্থন প্রাপ্তি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বৈধতা আদায় করা যায়। নাজিবুল্লাহ লয়া জিগরা পদ্ধতির মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের সংবিধানের বেশকিছু সংশোধন করেন যেমন আফগানিস্তান নাম পরিবর্তন করে ১৯৭৮ সালের পূর্বেকার নাম The Republic of Afghanistan করা হয়। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা দেওয়া হয় যদিও আফগানিস্তান তার সেকুলার চরিত্র অনেকখানি বজায় রেখেছিল। বিশেষ করে পিডিপিএ (PDPA) তার নাম পরিবর্তন করে ওয়াতান পার্টি (Watan Party) নামকরণ করে যাতে করে অ-পিডিপিএ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই নতুন দলে যোগদান করতে পারে।

এছাড়াও শান্তি প্রতিষ্ঠার এই পদ্ধতিতে সংকট নিরসনের জন্য বহুমুখী কতগুলি কর্মসূচি গৃহীত হয়েছিল। যেমন সরকার বিরোধী মুজাহিদিনদের সাথে তৎকালীন আফগান সরকার কতগুলো স্তরের মধ্যে দিয়ে তাদের বার্তালাপ চালিয়েছিল কিন্তু এত সত্ত্বেও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এবং এই পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৯২ সালে নাজিবুল্লাহ মুজাহিদিনদের দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং আফগানিস্তানে রাষ্ট্রসংঘের সদর দপ্তরে আশ্রয় নেন। ১৯৯২-৯৬ এই চার বছর রাষ্ট্রসংঘের সদর দপ্তর এই নাজিবুল্লাহর শেষ আশ্রয় ছিল। অতঃপর হাজার ১৯৯৬ সালে তালিবানরা নাজিবুল্লাহকে হত্যা করে। এইভাবে নাজিবুল্লাহ সময় শুরু করা শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াটিকে সাফল্যমণ্ডিত হতে পারেনি। পরবর্তীতে হামিদ কারজাই শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০১০ সালে National Consultative Peace Jirga নামক একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল যেখানে তালিবান এবং আরো অন্যান্য সরকারবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে এক ছাতার তলায় আনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু এই উদ্যোগটিও শেষপর্যন্ত সফল হতে পারেনি।

আফগানিস্তানের মানবাধিকার, নারীর অধিকার:-

মরুভূমিতে জলের খোঁজ চালানো যেমন দুঃসাধ্য/দুষ্কর ব্যাপার, ঠিক একইভাবে আফগানিস্তানের মাটিতে নারীর অধিকারের বিষয়টি কেবল দুঃসাধ্য/দুষ্কর ব্যাপার নয় দুঃসাহসিকও বটে। আফগানিস্তানের মতো একটি ক্ষণভঙ্গুর, দুর্বল, ব্যর্থ রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মানবাধিকার বিশেষত্ব নারীদের অধিকার কতটা পরিমাণে সুরক্ষিত রাখতে সমর্থ হবে তাই নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষত যেখানে, সাম্প্রতিক সময়ে ২০২১ সালের আগস্ট মাসে তালিবানদের দ্বারা আফগানিস্তানে দ্বিতীয় বার পূর্ণ ক্ষমতা দখল এবং আমেরিকা যেভাবে আফগানিস্তান নিজেদের সেনা প্রত্যাহার করল তাতে করে গোটা পৃথিবীর শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ আফগানিস্তানের বসবাসরত সকল নাগরিক বিশেষ করে মহিলাদের এবং শিশুদের মানবাধিকার রক্ষা নিয়ে যারপরনাই চিন্তিত। ১৯৯৬-২০০১ সাল অবধি আফগানিস্তানে তালিবানরা শরীয়তী আইন নামে মহিলাদের ওপর যে অত্যাচার নামিয়ে এনেছিলে তাতে করে সেই পর্বে মহিলাদের অধিকার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবন- স্বাধীনতা যেভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিল সেই বিভীষিকা এখনোও গোটা পৃথিবীতে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
আজকের দিনে পৃথিবীজুড়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে মূল বিবেচ্য বিষয় হল তালিবানদের এই উত্থানের দরুন আফগানিস্তানে নারীদের অধিকার কতটা পরিমাণে সুরক্ষিত থাকবে। এমন নয় যে তালিবানরা আসার আগে আফগানিস্তানের নারীরা আমাদের দেশ ভারত রাষ্ট্র বা উন্নত দেশগুলোর মতো সুযোগ-সুবিধা অধিকার ভোগ করতো, কিন্তু কিছু কিছু সংস্কার আফগানিস্তানের মহিলাদের ক্ষমতায়ন, অধিকার ও সুযোগ সুবিধাকে নিশ্চিত করতে পেরেছিল। ১৯২০ সাল থেকে শুরু করে তালিবানরা ক্ষমতায় আসার আগে অবধি মানে নাজিবুল্লাহ শাসনকালের অন্তিম পর্যায় পর্যন্ত ১৯৯২ অবধি এবং মাঝে দশ বছর বাদ দিলে ২০০১-২০২১ সালের আগস্ট মাসের আগে অবধি আফগান মহিলারা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা অধিকার ভোগ করতেন বা ক্ষমতায়নের সহায়ক যে সমস্ত অধিকারসমূহ আদায় করতে সমর্থ হয়েছিলেন তার একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা আমরা নিম্নে তুলে ধরলাম।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে আমিনুল্লাহ খানের সময়কালে আফগান নারীরা সর্বপ্রথম বেশকিছু স্বাধীনতা পেয়েছিল যেমন নারী শিক্ষা, পর্দা প্রথা নিষিদ্ধকরণ এবং এর বিপ্রতীপে আধুনিক বেশভূষা স্বীকৃতি। ১৯২১ সালে নতুন আইন পাস করা হয়েছিল যেখানে বলপূর্বক করে বিবাহ, অল্প বয়সে বিবাহ পণপ্রথা এগুলির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এছাড়াও পুরুষের বহু বিবাহ প্রথার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, আমানুল্লাহ খানের স্ত্রী রানী সোরায়া (soraya) একজন আধুনিক, আলোকপ্রাপ্ত মানুষ ছিলেন। তিনি আফগানিস্তানের মহিলাদের জন্য সর্বপ্রথম একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন, এছাড়াও তিনি মহিলাদের জন্য সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন যার নাম ছিল আনজুমা-হি-হিমায়াত-নিশান (Anjuma-i-Himayat-i-Nissan)। ১৯২০-২১ সাল নাগাদ নারীদের জন্য পৃথক একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছিল যার নাম ছিল মুস্তুরাত(musturat)। এছাড়াও এই পর্বে আফগান মহিলাদের জন্য একটি পৃথক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। রানী সোরায়া দ্বারা আনিত এই সমাজ কল্যাণমূলক কাজগুলো যা নারীদের অধিকার, ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে অনেকটা পরিমাণে সম্প্রসারিত করেছিল এগুলি সবই তৎকালীন আফগানিস্তানের গোঁড়া, রক্ষণশীল-সনাতনী, নানাবিধ সম্প্রদায় কর্তৃক সমালোচিত হয়েছিল।

আমিনুল্লাহ পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এর ফলে আফগান নারীদের জন্য স্বীকৃত অধিকার সমুহ যেগুলি নারী ও পুরুষের সমানাধিকার, নারীদের মর্যাদা সহ প্রভৃতি বিষয়গুলিকে আরও বেশী পরিমাণে সুরক্ষিত করেছিল সেগুলো সবই সংকুচিত, বাতিল করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৪৬ সালে সরকারি সাহায্যে নারী কল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই পর্বে নারীরা ভোকেশনাল প্রশিক্ষণে যোগদানও করেছিল। প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে হাজার ১৯৫৫ সালে ৫১ জন ছাত্রী কাবুল বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হয়েছিল। মূলত রাজা জাহির খান এবং তার যোগ্য প্রধানমন্ত্রী দাউদ খানের নেতৃত্বে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলযাতে করে নারীরা আরো বেশি পরিমাণে জনপরিসরের সকল ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে পারে। ১৯৫৭ সালে আফগান নারীরা সর্বপ্রথম রেডিও কাবুলের সঞ্চালকের দায়িত্বও পেয়েছিল। এই পর্বে আফগান নারীরা মৃৎশিল্প যুক্ত হয়েছিল। জনপরিসরে পর্দাপ্রথা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। শহরে এলিট একই সাথে সরকারি কর্মকর্তাদের পরিবার এবং সরকারি কর্মচারী সকল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা জনজীবনে আর পর্দা প্রথা ব্যবহার করবে না।

১৯৬৪ সালের সংবিধানে সর্বপ্রথম নারীদের বেশকিছু অধিকার প্রদান করা হয়েছিল। যেমন নারীর সমান অধিকার, ভোটাধিকার প্রদানের অধিকার,রাজনৈতিক এবং সামাজিক জীবনে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি ইত্যাদি। ১৯৭৭ সালে মিনা কামালের নেতৃত্বে মহিলারা সর্বপ্রথম শিক্ষার সুযোগও পেয়েছিল।১৯৮০-৯০দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণাধীন আফগানিস্তানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার, নারীদের শিক্ষা ইত্যাদি বেশি পরিমাণে গুরুত্ব পেয়েছিল। নাজিবুল্লাহ সময় ( ১৯৮৬-১৯৯২) ১৯৯১ সালের মধ্যে দেখা যাচ্ছে প্রায় ৭০০০ মহিলা বিদ্যার্থী আফগানিস্তানের উচ্চশিক্ষা অংশগ্রহণ করেছিল। ১৯০ জন মহিলা অধ্যাপক ছিলেন। আর বিদ্যালয় শিক্ষার দিকে নজর দিলে দেখা যাবে ২৩০০০ বালিকা স্কুলে যেত এবং মহিলা শিক্ষকের সংখ্যা ছিল ২২২০।

১৯৯২-৯৬ সালের মধ্যে আফগানিস্তান গৃহযুদ্ধের মধ্যে প্রবেশ করে এবং শেষে ১৯৯৬ সালে তালিবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করলে, এতদিন ধরে মহিলারা যে অধিকার পেয়েছিল সেগুলিকে একটি ফতোয়া জারির দ্বারা বাতিল করা হয়। এর ফলে মহিলা শিক্ষাক্ষেত্র এবং কাজের জায়গা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। শুধু বোরখা পরা নয় মাথা থেকে পা অবধি পুরো ঢেকে রাখা, এখন থেকে পুরুষ পুরুষ ছাড়া কোন মহিলা এককভাবে বাড়ির বাইরে বেরোতে পারবে না, এমনকি জানালা দরজার কাঁচও কালো রং দিয়ে ঢেকে দিতে হবে যাতে বাইরের লোক ঘরের ভিতরের দিকে নজর দিতে পারে এইভাবে তালিবান জামানায় একচেটিয়াভাবে মহিলাদেরকে গৃহবন্দি করা হয়েছিল। এই ধরনের মধ্যযুগীয় বর্বরতা সাথে মানানসই ফতোয়া তালিবানরা আফগান মহিলাদের জন্য জারি করেছিলেন।

২০০১ এর পরবর্তী পরিস্থিতিতে মহিলারা তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতা, সুযোগ, অনেকাংশেই ফিরে পেয়েছিল। বর্তমানে ২০২০ সালে প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে আফগানিস্তানের মোট জনসংখ্যা ৪৮.৬৮% হল মহিলারা। ২০০২ সালে মহিলাদের শিক্ষার হার ছিল ৫% এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১.৮%। গর্ভকালীন অবস্থায় মৃত্যুর হার এক লাখে ১৩০০ থেকে কমে ৬৩৮ হয়েছে। শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৮৫ থেকে কমে ৪৭ হয়েছে। সর্বোপরি মানুষের আয়ু ৫৭ সাল থেকে বেড়ে ৬৭ সাল হয়েছে। ২০০২ সালের হিসেব অনুযায়ী প্রতি মাথাপিছু জিডিপি যেখানে ১৬৯ ডলার ছিল তা বেড়ে ৫০৯ ডলার অবধি পৌঁছেছে এককথায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তালিবানরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার ফলে নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার রক্ষা প্রভৃতি প্রশ্নে এই ধরনের অর্জিত সাফল্য সমূহ আদৌ বজায় রাখা যাবে কিনা এইসব নিয়ে সারা পৃথিবী শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ যেমন চিন্তিত তেমনি একইভাবে মানবাধিকার রক্ষা, নারী সুরক্ষা ও শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা সমূহ আফগানিস্তানে তালিবানদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টিকে একটি বিপদ হিসেবেই দেখছেন কারণ তালিবানদের ১৯৯৬-২০০১ সালে কার্যকলাপ মানবাধিকার, নারী অধিকারের মূল সুরের সাথে কোনভাবেই মানানসই ছিল না।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গোটা পৃথিবী জুড়ে মানবাধিকার রক্ষায় সদা ব্যাপৃত Human Rights Watch নামক সংস্থাটি ৩০ জুন ২০২০ সালেEducation, Social Restriction, and justice in Taliban-Held Afghanistan একটি প্রতিবেদনে আফগানিস্তানে তালিবানদের আগ্রাসন, কিভাবে তালিবান আফগানিস্তানের অর্ধেক অংশ নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে, এর ফলে আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে মানবাধিকারের সংকট সৃষ্টি এবং তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ কীভাবে নিশ্চিত করা যায় সেই নিয়ে একটি অসাধারণ রিপোর্ট তৈরি করেছে। এই রিপোর্টটি আমাদেরকে বুঝতে সাহায্য করে যে আফগানিস্তানে তালিবানদের ক্ষমতা দখল স্রেফ সময়ের অপেক্ষায় ছিলে এর বেশি কিছু নয়। মাঝের এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়টুকু কেবল আফগানিস্তান এবং আমেরিকার মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটা পর্যায় ছিল। আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি আশরাফ গনি এই সমস্ত ঘটনার এক নীরব ও প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। যিনি উপযুক্ত সময় ও সুযোগ বুঝে, নগদ টাকা কড়ি একটা জাতিকে অভিভাবকহীন করে চোরের মতন পলায়ন করেছেন। সুতরাং আর যায় হোক তিনি নাজিবুল্লাহ নন।

শেষের কথা

আফগানিস্তানে তালেবানদের উত্থান গোটা পৃথিবীর শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের কাছে একটা বড় আঘাত এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে আফগানিস্তানে আমেরিকা আগমন এবং চলে যাওয়া এই পুরো বিষয়টি একটা নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতাকে বজায় রেখেই সংগঠিত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বেকারত্ব, স্থায়ী চাকরির অভাব, নিম্ন আয়, কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য করা, ক্রমাগত পরিবেশগত সংকট বর্তমানে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠেছে। ৪০ বছর আগে সোভিয়েত ইউনিয়নকে তাড়ানোর জন্য যাবতীয় উদ্যোগ আমেরিকার তরফ থেকে গ্রহণ করা হয়েছিল যাতে করে আফগানিস্তান ও তার সন্নিহিত অঞ্চলে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ ও কমিউনিস্ট ভাবধারা প্রসারিত না হয়। এই জন্য আমেরিকা পুঁজিবাদী মতাদর্শের সাথে ধর্মীয় মৌলবাদের এক বিষাক্ত মিশ্রণ তৈরি করেছিল যাদের নাম ছিল মুজাহিদিন। সেই সময় আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত বাহিনীকে সরাতে সম্পূর্ণরূপে সফল হয়েছিল। কিন্তু আফগানিস্তানে আমেরিকা নিজেই তার নিজের কবর খনন তৈরি করেছে যা দুটি ধারার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে এক, ওসামা বিন লাদেন যিনি আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ সংগঠিত করে আমেরিকার আধিপত্যের ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন; দুই, আর ঠিক কুড়ি বছর পরে এই আফগানিস্তানের মাটি থেকে আমেরিকাকে মাথা নিচু করে একপ্রকার স্বেচ্ছায় পালিয়ে যেতে হল।এইভাবে আফগানিস্তানের মাটিতে আমেরিকা দুইভাবে বধ হয়েছে।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন ক্ষমতার শূন্যতাকে ব্যবহার করে তালিবানরা আফগানিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল নিয়েছে, অন্যদিকে চীন-রাশিয়া প্রভৃতি বৃহৎ শক্তিবর্গ আফগানিস্তানের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কারণ আফগানিস্তানের ভূগর্ভস্থ লিথিয়াম, তামা, লোহা, কোবাল্ট, মার্কারি, ইউরেনিয়াম, ক্রোমিয়াম এবং পৃথিবীর দুষ্প্রাপ্য উপাদানসমূহ প্রভৃতি নানাবিধ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। এছাড়াও গোটা পৃথিবীর আফিম চাষের ৮৫% আফগানিস্তানে হয় যা নেশা দ্রব্য এবং ওষুধের কাজে একচেটিয়াভাবে ব্যবহৃত হয়। আজ গোটা পৃথিবীর সভ্য মানুষের এই কথাটা স্পষ্ট করে বলা দরকার যে এইসব সম্পদের উপর সর্বাধিক অধিকার রয়েছে আফগান জনগণের। কাজেই আফগান জনগণবাসীকে এমন এক ধরনের শাসন কাঠামো তৈরি করা উপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে যেখানে সকল প্রকার আফগানিরা অংশগ্রহণ করতে পারে। এক্ষেত্রে নাজিবুল্লাহ প্রণীত National Reconciliation Policy ধাঁচের আরো একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার আয়োজন করতে হবে যেটা সকল আফগান বাসীদের স্বার্থসমূহকে রক্ষা করবে, কারণ এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগসমূহ চরিত্রগত ভাবে অংশগ্রহণমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক্‌ এবং গণতন্ত্রসম্পন্ন হয়, যার অভাবে আজকের আফগানিস্তান ধীরে ধীরে মানবাধিকারহীন, নারীর অধিকারহীন, গণতন্ত্রহীন, প্রায় রক্তশূন্য কঙ্কালসার একটি নিথর রাজনৈতিক দেহতে পরিণত হচ্ছে।

অতএব এই প্রেক্ষিতে আজকের দিনে প্রধান সারা পৃথিবীর সভ্য মানুষের প্রধান দায়িত্ব হল এই রক্তশূন্য কঙ্কালসার নিথর রাজনৈতিক দেহটিতে যাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা যায় সেই যজ্ঞের প্রস্তুতি নেওয়া এবং এই যজ্ঞতে যাতে সোৎসাহে যুক্ত হওয়া যায় সেই সাধনাতে সামিল হওয়া।

উল্লেখপঞ্জি:-
https://www.pbs.org/newshour/politics/asia-jan-june11-timeline-afghanistan
https://reliefweb.int/report/afghanistan/accord-issue-27-incremental-peace-afghanistan

Click to access Agreement-For-Bringing-Peace-to-Afghanistan-02.29.20.pdf


https://origins.osu.edu/print/67

Afghan women


https://www.hrw.org/report/2020/06/30/you-have-no-right-complain/education-social-restrictions-and-justice-taliban-held
https://thewire.in/south-asia/the-us-treated-afghanistan-as-a-project-heela-najibullah

[লেখক – অভিজিৎ সাহা, সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, তেহট্ট সরকারি মহাবিদ্যালয়।]

Facebook Comments

Leave a Reply