অনুবাদে অর্ধেক আকাশ : মালিনী ভট্টাচার্য

fail

[মালিনী ভট্টাচার্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি সংস্থায় জনসংযোগে কর্মরত। কথাসাহিত্য, তথ্যভিত্তিক লেখালিখি ও অনুবাদের কাজ করছেন প্রায় এক দশক। সাহিত্যে ও শিল্পে নারীত্ব ও নারীর সত্ত্বায়ন বিষয়ে বিশেষ আগ্রহী মালিনী।‘অনুবাদে অর্ধেক আকাশ’— এই ধারাবাহিক কলামে বিশ্বসাহিত্যের কয়েকটি উপন্যাসে নারীত্ব ও নারীর সত্ত্বায়ন প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য অংশের অনুবাদ করবেন মালিনী।]

মার্থা অস্টেনসো

মার্থা অস্টেনসোর (১৯০০-১৯৬৩) ‘Wild Geese’ (১৯২৫) ক্যানাডার সাহিত্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা এই উপন্যাস প্রথম ওই অঞ্চলের আবেগময় রোমান্টিক শৈল্পিক ধরণকে আক্রমণ করে, ও ঐকান্তিকভাবে খানিক রূঢ়, জটিল, মনস্তাত্ত্বিক ‘সোশ্যাল রিয়ালিজম’ কে সাহিত্যচর্চার পুরোভাগে আনে। এই উপন্যাসের আখ্যানবস্তু মানুষের অন্তর ও বাহিরের চিরস্থায়ী একাকিত্ব। আমরা স্বাধীনতা বলতে কি বুঝি? বন্ধনই বা কি? মানুষ নিজের বিশ্বাস, মূল্যবোধের প্রতি কিভাবে, কতখানি দায়বদ্ধ? অস্টেনসোর প্রধান চরিত্ররা নিজেদের জীবনে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে। উপন্যাসের এই অংশে লিন্ড আর্চার সবেমাত্র ম্যানিটোবার একটি কৃষি-সম্প্রদায়ের স্কুলে পড়াতে এসেছে; গেয়ার পরিবারের সঙ্গে তার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। সেই পরিবারের ছোট মেয়ে জুডিথের সঙ্গে লিন্ডের প্রথম রাত্রিযাপনের কথা অনুবাদ করা হয়েছে।

কথাটা কেউ স্পষ্ট করে না বললেও বোঝা যাচ্ছিল সকলে কেলেব গেয়ারের অপেক্ষায় বসে। এমনকি এখানকার স্কুলের নতুন শিক্ষিকা, লিন্ড আর্চারওI আজ বিকেলেই ডাকের গাড়িতে ইয়েলো পোস্ট থেকে সে এসে পৌঁছেছে এবং মনে হয় সে ক্ষুধার্ত। কেলেবের স্ত্রী আমেলিয়া হাসিমুখে দ্রুতগতিতে রান্নাঘরের টুকটাক কাজ সারছেন, মনে হচ্ছে এখনও রাতের খাবারের ব্যবস্থাপনা চলছে। কিন্তু ব্যস্ততা তাঁর উদ্বেগকে আড়াল করে রাখতে পারছিল না। জুডিথ আর চার্লি এরমধ্যেই গরুদের দুধ দুইয়ে ফেলেছে, বেশ কয়েকবার বিনাকারণেই এঘরে এসে বাড়ির আবহাওয়াও পরখ করে গেছে। মার্টিন স্বভাবতই আনাড়ি, ঢিমেতালে চলে, কিন্তু আজ সে আস্তাবলটা ভীষণ পরিপাটি করে সাফ করেছে। তার যমজ বোন এলেন অর্গান বাজাচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় সুর লাগছিল না, তার বহুপরিচিত ‘বেন বোল্ট’ কী রেড উইং’-এর সুরও যেন সে ভুলে যাচ্ছে। এমনি এলেন ভালোই বাজায়, কয়েকবার শুনেই গান তুলে নিতে পারে।

নতুন স্কুলটিচার মেয়েটি নিচু মখমলে ঢাকা রকিং-চেয়ারটিতে চুপ করে বসেছিল। তার দুলুনির সাথে তাল মিলিয়ে চেয়ারের স্প্রিংটা আওয়াজ করে উঠছে। সে সন্দিগ্ধমনে ভাবছিলো,গতকাল ইয়েলো পোস্টে এই বাড়ির লোকেদের ব্যাপারে সে যা কিছু জানতে চেয়েছে, তার সোজাসাপ্টা জবাব কেউ দিতে তো চায়ই নি, বরং যথাসম্ভব এড়িয়ে গেছে। এখন তার মনে পড়ছে,যার গাড়িতে সে এতদূর এসেছে, সেই জন টোবাকোকেও এই বিষয়ে প্রশ্ন করে কোনো লাভ হয়নি, সে তার মুখ থেকে একটা অদ্ভুতরকমের শব্দ বার করেই ক্ষান্ত হয়,আর কথা বাড়ায়নি। তবে চেয়ারের এই আওয়াজটা পেটের খিদে থেকে আপাতত তার মনকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখতে পারছে।দফায় দফায় চেয়ারটা যেন এক অনুচ্চ চিৎকার করে বলে উঠছে – “কেলেব! কেলেব! না, কেলেব!”

এবার বাইরের দরজাটা খুলে গেল। জুডিথ এসেছে আবার। রান্নাঘরের দরজায় ঝোলানো লণ্ঠনের অনুজ্জ্বল আলোয় লিন্ড আর্চার তাকে ভালো করে দেখল। শক্তসমর্থ শরীর, যেন বিদ্রোহের জন্য সদাপ্রস্তুত।তার বুক উন্নত, চওড়া, প্রায় ছেলেদের মতো, কালো চুল মাথার ওপর চূড়ো করে বাঁধা, তাতে নীলচে আলোর ঝলকানি।চোখ নিচু, খানিক অপ্রসন্ন, আর ঠোঁটদুটো ভরাট,যে যার নির্দিষ্ট কোণে অবসৃত। গায়ে ওভারঅল আর মোটা সোয়েটার। দুপায়ে নিজের শরীরের ওজন দুভাগ করে দাঁড়িয়ে আছে জুডিথ, প্রয়োজনে যে কোনো মুহূর্তেই আঘাত সহ্য করে প্রত্যাঘাত করতে সক্ষম।

জুডিথ ধীরে ধীরে লিন্ডের দিকে এগিয়ে আসে। লিন্ডের মনে হয় এমন আশ্চর্য সতেজ সৌন্দর্য সে আজ অবধি দেখে নি।

“খিদে পেয়েছে?” সে জিজ্ঞেস করে।

“তা একটু…” কবুল করে লিন্ড।

অর্গানের কিবোর্ডের ওপর এলেনের সচল হাত থেমে যায়। জুডিথের দিকে সে চাপা ভর্ৎসনার চোখে তাকায় ।বড়বোনকে জুডিথ উপেক্ষা করে ভাঁড়ারঘরে ঢোকে। হাতে একটা প্লেট ও এক গ্লাস দুধ-সহ ফিরে আসে। প্লেটে দুটুকরো রুটি, বেশ খানিকটা মাখন মাখানো।

এলেন আরো বিরক্ত হয়। হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়।

“জুড, জানিস তো বাবা এসব অপছন্দ করেন-”

তার কথার মাঝেই জুড লিন্ডকে বলে, “এটা খেয়ে নাও,আবার কিছু পেটে পড়তে রাত হবে, অবশ্য যদি আজ খাওয়াদাওয়া কিছু হয়।” লিন্ড বিব্রত হয়েই খাবারটা হাতে নেয়,যেহেতু না নেয়াটা আরও বেশি লজ্জার।

এলেন আর কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরে চলে যায়। লিন্ডের মনে হলো সে তার মায়ের সঙ্গে ফিসফিসিয়ে কোনো জরুরি পরামর্শ সেরে নিচ্ছে। লিন্ড অনিচ্ছাভরে রুটিদুটোকে টুকরো করে, দুধের গ্লাসে চুমুক দেয়।

জুড অলসভাবে একটা ছোট লাঠিতে সুতো জড়াচ্ছিল। এখন সে লিন্ডের পাশে মাটিতে ধপ করে বসে পড়ল।

“শোনো, বাবা কিন্তু সহজ-সরল লোক নয়,” সে বলে। তার গলায় উদাসীনতা। “আজ প্রথম দিন, তাই দেরিতে খাবার পাবে। নতুন টিচার এলে এমনই নিয়ম। বাবা ভাবছে কোনো পুরুষমানুষ আসবে। আসলে আগে যারা পড়াতে এসেছে সবাই তো ব্যাটাছেলে ছিল। আজ নির্ঘাৎ চমকে যাবে। কিন্তু তুমি ভয় পেয়ো না, মিস আর্চার, জমি ছেড়ো না এতটুকুও। ”

আমেলিয়ার গলা পাওয়া গেল।

“জুডিথ!”

“কেন মা, ঠিকই তো বলেছি।”

এলেন এঘরে ঢোকে। জলভর্তি কুঁজো টেবলে নামিয়ে রাখে, তাতে একটা চড়া আওয়াজ হয়।বোধহয় টেবল থেকে নিজের হাতের দূরত্ব মাপতে ভুল করেছে সে।তার ভ্রূ-তে ভাঁজ। এলেনের চোখে রুপালি-ফ্রেমের পুরোনো চশমা, যা নিশ্চয়ই অন্যকারোর সম্পত্তি, তাই ওর চোখ সবসময়েই লাল হয়ে ফুলে থাকে, দুচোখের পাতা সারাক্ষণই সিক্ত। টেবলের ধারে একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে এলেন বোনের দিকে তিক্তভাবে তাকায়।তারপর তড়িঘড়ি বেরিয়ে যায়।

লিন্ড রুটি-মাখন খাওয়া শেষ করে। ঘরের আবহাওয়ায় কেমন একরকম নির্দয়তা ছিল যা তরল কথাবার্তায় কাটবে না।

জুডিথ বোধহয় ইচ্ছে করেই দিদিকে বিরক্ত করছিল। সে হঠাৎ শিস দিয়ে সিঁড়ির নিচে শুয়ে থাকা কুকুরটাকে ডাকল।উঠে বসল কুকুরটা ।

“কেলেব!” জুডিথ হঠাৎ বলে উঠল। কুকুরটা কান খাঁড়া করে এদিক-ওদিক দেখছে।

এলেনের দিকে তাকিয়ে জুডিথ একটা শয়তানি হাসি হাসে। এলেন শুনতে পায়নি এমন ভাব করে একমনে রান্নাঘরের কাজ করতে থাকে।

“আসলে -” এইটুকু বলে জুডিথ থামল, এরপর অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল। “বাবা কেন সারাদিন গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়ায় জানো? ওই আইসল্যান্ডার চাষাদের দেখাতে হবে তো, ফসল তোলার মরসুমে কত আরাম, কত সময় ওর হাতে,যখন তারা রাজ্যের নোংরা ঘেঁটে, খেটে মরছে। ”

লিন্ডের অস্বস্তি হচ্ছিল। উত্তরের এই সুদূর, নির্জন বসতিতে শিক্ষকতা করতে আসাকে উপলক্ষ করে তার মনে একটা রোমান্টিক,আবেগঘন অনুভূতি বাসা বেঁধে ছিল, সেই মায়াময়তা দ্রুত ছেড়ে যাচ্ছে তাকে। অনাবৃত ঘৃণাকে খুব কাছ থেকে কখনও দেখেনি সে। আজ দেখছে, এই সতেরো বছরের মেয়েটির দুচোখে।

বাইরে ঘোড়ার গাড়ির চাকার ঘড়ঘড় আওয়াজ শোনা গেল। এলেন অর্গানের সামনে এসে বসল। তার মুখের তারুণ্যকে ছাপিয়ে গেছে এক কঠোর স্থিরতা, যা পূর্ণবয়স্ক নারীদের মুখে কোনো আপতকালীন পরিস্থিতিতে লক্ষ করা যায়। লিন্ড ভাবতে লাগল,কী এমন হতে চলেছে যার জন্য এত সহনশীলতা সঞ্চয় করে রাখছে এরা??

“জুডিথ, এবার মার্টিনকে ডাক,” এলেন ক্ষীণস্বরে বলল। “বাবা এলেন।”

জুডিথ নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল।

আমেলিয়া চট করে রান্নাঘরের সিঙ্ক খালি করলেন এবং একটা বড় পাত্রে গরম জল বসালেন।তাক থেকে ময়লা তোয়ালে সরিয়ে নতুন তোয়ালে ঝুলিয়ে দিলেন।এপ্রন খুলে পরমুহূর্তে ঠিক করে নিলেন নিজের পোশাক। দেয়ালের চিড়-খাওয়া আয়নাতে একবার নিজেকে দেখলেন, চুল পরিপাটি করলেন।

দরজা খুলে গেল। প্রথম দেখায় লিন্ডের মনে হল, কেলেব গেয়ার বিশালকায়। কিন্তু রান্নাঘরের মাঝে এসে দাঁড়াতেই লিন্ড দেখল সে খুব লম্বা নয়, হয়তো মাঝারি উচ্চতার কমই হবে। কেলেবের কাঁধ বলিষ্ঠ, মাথাটা প্রকান্ড,বলা যায় তার শরীর-অতিরিক্ত,যেমনভাবে কোনো রুক্ষ পাথরখন্ড পাহাড়ের খাঁজে একসময় প্রতিষ্ঠিত হয়। দেখে সমীহ জাগে। তবে শরীরের নিম্নভাগ তুলনায় ক্ষীণ। কেলেবের এলোমেলো চুলে পাক ধরেছে, গোঁফে তামাকের ছোপ।ঘন কালো ভ্রূ তার মাংসল নাকের ওপর কোত্থেকে এসে যেন জুড়ে বসেছে।আর তার দুটো চোখ যেন দু-দুটো তীব্র আলোককণা, ওপাশের ঘরে বাতির ছায়ায় বসা লিন্ডকে সেই চোখদুটো সহসাই খুঁজে পেয়ে গেল। কোট, টুপি খুলে ফেলে কেলেব সিঙ্কে হাতমুখ ধুল। এই পর্যন্ত সে একটাও কথা বলে নি।

লিন্ড দেখল কেলেবের সঙ্গে আরো একজন রয়েছে; পরনে মলিন কাপড়জামা, গায়ে একটা লাল জ্যাকেট। এই লোকটাও নিজের কোট, ইত্যাদি খুলে রান্নাঘরে রাখা একটা চেয়ারে বসে পড়ল। মিসেস গেয়ার তাকে কী যেন বললেন, কিন্তু ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে সে জবাবে যা বলল লিন্ড তা ঠাহর করতে পারল না। তার মনে পড়ে গেল,আমেলিয়া আজ বিকেলে একইরকম শান্ত ও সম্ভ্রম-মেশানো সুরে তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে খামারবাড়ি থেকে বসতবাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন, জন টোবাকোর গাড়ি তাকে নামিয়ে দিয়ে গেছিল ওই গোলাঘর অবধিই।

খাওয়াদাওয়ার পর হাতমুখ ধোয়া অবধি কেলেব কথা বললো না। লিন্ড দেখল, সে উস্কুখুস্কু চুলে সামান্য চিরুনিও ছোঁয়ায় নি।

“স্কুলি আজ রাতে থাকছে।” ঘোষণা করার মতো করে কেলেব কথাটা বলল। তার কন্ঠস্বর শুনে লিন্ড অবাক হয়ে গেল। অস্বাভাবিক নরম স্বর লোকটার, প্রায় পোষা বেড়ালের আদুরে ডাকের মতো।

“সেকি! কোথায় শোবে ও? টিচার মেয়েটি তো চলে এসেছে আজ।” আমেলিয়া সামান্য আপত্তি করলেন।

“টিচার? ও হ্যাঁ, তাই তো,এসেছে বটে। স্কুলি থাকবে, বেশ – ” প্রথমবারের মতোই কেলেবের গলা মৃদু,তাতে এতটুকু জোর নেই।

স্কুলিকে ডেকে কেলেব মন্থরপায়ে খাবারঘরে ঢুকল। এই কাঠের বাড়ির একতলাটা দুই ভাগে বিভক্ত – একদিকে রান্নাঘর, অন্যদিকে এই খাবারঘর। অতিথি এলেও এই ঘরেই তাদের বসার ব্যবস্থা করা হয়।

“তুমিই পড়াবে?” কেলেব জিজ্ঞাসা করে। বিরাট লোহার উনুনের কাছেই বসেছে সে, লিন্ডের মুখোমুখি নয়, তার থেকে একটু ঘুরে। লোকটার হাবভাবে বিস্ময়ের লেশমাত্র নেই, নতুন টিচার যে একজন মহিলা এটা যেন তার জানাই ছিল। লিন্ড উঠে হাত বাড়িয়ে দিল। কেলেব ফিরেও তাকাল না। লজ্জায় লাল হয়ে গেল লিন্ড।

“ইনি হচ্ছেন তোমার ইস্কুলের আরেকজন ট্রাস্টি, স্কুলি এরিকসন,” কেলেব তাকে দেখিয়ে বলে।

লিন্ড স্কুলির দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, সে জোরে করমর্দন করে।

“তিনজন ট্রাস্টি থাকার কথা,” কেলেব পরিশ্রান্ত ও নিরস গলায় বলতে শুরু করে, যেন একটা জরুরি অথচ অপ্রীতিকর আলোচনা চলছে। “তবে জশ কার্টিস মারা যাওয়ার পর আর নতুন লোক ঠিক করা হয় নি। আমাদের এলাকায় সবকিছুই শীতবৃষ্টির ওপর নির্ভর করে। আর আমরা দুজন মন্দই বা চালাচ্ছি কোথায়! কি বল স্কুলি?”

উত্তরে স্কুলি কিছু একটা বলল,যাকে সম্মতি বা বিরোধ যা খুশি ধরে নেয়া যেতে পারে। সে কানে কম শোনে, তার ওপর ইংরেজি বলে খুব অল্প, বোঝেও অল্পই।

সবাই খেতে বসেছে। এলেন আর মার্টিনের মাঝে লিন্ডের জায়গা হয়েছে। লম্বাটে টেবিলের এক মাথায় কেলেব, অন্যদিকে স্কুলি।

“খুব তাড়াতাড়ি এবার গরম পড়ে গেল, কি, স্কুলি?” কেলেব এধার থেকে হাঁক পাড়ে।

স্কুলি ঘাড় নেড়ে সায় দেয়। আলু ও গ্রেভি তুলে নেয় পাতে।

কিছুক্ষণের নীরবতা। যে যার খাবার তুলে নিচ্ছে। জুডিথ ছাড়া বাকি সব ছেলেমেয়ে মাথা নিচু করে খাচ্ছে। হঠাৎ যেন তারা অপ্রতিভ হয়ে পড়েছে। লিন্ডের আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত সৌন্দর্য, তার কেতাদুরস্ত পোষাকআষাক ওদের একটু লজ্জায় ফেলে দিয়েছে।

“তোমাদের ওদিকে বৃষ্টি হল?” কেলেব আবার তারস্বরে ডাকে স্কুলিকে। আমেলিয়ার মুখে আশঙ্কার ছাপ। একবার স্বামীকে, একবার লিন্ডকে দেখছেন।

স্কুলি জানায় বিশেষ বৃষ্টি হয়নি, গত হপ্তায় সামান্য একটু,মোটের ওপরে বেশ শুকনো মরশুম।

খেতে খেতে কেলেব স্কুলির সাথে এই ধরনের কথোপকথন টানা চালিয়ে গেল। যেন স্কুলিই এই সন্ধ্যার বিশেষ অতিথি। লিন্ড বারবার জুডিথকে দেখছিল, ওর চোখ জ্বলজল করছে। লিন্ড একটু হাসল। কেলেব যে তাকে গ্রাহ্যই করছে না,তার উপস্থিতি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে চলেছে এবং এতে তার চেয়ে জুডিথ যে অনেক বেশি অপমানিত বোধ করছে,সে বুঝতে পারল।

খাওয়া শেষ হওয়ার পরও অবস্থার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটল না। কেলেব যেন লিন্ডকে দেখতেই পাচ্ছে না, যেন হাওয়ার সঙ্গে মিশে গেছে সে। লিন্ড কোনার সোফাতে একটা বই নিয়ে বসল। মার্টিনের সঙ্গে ছোট্ট চার্লি আবার গোয়ালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। জুডিথ এখন টেবিল পরিষ্কার করছে। বাসি প্লেটগুলো ডাঁই করে রান্নাঘরে নিয়ে যাচ্ছে।

“এলেন, আমাদের কিছু একটা বাজিয়ে শোনা,” কেলেব আদেশ করল। সে আর স্কুলি নিজেদের চেয়ারদুটো ঘরের মাঝখানে টেনে এনেছে, ইতিমধ্যে পাইপও ধরিয়েছে। নীলচে ধোঁয়ার কুন্ডলি কেলেবের মাথার ওপর জমাট বেঁধেছে। বহুদিন আগে দেখা একটা ছবি মনে পড়লো লিন্ডের। ছবিটা এক ফকিরের, মুখে তার অবজ্ঞা, অপলক দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল আকাশের দিকে। যেন নিজেরই কল্পনার কোনো এক পৈশাচিক সৃষ্টিকে মন দিয়ে নিরীক্ষণরত।

জুডিথ রান্নাঘরের কাজে মা’কে সাহায্য করছে। এলেন বাবার কথামতো অর্গানের কাছে গিয়ে বসল। তার গায়ের মোটা সুতির চেককাটা জামাটা ছোট হয়ে গেছে, তার অপরিসর কাঁধ ও অপরিণত বুকের পক্ষেও যা অপ্রতুল। জুডিথের চেয়ে তার চুল হাল্কা, পাতলাও।সে নিজের চুল তার চওড়া কপাল থেকে সরিয়ে এনে আঁট করে খোঁপা বেঁধেছে। লিন্ড দেখল ওর ভ্রূ-জোড়া অপরূপ,মনে হচ্ছে যেন তুলি দিয়ে আঁকা। চশমা পরলে ওর চোখ দুটো বড় দেখায়, কাচের পিছনে যারা ঘন নীল, তরল, আবছায়া-সদৃশ। সরু, দুর্বল আঙ্গুলে এলেন বাজানো শুরু করেছে।

সে বাজিয়ে চলেছে, “Lead Kindly Light”,এবং কেলেবের মুখে, “অবশ্য বিয়ার্নসন এবার সবচেয়ে ভালো মাছের ভেড়িগুলো কুক্ষীগত করেছে,” অথবা “গোটা পুকুরটা অবশ্যই ওর জন্য ছেড়ে দেয়া হবে না, ভেবেছে কী ব্যাটা! দেখি, এরমধ্যে একদিন মার্টিনকে পাঠাবো, নতুন একটা জাল কিনেছি… তোমায় কী বলেছে ব্যাটা?”

স্কুলি জানায়, বিয়ার্নসন কিছুই বলেনি। দুজনের হাসির তোড়ে ঘরের দেয়ালগুলোর ফেটে পরার উপক্রম হয়। এলেন থমকে যায়।কিন্তু কেলেব একবার তার দিকে আঁড়চোখে তাকাতেই সে আবার বাজাতে শুরু করে। জুডিথ এসে মেঝেয় একটা কম্বলের ওপর বসল,এবং কুকুরটা তার কোলঘেঁষে।জুডিথ দেয়ালে হেলান দেয়। লিন্ডের আবার মনে হয়, কী আশ্চর্য সুন্দরী সে। রূপকথার অলীক কোনো জীবের মতন, হয়তো বা কোনো নরাশ্বিনী!

এবার কেলেব একটা লম্বা গল্প ফেঁদে বসে, কবেকার কাঠ-বিক্রির কথা। স্কুলি প্রায় বধির, অতএব সে উচ্চৈঃস্বরে বলছে। এলেন একটা গান শেষ করে আরেকটা আরম্ভ করে। দ্রুতলয়ের একটা গান। তারপর একটা ঘুমপাড়ানি সুর, সব শেষে একটা ওয়াল্টজ। ওর দুইগালে লাল ছোপ পড়েছে। ঠোঁট টিপে রেখেছে কোনোক্রমে। পাশ থেকে দেখলে মনে হবে যেন ক্লান্ত এক বৃদ্ধা।

আমেলিয়া টেবলের কাছে এসে দাঁড়ালেন, লণ্ঠনের আলো একটু বাড়িয়ে দিলেন। তাঁর চোখের নিচের কালি স্পষ্ট হয়ে উঠল। আমেলিয়ার ঠোঁটের চারপাশে বলিরেখা, হালকা সোনালী চুলে পাক ধরছে। আমেলিয়ার বয়স পঞ্চাশ হতে চলল, শরীরে মেদ জমছে। তবু তাঁর চলাফেরায়, কথাবার্তায় যে মর্যাদা প্রত্যক্ষ করা যায়, তা যেন তাঁর দেহেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। কমবয়সে তিনি যে লাবণ্যময়ী ছিলেন, এখনো তার যথেষ্ট আভাস পাওয়া যায়। এই পরিবেশে তাঁকে যেন ঠিক মানায় না। কখনও টুকরো কাগজ তুলে নিচ্ছেন, কখনও আসবাবপত্র গোছাচ্ছেন। তাঁকে দেখতে দেখতে ক্রমে লিন্ডের মনে অনুকম্পা জন্মায়। আমেলিয়ার কি এর চেয়ে ভালো জীবন প্রাপ্য ছিল না?

“আরে, ভুলেই গেছিলাম, সাইডিংয়ে যে ‘ফার’ পাঠিয়েছিলে, তার কেমন দাম পেলে? গ্রিনি নিলো, নাকি?” কেলেব আবার শুরু করেছে।

স্কুলি আহ্লাদিত হয়ে বলে, “হাঁ, গ্রিনি নিয়েছে বটে। বুদ্ধু একটা! হেঁ হেঁ। ”

“সেই যে নেকড়ের চামড়াটা মার্টিন এনেছিল গতবার,দেখিয়েছি তোমায়? বিরাট ছিল জানোয়ারটা! কোথায়, কম্বলটা কোথায়? এই মার্টিন, নিয়ে আয় তো। সেই চামড়া দিয়ে কম্বল বানিয়েছি, গায়ে দেবে? এই, জুড! নিয়ে যায় কম্বলটা।”

মার্টিন ঘরের ওপাশে বোনের কাছে গেল। কম্বলটা নেবে। জুডিথ ধীরে ধীরে উঠলো। তার চোখেমুখে তীব্র অসন্তোষ।

“স্কুলি কম্বলটা বারতিনেক দেখেছে,” চিবিয়ে চিবিয়ে বলল সে। তারপর এক ঝটকায় কম্বলটা তুলে মার্টিনের হাতে দিল। তার এই বিরক্তিতে মার্টিন যেন মজা পেয়েছে। তার বয়স কুড়ি ছাড়িয়েছে। এই বাড়িতে ক্ষোভ কিংবা বিরক্তি দেখিয়ে যে কোনো লাভ হয় না,এতদিনে সে ভালোই জানে।

কেলেব হাসে।

“আহা, স্কুলির কি আর মনে থাকে? এমন একখানা কম্বল…” এই হাসিতে প্রসন্নতা, নিশ্চিত আত্মপ্রসাদ।

বাড়ির কর্তাকে খুশি করতে স্কুলি কম্বলটা নেড়েচেড়ে দেখে। বলে, দিব্যি হয়েছে। তারপর কেলেব জিনিষটা নিজের হাতে নেয়, আবার কথা বলতে শুরু করে।

জুডিথ তার কুকুরটাকে ডেকে নেয়, বেরিয়ে যায়।

আমেলিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, এতক্ষণ পর একটু বসেন। কোলে একরাশ ছেঁড়া মোজা, রিফু করবেন।

খানিক পরে জুডিথ ফিরল।সঙ্গে কুকুরটা নেই।সে সোজা লিন্ডের পাশে গিয়ে বসল। এখনও কম্বলটা তার বাবার হাতেই।

চার্লি একা বসে তাস খেলছে।

“চার্লি, শোন,” কেলেব তাকে ডাকে। “ইয়েলো পোস্ট থেকে তোর জন্য আজ নতুন এক বান্ডিল তাস কিনে এনেছি! মেয়েদের জন্য কী আর আনব, সবই তো আছে।”

জুডিথ নিজের জুতোপরা পা এগিয়ে দেয়। লিন্ড দেখে, তাদের মধ্যে একটার ডগার ক্যাপ খোলা। আমেলিয়া মেয়ের দিকে তাকান, মাথা নেড়ে জুডিথকে কথা বলতে বারণ করেন। তিনি কেলেবের পিছনে বসেছেন, সে এই নির্বাক ইঙ্গিতটুকু দেখতে পায় না।

এলেন হাই তোলে।

“কী হল মা, এই যে, এবার আমরা শুয়ে পড়ব,কেমন?,” কেলেব জানায়। “স্কুলি-আমি দুজনেই খুব ক্লান্ত, কি স্কুলি?”

জুডিথ লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়।

“আমি চললাম,” সে উগ্রভাবে বলে। তাতে বিরক্তি গোপন করার চেষ্টা নেই।

কেলেব স্ত্রীর দিকে তাকায়। পাইপটা উঠিয়ে জুডিথের দিকে নির্দেশ করে।

“মেয়েকে সহবত শেখাতে হবে তো, নাকি?” মোলায়েম করে বলে কেলেব।

আমেলিয়া চকিতে মেয়ের দিকে তাকান।

“জুডি – মনে থাকে যেন -”

জুডিথ আবার বসে পড়ে। লিন্ড দেখতে পেল ওর হাতের শক্ত করা মুঠো। লিন্ডের মনে হলো এ পরিবারের সকলের মতোই সেও হয়তো কেলেব গেয়ারকে ভয় পাবে। হয়তো আগামী কদিনের মধ্যে ঘেন্নাও করবে।

#

বিরাট চিলেকোঠায় পর্দা ঝুলিয়ে তিনটি অপ্রশস্ত কামরা বানানো হয়েছে – প্রথমে ছেলেমেয়েদের শোবার ঘর, কালেভদ্রে অতিথি এলেও তাদের এখানেই ঠাঁই হয়। নিচের ঘরে কেলেব আর আমেলিয়ার খাট; দিনের বেলায় এই ঘরটা দেয়ালে আলমারির মতন ভাঁজ করা থাকে। চিলেকোঠার মেঝে পাইন-কাঠ দিয়ে তৈরি। পাটাতনের ফাঁকে ফাঁকে ছোট গর্ত,সেখানে চোখ রাখলে অন্ধকার ভেদ করে দেখা যাবে নিচের ঘরে রাখা স্টোভের গনগনে লাল আগুন। ওপরে মাকড়সার জালে ঢাকা অমসৃণ কড়িবর্গা ঢালু হয়ে নেমে গেছে। তেমন কোনো ঝড়ের রাতে দেয়ালের দিকে পাশ ফিরে শুলে দমকা হাওয়া এসে মুখ ছুঁয়ে যায়। শীতের ভোরবেলায় প্রায়শই ক্ষুদ্র বরফকণা বালিশের গায়ে জমে থাকে।

জুডিথ কাপড় ছাড়ছে। রাতপোষাক গলিয়ে নিয়ে সে অন্তর্বাস খুলে ফেললো। সে লিন্ডকে দেখছে। বাইরের ছিমছাম পোশাকের ভেতর লিন্ড সিল্কের সূক্ষ্ম, সুন্দর অন্তর্বাস পরে আছে। জুডিথ চোখ সরিয়ে নিলো, মুখে কিছু বললো না।

দুজনেরই পোষাক বদলানো সারা হলে জুডিথ দেখতে পেল বেডসাইড টেবলে লিন্ড নিজের গলার হার খুলে রেখেছে। টেবল থেকে ঘন হলুদরঙের পাথরের মালাটা সে সন্তর্পণে তুলে নেয়। পাশেই সমান স্বচ্ছ একজোড়া পাথরকুচির দুল রয়েছে।

“বুনো মধু! ফোঁটা ফোঁটা বুনো মধু!” সে অস্ফুটে বলে ওঠে, “তোমায় মানাবে খুব।”

লিন্ড যেন একটু কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকায়; চকিতে বলে, “মালাটা তুমি রাখতে পারো, জুডিথ।”

জুডিথ হেসে ফেলে। সে হাসি অকপট, তার বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা। “ইশ্,এইটা পরলে যা লাগবে না আমাকে! তবে এসব পরে কি খামারের কাজ হয়? না না, থাক। এটা তোমার জন্যই তৈরি, মিস আর্চার।”

জুডিথ ঘুমিয়ে পড়লে লিন্ড জানলার কাছে গিয়ে বসে। নতুন জায়গায় প্রথম রাত, তার অস্থির লাগছে। রাতের আকাশে তখনও সূর্যাস্তের রঙ।রঙের আভাস। নিচে বহুদূর পর্যন্ত আঁধারে ঢাকা জমি।

Facebook Comments

Leave a Reply