শান্তি ও গণতন্ত্র পুনর্গঠনের নেপথ্যে থাকা রাজনৈতিক-অর্থনীতি : প্রসঙ্গ আফগানিস্তান – কৌশিক চট্টোপাধ্যায়

fail

ইতিহাসের চাকা

আফগানিস্তান। শব্দটা কানে এলে যে কথারা আওয়াজ তোলে তাতে মনে জাগে ভয়। চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার একটা ছবি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আলো-আধারী সেই ঘোরে বোমারু বিমান ধ্বংসের বার্তা নিয়ে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায়। সাইরেন বাজে। আমরা শুনতে পাই গোলা-গুলির শব্দ। অদূরে সেল ফাটে। একটা ছিন্নভিন্ন মানব শরীর আমাদের দিকে ছিটকে আসে। শুষ্ক বালি মাটিতে সেটা ফিনকি দিয়ে রক্ত ছেটায়। রক্তে ভেজা সেই দলাপাকানো মাংসপিন্ড দেখে আমরা বুঝি না যে, সেটা নারী শরীর না কোন শিশুর দেহাংশ। পোশাকের কোন টুকরোও তাতে লেগে থাকে না। আমরা সেটাকে তাই কোন সাম্রাজ্য-সেনার বলে দাবিও করতে পারি না। বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গির ছিন্ন দেহ-পরিচয়ও সে তখন বহন করে না। তিষ্ঠবার সেই ক্ষণহীন কাল, নির্বিচার হত্যায় নিজেকে সামিল করতে চায় না। আমরা শুধু পালাতে থাকি। নিশ্চিত মৃত্যু থেকে আপেক্ষিক জীবনের দিকে, সংঘর্ষের ধূম্রজাল ছিঁড়ে শান্তির পথে, আগ্রাসনের পরিণাম হতে গণতন্ত্রের উদ্দেশ্যে।

সেটাও কি আফগান মানুষ পারে? দুর্গম খাইবার পাস কি তার জীবনধারণের সহজ পাস হয়? শরণার্থী, অভিবাসী পরিচয় কি ততটা সহজে অর্জিত হয়, যতটা সহজে মরুবালিতে অথবা পাহাড়ের খাদে হারিয়ে যায় আফগান সতীর্থের দেহ?
এমন হাজারো প্রশ্নের উত্তর না হয়।
না-এ ভরা সেই প্রতিক্ষণ আফগান জনজীবনের সমকালকেই কি কেবল চিহ্নিত করে?
ইতিহাস সেই প্রশ্নের উত্তরও না-এ দেয়। রণভূমে লালিত জীবনকথায় আফগানবাসী অনন্য হয়। তাই এই অঞ্চল মানবশূন্য প্রান্তরে পরিণত হয় না। প্রতিনিয়ত নতুন নিয়মে এখানকার সমাজজীবন গড়ে ওঠে। কিন্তু সেই জীবনেও রক্ত ঝরা অনিবার্য থাকে। সেই রক্তেই লেখা হয় ধর্মের দিনলিপি। এমনকি আলেকজান্ডার থেকে আমেরিকা, সব শাসনেই নিরীহ সাধারণ মানুষের রক্ত ঝরানো পথে ইতিহাসের চাকা ঘোরে। শব্দরা কথা বলে। ষড়যন্ত্রের পাশা খেলায় জয়ী হয় বৈদেশিক আগ্রাসনের আস্ফালন, যার ফাঁকে ফাঁকে বয়ে চলে অগ্রগতির খোলা হাওয়া।

আফগান জনজীবন ও রাজনীতি
উঁচু উঁচু পর্বতমালায় ঘেরা আফগানিস্তানের জনজীবন কোনদিনই সুরক্ষিত ছিল না। প্রকৃতির রক্ষাকবচে থাকা সঙ্কীর্ণ গিরিপথ চিরকালই এখানকার জনজীবনকে বিদেশী আক্রমণের মুখোমুখী করে তুলেছে। পৌরাণিক কাহিনীর বাইরে দাঁড়িয়ে আমাদের জানা ইতিহাসের পাতায় চোখ ফেরালে সেই বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়। বাবর থেকে নাদির শাহ, অথবা ব্রিটিশ, রুশ হয়ে মার্কিন ন্যাটো বাহিনী, সকলেই আফগানদের শাসন করেছে। কিন্তু কোন শাসনই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
জাতি বিধ্বংসী অন্তর্বর্তীকালীন লড়াইয়ের জন্য প্রাণহানি, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অবকাঠামো ধ্বংস, পরিবর্তিত জনগোষ্ঠীর নৃকুলতাত্ত্বিক পরিস্থিতি সহ ধর্মীয় পালাবদল, সবই এই মাটিতে ঘটেছে। প্রাণের বিনিময়ে যার মূল্য চুকিয়েছে লক্ষ লক্ষ আফগান নাগরিক। স্বজনহারা বেদনায় তারা সেটা মিটিয়েছে।
যুদ্ধ এবং বিচিত্রবর্ণের চলচ্ছবিতে ফুটে ওঠা শাসনগুলি শতাব্দী প্রাচীন প্রথাসিদ্ধ ও নৈতিক নিয়মে লালিত আফগান ঐতিহ্য ও তাদের জীবনধারা মারাত্মক আঘাত করেছিল। সেইসঙ্গে রাজনৈতিক-অর্থনীতির দ্রুত পট পরিবর্তন তাদের জীবনাভ্যাস এবং সামাজিক রীতিনীতিকেও দ্রুত বদলে দিতে সাহায্য করেছিল। স্থানীয় জীবনধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বুদ্ধ পরবর্তী ইসলামও এর ব্যতিক্রম ছিল না।১ সেই আঙ্গিকে আফগানদের ইতিহাস হল বেসামরিক এবং ধর্মীয় শক্তির মধ্যে চলা সংগ্রামের ইতিহাস, যা সফলভাবে এই মাটিতে পালিত হয়।
ধর্মীয় মৌলবাদ সবচেয়ে জোরালো রূপ ধারণ করে গত শতাব্দীর সাতের দশকের পর থেকে। ঠান্ডা লড়াইয়ের জোরালো আবহাওয়ায় মার্কিনী ইন্ধন সোভিয়েত বিরোধী ধর্মীয় শক্তিগুলিকে এক হতে সাহায্য করে। ঠান্ডা লড়াইয়ের মশান হয়ে ওঠে আফগানিস্তান। পিডিপিএর ধর্ম বিরোধী নীতিগুলির বিরুদ্ধে মোজাদ্দিদি, ওয়ায়েজি, কিয়ানি এবং অন্যান্য সম্মানিত ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গের গোষ্ঠীগুলি সমবেত হয় ধর্ম রক্ষার নামে সশস্ত্র মৌলবাদী জীবন চর্চায়। ১৯৯২ সালে রাষ্ট্রপতি নজিবুল্লাহর পতনের পর আফগানিস্তান হয়ে ওঠে ইসলামিক রাষ্ট্র যেখানে মোজাহেদিন এবং তালিবানপন্থী বাহিনী ইসলামের জেহাদি বিজয় ঘোষণা করে।
একুশ শতকের আফগান ইসলামের রাজনীতিকরণকে স্পষ্ট করে। ঐতিহাসিক নথিতে সামাজিক এবং রাজনৈতিক জীবনে ধর্ম ও ইসলামী আলেমদের ভূমিকা সম্পর্কে যে সকল প্রমাণ পাওয়া যায় তার থেকে আলাদা হয় এই সময়ের সমাজ-রাজনৈতিক পরিসর। যেমন ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে মানুষ সংসদ ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, যেখানে ফলাফলে দেখা যায় যে ইসলামী মৌলবাদীরা (মূলত তালিবানপন্থী বাহিনী) অর্ধেক আসনে জয় পেয়েছে। এই নির্বাচনের প্রেক্ষিতে নতুনত্বের অন্তত দুটো গুরুত্বপূর্ণ দিক আমার দেখতে পারি – (১) নির্বাচনী খবর প্রসঙ্গে প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলির শিরোনাম, যেখানে ছাপা হয় – “ধর্মকে আর রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না”, ইত্যাদি; এবং (২) নাগরিক সমাজের সেই সকল বোদ্ধাদের কথা, যারা নিজেদেরকে গণতান্ত্রিক এবং মানবাধিকারের যোদ্ধা বলে দাবি করেছিল, তারা কখনোই এটা বলার সুযোগ মিস করেনি যে “গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে ইসলামের মধ্যে এবং শরিয়ত আইন অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা উচিত।”[২]
নৃকুলগোষ্ঠীগত অবস্থানের পার্থক্য এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কথা আপাতভাবে সরিয়ে রেখে আফগান জনজীবনের কথা বলতে হলে আরও তিনটে মৌলিক ফারাকের কথা উল্লেখ করতেই হয়। প্রথমত, সংগীত প্রসঙ্গ, যেটা সুফি সংগীত, লোকসংগীত, ইত্যাদি হতে পারে। নব-উদ্ভাবিত বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পেশাদার সঙ্গীতশিল্পীদের অস্তিত্ব এখানে সময়ে সময়ে, নতুন গান চালু করার সঙ্গে সঙ্গেই সংগীতকে নতুন পণ্য হিসেবে মানুষের সামনে হাজির করে। মাজারের এক অনন্য মর্যাদা সমাজে প্রতিফলিত হলেও সেখানে সংগীতে বিনোদনের বিষয়টি ধর্মীয় বাধানিষেধে গ্রাম-শহরের মধ্যে ফারাক নির্মাণ করে। সংগীতজীবনকে শহরবাসী কিছুটা উপভোগ করতে পারলেও গ্রামের মানুষ সেই স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়।[৩] মৌলবাদী শাসন সেই পার্থক্যকেও দ্রুত মুছে দিয়েছে।
দ্বিতীয় যে বিষয়টি গ্রামজীবনের সঙ্গে শহরজীবনকে এক করে তোলে সেটা হল গুনিনবিদ্যা। আফগানিস্তানের প্রেক্ষাপটে মধ্য এশিয়াটিক শামানিজমের বর্ণনা নৃতাত্ত্বিক সাহিত্যে খুব কমই দেখা যায়। এটা সত্য যে, আফগানিস্তানের অধিকাংশ জনগণই মুসলমান, তারা মনে করে যে মানুষ শামানবাদী চর্চার মধ্যেই বেঁচে আছেন। এইভাবে, যদিও আধুনিক আফগানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হানাফি স্কুলের সুন্নি মুসলমান, মধ্য এশীয় শামানিজম থেকে প্রাপ্ত বিশ্বাস এবং অভ্যাসগুলি স্পষ্টতই গ্রামীণ এবং শহুরে জনসংখ্যার বিভাজন রেখা মুছে দিয়ে বিশ্ব-মনস্তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।[৪]
তৃতীয় যে বিষয়ে গ্রাম-শহরের জীবনধারায় সাদৃশ্য তুলে ধরে, সেটি হল আফগান মহিলাদের বিয়ে এবং শিক্ষার মধ্যে যে-কোন একটিকে বেছে নেওয়ার অভ্যাস। অর্থাৎ একটি মেয়ে যখন বিয়ের বয়সে পৌঁছায়, তখন তাকে অবশ্যই তার জীবনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পথের মধ্যে থেকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হয়: হয় তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং তার শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার কথা ভুলে যেতে হবে, অথবা যদি সে তার শিক্ষা চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে তাকে বিয়ে করা ভুলে যেতে হবে। ভোগের পণ্যে পরিণত হওয়া আটকাতে পারিবারিক সহায়তায় তাকে বিয়েটাই করতে হয়। আর একবার সে বিবাহিত হলে, দৈনন্দিন সমস্ত পারিবারিক বিষয়গুলিকে তার ওপর এমনভাবেই চাপিয়ে দেওয়া যাতে সে তার উচ্চশিক্ষা অব্যাহত রাখতে না পারে। এই সমাজের রাজনৈতিক বয়ানে সেটাই হল “একটি শিশুর জন্য সেরা উপহার।”[৫]
এমন নানা আঙ্গিকে আমরা আজকের আফগানিস্তানকে দেখতে পারি। আমাদের প্রতিবেশী দেশটির সেই ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষাভাবনা এবং তার প্রেক্ষিতেই তখন আমরা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের জনমানসে বেড়ে চলা সামাজিক টানাপড়েনকে বুঝতে পারি। আমরা ধরে নিতে পারি যে আফগান রাষ্ট্রটি ভঙ্গুর, কিন্তু ইউরেশীয় অঞ্চলে তার ভৌগলিক অবস্থান, আত্মবলিদানের শক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং আদর্শের উপর ক্রমাগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সেটা টিকে আছে। মনে রাখতে হবে যে ২০০১ সালে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্র-নির্মাণ এবং গণতন্ত্রায়ন প্রকল্প হিসেবে যা শুরু হয়েছিল তা শীঘ্রই অভিজাতরা দখল করে নেয়। সেই সম্প্রদায় তাদের প্রভাব আরও বাড়ানোর জন্য আধা-আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক শাসন কাঠামোতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অভ্যন্তরে ধর্মকে জড়িয়ে নেয়। রাষ্ট্রীয় রাজস্ব বিতরণ, বহিরাগত দাতাদের কাছ থেকে পাওয়া আর্থিক সাহায্য, বিনিময়ের বিশ্বস্ততা এবং নিয়ন্ত্রণ, সব কিছুতেই শুরু হয় চরম কেন্দ্রীকরণ এবং অস্ত্রের ঝলকানি। তাতে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়, বিচারখাতের সংস্কার ব্যর্থ হয়, উচ্চ মাত্রার দুর্নীতি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সরকারের বৈধতা হ্রাস পায়, যা দারিদ্র্য বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। ইতিবাচক দিক থেকে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার পরিসর কিছুটা উন্নত হয়। আংশিকভাবে নারীর অধিকারের উপর জোর দেওয়ার কারণে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নারীর অংশগ্রহণ কিছুটা বৃদ্ধি পায়। তবে ২০১৪ সাল থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্রমঅবনতির কারণে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। নাগরিক নিরাপত্তার খাতিরে আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন থাকলেও বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব অমীমাংসিত থাকে, যা খুনের জেহাদি রাজনীতিকে ক্রমে অনিবার্য করে তোলে এবং তাতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতি আশাহত হয়।

আফগান সম্পদ ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি
আফগানিস্তানের প্রধান উপযোগিতা হল এর ভৌগলিক অবস্থান। ইতিহাসের স্থলযাত্রাপথে ভারত বিজয়ের যে পথ, বাণিজ্য বিস্তারের যে পথ, তার মূলটি এই অঞ্চলেই গম্যতা পেয়েছে। শুধু মাত্র জুয়াঞ্জ্যাং, ফা-হিয়েন, কিম্বা হিউয়েন সাং-এর মতো চৈনিক পরিব্রাজক নন, শাসক দারিয়ুস, গজনীর মামুদ, চেঙ্গিস খান, অ্যালেকজান্ডার থেকে বাবর, সকলেই এই পথে তাদের বিজয়ের রথ ছুটিয়েছেন। এই সিল্ক-রুট ধরে বাণিজ্যের বিস্তার ঘটেছে। তাতে অবশ্য দীর্ঘকাল ধরে মূলত দুটো বিষয় আফগানের মাটিকে সমৃদ্ধ করেছে। এক, বিদেশী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শাসনপ্রণালীতে এক ধরনের সমৃদ্ধি, এবং দুই, লুঠের সম্পদে কিছু আফগান উপজাতির গোষ্ঠীজীবনে সমৃদ্ধি।
এই উপযোগিতাও সম্পদের নামান্তর। আফগান ভূখণ্ডের দখল মানেই সমগ্র ইউরেশীয় অঞ্চলে কর্তৃত্ব স্থাপন। সেই সম্পদের বাইরে আফগানের নিজস্ব সম্পদ মূলত দুই ধরনের। প্রথমটি এর পশুপালন ও চাষাবাদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, যখন দ্বিতীয়টি প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ সম্পদের কথা বলে। প্রথমটি যখন গ্রামীণ জীবনধারার পরিচয় দেয়, দ্বিতীয়টি তখন শিল্পায়নের মধ্যে দিয়ে নগর বিকাশের বার্তাবাহক হয়। উভয় ক্ষেত্রেই অবশ্য মূর্ত হয় যুদ্ধের রাজনীতি।
প্রথমটির ক্ষেত্রে উদাহরণে মুঘল শাসক বাবরের কথা বলা যায়। ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর দুই দশকে বাবর যখন কাবুল সহ আফগানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিজের দখলে নিয়ে আসেন সেই সময় এই অঞ্চলের সম্পদ হিসেবে যেটি প্রথম স্থান দখল করে তা হল আফগান কারাকুল। এই প্রজাতির ভেড়া তার সুস্বাদু মাংসের জন্যই বিখ্যাত হয় না, সেদিন থেকে আজকের আন্তর্জাতিক বাজারও এই পশুর লোম থেকে নির্মিত কম্বল সহ সকল শীতবস্ত্রের সর্বাধিক আকর্ষণীয় উপাদান হয়।[৬] গ্রামীণ হস্তশিল্পের ভরাডুবির সঙ্গে কারাকুলের একচেটিয়া বাজারে যদিও বা ওঠানামা করে, কিন্তু আফিম চাষ শুধু তার ভেষজ গুণে নয়, নেশার দ্রব্য উৎপাদনের সাফল্যে চিরদিনই ঊর্ধ্বমুখী বাজারকেই নিশ্চিত করে। মাদকদ্রব্য-শিল্প এখানে কৃষিতে চুক্তি-শ্রমিক প্রথার প্রাসঙ্গিকতা বাড়িয়ে তুলেছে। ড্রাগ-ডলার শব্দবন্ধ আফগান কৃষিসম্পদের দ্যোতক।[৭] 
সম্পদের দ্বিতীয় মাত্রায় যে খনিজ দ্রব্যের কথা বলা হয় তার ইতিহাসও প্রাচীন।[৮] কমপক্ষে পাঁচ হাজার বছর আগে আফগানরা তাদের বিশাল তামা সম্পদ খনন করে এবং প্রাচীন সিল্ক রোডের পথ ধরে ইউরেশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকা জুড়ে তাদের পণ্য ব্যবসা করে, যা মানব সভ্যতার দ্রুত পরিবর্তনে সাহায্য করে। আফগানিস্তানের মেস আয়নকের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান, পাঁচ হাজার বছরের পুরনো সেই তামাখনির প্রমাণ দেখায়। কাবুলের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্রোঞ্জ যুগের খনিশহর। এখানে হিন্দু, এবং পরে বৌদ্ধদের আনাগোনা ছিল। একটি বৌদ্ধ শহরের পরিচিতিতে আয়নক পঞ্চম থেকে সপ্তম শতাব্দীতে সমৃদ্ধির উচ্চতায় পৌঁছেছিল।[৯] আজ, আয়নক তামার আমানত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিসাবে স্বীকৃত, যার মধ্যে ২০ মিলিয়ন মেট্রিক টন শোষণযোগ্য তামা রয়েছে।[১০] 
শিল্পবিপ্লব পরবর্তী সময় ধাতু বিজ্ঞান ইউরোপীয় বণিক শ্রেণীর হাত ধরে সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে পড়ে। কয়লা, লোহা, তামা, সোনা সহ সকল মূল্যবান ধাতুর সন্ধান যা বণিকবাদী নীতি পুষ্ট বাণিজ্যতন্ত্রের নিয়মে আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেটা উনিশ শতকের শুরুতেই এশিয় অঞ্চলে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। ১৮০৮ সালের প্রথম দিকে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধাসামরিক ইউনিটের মধ্যে থাকা জরিপকারীরা এবং পরে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী, আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে তাদের রাশিয়ান জারপ্রতিদ্বন্দ্বীদের পিছনে ফেলে সম্পদ দখলের মরিয়া চেষ্টা করে।[১১] ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সিন্ধু নদীর অববাহিকা অঞ্চলে কয়লার সন্ধান করে। ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার বার্নসের নেতৃত্বে ১৮৩৬-৩৭ সালে প্রথম বাণিজ্যিক কাবুল অভিযানের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল সেই সকল খনিজ সম্পদের দখল।[১২] ১৮৩৯-১৮৪২ সালের প্রথম অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে প্ররোচিত করাতে বার্নসের এই দখলী অভিযান অধিকতর সাফল্য লাভ করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আরেক কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হেনরি ড্রামন্ড (১৮৪১) এই যুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে ব্রিটেনকে মূলত আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ দখলের সম্ভাবনাটিকে বোঝাতে পেরেছিলেন। আধুনিক ভূতাত্ত্বিক জরিপের একটি নথি হিসেবে তিনি ক্যাপ্টেন হারবার্ট প্রণীত বহু-খন্ডে বিভক্ত “ভূতাত্ত্বিক প্রতিবেদন”টির কথাও উল্লেখ করেন, যা ঔপনিবেশিক মননকে এবং “লন্ডন পুঁজিপতিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।”[১৩]
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লক্ষ্য ছিল- (১) জরিপের সাহায্যে আফগানিস্তানে মজুত খনিজ সম্পদকে চিহ্নিত করা এবং সবার আগে তাকে দখল করা। (২) আফগানিস্তানের খনিশিল্পগুলিতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়িয়ে খননের কাজকে আরও দ্রুততার সঙ্গে লাভজনক করে তোলা। (৩) আয়নক তামার খনিতে খননকার্যের পুনরুজ্জীবন ঘটানো, যাতে এই বৃহৎ তামা ভান্ডারকে বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার অন্দরে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। এবং (৪) আফগানদের এটা বোঝানো যে এই খনিশিল্পের বিকাশকে একটি ‘আগ্রাসনের কাজ’ হিসাবে বিবেচনা না করে বরং এটিকে আফগানিস্থানে বিদ্যমান আর্থিকব্যবস্থার পুনর্গঠনে সাহায্যকারী পুঁজি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা যা পরোক্ষভাবে আফগান খনি শ্রমিকদের কাজের পরিসরে উন্নতি ঘটানোর সঙ্গে সঙ্গে “সামাজিক স্থিরতা এবং সমৃদ্ধিতে আফগানিস্তানে স্থায়ী শান্তির যুগ” প্রতিষ্ঠিত করবে।[১৪]
যাইহোক, ব্রিটিশরা কখনই আফগানিস্তানে বাণিজ্যিকভাবে টেকসই খনি স্থাপনের জন্য যথেষ্ট অগ্রবর্তী হতে পারেনি। তা সত্ত্বেও, তারা উনিশ এবং কুড়ি শতকে এই অঞ্চলস্থিত সম্পদের প্রতি ‘ব্যাপক আগ্রহ’ বজায় রেখেছিল। তৃতীয় অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধে পর্যুদস্ত হয়ে অবশেষে ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ সেনা ও তার বিমান বাহিনী আফগানিস্তান থেকে পশ্চাদপসরণ করে।[১৫] ব্রিটিশ উত্তর আফগানিস্তানকে সংহত করে গাজি আমানুল্লাহ খান তাঁর রাজত্ব শুরু করেন। আমানুল্লাহ খানের এই বিজয় (১) নিঃসন্দেহে অখন্ড ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতার লড়াইকে অনুপ্রাণিত করে, (২) লেনিনের নেতৃত্বে সদ্য গড়ে ওঠা সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের সহযোগিতায় আফগানিস্তানের নিজস্ব বিশেষভাবে দক্ষ সেনাবাহিনী ও তার বিমানবাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, এবং (৩) লিখিত সংবিধান কার্যকরী করার মধ্যে দিয়ে আফগানিস্তান প্রজাতান্ত্রিক মানসিকতায় সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের দিকে অগ্রবর্তী হয়। এই গণতান্ত্রিক সমাজ-রাজনৈতিক পরিসর মেয়েদের শিক্ষা ও স্বাধীনতার ওপর জোর দেয়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে কমিউনিস্ট সংসর্গ ব্রিটিশরা ভালোভাবে নেয়নি। ফলে তাদের ষড়যন্ত্রে আফগানিস্তানে উপজাতি বিদ্রোহের (মূলত পাশতুন) আবহে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯২৯র ১৪ জানুয়ারি আমানুল্লাহ ক্ষমতা থেকে অপসারিত হন। নানা উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে চার বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর ৮ নভেম্বর ১৯৩৩, মহম্মদ জাহির শাহ ক্ষমতা দখল করেন এবং আফগানিস্তানের রাজা হিসেবে পরবর্তী প্রায় ৪০ বছর শাসন করেন। নতুন সংবিধানে প্রজাতান্ত্রিক আফগানে ১৯৭৩ পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে শান্তি বজায় ছিল। সেই বছরের জুলাইয়ে চিকিৎসার জন্য আফগানের শেষ সম্রাট ইতালি গেলে তাঁর তুতোভাই মহম্মদ দাউদ খান ক্ষমতা দখল করেন। আফগানে পুনরায় অশান্তির জন্ম হয়। বছর ছয় ধরে চলা নানামাত্রিক বিদ্রোহের সেই রাজনৈতিক অবস্থা পুনরায় বদলে যায় ১৯৭৯র ২৪ ডিসেম্বরের পর, যখন সোভিয়েত বিমান, সেনাবাহিনী ও সাঁজোয়াবাহিনী আফগান নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী হয়।[১৬] একটা কথা এখানে বলা দরকার যে পরিবহন, শক্তি সঞ্চালন এবং যোগাযোগ পরিকাঠামোর অভাবের কারণে আফগানিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ বিশ শতকেও সীমিত ছিল।

আফগান মাটির বিরল উপাদান এবং দখলদারির রাজনৈতিক-অর্থনীতি
ব্রিটিশদের প্রত্যাহারের পর, আমানুল্লাহ খানের নেতৃত্বে যে নতুন সংসদীয় রাজতন্ত্র আফগানিস্তানে প্রতিষ্ঠিত হয় তার বিরুদ্ধে পাশতুন বা পাঠানদের খেপিয়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা ধর্মের সুরসুরিকে (যেমন, শিক্ষায় নারীর স্বাধীনতায়, বিধর্মী সুরাইয়ার রানী হওয়া ইত্যাদি) কাজে লাগালেও তার নেপথ্যে ছিল “আফগান মাটির বিরল উপাদান”-এর ওপর সোভিয়েতের একচেটিয়া সুযোগলাভের পথে কাঁটা ছেটানো। কারণ সোভিয়েতের সেই অনুসন্ধান এবং উন্নয়ন কাজকে উৎসাহিত করেছিলেন আমানুল্লাহ খান নিজে। সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধানের পর ১৯২৭ সালে সোভিয়েত জরিপকারী ভ্লাদিমির ওব্রুচেভ “আফগানিস্তানের জীবাশ্ম সম্পদ” শিরোনামে যে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছিলেন তাতে তিনি মাটির নীচে থাকা তেল ও গ্যাসের বিবরণ দেন।[১৭] তিনিই প্রথম বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস সমৃদ্ধ আমু দরিয়া অববাহিকা অঞ্চলের কথা বিশ্বকে জানান।
বিশ শতকের তিনের দশকের গোড়ার দিকে আফগান ফিল্ডে অবতীর্ণ হয় আমেরিকা। জাহির শাহ-এর ক্ষমতা দখল তখন সময়ের অপেক্ষা। শাহ তাঁর বৈদেশিক নীতিতে সোভিয়েত এবং আমেরিকা -এই দু’পক্ষকেই তাল দিয়ে চলতে চান। তাঁর উদ্যোগে আফগান সরকার ‘আমেরিকান ইনল্যান্ড অয়েল কোম্পানি’কে তেল ও খনিজ অনুসন্ধানের অধিকারে ২৫ বছরের একচেটিয়া ছাড় দেয়। আফগানের মাটিতে শুরু হয় ঠান্ডা লড়াইয়ের বীজবপন। সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ বনাম পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের দ্বান্দ্বিক পরিসর হয়ে ওঠে আফগানের মাটি। লক্ষ্য হয়ে ওঠে আফগান মাটির বিরল উপাদানের একচেটিয়া অধিকার। অত্যাধুনিক হাতিয়ারের বাইরে সহায়ক এবং সহজলভ্য হয় মানব-বোমা। বিভিন্ন আফগান নৃকুলগোষ্ঠীর মানুষ, যাদের অশিক্ষা, ধর্মান্ধতা এবং দারিদ্র এই সহজলভ্যতার কারণ হয়। তবে এই মাটির সম্পদ আহরণের সেই প্রথম বাস্তব অভিজ্ঞতা আমেরিকার কাছে সুখকর হয় না। আফগানদের অত্যাচারে বিরক্ত হয়ে কোম্পানিটি ‘স্বেচ্ছায়’ চুক্তি থেকে সরে আসে।[১৮] 
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, আফগান সরকার বড় আকারের ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান শুরু করে। তারা আমেরিকান, পশ্চিম ইউরোপীয়, চেক এবং সোভিয়েত উত্স থেকে প্রযুক্তিগত এবং আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করে। সাতের দশকে প্রায় সাতশরও বেশি ভূতাত্ত্বিক প্রতিবেদনে প্রচুর সম্পদের করা উল্লেখ করা হয়, যেগুলো শোষণের অপেক্ষায় রয়েছে। আফগানিস্তানের খনি ও সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কাবুলে জাতিসংঘ অসংখ্য প্রতিবেদন গোপন করে যাতে উত্তলনের জন্য প্রতীক্ষায় থাকা সেই সম্পদ আফগানদের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়।[১৯] সোভিয়েত ভূতাত্ত্বিকরা যেহেতু নিজেরা হাজির থেকে জরীপের কাজ করতেন তাই তাদের কাছে এই সব তথ্য ছিল। তারা এই সব মূল্যবান খনিজ সম্পদের কথা জানতেন। তবে যোগাযোগের পথ নির্মাণে পরিবহনকে সহজতর করে না তুলতে পারার জন্য এবং সেই সম্পদকে পুঁজিবাদী কৌশলে গ্রাস করার চেষ্টা না থাকার কারণে এখানকার তেল, গ্যাস, লবণ, কয়লা, তামা, সোনা, লিথিয়াম, কোবাল্ট সহ অন্যান্য মূল্যবান ধাতুসামগ্রী সেইভাবে বাণিজ্যিক হয়ে উঠতে পারেনি।
প্রাকৃতিক জ্বালানি গ্যাস এবং খনিজসম্পদের মজুতদার হিসেবে আফগানিস্তান বিশ্বের বৃহত্তম আধার পরিচিতি লাভ করেও বিংশ শতাব্দীর শেষেও সেই মজুত প্রায় অটুট থাকে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সেই আগ্রাসনের লালসায় সোভিয়েতকে আফগানের মাটি ছাড়া করতে চায়। পুরনো কায়দাতেই ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার হয় নৃকুলগোষ্ঠীর মানুষ। ১৯৮৮ সালে জন্ম নেয় অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত আল-কায়দা জঙ্গিগোষ্ঠী। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই সময় আফগানরা তাদের বৈদেশিক মুদ্রার বেশিরভাগই অর্জন করতো সোভিয়েতকে প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি করে। শুধু তাই নয়, এই দশকে সোভিয়েত কেবলমাত্র দুটো জায়গাতেই ইউরেনিয়াম খননের কাজ সম্পূর্ণ করেছিল।[২০]
প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্যর মাঝে পড়েও আফগান সাধারণ মানুষ রক্তে ভিজেছে। উনিশ থেকে বিশ শতাব্দীর প্রথম দিকে সেটা ছিল ব্রিটেন বনাম জার রাশিয়ার লড়াই। তারপর গোটা বিশ শতাব্দী জুড়ে সেটা হয়েছে দোসর ইংরেজদের সঙ্গে নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে সোভিয়েতের লড়াই। আফগানিস্তানকে তাদের সাম্রাজ্য বিকাশের রণভূমি হিসেবে তারা ব্যবহার করেছিল।[২১] ফলস্বরূপ, বিগত দুই শতাব্দীতে সম্পদ উন্নয়ন এবং পরিকাঠামো নির্মাণের কাজে আফগানিস্তানকে বাইপাস করা হয়েছিল। গত শতাব্দীর নয়ের দশকের শুরু থেকে দ্রুত সামাজিক অবনমনে যেটা ঘটেছিল তাতে আমেরিকার মদত ছিল। নাগরিক যুদ্ধের নামে তালিবান সশস্ত্র উত্থানের সঙ্গে গোটা অঞ্চলটাতে ক্রমে মৌলবাদের ছায়া ঘনায়। আগুন নিয়ে সেই খেলায় সোভিয়েতকে আফগানের মাটিছাড়া করা গেলেও আর্থিক দম্ভের টুইন-টাওয়ার তাদের খোয়াতে হয়।
প্রসঙ্গত, সোভিয়েতের বিপর্যয়ের পর মার্কিন নেতৃত্বাধীন একটি একমেরু বৈশ্বিক ব্যবস্থা আফগানের মাটিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে। প্রথমে তারা বিষয়টিকে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষিতে চালু করে। সেই কৌশলে হাতিয়ার হয় মুজাহিদিন গোষ্ঠী, যাদের সঙ্গে আমেরিকান জরিপকারীরা ১৯৮০র সময় থেকেই কাজ করে আসছিল। তবে কিছু মুজাহিদিন গোষ্ঠী তাদের সোভিয়েত বিরোধী মানসিকতার জন্যই যে কেবলমাত্র মার্কিন শক্তির সহায়তা করছিল তা নয়, খনির মাধ্যমে অর্থায়নে আমেরিকার প্রত্যক্ষ সহায়ক ভূমিকা সেই সমর্থনের মূল কারণ ছিল। নয়ের দশকে, মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ (ইউএসজিএস) এবং মুজাহিদিন সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক একের পর এক খনি অঞ্চলের দখল নেয়। যেমন মুজাহিদ কম্যান্ডার আহমদ শাহ মাসুদ, তার সামরিক অভিযানের অর্থায়ন করেছিলেন পানশিরের সফল রত্ন খনিশিল্পের সাহায্যে। পোলিশ কোম্পানি ইন্টারকমার্সের সহযোগিতায় পানশিরের খনিগুলি স্বল্পকালীন ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শাসনকালে প্রতি বছর ২০০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে।[২২] তবে নয়ের দশকের প্রথমার্ধে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আফগানিস্তান সোভিয়েত সৈন্যদের দখলে থাকায় সেখানকার তেল ও গ্যাসসম্পদ মার্কিনীদের বোঝাপড়ার বাইরে থেকে যায়।
১৯৯২-১৯৯৬-এর গৃহযুদ্ধের সময় সারা আফগান জুড়েই খনি অঞ্চলগুলিতে অরাজকতা দেখা দেয়। চোরাচালান ও দুর্নীতির সঙ্গে সেখানে মজুরিহীন শ্রমের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। সেই পরিস্থিতি আফগান খনিজ সম্পদ শোষণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলিকে বিশেষ সহায়তা দেয়। সেই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী করতে তালিবদের ক্রমান্বয়ে আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত করার কাজটা সময়ের নিরিখে মার্কিনীদের কাছে, বিশেষ করে ন্যাটোবাহিনীর কাছে, বিশেষভাবে জরুরী হয়ে পরে। মনে রাখতে হবে যে তখন বেশীরভাগ খনি অঞ্চল মুজাহিদিন গোষ্ঠীর দখলে ছিল এবং তারা তখন আফগানিস্তানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে রত্নখনিগুলির জাতীয়করণ করার চেষ্টাতেও নিয়োজিত ছিল। ১৯৯৬ সালে আফগানিস্থানে তালিবদের পূর্ণক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পর, ক্ষমতাচ্যুত সরকার এবং মুজাহিদিন দল ‘ইউনাইটেড ইসলামিক ফ্রন্ট ফর দ্য স্যালভেশন অফ আফগানিস্তান’ (ইউআইএফ) হিসেবে একত্রিত হয় – যা পশ্চিমী দেশগুলিতে “উত্তরের জোট” নামে বেশি পরিচিত। মূলত খনি ও গ্যাসের দখল নিজেদের হাতে রাখতেই তাদের এই জোটগঠন। প্রসঙ্গত, ইউআইএফ কমান্ডাররা ২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আক্রমণের পূর্বে প্রায় শতাধিক পান্না খনি পরিচালনা করছিল।[২৩]
১৯৯৬ সালে তালিবানরা কাবুল দখল করার পর তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান (টিএপি) গ্যাস পাইপলাইন সহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা শুরু করে। তখন আফগানিস্তানের অধিকাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণকারীরা হল তালিবান সশস্ত্রবাহিনী। ইউনাইটেড ইসলামিক ফ্রন্ট ওরফে নর্দান অ্যালায়েন্স অবশ্য তখনও উত্তরের বেশ কিছু খনি অঞ্চলকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছিল। দুই সশস্ত্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর লড়াইকে জিইয়ে রেখে মার্কিন নেতৃত্বে আফগানে বিনিয়োগ করার যে কৌশল আমেরিকা করেছিল তাতে ভৌগলিক বাধার বাইরে রাজনৈতিক বাধা তখনই সৃষ্টি হয় যখন নর্দান অ্যালায়েন্সকেও আমেরিকার সাহায্যের বিষয়টা তালিবানদের কাছে ধরা পরে যায়। তৃতীয় যে বাধাটা তৈরি হয় সেটা অর্থনৈতিক।[২৪] বিদেশী আর্থিক বিনিয়োগকারীদের আফগান ভয়। সেই ভয় কেবল সহিংসতায় সীমায়িত নয়, বরং সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা, যা হল জাতীয়করণের ভয়। কারণ, উভয়গোষ্ঠীর কাছেই “খনিজগুলি ঐতিহ্যগতভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।”[২৫] হয়তো সেই কারণেই ২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বে ‘অপারেশন এন্ডুরিং ফ্রিডম’ আক্রমণের নেতৃত্ব আফগানিস্তানের সম্পদ আহরণে বিনিয়োগকারীদের লাভের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।
যাইহোক, ৭ অক্টোবর ২০০১ থেকে শুরু হওয়া মার্কিন নেতৃত্বে ‘অপারেশন এন্ডুরিং ফ্রিডম’ (ও.ই.এফ) নামের আক্রমণ আফগানিস্তানকে একটি ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত করেছিল যার মূল লক্ষ্য ছিল মধ্য এশিয়া সহ সমস্ত ইউরেশিয়াকে মুক্ত বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া। মার্কিন সরকার এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এ.ডি.বি) নিউ সিল্ক রোড (এন.এস.আর) নামে একটি উদ্যোগে ইউরেশিয়ান সুপারকন্টিনেন্টের বিভিন্ন অঞ্চলগুলিকে জুড়ে আফগানিস্তানকে পরিবহন, শক্তি সঞ্চালন এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্কের একটি কেন্দ্রীয় ভূমিতে পরিণত করতে চায়।২৬ ২০০২ সাল থেকে আফগান মানবাধিকার আইনে বলা হয় যে বেশিরভাগ আফগানবাসীর তথাকথিত প্রাকৃতিক সম্পদজাত অভিশাপের প্রভাব ভোগ করার চেয়ে তাদের রাজনৈতিক এবং কর্পোরেট নেতাদের দ্বারা প্রতিশ্রুত উন্নয়নের সুবিধা ভোগ করার সম্ভাবনা বেশি। এই নিয়মেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানদের আপেক্ষিক স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যক্তিগত মালিকানা, বিনিয়োগকারীদের অধিকার এবং মুক্ত বাণিজ্যের গ্যারান্টি দেওয়ার জন্য নয়া-উপনিবেশী আইনী শাসন আরোপ করেছিল। এই শাসন বজায় রাখার জন্য কতটা জোরপূর্বক শক্তির প্রয়োজন হতে পারে তা দেখার বিষয়। তালিবানদের দ্বারা সহিংস প্রতিরোধ তখন অব্যাহত থাকে। সম্পদের নিয়ন্ত্রণের উপর সহিংস প্রতিযোগিতা, সেইসঙ্গে অবৈধ খনি, চোরাচালান, মাফিয়ারাজ এবং সামাজিক পরিসরে ধর্মীয় মৌলবাদী হিংসা, আফগানিস্তানের সামাজিক সমস্যাকে ক্রমশ বাড়িয়ে তোলে।[২৭]
২০০২ সালের ২০ মার্চ ইউএসজিএস যে রিপোর্ট প্রকাশ করে তাতে আফগানিস্তানের খনিজের তালিকায় থাকে : তামা, লোহা, সোনা, পারদ, কোবাল্ট, সীসা, ইউরেনিয়াম, ক্রোমিয়াম, সিজিয়াম, লিথিয়াম, নিওবিয়াম, ট্যান্টালাম এবং আরও কিছু বিরল ধাতু। এই রিপোর্ট মজুত তেল ও গ্যাসের যে পরিমাণ সনাক্ত করেছিল তা সোভিয়েত অনুমানকে বহুগুণে ছাড়িয়ে যায়। আফগান মাটির বিরল এইসব উপাদানগুলিকে আত্মসাৎ করার লক্ষ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নতুন সিল্ক রোডকে বাণিজ্য সুবিধার প্রধান অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করে এবং বিভিন্ন দেশকে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তোলে।[২৮]
এই বিনিয়োগকারীরা আমেরিকান, চীনা, রাশিয়ান, ভারতীয়, ব্রিটিশ, কানাডিয়ান বা অন্য যে-কোন দেশের নাগরিক হতে পারেন। সেটা গুরুত্বপূর্ণও নয়, কারণ তারা আমেরিকান নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থার মধ্যেই বিনিয়োগ করে চলেছেন। মার্কিন প্রশাসন, ন্যাটো বাহিনী এবং তার পুঁজিবাদী কৌশলের কাছে সম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ তখন একটি অপরিহার্য অনুঘটক, যা শুধু নতুন সিল্ক রোডের প্রকৃত রাজনৈতিক-আইনি-অর্থনৈতিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য নয়, একটি কৌশলগত নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা, যা মধ্য এশিয়ার সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুরো ইউরেশিয়া জুড়ে আমেরিকান আধিপত্যের একটি উদীয়মান সাম্রাজ্যের চিরস্থায়ী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বৈশ্বিক স্থিতাবস্থা রচনা করতে সফল হবে। শুধুমাত্র আফগান খনিজ, তেল এবং গ্যাসের জন্য একটি অঞ্চল দখল, এবং সেইসঙ্গে পারস্য উপসাগরীয় তেলক্ষেত্রগুলিতে প্রবেশের কৌশলগত খেলার সুবিধা হিসেবেই বুশ প্রশাসন বিষয়টিকে বিবেচনা করে।[২৯]
ফলে চীন আফগান খনিজ সম্পদের কতটা অংশের নিয়ন্ত্রণ লাভ করলো তা মার্কিনীদের কাছে তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই সুযোগকে কাজের বাস্তবায়নে পরিণত করে চীন। একজন মধ্যস্থতাকারী, প্রয়োগকারী এবং প্রভাবশালী অবস্থানে আমেরিকার মর্যাদা বজায় রেখে বৈশ্বিক মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার মধ্যে চীনের সম্পৃক্ততাকে আরও গভীর করার কাজেই তারা মনোযোগী হয়।[৩০] প্রসঙ্গত, ২০০৩-এর পর ইউএসজিএস, ব্রিটিশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ, আফগানিস্তান ভূতাত্ত্বিক জরিপ এবং কানাডিয়ান ফোর্সেস ম্যাপিং অ্যান্ড চার্টিং এস্টাব্লিশমেন্ট কর্তৃক পরিচালিত অসংখ্য যৌথ গবেষণায় জানা যায় যে আফগান খনিজ ও পেট্রোলিয়াম সম্পদ প্রচুর পরিমাণে রয়েছে যা অর্থনৈতিক এবং ভূ-কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
২০০৬ সালের ইউএসজিএস মূল্যায়ন তালিকায় সম্ভাব্য আফগান তেল ও গ্যাসের পরিমাণ দাঁড়ায়- ১.৬ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল, ১৬ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ৫০০ মিলিয়ন ব্যারেল প্রাকৃতিক তরলগ্যাস। আফগানিস্তানের নন-ফুয়েল খনিজ সম্পদের সম্ভাব্য মূল্য, যা আগে বিলিয়ন ডলার বিবেচিত ছিল তা এক ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে সমীক্ষায় উঠে আসে।[৩১] ২০১১ সালে আবার সেই মূল্যায়ন পরিমানে বেড়ে হয়- ১.৯০৮ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল, ৫৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ৬৬৭ মিলিয়ন ব্যারেল প্রাকৃতিক তরলগ্যাস। ফলে আফগান তেল ও গ্যাসের মজুত অতিরিক্ত দুই ট্রিলিয়ন ডলারের মতো হতে পারে বলে ধরে নেওয়া হয়।
চীন গ্যাস পাইপ লাইন নির্মাণে এগিয়ে আসে।[৩২] ২০০৭ সালে আফগানিস্তান সরকার তামার উত্তোলনের জন্য দুটি চীনা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগকে যৌথভাবে (চায়না মেটালার্জিক্যাল কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশনের (সিএমসিসি) ৭৫ শতাংশ মালিকানা এবং জিয়াংজিকি কপার কোম্পানির (জেসিসি) ২৫ শতাংশ মালিকানা হিসেবে) তামা উত্তোলনের জন্য ছাড়পত্র দেয়। তেল উৎপাদনেও চীন এখানে বিপুল বিনিয়োগ করে।[৩৩] এটা তারপর ব্যাপকভাবে রিপোর্ট করা হয়েছিল যে কনসোর্টিয়াম ছাড়ের জন্য চীন ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদান করে, কিন্তু ডকুমেন্টেশন দেখায় যে সেটা ৪.৩৯ বিলিয়ন ডলার। মার্কিনীদের চীন বিরোধ শুরু হয়। যাইহোক, সম্পদের প্রশ্নে শুধু আয়নকেই বার্ষিক তামা উত্তোলন দু’লক্ষ মেট্রিক টন পর্যন্ত হতে পারে, যা বর্তমান বার্ষিক বিশ্ব উৎপাদনের ১.৩ শতাংশ। আফগানিস্তান বিশ্বের শীর্ষ ১৫টি তামা উৎপাদকদের মধ্যে একজন হতে পারে। পুরো খনি সেক্টরটি আফগানিস্তান সরকারকে ২০১৬ সালে প্রায় দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব দেয় এবং আশা করা হয় যে ২০২৬ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় দেবে।
বিশ্বের বিরল ধাতব উপাদানের (আরইই) ৯৫ শতাংশের বেশি উৎপাদক হিসেবে চীনের আধিপত্য আজ সর্বজনবিদিত। আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প সাহেবের গলাতেও তাই চীনবিরোধী স্বর। আতঙ্কের কারণ শুধু সস্তা শ্রমনির্ভর বাণিজ্যে চীনের সাফল্য নিয়ে নয়, আফগান মাটির এই বিরল পণ্য উত্তোলনে চীনের সাফল্য নিয়ে।[৩৪] মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলির হাতে সেই পণ্য আজ শুধু কম নেই, তার আফগান উৎস আজ তাদের হাতছাড়া। চীন সেখানে তার উৎসমুখ বজায় রাখতে পেরেছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে পণ্যের বিশ্ব বাজারে এই সকল বিরল ধাতুর সরবরাহ সীমিত করে বাজারে দাম বাড়ানোর পুঁজিবাদী খেলার তাসটা যে চীনের হাতে চলে গেছে সেটা দেখেই এমন হুমকির সুর। তবে এখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। পাকিস্তানের ভূমিকাও আর অস্বীকার করার জায়গায় নেই।
২০১০ সালের পর থেকেই চীন আফগান মাটিতে ডিসপ্রোসিয়াম, নিওডিয়ামিয়াম, টারবিয়াম, আরবিয়াম, ইউরোপিয়াম, ইট্রিয়াম, সেরিয়াম, ইন্দিআম, ল্যান্থানাম, টেল্লুরিআম, স্ক্যান্ডিয়াম, থুলিয়াম, নিওবিয়াম, লিথিয়াম, ট্যানটালামে প্রভৃতি মহামূল্য ধাতুভান্ডারের অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ভিত্তিতে দখল করে। আফগানের মাটিতে এগুলি প্রচুর পরিমাণে মজুত রয়েছে। চীনা উত্পাদিত এই আরইই-র বিকল্পগুলির কিছু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকাতে পাওয়া গেলেও এবং সেটা চীনের মোট উৎপাদনের কাছাকাছি হলেও বলা যায় যে একুশ শতকের বিশ্বায়ন এই বিশ্বকে আর উত্তর-দক্ষিণে ভাবে না, সেটা এখন পূর্ব-পশ্চিমে বিভক্ত। বলা হয় যে পুঁজিবাদের কর্মক্ষমতা (ক) জাতি-রাষ্ট্রের শক্তি, (খ) পুঁজিবাদী সমাজের সামাজিক সমন্বয় এবং (গ) আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার উপর নির্ভর করে। এই তিনটি জিনিসই আজ সংকটে রয়েছে।[৩৫] আফগান প্রেক্ষাগৃহে তাই আজ পাক-রাজনৈতিক কুশীলবদের কৌশলী অভিনয় শুরু হয়। চীনের পাক-যোগ নতুন নয়। সেই নতুন কাহিনী ভারতের সামাজিক পরিসরকেও অশান্ত করে তুলতে পারে।

শেষের কথা
২০১০ সালের ৩১ জানুয়ারি, আফগানিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “প্রায় সমাপ্ত ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভের রিপোর্ট অনুযায়ী, আফগানিস্তানের নন-ফুয়েল খনিজ সম্পদের মূল্য এক ট্রিলিয়ন ডলার।” অর্থাৎ আফগান খনিজ সম্পদের আনুমানিক মূল্য এক ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার[৩৬] এবং তেল এবং গ্যাস রিজার্ভ সহ সকল এক্সট্রাক্টিভ রিসোর্সের মোট মূল্য তিন ট্রিলিয়ন হতে পারে।[৩৭] এই সম্পদের মধ্যে রয়েছে আনুমানিক ১.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন উচ্চ গ্রেড আরইই।
পূর্ব-গোলার্ধের সেই সম্পদের বেশীটাই এখন এই গোলার্ধের শক্তিধর দেশ চীনের নিয়ন্ত্রণে। তবু বলতে হয় যে এক বিপুল সম্পদের ভান্ডার হয়ে আফগানিস্তান কেবল বৈশ্বিক প্রাধান্যের প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে বসে আছে। জিওস্ট্রেটিজিস্টদের মতে, কে পৃথিবীকে শাসন করে তার মূল বিষয় হল কে ইউরেশিয়া শাসন করে। শেষ পর্যন্ত, যে কেউ খেলার নিয়মগুলো লিখবে, রাজনৈতিক বৈধতা, ধর্মীয় মৌলবাদের স্বীকৃতি এবং আর্থিক মুনাফা নিশ্চয়তায় সামরিক শক্তির যোগান দিয়ে সেই নিয়মগুলোর প্রয়োগে পণ্য-উত্পাদন/শক্তি-উত্পাদন/আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকে সে সম্পদবিকাশের শিল্পায়নে নিয়ন্ত্রণ করবে।[৩৮] সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ভূ-কৌশলীদের কাছে এই আক্রমণটি কেবল আফগানিস্তানের সম্পদ উত্তোলনে বিনিয়োগের অনুমতি দেয়নি, এটি তখন থেকেই মধ্য এশিয়া জুড়ে পরিবহন, শক্তি সঞ্চালন এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্কের একটি প্রধান ভূখণ্ড হয়ে ওঠার সম্ভাব্যতায় উন্মুক্ত হয়। ইউরেশীয় মহাদেশের নিয়ন্ত্রকের আসন গ্রহণের পথ খুলে দেয়। চীন সেটা আগেই বুঝেছিল। আফগানিস্তানের বস্তুবাদী ইতিহাসটা সে অনেক আগেই ভালোভাবে বুঝে নিয়েছিল।
চীন তাই জানতো যে আমেরিকার নেতৃত্বে চলা এই যুদ্ধ শান্তি ও গণতন্ত্রকে উন্নীত করার যে কথা দাবি করে, ধ্বংসের প্রাথমিক উদ্দেশ্যকে বৈধতা দিতে সৃজনশীলতার যে ব্যাখ্যা প্রদান করে, তা অবাধ বাণিজ্যের বৈশ্বিক ব্যবস্থায় একমেরুকরণের বিস্তার। পূর্ববর্তী কোন আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে পুঁজিবাদী সামাজিক ব্যবস্থায় প্রতিস্থাপন করা ছাড়া এটা অন্য কিছু নয়। আফগান জনগোষ্ঠীগুলির কাছে তাই এটা সমাজের যেকোন প্রকার সামাজিক-অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে গঠিত একটি মৌলিক শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন।[৩৯] সেই দিকে অংশ না নিয়ে তখন চীন ফাইবার অপটিক কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক, তেল ও গ্যাস পাইপলাইন, বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক, রেলপথ এবং হাইওয়ে তৈরির কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে। কারণ এগুলোই ইউরেশিয়ায় রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের নতুন সংজ্ঞা গঠন করে দেয়।
ভূ-কৌশলীরা তাই স্বীকার করেন যে, আধিপত্যের এই পরিকাঠামো তৈরি করা শেষ পর্যন্ত একটা স্বতন্ত্র সম্পদ দখলের চেয়ে আজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়। নির্বিশেষে একথা স্বীকার্য হয় যে প্রতিটি সম্পদ ইতিহাসের যে-কোন সময়েই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিকল্প শক্তি-প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি ভবিষ্যতে যেমন তেল এবং অন্যান্য হাইড্রোকার্বনকে অপ্রয়োজনীয় করে তুলতে পারে, ঠিক সেইভাবে উইঘুরদের বিদ্রোহী করে তুলে (যদিও সংখ্যায় তারা বেশ কম) তাজিক সহ অন্যান্য নৃকুলগোষ্ঠীর সহায়তায় আফগানিস্তানে অন্তর্বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে কোন বাহ্যশক্তি। ততদিন পর্যন্ত সম্পদ শোষণের ভিত শক্ত করতে মৌলবাদের নির্মম জাঁতাকলে সাধারণ আফগান মানুষ পিষ্ট হবেন, প্রতিবাদী হবেন, বিক্ষোভে সামিল হবেন, অথবা মোল্লা মহম্মদ হাসান আখুন্দের তালিবানী শাসন মেনে নেবেন।

পাদটিকা এবং গ্রন্থসূত্র:

১ এই প্রসঙ্গে আরও বিশদে জানতে দেখুন, Sikoev Ruslan, (2006). “Muslim Clergy in the Social and Political Life of Afghanistan,” in Central Asia and the Caucasus, 2(38): 126-130.
২ উপরের ১ নম্বর নির্দেশিকার বাইরে দেখা যেতে পারে, Oz Hassan and Andrew Hammond, (2011). “The Rise and Fall of American’s Freedom Agenda in Afghanistan Counter-Terrorism, Nation-Building and Democracy,” in The International Journal of Human Rights, 15(4): 532–551.
৩ দেখুন, Mark Slobin, (1970). “Music and the Structure of Town Life in Northern Afghanistan,” in Ethnomusicology, 14(3): 450-458.
৪ দেখুন, Homayun Sidky, (1990). “‘Malang’, Sufis, and Mystics: An Ethnographic and Historical Study of Shamanism in Afghanistan,” in Asian Folklore Studies, 49(2): 275-301.
৫ নারী শিক্ষা প্রসঙ্গে এমন আলোচনা প্রসঙ্গে দেখা যেতে পারে, Nina Burridge, Anne Maree Payne & Nasima Rahmani, (2016). “‘Education is as important for me as water is to sustaining life’: perspectives on the higher education of women in Afghanistan,” in Gender and Education, 28(1): 128–147. এছাড়াও দেখুন, Tejendra Pherali, (2018). “Learning in the Chaos: A Political Economy Analysis of Education in Afghanistan,” in Research in Comparative and International Education, 13(2): 239-258.
৬ আর্থিক বাণিজ্যের প্রেক্ষিতে কারাকুলের গুরুত্ব প্রসঙ্গে আলোচনায় দেখুন, Abdul Hay Kayoumy, (1969). “Monopoly Pricing of Afghan Karakul in International Markets,” in Journal of Political Economy, 77(2): 219-236.
৭ এই ড্রাগ অর্থনীতির উন্মেষ এবং আফগানিস্তানের রাজনৈতিক-অর্থনীতি প্রসঙ্গে দেখুন, Jonathan Goodhand, (2008). “Corrupting or Consolidating the Peace? The Drugs Economy and Post-conflict Peacebuilding in Afghanistan,” in International Peacekeeping, 15(3): 405-423.
৮ দেখুন, Henry Drummond, (1841). “On the Mines and Mineral Resources of Northern Afghanistan,” in Journal of the Asiatic Society. 109(25): 74–79.
৯ দেখুন, Afghanistan MOMP, (2014). Mes Aynak Archaeology. Kabul: Ministry of Mines and Petroleum.
১০ দেখুন, Emmanuel Huntzinger, (2008). The Aynak Copper Mine: Assessment of Threats and Opportunities for Development from a Sustainable Business Perspective. Kabul: Integrity Watch Afghanistan. P. 24.
১১ দেখুন, Mountstuart Elphinstone, (1815). An Account of the Kingdom of Caubul and its Dependencies in Persia, Tartary and India; Comprising a View of the Afghaun Nation, and a History of the Dooraunee Monarchy. London: Longman. Pp. 151. এবং অবশ্যই দেখা যেতে পারে, John F. Shroder, (1981). “Physical Resources and the Development of Afghanistan,” in Studies in Comparative International Development, 16(3–4): 36–63.
১২ দেখুন, Andrew Grout, (1995). Geology and India, 1770–1851: A Study in the Methods and Motivations of a Colonial Science. London: University of London. P. 192.
১৩ ১২ নম্বর দ্রষ্টব্য, পৃঃ ৭৬।
১৪ ১২ নম্বর দ্রষ্টব্য, পৃঃ ১৯৩-১৯৪।
১৫ পুঁজিবাদের সেই উপনিবেশী রূপের আলোচনায় দেখা যেতে পারে, Saleem H. Ali and John F. Shroder, (2011). Afghanistan’s Mineral Fortune: Multinational Influence and Development in a Post-War Economy. Burlington: Institute for Environmental Diplomacy and Security, University of Vermont. P. 5. এছাড়াও দেখুন, Arne Strand, Kaja Borchgrevink and Kristian Berg Harpviken, (2017). Afghanistan: A Political Economy Analysis. Oslo: NUPI Report.
১৬ দেখুন, Rosanne Klass (ed.), (1987). Afghanistan: The Great Game Revisited. New York: Freedom House.
১৭ ১৫ নম্বর দ্রষ্টব্য, পৃষ্ঠা ৫।
১৮ এই আলোচনা প্রসঙ্গে দেখা যেতে পারে, John F. Shroder, (1981). “Physical Resources and the Development of Afghanistan,” in Studies in Comparative International Development, 16(3–4): 36–63. বিশেষ করে এখানে পৃষ্ঠা ৪৪ দ্রষ্টব্য।
১৯ দেখুন, R. D. Tucker, H. E. Belkin, K. J. Schulz, S. G. Peters and K. P. Buttleman, (2011). Rare Earth Element Mineralogy, Geochemistry, and Preliminary Resource Assessment of the Khanneshin carbonatite Complex, Helmand Province, Afghanistan: U.S. Geological Survey Open-file Report 2011–1207. Reston and Kabul: United States Geological Survey. P.1.
২০ দেখুন, Paul McCready, (ed.), (2006). Afghanistan: Special Publication, Mining Journal. London: Mining Communications Ltd. P. 8.
২১ দেখুন, Barnett R. Rubin, (1995). The Search for Peace in Afghanistan: From Buffer State to Failed State. New Haven: Yale University Press.
২২ দেখুন, Matthew DuPée, (2012). “Afghanistan’s Conflict Minerals: The Crime-State-Insurgent Nexus,” in CTC Sentinel, 5(2):11–14. ১২ পাতা দ্রষ্টব্য।
২৩ ২২ নম্বর দ্রষ্টব্য এবং এমন তথ্য প্রসঙ্গে ১৩ নম্বর পাতাটি দেখা যেতে পারে।
২৪ দেখুন, Zbigniew Brzezinski, (1997) .The Grand Chessboard: American Primacy and its Geostrategic Imperatives. New York: Basic Books.
২৫ দেখুন, John F. Shroder, (1981). “Physical Resources and the Development of Afghanistan,” in Studies in Comparative International Development, 16(3–4): 36–63. উদ্ধৃতিটির জন্য পৃষ্ঠা ৪৯ দ্রষ্টব্য।
২৬ এটাকেই পরে “একবিংশ শতাব্দীর নতুন নিয়ম” হিসেবে আখ্যায়িত করেন হিলারি ক্লিন্টন। দেখুন, Hilary Clinton, (2011). Remarks on India and the United States: A Vision for the 21st Century. Washington D.C.: US Department of State.
২৭ খনি আইনের অলিন্দে গজিয়ে ওঠা দুর্বৃত্তায়ন প্রসঙ্গে দেখুন, Lynne O’Donnell, (2014). “Does Afghanistan’s New Mining Law Benefit Its Mafias?” in Foreign Policy. 3 September.
২৮ দেখুন, Michael Skinner, (2015). “Afghanistan from Barrier to Bridgehead: The Political Economy of Rare Earth Elements and the New Silk Road,” in Ryan David Kiggins (ed.), The Political Economy of Rare Earth Elements: Rising Powers and Technological Change. London: Palgrave Macmillan. Pp. 106-132.
২৯ বুশ প্রশাসনের ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজিতে সংজ্ঞায়িত কৌশলগত লক্ষ্যের সেই আলোচনা প্রসঙ্গে দেখা যেতে পারে, G. W. Bush, (2002). The National Security Strategy of the United States of America. Washington, D.C.: White House.
৩০ দেখুন, Robert D. Kaplan, (2009). “Beijing’s Afghan gamble,” in New York Times. 7 October.
৩১ এমন সমীক্ষা প্রসঙ্গে দেখা যেতে পারে, S. G. Peters, T.V.V. King, T.J. Mack and M.P. Chomack, (eds.) and the US Geological Survey Afghanistan Mineral Assessment Team (2011). Summaries of Important Areas for Mineral Investment and Production Opportunities of Nonfuel Minerals in Afghanistan. Vol. I & II. Reston: US Geological Survey.
৩২ চীন গ্যাস পাইপ লাইন প্রসঙ্গে দেখুন, M. A. Samimion, (2012). “China eyes gas pipeline via Afghanistan,” in Cimicweb. 6 Junuary.
৩৩ দেখুন, Hamid Shalizi, (2012). “China’s CNPC begins oil production in Afghanistan,” in Reuters. 21 October.
৩৪ দেখুন, Tom A. Peter, (2011). “China wins $700 million Afghan oil and gas deal. Why didn’t the US bid?” in Christian Science Monitor. 28 December.
৩৫ John F. Campbell and John A. Hall, (2021). What Capitalism Needs. Cambridge: Cambridge University Press.
৩৬ দেখুন, James Risen, (2010). “U.S. Identifies Vast Mineral Riches in Afghanistan,” in The New York Times. 13 June.
৩৭ দেখুন, Eltaf Najafizada, and James Rupert, (2010). “Afghanistan will invite new iron mine bids after issues over transparency,” in Bloomberg. 3 Feb. এছাড়াও দেখা যেতে পারে, Eltaf Najafizada, (2011) “U.S., Afghan Study Finds Mineral Deposits Worth $3 Trillion,” in Bloomberg. 29 January.
৩৮ দেখুন, Zbigniew Brzezinski, (1997). “A Geostrategy for Eurasia,” in Foreign Affairs, 76(5): 50–64.
৩৯ দেখুন, Ellen Meiksins Wood, (2003). Empire of Capital. London: Verso. আলোচ্য অংশের জন্য ১৪৪-১৪৫ পাতা দ্রষ্টব্য।

[লেখক – এম. এ, পি এইচ. ডি, সহকারী অধ্যাপক, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, প্রফেসর সৈয়দ নুরুল হাসান কলেজ, ফারাক্কা, মুর্শিদাবাদ]

Facebook Comments

Leave a Reply