আফগানিস্তানের বদলানো সময় ও ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার বর্তমান চিত্র : দেবাঞ্জন বাগচী

fail

আফগানিস্তানের ব্যাঙ্কিং-এর গোড়ার কথা

উনিশশো উনচল্লিশ সালে ‘ডা আফগানিস্তান ব্যাঙ্ক’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে প্রথম ব্যাঙ্কিং-এর প্রতিষ্ঠা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কটি প্রতিষ্ঠার লগ্নে দু’টি উদ্দেশ্যকে প্রথম সারিতে রাখা হয়। প্রথমটি মূল্যের স্থিরতা, দ্বিতীয়টি দীর্ঘকালীন সময়ে অর্থনীতির বুনিয়াদকে পোক্ত করা। যে কোন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের মূল কাজের মধ্যে আরও কিছু বিষয় আসে, যেমন- ঋণনীতি নির্ধারণ, বৈদেশিক বাণিজ্য প্রসার ও নগদের চাহিদা-যোগান নিয়ন্ত্রণ। যদি বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব খুলে দেখেন, দেখবেন আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কটি লাভজনক। তবে ডলার এবং ইউরোর ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল। কারণ আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ প্রায় চল্লিশ শতাংশ। দশ শতাংশের ওপর হলেই বলা যায় দেশটি স্বনির্ভর নয়। ওদিকে আবার বিনিয়োগের প্রায় নিরানব্বই শতাংশ রাখা মার্কিন ট্রেজারি বিল বা বন্ডে। পুঁজিবাদের কী মহিমা! নিঃস্ব আফগানিস্তানের থেকে টাকা নিতে মার্কিন ট্রেজারি বিল! আবার অন্যদিকে আরেকটি রূঢ় সত্য হল ‘ডা আফগানিস্তান ব্যাঙ্ক’-এর স্বদেশের প্রায় কোন সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার ওপরেই ভরসা নেই। আরো সংক্ষেপে বলতে হলে এত বছরেও ব্যাঙ্কটি সাফল্য থেকে দূরেই আছে।
সুস্থ অর্থনীতি নিজেই প্রকৃত সুদের হার নির্ধারণ করে নেয়, কারণ সেখানে চাহিদা ও যোগানের উপযুক্ত পরিবেশ থাকে। সেই পরিবেশ তো দূরস্থান, তালিবান সরকার ক্ষমতায় এসে আগেই বেশ কিছুদিন ব্যাঙ্ক বন্ধ করে রেখেছে। খুলেছে তারপর, কিন্তু বিতাড়িত হয়েছেন অভিজ্ঞ মহিলা কর্মীরা, সপ্তাহে দু’শো ডলারের বেশি তোলায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। দেশে এহেন নগদের দুর্ভিক্ষে সাধারণ মানুষ গৃহস্থালির সরঞ্জাম পথে বিক্রি করছেন। কিন্তু কিনবে কে, ক্রেতার হাতেও টাকা নেই। অথচ এই দামী জিনিসগুলি সমৃদ্ধ মানুষজন একদিন কিনেছিলেন তাই আজ বিক্রি করতে এসেছেন। কিনেছিলেন দেশে স্থিতাবস্থা আসবে ভেবেই। পুঁজিবাদীদের উপস্থিতিতে দৃশ্যমান স্থিতিতে, ইতিহাস-পড়া মানুষ বিশ্বাস করে না। সে আসলে মরীচিকা, তা আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষজন বোঝেননি।

আফগানিস্তানের ব্যাঙ্কিং-এর বর্তমান চিত্র

আফগানিস্তানে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রায় সাহায্য আসত। ব্যাঙ্কগুলির আয়ের মূল উৎস ছিল বৈদেশিক মুদ্রা কেনা-বেচা। বর্তমানে আফগানিস্তানে প্রায় কোন দেশই আর্থিক সাহায্য পাঠাচ্ছে না। ব্যবসা বন্ধ করে চলে গেছে ‘ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন মানি ট্রান্সফার’ বা ‘মানিগ্রাম’-এর মতন সংস্থাগুলি। ফলে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা পতনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। দেশের ব্যাঙ্কগুলি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককে জানিয়েছে, তাদের হাতে আর কিছুদিন চলার মতন টাকা আছে। মানুষ নতুন করে টাকা রাখছেন না, সবাই টাকা তুলছেন ও ব্যাঙ্কের বাইরে লম্বা লাইন। অন্যদিকে আফগান মুদ্রা ‘আফগানি’র দাম কমছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে। অনেকে মনে করছেন ‘ক্রিপটোকারেন্সি’র মাধ্যমে যেহেতু সন্ত্রাসবাদ উপকৃত হয়, এইসব কারবারিরাও আফগানিস্তানের এই শূন্যস্থান পূরণ করতে উদ্যোগী হবে। ব্যাঙ্কগুলি দেউলিয়া হলে যে দশ/পনেরো শতাংশ মানুষকে ব্যাঙ্কিং-এর আওতায় আনা গিয়েছিল, তাঁদের দুরবস্থা দেখে ভুল বার্তা যেতে পারে অন্যদের কাছে। আরও দুঃখের কথা হল, মাত্র দুই বছর আগেই আফগানিস্তানের প্রথম ডিজিটাল পেমেন্ট(আমাদের পরিচিত ‘পেটিএম’, ‘ফোন পে’ বা ‘গুগল পে’-র মতন) পদ্ধতি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের অন্তর্ভুক্ত হয়। কাবুল থেকে দূরবর্তী ও দুর্গম এলাকায় টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে আস্তে আস্তে জনপ্রিয়ও হচ্ছিল এই ব্যবস্থা। হয়ত নড়বড় করতে করতেও কোথাও একটা অগ্রগতি ছিল। ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে গেলে এই উদ্যোগ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত আফগান মানুষজন ভয়ে আছেন। তালিবান ক্ষমতায় আসার পর যাঁদের খুঁজছিল, তাঁদের মধ্যে ছিলেন আসেফ খাদেমি। ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং উদ্যোগের অন্যতম হোতা আসেফ খাদেমি। শেষ দু’বছর এই যুবক অক্লান্ত পরিশ্রম করছিলেন ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং-এর প্রসার নিয়ে। তিনি মৃত্যুভয়ে ছিলেন কারণ ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং হাওলা কারবারিদের আয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করেই বলি, কাবুলের পতনের পর এখনও তাঁর খবর নেই।

প্রথম তালিবান জমানায় আফগানিস্তানের ব্যাঙ্কিং

মার্কিন অভিযানের আগে, তালিবান প্রশাসনের প্রথম দফায় আফগানিস্তানে ছয়টি ব্যাঙ্ক থাকলেও সেগুলির অস্তিত্ব ছিল নামমাত্র। তালিবান চেয়েছিল ইসলামিক ভাবাদর্শে ব্যাঙ্ক পরিচালন করতে। শরিয়তের বিধান মেনে সেই পদ্ধতি চালু করা এবং পরিচালনার মেধা তাদের ছিলনা। আফগানিস্তানে এখনও ইসলামিক ব্যাঙ্কিং পদ্ধতি চিরাচরিত পদ্ধতির চেয়ে জনপ্রিয় হয়নি। ইসলামিক ব্যাঙ্কিং-এ সঞ্চয় ও ঋণ উভয়ক্ষেত্রেই সুদ বিষয়টিকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়। ব্যাঙ্ক কাউকে ব্যবসার জন্য ধার দিতেই পারে, কিন্তু সুদ নেয় না। তার বদলে উভয় পক্ষ দ্বারা সমর্থিত একটি লভ্যাংশ নেয়। এছাড়াও এই ব্যাঙ্কগুলি বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি পরিষেবা দিয়ে আয় করে। আমরা এমন পদ্ধতির সঙ্গে অপরিচিত হলেও এইভাবে সাফল্যের সঙ্গে ব্যাঙ্ক চলছে মধ্যপ্রাচ্যে, মালয়েশিয়া ও পশ্চিম ইউরোপে। তালিবানের কিন্তু সেভাবে পরিচালনার কোন অভিজ্ঞতাই ছিল না। তাই ঋণ দেওয়া একেবারেই বন্ধ হয়, গুরুত্বপূর্ণ পদে অযোগ্য প্রশাসকদের বসানো হয় ও ভুল পদ্ধতিতে ব্যাঙ্ক চালানো হয়। এখনও তারা শিক্ষা নেয়নি, অভিজ্ঞ মহিলা কর্মচারীদের বরখাস্ত করে বুঝিয়ে দিয়েছে। এমনিতে ব্যাঙ্কের ব্যবসা ঋণ দেওয়া, সেই ব্যবসায় ক্ষতি হলে তা আর পাঁচটা ব্যবসার মতন করেই দেখা হয়। অর্থাৎ তামাদি ঋণকে লাভ থেকে মুছে দেওয়া হয়। তালিবানরা আফগানিস্তানের ব্যাঙ্কগুলিতে ঋণ তামাদি হয়ে গেলেও সেগুলি ব্যালেন্স শিটে বছরের পর বছর বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এবং এর জন্য লাভ থেকে কোন অংক ক্ষতি হিসেবে সরায় নি। অনুন্নত হিসাবরক্ষার ফলে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয় ও তার জায়গা দখল করে হাওলা পদ্ধতি। মার্কিন আগ্রাসনের আগে মাত্র পাঁচ হাজার তেজারতি কারবারির দখলে চলে যায় পুরো অর্থনৈতিক লেনদেন। তারা এতই অপরিহার্য ছিল যে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলিকে তো বটেই এমনকি কিছু ব্যাঙ্ককেও দেশের আরেক প্রান্তে টাকা পাঠাতে গেলে এদেরই দ্বারস্থ হতে হত। দক্ষিণ এশিয়ার কোথাওই সেই হাওলা পদ্ধতি উঠে যায়নি। ওখানেও বহাল তবিয়তে লুকিয়ে ছিল, কারণ এর সঙ্গে দেশের মানুষের বহু বছরের পরিচয় ও কোন কাগজ ছাড়াই দ্রুত নগদের লেনদেন হয়। যেমন সে ব্যবস্থা চলে যায়নি, তেমনই সীমিত হলেও আছে সেই হাওলা কারবারিরাও। এরা দাঁতে দাঁত চেপে দীর্ঘ কুড়ি বছর অপেক্ষা করেছে তালিবানদের প্রত্যাবর্তনের। আর সঙ্গে আছে সেইসব মানুষজন, যাঁদের ধনসম্পদে দু’ হাজার এক সালে সরকার তালা লাগিয়ে দেয়।

হাওলা অর্থনীতি – নগদহীন লেনদেনের জগৎ

কথা প্রসঙ্গে একবার হাওলা নিয়েও কিছু কথা বলে নেওয়া যাক, কারণ এই প্রসঙ্গ আসবে। হাওলা পদ্ধতির মাধ্যমে কিভাবে আন্তর্জাতিক নগদ লেনদেন করা হয় তাতেই সীমাবদ্ধ থাকব। মনে করুন ফেলু থাকে সিরিয়ায় এবং সন্তু থাকে কলকাতার হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রীটে। সন্তু খুব জরুরী দরকারে ফেলুর কাছে ‘একশো’ টাকা চাইল এবং খুব অল্প সময়ের জন্যেই সেটা তার দরকার। এই টাকার জন্য এখন ফেলু সিরিয়ার হাওলা কারবারির কাছে যাবে শুধুমাত্র সুনামের ওপর ভরসা করে। সেখানে গিয়ে ‘একশো’ টাকা ও পরিষেবার মূল্য সে দেবে। সিরিয়ার হাওলা কারবারি ফেলুকে একটি পাসওয়ার্ড দেবে, যা সন্তুকে জানাতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্তু একটি ফোন পাবে ভারতীয় হাওলা কারবারির থেকে। তারপর সন্তুর কাছে টাকা নিয়ে সে আসবে, টাকা নেওয়ার আগে সন্তুকে সঠিক পাসওয়ার্ড বলতে হবে। ভারতেও প্রচুর ব্যবসায়ী এভাবে নগদ জোগাড় করেন। বেঠিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলে এভাবে খুব সহজেই উগ্রপন্থীদের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়া যায়। পাকিস্তানে এমন কিছু সন্দেহজনক লেনদেনের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদীদের হাতে নগদ চলে যায়। পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মহলে এই কারণেই বিপজ্জনক দেশ বলে চিহ্নিত এবং বৈদেশিক মুদ্রা সেখানে পৌঁছানো ভারতের তুলনায় শক্ত।

‘আই এস আই এস’-এর ভুল থেকে তালিবানের ব্যাঙ্কিং শিক্ষা

এবার আসি শেষ কুড়ি বছরের তালিবান অর্থনীতির কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয়ে, এতদিন কি করে তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সামলেছে তালিবান। কুড়ি বছর তালিবানের আয়ের উৎস ছিল প্রধানত চারটি – বৈদেশিক সাহায্য, আফিম ও মাদক ব্যবসা, অপহরণ ও ব্যবসায়ীদের থেকে তোলা আদায়। তোলা আদায় বলতে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় বা পণ্যবাহী গাড়ির থেকে টাকা নেওয়া ইত্যাদি সবই ধরছি। অন্যদিকে তাদের চালাতে হয়েছে এক সুবিশাল ফৌজ। সেই ফৌজের মাইনে এবং অন্যান্য বিষয় ব্যবস্থাপনার সময় তাদের নিজেদের মতন করে অর্থনীতি তৈরি করতে হয়েছে। তালিবানের শেষ কুড়ি বছরের অর্থনীতির বেশিরভাগ লেনদেনই হয়েছে নগদে, হাওলা পদ্ধতির মাধ্যমে। নগদে লেনদেন সবসময়ই অপরাধ জগতের পক্ষে সহায়ক। এই কাজে তারা কিন্তু শিক্ষা নিয়েছে ইরাকে ‘আই এস আই এস’- এর করা ভুল থেকে।
‘আই এস আই এস’ তাদের অর্থভাণ্ডার তৈরি করেছিল নগদে। যা আমেরিকা বোমারু বিমানের সাহায্যে ধ্বংস করে। তাই তালিবান তাদের পুরো অর্থভাণ্ডারই কিন্তু নগদে লুকিয়ে রাখেনি। বরং আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের ব্যাঙ্কগুলিতে বেশ কিছুটা সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল ভুয়ো অ্যাকাউন্ট ও ভুয়ো কোম্পানি বানিয়ে। দেশের এমন বিপদ ঠেকানো সম্ভব হয় যদি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের KYC (Know your customer) ও AML (Anti money laundering) আইন শক্ত হয়। এই আইনগুলি প্রবর্তনের মাধ্যমে করদাতাদের অর্থ উগ্রপন্থীদের হাতে যাওয়ার পথ বন্ধ করা হয়। আফগানিস্তানে আইন-কানুনের প্রয়োগ সম্ভবত আমাদের দেশের চেয়ে খারাপ। তাই এসব করা খুব কঠিন হয়নি।

কাল তুমি আলেয়া – আফগানিস্তানের ব্যাঙ্কিং-এর স্বল্পস্থায়ী সুবর্ণযুগ

অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে খুব সুস্থির অর্থনীতি সাধারণত দেখা যায় না। রাজনৈতিক অস্থিরতা আফগানিস্তানের শতাধিক বছরের সঙ্গী। সেই কুফলের ভুক্তভোগী দেশের মানুষজন। ঋণনীতি নেই তাই বিনিয়োগের নিরাপত্তা নেই, নিরাপত্তা নেই বলে ব্যাঙ্ক দূরবর্তী অঞ্চলে শাখা খোলে না এবং ঋণ দেয় না, ব্যাঙ্ক ঋণ দেয় না তাই ভোগ্যপণ্যের বিক্রি বাড়েনি, বিক্রি বাড়েনি বলে উৎপাদন বাড়েনি, উৎপাদন বাড়েনি বলে সংগঠিত ক্ষেত্রে আবার কর্মসংস্থানও হয়না, কর্মসংস্থান না হলে বাজারে চাহিদা বাড়বে না, চাহিদা না বাড়লে বিনিয়োগ হবে না। এই দুষ্টচক্র থেকে বেরোনোর অনুঘটক হিসেবে ব্যাঙ্কের ভূমিকা আছে। তবে এত প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়েও আফগানিস্তান কিন্তু এগোচ্ছিল। প্রথম দফায় তালিবানদের গদিচ্যুত করার পর আফগানিস্তান বিশ্বায়িত আধুনিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা থেকে শিক্ষালাভ করার চেষ্টা করেছিল।
দু’ হাজার এক সালের পর আই এম এফ সহ বিভিন্ন দেশ আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে এগিয়ে আসে। মানুষের স্বাস্থ্য-শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দেশের পরিকাঠামো, সবই নতুন করে ঢেলে সাজাতে বিদেশী পুঁজি আসে। যা পরিচালন করতে দেশে উপযুক্ত ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। অবশেষে দু’ হাজার তিন সালে ব্যাঙ্কিং আইন আসে। যার মাধ্যমে অন্য ব্যাঙ্কগুলির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায়ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গুরুত্ব বাড়ে। আফগানিস্তানের মানুষজন বহুদিনের অভ্যাসে বা অভিজ্ঞতায় নগদ উদ্বৃত্ত হলে তা হাতেই রাখতে পছন্দ করেন। এরপর একটি সম্ভাবনা তৈরি হয় যে জনসংখ্যার বড় অংশ ব্যাঙ্কে আসবে। সম্ভাবনা তৈরি হয় যে মানুষজন ফিক্সড ডিপোজিট করবেন, সেই টাকায় ব্যাঙ্কগুলি ঋণ দেবে মানুষজনকে ও শিল্পক্ষেত্রে।
আফগানিস্তান দুর্গম এলাকায় ভরা একটি দেশ, সেখানে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার প্রসার খুব জরুরী ছিল। আস্তে আস্তে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বাড়তে থাকে, গ্রাহক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাঙ্কের সংখ্যা বাড়ে। তিনটি সরকারি ব্যাঙ্কের সঙ্গে দশটি বেসরকারি ব্যাঙ্ক খোলে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মাইনে পাওয়ার সুবিধা পান সাধারণ মানুষ, ডেবিট কার্ড ও ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং-এর সঙ্গে তাঁদের আলাপ হয়। এর সুফল আমরা দেখতে পাই সেই সময়ের অর্থনৈতিক সূচকগুলিতে। যেমন – সরকারি আয়, বিনিময় মূল্য, বিনিয়োগের প্রসার, শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, এমনকি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও। আফগানিস্তানেও পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। দু’হাজার পাঁচ সাল নাগাদ আমরা দেখতে পাই সরকারি ছয়টি ব্যাঙ্কের মাত্র তিনটি রাখা হলেও দেশে মোট এগারোটি ব্যাঙ্ক তাদের কাজ চালাচ্ছে। এমনকি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্কও কাবুলে শাখা খুলেছে। দু’হাজার আট সালে তা বেড়ে হল পনেরটি। এই দু’হাজার আট সাল অবধি দেশে ঋণের বৃদ্ধি হচ্ছিল প্রায় চল্লিশ গুণ এবং সঞ্চয় বেড়েছিল কুড়িগুণেরও বেশি। আফগানিস্তানের মাত্র দশ থেকে পনেরো শতাংশ মানুষই এখনও অবধি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। খুব কম মনে হলে জানিয়ে রাখি আমাদের রাষ্ট্রনেতারা মানুষকে ‘জন ধন যোজনা’ বা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ইত্যাদি জনগণেশ পুজোর প্রকল্প ঘোষণা করেও খুব বেশি হলে, মাত্র আশি শতাংশ মানুষকে ব্যাঙ্কিং-এর আওতায় আনতে পেরেছেন।

কর্পোরেট ক্ষতির ‘গ্লোবালাইজেশন’, আর লাভের ‘প্রাইভেটাইজেশন’

যা বলছিলাম, এই দু’হাজার দশের পর কিন্তু আফগানিস্তানের ব্যাঙ্কিংয়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে। আফগানিস্তানের ব্যাঙ্কিং নিয়ে খবরাখবর এদিকের কাগজে কমই আসে, তবে দশ বছর আগে একবার এসেছিল। ‘কাবুল ব্যাঙ্ক’ দেউলিয়া হয়, যার সঙ্গে জড়িয়েছিল প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের ভাইয়ের নাম। উপমহাদেশে একালের আর পাঁচটা ব্যাঙ্ক কেলেঙ্কারির মতন এটিও ঘটিয়েছিলেন সেই ব্যাঙ্কের কর্তাব্যক্তিরা। ঘটানো হয়েছিল হায়দ্রাবাদের ‘সত্যম’ কেলেঙ্কারির মতন অজস্র ভুয়ো কর্মী দেখিয়ে। বাজার অর্থনীতির যুগে এভাবেই জালিয়াতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে শিখছে সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্র।জালিয়াতির ধরনের বিশ্বায়ন হচ্ছে। তাতে রাঘব বোয়ালদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ডুবলে সরকার অধিগ্রহণ করে বাঁচাচ্ছে। তাতে সেই ক্ষতি বহন করছেন করদাতারা, যাঁরা টাকা চুরি করছেন তাঁরা চলে যাচ্ছেন বারমুডা। ক্ষতির ‘গ্লোবালাইজেশন’-এ চিহ্নিত হচ্ছে লাভের ‘প্রাইভেটাইজেশন’। একমাস আগের খবর দেখুন, মার্কিন সৈন্যবাহিনীর পরাজয়ের যে কারণগুলি বিশ্লেষণে উঠে এল তার অন্যতম কিন্তু ছিল ভুয়ো আফগান সৈন্য। সৈন্যবাহিনী তৈরির নামে আফগান প্রশাসন ভুয়ো সৈন্য দেখিয়ে পশ্চিমী বিশ্বের কাছে টাকা নেয়, এবং তা গাপ করে। অর্থাৎ নিয়মের ফাঁক-ফোঁকর বুঝে নিয়ে, ভুয়ো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বানিয়ে টাকা সরানোর কায়দা কিন্তু এক শ্রেণীর মানুষ দ্রুত রপ্তও করে নিয়েছিলেন।
আফগানিস্তানে ঋণনীতির সুবিশাল অংশ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ছিল না। ঋণ দেওয়ার সময় ছিল উপযুক্ত নিরাপত্তার অভাব। যার জন্য গৃহঋণের মতন জরুরী ব্যাঙ্কিং পরিষেবা সেখানে শুধুমাত্র পদার্পণই করতে পেরেছিল, বাড়তে পারেনি। বেশিরভাগ ব্যাঙ্ক তাদের গৃহঋণ বিভাগও খুলে উঠতে পারেনি। কেন হয়নি তা জানতে গেলে দেশটির আইন-কানুন জানতে হয়। সেই আলোচনায় যাচ্ছি না। পুঁজিবাদ শেখায় ঋণে সুদের হার কমিয়ে দিতে, সঞ্চয়ে সুদ কমাতে ও সঞ্চয়যোগ্য টাকা ফাটকাবাজারে আনতে। অর্থনীতি ঋণনির্ভর হয়ে ওঠা খুবই ক্ষতিকর, তবে ঋণব্যবস্থাহীন অর্থনীতির পক্ষেও কেউ সওয়াল করে না। উপযুক্ত ঋণব্যবস্থা দেশের অর্থনীতি তথা সাধারণ মানুষ উভয়কেই সমৃদ্ধ করে।

আফগানিস্তানের ব্যাঙ্কিং-এর ভগ্নদশা ও দুয়ারে দুর্ভিক্ষ

বর্তমানে বৈদেশিক বাণিজ্যে যুক্ত ভারতীয় ব্যবসায়ীরা কিন্তু সরাসরি আফগান ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাজ করতে সাহস পাচ্ছেন না। বিক্রেতা এক, ক্রেতাও এক, কিন্তু বদলেছে সরকার, যাদের ওপর ভরসা নেই। তাই এখন সরাসরি আফগান অ্যাকাউন্টে টাকা না পাঠিয়ে এঁরা দ্বারস্থ হচ্ছেন কোন এক মধ্যস্থতাকারীর। যাঁদের বেশিরভাগই দুবাইতে এবং উভয়পক্ষকেই স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবসার নিরাপত্তা দিচ্ছেন। তবে বিশ্বায়িত বাজারে কিছুই বিনা পয়সায় আসে না। সেই নিরাপত্তা প্রদান করার মাধ্যমে বাজারে এলেন আরো এক মধ্যস্বত্বভোগী, আমাদের হাত পুড়ছে পোস্ত কিনতে গিয়ে। হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি সম্পূর্ণ আফগান মশলা ও শুকনো ফলের, তাই সেখানেও বিরিয়ানির দাম বাড়ছে। তবে পোস্ত না খেয়েও আমরা বাঁচব, কিন্তু আফগানিস্তানের শিশুরা বাঁচবে না শিশুখাদ্য না পেলে। সাধারণ মানুষজন বাঁচবেন না ভারতসহ অন্যান্য দেশ থেকে জীবনদায়ী ঔষধ না পৌঁছালে। সেগুলি যাচ্ছে না, কারণ ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। টাকার দুর্ভিক্ষ এসেই গেছে, দেশটি হয়ত এক দুর্ভিক্ষ থেকে অল্পই দূরে। বিশ্বায়িত দুনিয়ায় বিপদ এক দেশে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোন না কোন রূপে অন্য দেশে চলেই যায়। সাধু সাবধান।

পুঁজিবাদীদের পলায়ন

‘ফ্লাইট অফ ক্যাপিটাল’ অর্থনীতির বৃত্তে এক পরিচিত শব্দবন্ধ, যেভাবে পুঁজি একদেশ থেকে উড়ে অন্যদেশে যায়। তবে আফগানিস্তানের ‘ফ্লাইট অফ ক্যাপিটালিস্টস’-এ ঝুলন্ত আফগান নাগরিকের দৃশ্য ছিল এক রূপক। যাওয়ার আগে পুঁজিবাদীরা আফগানিস্তানকে সম্পূর্ণ ত্রাণনির্ভর দেশে রূপান্তরিত করেছে, তারপর ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার আগেও ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে গেছে আফগানিস্তানকে। আফগানিস্তানের নিজস্ব টাঁকশাল নেই, নগদ মুদ্রণের জন্য তারা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল পোল্যান্ড ও ফ্রান্সের ওপর। আপাতত দুইদেশই জানিয়ে দিয়েছে তারা মুদ্রিত নগদ পাঠাবে না। পুঁজিবাদীদের ওপর নির্ভর করলে কী হয়, এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর হয় না। আমেরিকা চলে যেতেই পারে, তবে একটি দেশকে সম্পূর্ণ ত্রাণনির্ভরশীল করে দিয়ে? দেশের মানুষজন সবাই যে অখুশি এমনও নয়, সরকারি কর্মচারীদের আর ঘুষ দিতে হচ্ছে না। সেই বিষয়েও অনেকেই খুশি। এটা শুনতে আমাদের অবিশ্বাস্য লাগতেই পারে, তবে কেউ কেউ বলছেন বৈকি।
তবে বিশ বছর কম সময় নয়, এবিদায় মধুর হতেই পারত। যদি আফগানিস্তানকে একটু স্বনির্ভর করে তোলা যেত। অথবা যেভাবে সাম্রাজ্যবাদীরা চলে গিয়েও কিছু দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে যায়।
কাবুল, তোমার বুকে চেনা বন্দুক কাঁধে অচেনা মুখের সারি,
চোখে তাদের হিমযুগের আশ্বাস।
ছুটতে ছুটতে আমি শুনতে পাচ্ছি খুলি ফাটার শব্দ,
ধর্ষিতার চিৎকার, বন্দুক কাঁধে জেহাদি কিশোরের উল্লাস।
অজেয় কাবুল আমার,
তোমার পথের পাশেবোমায় টুকরো হওয়া পাথরের টুকরোগুলো
গর্ব করে বুকে ধরে রেখেছে আজও,
আগ্রাসনের ঔদ্ধত্য টুকরো হওয়ার হাহাকার।
কথা দিয়েছিলে কবিতা লিখতে শেখাবে তুমি।
তোমায় নিয়ে পুশতু ভাষায় লেখা
অপটু কবিতা আমার, মনে রাখবে তো!
শেষ বিদায়ের আগে একবার খোলো তোমার মুখ,
তোমার জিভে লেগে থাকা হাজার বছরের
অস্থিরতার স্বাদে
অমরত্ব পাক, তোমাকে আবার পাওয়ার স্বপ্ন।
কাবুল আমি ফিরে গেলাম।

উপসংহার

আফগানিস্তান যখন মহিলা ব্যাঙ্ক কর্মচারীদের বসিয়ে দিচ্ছে, আমাদের অন্য প্রতিবেশী বাংলাদেশ কিন্ত অন্য পথ নিয়েছে। তারা অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হারে ভারতের থেকে এগিয়েছে, টাকার বিনিময় মূল্যেও প্রায় সমান। সম্ভব হয়েছে নারীদের কর্মসংস্থান গুণোত্তর প্রগতিতে বাড়ায় এবং ক্ষুদ্রঋণের প্রসার হওয়ায়। আফগানিস্তানের ভুল থেকে কোন দেশ কী শিক্ষা নেবে জানিনা, তবে আমাদেরও নেওয়ার আছে। রাজনৈতিক নেতারা স্তাবকদের অনভিজ্ঞতা সত্ত্বেও ব্যাঙ্কের শীর্ষস্থানে বসিয়ে চলেছেন। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বর্তমান গভর্নর ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন এবং তাঁর তেমন কোনো ব্যাঙ্কিং অভিজ্ঞতা ছিল না। তারপর তড়িঘড়ি সরকারী ব্যাঙ্কগুলির সংযুক্তিকরণ হয়ে যাচ্ছে। কাগজ খুলে দেখছি আমাদের রাজ্যের এক সদ্য দল-বদলানো নেতাকে রোজই কোন না কোন সমবায় ব্যাঙ্ক থেকে অপসারণ করা হচ্ছে। আশা রাখি প্রতিবেশী দেশের ভুল থেকে শিখে, আমাদের প্রশাসকরাও এমন নিয়োগের আগে একদিন পুনর্বিবেচনা করবেন।

[লেখক পরিচিতি – অক্ষরকর্মী, চিত্রগ্রাহক, নদীকর্মী ও ব্যাঙ্ক কর্মচারী।]

Facebook Comments

Leave a Reply