ভাষা ছন্দ ও প্রবাহমানতা : শৌভিক দত্ত

fail

ভাষা স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ।সে অনেকটা আমার মতো। অথবা আমার মতো নয়। শব্দ সফরের যাত্রী নিয়ে ট্রেন আসে, চলে যায়। কখনও আমার স্টেশনে দাঁড়ায়, কখনও দাঁড়ায় না।তবে ট্রেনের এই আসা যাওয়ার সাথে গাছ ও আমার ভূমিকায় বদল আসে। এক অভিনয়ের বাইরে আমরা কেউ নই। কখনও আমি যাত্রীর অভিনয়ে, কখনও বা গাছের ভূমিকায়। স্থানবদলের অনিবার্যতার আঙ্গিকে দর্শক হিসেবে নিজেকে দেখার এই আশ্চর্য অনুভূতি। যখন শব্দ ভ্রমণ শেষে ট্রেন থেকে নেমে আসছি, ধ্বনির অনুরণন গায়ে মিশিয়ে,আমার কলমে ছন্দের আদর কখনও সখনও।ছন্দের কথা ভাবলে কিশোরবেলার সেই মেয়েটির কথা মনে পড়ে যায়, যার যাতায়াতের পথে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম আমরা অনেকেই।আসলে যে কোনও কবিতা লিখিয়ের কাছেই ছন্দের আকর্ষণ মারাত্মক। আরও পরে দেখতে পেয়েছি, কবি কেন, পাঠকের কাছেও ছন্দের আবেদন প্রায় সর্বজনীন।
পৃথিবীতে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য যা কিছু বর্তমান, তা মূলত এক সামানুপাতিক সুত্রসাপেক্ষ।সব ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুরই এক নিজস্ব প্যাটার্ন বা চলন আছে। সেই চলন কখনও প্রত্যক্ষ ভাবে প্রতীয়মান নাও হতে পারে,তবে বিশ্বাস করি প্রচ্ছন্ন হলেও তা থাকে।সেই চলনকে ছন্দ ভাবতে ক্ষতি নেই বলেই মনে হয় আমার।দেখেছি ছন্দহীন জীবন মানুষ সাধারণভাবে পছন্দ করে না। যদি কখনও জীবনের ছন্দ টোল খায়,তবে মানুষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
কবিতা যা ইন্দ্রিয়ের বাইরে নয় ,বা হতে পারে না,ফলে কবিতায় ছন্দের ব্যবহার সেই প্রাচীন সময় থেকেই আমাদের সাহিত্যে লক্ষ্য করা যায়।এর কারণ হিসেবে মনে হয়, যেহেতু সে যুগে পঠন পাঠন মূলত শ্রুতিনির্ভর এবং লিপিবদ্ধ করার অনুশীলন ছিল না,তাই ছন্দোবদ্ধ পঙক্তি কিংবা ঘটনা
মনে রাখা সহজ হতো মানুষের। এমনকি এই সময়ের প্রেক্ষিতেও একজন পাঠক যেভাবে প্রিয় কবির কবিতার পংক্তি মনে রাখতে সমর্থ, গদ্যের ক্ষেত্রে একজন পাঠক তেমন সাবলীল নন। একথা ঠিক যে, ছন্দের প্রথাগত ব্যাকরণ অস্বীকার করে আমার পূর্বসূরি, সমসাময়িক ও পরবর্তী অনেক কবিই কবিতাকে ছন্দমুক্ত করতে চেয়েছেন। তা সত্বেও তাঁদের কবিতার নিবিড় পাঠ কে অনুধাবন করলে দেখা যায়,লেখায় কোথাও এক অন্তঃসলিলা ছন্দ থেকেই গেছে।কারণ তা যদি না হতো তবে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে খুব অনায়াসেই কবিতার কাঠামো তৈরি করা যেত। এমনকি এই আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্সের যুগে যন্ত্রের সাহায্যে কবিতা তৈরি করা তেমন অসম্ভব হতো না।কিন্তু এরকম কিছু হয়ে ওঠে না।আঙ্গিক, টেক্সচার, ধ্বনি শব্দের অদলবদল, অন্য ভাষা থেকে আহৃত শব্দের ব্যবহার, গাণিতিক সঙ্কেতের প্রয়োগ, এসবকিছুই কবিতা নির্মাণের মালমসলা হলেও কোথাও লেখায় এক অন্তর্নিহিত ছন্দ থাকেই। দীক্ষিত পাঠক যা টের পান নিজের অনুভবে।
এক প্রবহমান নদীর মতো যুগে যুগে কবিতার ভাষা , নির্মাণ প্রকরণ, ছন্দের ব্যাকরণ পরিবর্তিত হয়েছে। প্রাকৃতিক নিয়মে যেভাবে পৃথিবী। নিজেকেও প্রকৃতির এই পরিবর্তনের এক ক্ষুদ্র অংশ হিসেবেই দেখি। নিজের লেখাকেও সেভাবেই ভাবতে চাই।

নাচপুতুল

কিছু শিষ্টাচার হোক অন্তত মুখস্থ থেকে দূরে
কালাশোক থেকে ছিন্ন ছিন্ন ছায়া সরে যাক
ভিক্ষাবেষ্টনী ঘিরে তাসাগান সুরে ও নূপুরে
হতোগামী মুণ্ড নিয়ে কেউ কেউ হয়তো অবাক

হয়ে যাক যে সব রাত্রি হওয়ার চিহ্ন থাকে যার
অভ্যাস গুলিয়ে যায়, অনভ্যাসও কিছু কিছু পথে
মত খোঁড়াখুঁড়ি শেষে কখনও বা অল্প অমতে
নেমেছে সাবেক মেঘ ছটফটে অল্প আয়ু তার

কিছু তো কর্ষণযোগ্য , উচ্চারণে ধরে রাখে জল
শোক অন্তরীপ বেয়ে চুপচাপ হেঁটে যাওয়া ফুল
আগুন ফুরিয়ে আসে কান্নাও পারে না ভেজাতে
মাটির আশ্রয় চায় চুরমার মাটির পুতুল ……।

পতনপাথর

এবং বিভাজ্য থাকি ভাগফলে কিবা আসে যায়
নির্গুণ বল্কলে বুঝি আমি এক উদাসীন দাস
যোগাযোগ রপ্ত নই,ছাই রাখি শীতের কন্দরে
তুইও আমারই ভেদ তবুও আগুন হতে চাস!!

কেন ভাবি কেন এই উপজল বেয়ে অনেক
থেমেছে স্নায়ু, মেদ মজ্জা অস্থি মাংস ঘাম
লবণের দ্বার খুলে এপর্যন্ত ঘটনা এসেছি
উপকূলজাত ভুলে পাথরেও রেখেছি প্রমাণ

যতোটা পাথর আমি, পতনও প্রত্যক্ষ ততোধিক
জেনেছি অক্ষর থেকে জিহবাও সরে যেতে থাকে
অলীক বাণিজ্য শেষে হিমঘরে ফেলেছি শয়ান
কালাধিক মাস যায়, শূন্যের উপাধি দিই তাকে ……।

Facebook Comments

Leave a Reply