নেপথ্য কথন – প্রসঙ্গ আফগানিস্তান : বরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়

fail

গত একমাসের বেশি সময় ধরে আফগানিস্তান নিয়ে যত আলোচনা তা প্রেক্ষিত মেনেই। ১৫ আগস্ট কাবুলে তালিবানি দখলদারির পর প্রাইম টাইম, নিউজ প্রিন্ট, ডিজিট্যাল মিডিয়া জুড়ে – উদ্বেগ, সন্ত্রাসবাদ, আগ্রাসন, ধর্মীয় মেরুকরণ, মুসলমানরা কত খারাপ হতে পারে – ইত্যাদি ইত্যাদি। সঙ্গে ছিল আফগানিস্তান, কাবুল, পঞ্জশির, আমেরিকা, মুজাহিদ। বিদগ্ধজনদের আলোচনায় বারবার ঘুরে ফিরে ‘তালিবান’। আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষকে নিয়ে আলোচনা সেখানে কম। আফগানিস্তানে প্রায় শতাধিক মিডিয়া গত কয়েকদিনে ঝাঁপ বন্ধ করতে বাধ্য হওয়া নিয়েও খুব বেশি আলোচনা নেই। সত্যিকে অস্বীকার করে লাভ নেই। সময়টা এখন এমন, যেখানে কারোর কারোর জল ঘুলিয়ে খেতেই আনন্দ। তাই সেইসব প্রতিবেদনের একটা বড়ো অংশ জুড়ে যত না ‘তালিবানি’ হানাদারি নিয়ে উদ্বেগ, তার চেয়ে ঢের বেশি উৎসাহ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে। চোখ না এড়ানোই স্বাভাবিক।আফগানিস্তানের তালিবানি হানাদারিকে সামনে রেখে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের সুর চড়ানো। সে প্রসঙ্গ আপাতত তোলা থাক!আফগানিস্তানে যাই।
এই শতাব্দীর গোড়ায় গা ঢাকা দিতে বাধ্য হওয়া তালিবানিরা যে বহাল তবিয়তেই কুড়ি বছর ধরে নিঃশব্দে এবং সশব্দে শক্তি সঞ্চয় করেছে তার প্রমাণ সাম্প্রতিক ঘটনাবলী। আমেরিকা বিনা কারণে আফগানিস্তান থেকে পিঠ দেখিয়েছে ভাবলে ভুল ভাবা হবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ঠিক কোন মারপ্যাঁচে তাদের লক্ষ্মী ছেলের মত ঘরে ফিরে যাওয়া তাও ভাববার বিষয়।ইরান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, পাকিস্তান দিয়ে ঘেরা আফগানিস্তান ভৌগোলিক কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিধর দেশের কাছে এক লোভনীয় স্থান। যে দেশের ওপর দখলদারি বজায় রাখতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলো এবং অবশ্যই ভারতের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা অনেক সহজ হয়ে যায়। এ তথ্য ইতিহাস স্বীকৃত। অতীতেও বারবার এই পথ দিয়েই ভারতে পা রেখেছে বিদেশী শক্তি। আর বর্তমান ভারতের প্রায় ১৩৫ কোটি জনসংখ্যার বাজারের ওপর দখলদারির লোভ তো অনেক দেশেরই। ভারতের বাজার ধরার লড়াই সবসময়েই আছে। ভারতে সহজে প্রবেশের জন্য বিভিন্ন করিডর তৈরি করাও আছে। তাই আফগানিস্তানের ঘটনায় ভারতের ওপর প্রত্যক্ষ কোনো প্রভাব না পড়লেও পরোক্ষ প্রভাব থাকছেই। তবে এগুলো কোনোটাই যেহেতু আমাদের আলোচনার বিষয় নয় তাই সে প্রসঙ্গও থাক। এ নেহাতই সামান্য কিছু প্রারম্ভিক আলাপচারিতা।
আফগানিস্তানের যেমন নিজস্ব দীর্ঘ এক ইতিহাস আছে তেমনই এই দেশ নিয়ে আলোচনায় আরও কয়েকটা দেশের নাম আসেই। রাশিয়া, আমেরিকা, পাকিস্তান, ইরান। কিছুটা ভৌগোলিক, কিছুটা রাজনৈতিক কারণে রাশিয়ার সঙ্গে আফগানিস্তানের সখ্যতার বয়স শতাধিক বছরের। আবার যুদ্ধও হয়েছে। অল্প জায়গায় সেই ধারাবিবরণী অসম্ভব।তবে শেষ পাঁচ দশকে আফগানিস্তানের পরতে পরতে গোলাবারুদের গন্ধ সেঁটে যাওয়ার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়েছে রাশিয়া, আমেরিকা, পাকিস্তানের নাম। দুই পরম শক্তিধরের ঠাণ্ডা লড়াইয়ের ফল, দেশে একের পর এক অভ্যুত্থান। এসবের ফল অনেকটাই ভোগ করেছে আফগানিস্তান। যার শুরু মোটামুটি ১৯৭৩ সালে।
১৭জুলাই, ১৯৭৩।রাজা মহম্মদ জাহির শাহ তখন ইতালিতে। রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা দখল করেন রাজারই আত্মীয়, সেনা কম্যান্ডার মহম্মদ দাউদ খান।এই অভ্যুত্থানে দাউদ খানকে পরোক্ষে সহায়তা করেছিলো বাম দল পিডিপিএ বা পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফ আফগানিস্তান। পশ্চিমি সংবাদমাধ্যম অনুসারে যে অভ্যুত্থানের পেছনে হাত ছিলো রাশিয়ার। যদিও সেই দাবি ইতিহাস স্বীকৃত নয়। এরপর যাত্রা শুরু হয় রিপাবলিক অফ আফগানিস্তানের।
‘লোয়া জিগরা’ (পাশতুন জনগণের আইনি সম্মেলন) আফগানিস্তানের এক চালু প্রক্রিয়া। ১৯৭৭ সালে এরকমই এক ‘লোয়া জিগরা’য় তৈরি হয় নতুন সংবিধান।প্রেসিডেন্সিয়াল ওয়ান পার্টি স্টেট হবার পরেই দাউদ খানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ে আমেরিকা ও পাকিস্তানের। যা নিয়ে দাউদ খানের সঙ্গে পিডিপিএ-র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিবাদ বাড়ে। এরপরেই ১৯৭৮-এর ২৭-২৮ এপ্রিল সোর রেভলিউশন বা এপ্রিল রেভলিউশন। যে বিপ্লবের পর অন্য পথে হাঁটা শুরু আফগানিস্তানের। যদিও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবাদে বারবার ধাক্কা খেয়েছে সেই অগ্রগতি। পারচাম এবং খালেক গোষ্ঠীতে পিডিপিএ ভাগ হয়ে গেছিলো ১৯৬৭ সালেই।১৯৭৮-এর অভ্যুত্থান-এর পেছনে ছিলো পিডিপিএ-র খালেক গোষ্ঠী। যে অভ্যুত্থানে দাউদ খান এবং তাঁর পরিবারের সদস্য সমেত প্রাণ যায় অনেকেরই।যদিও সোভিয়েত হস্তক্ষেপে বিপ্লবের পর দুই গোষ্ঠী মিলে ভাগাভাগি করে নুর মহম্মদ তারাকির নেতৃত্বে তৈরি হয় নতুন সরকার। ১৭ মে ১৯৭৮ কাবুলে আসে সিপিএসইউ-র এক উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল। যে দলে ছিলেন নিকোলাই সিমোনেঙ্কো, ইয়ুরি গ্যানকোভস্কি এবং ভি এম স্মিরনভ। এছাড়াও নিরাপত্তা বিষয়ে পরামর্ষ দিতে আরও এক প্রতিনিধি দল আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে। নতুন সরকারে খালেক গোষ্ঠীর তারাকি রাষ্ট্রপতি হন। পারচাম গোষ্ঠীর বারবাক কামাল উপপ্রধানমন্ত্রী। বিদেশ মন্ত্রী খালেক গোষ্ঠীর হাফিজুল্লা আমিন। যদিও কয়েকমাসের মধ্যেই বিবাদে জড়িয়ে পরে পিডিপিএ-র দুই গোষ্ঠী। খালেক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বলা হয় এই বিপ্লবে পারচাম গোষ্ঠীর কোনো ভূমিকা ছিল না। ৩০ এপ্রিল শুরু হওয়া সরকার জুলাই মাসের মধ্যেই বিভিন্ন সরকারি পদ থেকে পারচাম গোষ্ঠীর লোকজনকে সরিয়ে দেয়। বারবাক কামালকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় চেকোস্লোভাকিয়ার রাষ্ট্রদূত করে। নিজেদের গায়ে লেগে থাকা ‘কমিউনিস্ট’ তকমা দ্রুত ঝেড়ে ফেলতে উদ্যোগী হয় তারাকির সরকার।
আপাতদৃষ্টিতে এই বিবাদ যতটা সহজ বলে মনে হয় ততটা সহজ ছিলো না। ৭৮-এর বিপ্লবের পর আফগানিস্তানে সোভিয়েত আধিপত্য বেড়ে চলায় প্রমাদ গুনেছিলো আমেরিকা, পাকিস্তান। এর মাঝেই ১৯৭৮-এর ৫ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আফগানিস্তান কুড়ি বছর মেয়াদি সহযোগিতা এবং বন্ধুত্বের চুক্তি করে। যে চুক্তির পরেই আরও অশান্ত হয়ে উঠতে শুরু করে আফগানিস্তান। ১৯৭৯-র জানুয়ারি থেকেই আফগানিস্তান জুড়ে শুরু হয়ে যায় গেরিলা আক্রমণ। সেইসময়ের ২৮ প্রদেশের মধ্যে ২৫টিতেই শুরু হয়ে যায় বিদ্রোহীদের আক্রমণ। পাকিস্তান সীমান্ত থেকে দলে দলে বিদ্রোহীদের ঢুকিয়ে দেওয়া হয় আফগান প্রদেশে। ১৯৭৯ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে, পাকিস্তান থেকে আসা আফগান শরণার্থীদের নিয়ে গঠিত একটি গেরিলা বাহিনী আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের কাছে প্রাদেশিক রাজধানী আসাদাবাদ-এ এক অভিযান চালায় এবং সেখানে একটি সেনা ছাউনি দখল করে। গেরিলারা শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত হলেও, কিছু সময়ের জন্য সেনা ছাউনিতে দখল রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কারণ গেরিলা আক্রমণের পরেই আফগান সেনাপতি গোপনে পালিয়ে যান। এর মধ্যেই আমেরিকা দাবি জানায় সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ অন্য সব দেশকে ‘প্রিন্সিপাল অফ নন ইন্টারফেয়ারেন্স’ মেনে আফগানিস্তান থেকে সরতে হবে। অন্যদিকে বিক্ষুব্ধ আফগানিদের গেরিলা ট্রেনিং দেবার অভিযোগ ওঠে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় আমেরিকা আফগানিস্তানে অস্থিরতা তৈরির জন্য বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহ করছে। এই ডামাডোলের মধ্যেই ১৯৭৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ফের ক্ষমতার হাতবদল। এবার তারাকিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন হাফিজুল্লা আমিন। ক্ষমতা হাতে নিয়েই মৃত্যুদণ্ড দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবদুল কাদিরকে। একাধিক সরকারি আধিকারিককে জেলে পাঠান। যদিও মাত্র কয়েকমাসের শাসনে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় আফগানিস্তান জুড়ে। পাশাপাশি সোভিয়েতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১৬ অক্টোবর সিন্দান্দ এয়ার বেসের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয় সোভিয়েত বাহিনী। ওই বছরেরই ২০ ডিসেম্বর নিরাপত্তার কারণে রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ ছেড়ে তাজবেগ প্রাসাদে চলে যান আমিন। ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সোভিয়েত আফগান সহযোগিতা এবং বন্ধুত্ব চুক্তির (১৯৭৮) ভিত্তিতে আফগানিস্তানে ঢোকে সোভিয়েত ইউনিয়ন। যে চুক্তিতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক এবং সামরিক সহায়তার কথা বলা ছিলো।ওইদিন গভীর রাতে ২৮০টি এয়ারক্রাফট এবং সাড়ে ৮ হাজার করে তিন ডিভিশন সৈন্যবাহিনী আফগানিস্তানে প্রবেশ করে। মুজাহিদিনদের কড়া প্রতিরোধের মুখে পড়ে সোভিয়েত বাহিনী। যদিও কয়েকদিনের মধ্যেই বিদ্রোহীদের হটিয়ে কাবুল সহ সংলগ্ন অঞ্চলের দখল নেয় সোভিয়েত বাহিনী। ২৭ ডিসেম্বর তাজবেগ প্রাসাদে এক অভ্যুত্থানে নিহত হন হাফিজুল্লা আমিন। এবার ক্ষমতা দখল করেন পিডিপিএ পারচাম গোষ্ঠীর বারবাক কামাল।
বারবাক কামাল মোটামুটি ৬ বছর আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ছিলেন। ১৯৮৫-র ২০ নভেম্বর তিনি যখন রাষ্ট্রপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন তখন আফগানিস্তান প্রায় সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে। আমেরিকার দাবি অনুসারে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর সংখ্যা ১ লক্ষ ২০ হাজার। ততদিনে পরিস্থিতি আরও জটিল। বিদ্রোহী আফগান মুজাহিদিনদের ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী’ আখ্যা দিয়ে অর্থ, অস্ত্র সাহায্য করছে আমেরিকা। মদত পাকিস্তানের। চোরাগোপ্তা যুদ্ধ, গেরিলা হানা চলছে দেশজুড়ে। প্রতিরোধে সোভিয়েত বাহিনী।
৪মে ১৯৮৬ আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন পিডিপিএ পারচাম অংশের নেতা নাজিবুল্লাহ। যিনি আফগান জনসাধারণের বড়ো অংশের খুবই পছন্দের ছিলেন। একাধিক জনগোষ্ঠীর আফগানিস্তানে ‘পাশতুন’রাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ। নাজিবুল্লাহও ছিলেন পাশতুন। যদিও পরবর্তী সময়ে নিজস্ব ভাবধারায় চলতে অভ্যস্ত পাশতুন-দের থেকে কিছুটা বিরোধিতা পেয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনায় অভ্যস্ত নাজিবুল্লাহ। রাষ্ট্রপতি হবার আগে একদিকে যেমন ধাপে ধাপে উঠে এসেছিলেন পিডিপিএ পারচাম গোষ্ঠীর ওপরের দিকে তেমনই সংযোগ রক্ষা করে চলতেন সরকার এবং ‘খাদ’-এর মধ্যে। ১৯৮০ সালে তিনি দেশের নিরাপত্তা বিষয়ক সংস্থা খাদামত-ই আয়েতলা-ত দাওলাতি (খাদ)-এর প্রধান হয়েছিলেন। বারবাক কামালের ইস্তফার পরে প্রশাসনিক স্তরে দক্ষ এবং সোভিয়েতের প্রতি বিশ্বস্ত নাজিবুল্লাহই ছিলেন প্রথম পছন্দ।
ক্ষমতায় বসার পরেই প্রথম তিনি আফগান জনসাধারণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক সহজ করার চেষ্টা করেন। ১৯৮৬ থেকে শুরু হয় নতুন সংবিধান রচনার কাজ। যে সংবিধান গ্রহণ করা হয় ২৯ নভেম্বর ১৯৮৭তে। ১৯৮৭তেই আফগানিস্তানে লোকাল বডি নির্বাচন করেন নাজিবুল্লাহ। রাজনৈতিক দল গঠনের অনুমতি দেওয়া হয়। এছাড়াও দেশের সংস্কারে একাধিক নতুন নীতি প্রণয়ন হয় তাঁর আমলেই। যার মধ্যে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমি সংস্কার। দেশের সংবিধানে বদল এনে তাঁর আমূল ভূমি সংস্কারের নীতিতে প্রতিরোধ আসে দেশের ভেতর থেকেই। বিভিন্ন ইসলামিক এবং উপজাতি গোষ্ঠী ভূমি সংস্কারের বিরোধিতা করে। এমনকি পাশতুনদের একটা বড়ো অংশও নাজিবুল্লাহর বিরোধিতা করে। ১৯৮৮ সালে দেশের সংসদীয় নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করলেও মুজাহিদিনরা এই নির্বাচন বয়কট করে।
নাজিবুল্লাহ সরকার সবথেকে বড়ো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলো ন্যাশনাল কম্প্রোমাইজ কমিশন (এনসিসি) গঠন করে। কমিউনিস্ট সরকারের বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে মীমাংসা সূত্র খুঁজে পেতে তৈরি হয়েছিলো এই কমিশন। আফগানিস্তান পুনর্গঠনের কাজে এই কমিশন তৈরির পেছনে বড়ো ভূমিকা ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের। কারণ দেশের পুনর্গঠনের জন্য এই সময় সবথেকে প্রয়োজনীয় ছিলো মতানৈক্যের। এছাড়াও এই সময়েই সোভিয়েত মিলিটারির তত্বাবধানে আফগান বাহিনীকে আরও আধুনিক করে তোলার পরিকল্পনাও নিয়েছিলেন নাজিবুল্লাহ। কারণ অত্যাধুনিক বাহিনী ছাড়া আমেরিকা, ইরান, পাকিস্তানের মদতে ক্রমশ বেড়ে চলা মুজাহিদিনদের নিয়ন্ত্রণ করা তখনই কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠছিলো।
সোভিয়েত ইউনিয়নর প্রত্যক্ষ মদতে বারবাক কামালের এবং নাজিবুল্লাহর আমলে আফগানিস্তান জুড়ে শুরু হয় একাধিক সংস্কারমূলক কাজ। বিশেষত নাজিবুল্লাহর সময় দেশের শিল্পক্ষেত্রে প্রাইভেট সেক্টরকে উৎসাহ দেওয়া হয়। গ্রহণ করা হয় পঞ্চবার্ষিকী অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচি। যে সমস্ত কর্মসূচি চলেছিলো ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। যে সময়ের পরিসংখ্যান অনুসারে দেশের অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি সবক্ষেত্রেই অগ্রগতি ঘটেছিলো। বাড়ে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য এবং বহির্বাণিজ্য। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় শিক্ষাক্ষেত্রেও। শুরু করা হয় লিটারেসি ড্রাইভ। শিক্ষায় সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত অবৈতনিক করে দেওয়া হয়।লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
যদিও উন্নয়নমূলক এবং গঠনমূলক এইসব কাজে বাধা আসে দেশের ভেতর থেকেই। মূলত বিভিন্ন উপজাতি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বিরোধিতা শুরু হয়ে যায়। সেই সময় না জানা গেলেও পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তানে সরকার বিরোধী এই মদতের কথা স্বীকার করে নেয় আমেরিকা। যা প্রকাশ্যে আসে প্রায় ২০ বছর পরে। ১৯৯৮ সালে লা নভেল অবজারভেটর-কে এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের জাতীয় সুরক্ষা উপদেষ্টা জুগেনভ ব্রেজেনেস্কি জানান – সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে ঢোকার ৬ মাস আগে ১৯৭৯ সালের জুলাই মাস থেকেই আমেরিকা আফগানিস্তানের বিভিন্ন উপজাতি এবং ইসলামিক গোষ্ঠীকে সাহায্য দিতে শুরু করেছিল।
১৯৮৫ সালের মার্চ মাস থেকেই আফগানিস্তান থেকে বাহিনী প্রত্যাহারের বিষয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করে দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। মিখাইল গর্বাচভের সিদ্ধান্ত অনুসারে তাড়াহুড়ো না করে আফগানিস্তান প্রজাতন্ত্রকে আরও ভালোভাবে গঠনের জন্য কিছুটা সময় নেয়। জেনেভা চুক্তি অনুসারে ১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই ৩২টি আফগান প্রদেশের মধ্যে ২৬টি থেকে বাহিনী পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়েছিলো। সোভিয়েত বাহিনী ফিরে যাবার পরে আরও চার বছর সরকার চালাতে সক্ষম হয়েছিলেন নাজিবুল্লাহ । যদিও ক্রমবর্ধমান মুজাহিদিন বিদ্রোহের জেরে ১৪ এপ্রিল ১৯৯২ তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। নাজিবুল্লাহর পতনের পেছনে একদিকে যেমন সোভিয়েত সাহায্য বন্ধ হয়ে যাওয়া বড়ো কারণ ছিলো, অন্যদিকে পাকিস্তান, আমেরিকা, ইরানের মদতে দেশের অভ্যন্তরে ক্রমাগত বিদ্রোহও তাঁকে সরকারে টিকতে দেয়নি। সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচভ ইস্তফা দেবার পর ক্ষমতায় এসেছিলেন বরিস ইয়েলেতসিন। যিনি ক্ষমতায় আসার পরেই আফগানিস্তানের জন্য সাহায্য পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। এর পাশাপাশি নাজিবুল্লাহর শান্তি আলোচনা প্রক্রিয়া এড়িয়ে মুজাহিদিনদের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতার জন্য আলোচনা শুরু করেন। যে ঘটনা নাজিবুল্লাহর পতনকে আরও ত্বরান্বিত করেছিলো বলেও ধারণা আন্তর্জাতিক মহলের।
এর পরবর্তী ঘটনাক্রম সকলেরই জানা। মুজাহিদিন, তালিবান, আমেরিকার হাত ঘুরে আফগানিস্তান এখন আবার তালিবানি দখলে। বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছরে আফগানিস্তান জুড়ে কয়েক লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সোভিয়েত সৈন্য, আমেরিকান সৈন্য, মুজাহিদিন, তালিবান, সে দেশের সাধারণ নাগরিক – সকলেই আছেন সেই তালিকায়। আজ আফগানিস্তান এক যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র। বর্তমানে ঠিক যে জায়গায় আফগানিস্তান দাঁড়িয়ে, তাতে খুব তাড়াতাড়ি কোনো সমাধান সূত্র পাওয়া বা সমস্যা মিটে যাবার সম্ভাবনা কম। বিগত মাস দেড়েক সময়ে তালিবানিরাও এখনও পর্যন্ত এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি যাতে মনে করা যেতে পারে এবার আফগানিস্তানে শান্তি ফিরবে। বরং বর্তমান তালিবানি শাসনে ফের ১৯৯৬-এর ছায়াই দেখছেন সে দেশের মানুষ। এখনও পর্যন্ত সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং আরব আমীরশাহী ছাড়া অন্য কোনো দেশ থেকে তালিবানি সরকারের স্বীকৃতি মেলেনি। কাজেই আপাতত আরও কিছু বছরের অপেক্ষা ছাড়া আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে এখনই তা বলা সম্ভব নয়।

[লেখক – সাংবাদিক।]

Facebook Comments

Leave a Reply