হে চিরপ্রণম্য ছন্দ : ইন্দ্রনীল ঘোষ

fail

সাহিত্যের আরও বিভিন্ন উপকরণের মতই ছন্দ নিয়েও নানা কথা। ছন্দ প্রাচীন না চিরন্তন, আরোপিত না উৎসারিত, বাইরের সাজ না ভিতরের গঠন, পরিত্যাজ্য না অপরিহার্য … এমনই নানা বিষয়ে আলোচনা চলে। এ’ গদ্যের শুরুতেই ব’লে রাখি, ছন্দ বলতে আমি এখানে কেবলমাত্র ব্যাকরণের আওতাভুক্ত ছন্দের কথাই বলছি না; বরং হিসেব-নিকেশ তর্ক-বিতর্ক উকিল-আদালতের বাইরে যে ছন্দ শ্রবণানুভূতির, যার আবেদন প্রাণের কাছে, যে ধ্বনিসচলতা পাঠকের মনে কবিতায় জীবন্ত গতির রূপরেখাটি ফুটিয়ে তোলে, তার কথাই মূলত বলছি।
ছন্দ আরোপিত বললে খুব একটা ঠিক বলা হয় না, বরং আহরিত— প্রকৃতি থেকেই শেখা। জন্ম বৃদ্ধি ক্ষয় জন্ম এ’ গতিময়তা ছন্দের নিয়মেই হয়। বস্তুর সূক্ষতম কণাটিও ছন্দে নড়ে-চড়ে। কথাগুলো আপাতভাবে ভাবাবেগ জড়িত উচ্চারণ মনে হলেও, একেবারেই নয়। একদম গাণিতিক কথা। যাঁরা গণিত সম্পর্কে, বিজ্ঞান সম্পর্কে, স্থাপত্যবিদ্যা সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল তাঁরা এ’ কথা জানেন। একটা উদাহরণ দিই। ফিবোনাচ্চি সিকোয়েন্স নামে একটি বিখ্যাত সিকোয়েন্সের কথা অনেকেই শুনেছেন। সিকোয়েন্সটির প্রথম দুটো সংখ্যা ১, ১। তারপর থেকে প্রত্যেকটা সংখ্যা আগের দুটো সংখ্যার যোগফল, এইরকম — ১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ২১, … এভাবে চলতে থাকে। এই সিকোয়েন্সের বিশেষত্ব হচ্ছে প্রকৃতিতে এই সিকোয়েন্স সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় — ক্রোমোজোম থেকে ফুলের রেণু থেকে আকাশগঙ্গা কোনখানেই বা সে নেই? মানব সমাজে এর উৎপত্তি বা প্রথম ব্যবহার কোথায় জানেন? ভারতে ২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। আচার্য পিঙ্গলের সংস্কৃত ছন্দে।
ছন্দ এভাবে প্রকৃতি থেকেই মানুষের শেখা। প্রকৃতিতে যে সচলতা, তাই কবিতার ধ্বনিতে, যে কারণেই জীবন্ত হয়ে ওঠে গতিরূপ। ছন্দ বাড়িতে ব’সে বুদ্ধি ক’রে আঁক ক’ষে বানানো হলে তা ধ্বনি-গুণের সাথে একাত্ম হতে পারত না। টিঁকত না। জোড় ও বিজোড় মাত্রার যে গতিপ্রকৃতির পার্থক্য তাও এ’ বিশ্বের সিমেট্রির প্যাটার্নের দিকেই ইশারা করে।
পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা স্থির অনড় জগদ্দল পাথরের স্তূপ দেখে শিহরিত হই না, শিহরিত হই সেই স্থানু নৈশব্দের কন্ট্রাস্টে প্রাণের স্পন্দন দেখে, পাহাড়কে ঘিরে সময়, হাওয়া, আলো, পাতা, ঝর্ণা এসবের চলাচল দেখে। গতি বাদে যেমন সৃষ্টি ভাবা যায় না, তেমনই ছন্দ বাদে কবিতা। “ছন্দ” শব্দটিকে আমরা সীমিত ক’রে ফেলেছি কেবলমাত্র ব্যকরণের পরিচিত কিছু সমমাত্রার ছন্দ অর্থে। বহু অসম মাত্রার ছন্দ আছে যা শুনলে অনভ্যস্ত কান টেরই পাবে না ছন্দের কবিতা শুনছে। গতিতেই ছন্দের বাস। কবিতায় ধ্বনির চলা থামা বাঁকের সমস্ত ধরণই ছন্দ। এমনকি ছন্দ ভাঙাটিও ছন্দেরই আওতায় পড়ে। যদি না পড়ে তবে তা জবরদস্তি হয়ে যায়, গতিহীন অসাবলীল — সিঙ্ক্রোনাইজ করে না। কবিতায় ছন্দ নেই বলতে তাই মানে দাঁড়ায় কবিতার মধ্যে ধ্বনি থেকে ধ্বনিতে কোনো সরণ নেই, চলাচলের রূপ ফুটে উঠছে না, তা অনড় জগদ্দল কিছু শব্দপিণ্ড মাত্র।
তরুণ বয়েসে এক সিনিয়ার কবির কাছে একটা কথা শুনেছিলাম — কোনো চলমান ট্রেনে লেখা কবিতা আর থেমে থাকা ট্রেনে লেখা কবিতায় ধ্বনির গতিরূপ এক হয় না। এটাই ধ্বনির কম্পন সম্পর্কে কবির অনুভব, যা ফুটে ওঠে কবিতায়। এবং যার ধরণকে আমি ছন্দ বলছি।
ছোটবেলায়, বাকি অনেকেরই মতো ব্যকরণগত ছন্দের চর্চা করেছিলাম। কিছু কবিতাও লিখেছিলাম। পরে আর অমন প্রথাগত ছন্দে কখনও লিখিনি। কিন্তু তার অর্থ এই নয়, যে আমার কবিতায় ছন্দ নেই। বরং আমি মনে করি, আমার সমস্ত কবিতাই ছন্দের কবিতা। কোনোদিন বাঁচতে বাঁচতে যদি ছন্দবোধ হারিয়ে ফেলি, আশঙ্কা হয়, সেইদিন প্রকৃতির দিকে কী ভীষণ সংবেদনহারা এক জড় বস্তুর মতো চেয়ে থাকব আমি — যার ভাষার শিরা উপশিরায় আর কোনো স্পন্দন নেই, ধ্বনির ঝর্ণা যাকে ভিজিয়ে দেয় না।

 

পাখি

রাতবিরেতের আবহাওয়া খুলে রাখি

                         ওড়ে পাখি

অপ্রকৃতিস্থ শিশিরে ভেজানো ডানা

                         চার দানা

মানুষের ক্ষুদ ফুটছে জলীয় চাঁদে

                         লীন ফাঁদে

ভাতের গন্ধে দাঁড়ালো হাসনুহানা…

 

খেলুড়ে বাঘ

জোৎস্নার  রাতে

ফেলে গিয়েছে থাবা

খেলুড়ে বাঘ…

দেখি তার নখ দিয়ে

চাঁদ নামে —

কীসব স্বাদের

ভাঁজ খুলে দিয়েছে

কীসব খেলা

যেন কোনোদিকে আজ

দিক নেই

Facebook Comments

Leave a Reply