ছন্দের কবিতা : সৌমনা দাশগুপ্ত

fail

কবিতা লেখার আগে অব্দি আমি ছবি আঁকতাম। বলতে গেলে জীবনের বেশিটা সময় আমি ছবির জন্য দিয়েছি। সে-সময়ে প্রথম প্রথম বড়ো কোনো কাজ করার আগে, বিশেষত অ্যাবস্ট্রাক্ট ফর্মে কোনো কাজ করার আগে, আমি অবজেক্টগুলোর প্রতিটিকে আলাদাভাবে রিয়্যালিস্টিক ফর্মে আঁকা প্র্যাকটিস করে তবেই মূল কাজে হাত দিতাম। ঠিক সেরকমই আমার ব্যক্তিগত মত, কবিতার মূল কাঠামো বা ছন্দ শিখে তবেই ছন্দভাঙার বা গদ্যকবিতার দিকে যেতে হবে। অন্তত, নিজে আমি তাই-ই করেছি। আমার মনে হয়, এই যে বিশ্বপ্রকৃতি, এর প্রতিটি কাজই এক ছন্দের মধ্যে দিয়ে ঘটে চলেছে। এমনকী প্রাকৃতিক বিপর্যয়কেও আমার কেন জানি না মনে হয় এক ছন্দোবদ্ধ নাশকতা। নদী বয়ে যাচ্ছে, গাছ থেকে পাতা খসে পড়ছে, পাখি ডাকছে, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ শুনতে পাওয়া ঝিঁঝিঁর ডাক, সবই কী আশ্চর্য ছন্দে চলছে। আর এভাবেই উত্তরবঙ্গের প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে উঠতে উঠতে তৈরি হয়েছে আমার তালজ্ঞান, ছন্দের কান। ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখি, বাংলাভাষী মানুষ কথাও বলে অক্ষরবৃত্তে বা পয়ার ছন্দে। তাই ছন্দকে আমার কখনই কবিতার থেকে আলাদা করে বোঝার দরকার পড়েনি। গদ্যকবিতারও একটা চলন বা প্যাটার্ন আছে, সেও আদতে ছন্দোবদ্ধ। ছন্দের বোধ থাকলে গদ্য-কবিতা লেখার সময়ও সেরা বিন্যাসে সেরা শব্দগুলি বসানো যায়। তা বলে শুধু অন্ত্যমিল থাকলেই যে ছন্দের কবিতা বলা হবে তা নয়। আবার শুধু মাত্রা গুনে গুনে লিখলেই যে নিখুঁত ছন্দে লেখা হবে, তারও কোনো স্থিরতা নেই। আসল কথা হল, মাত্রা যেন অক্ষর গুনে না হয়। মাত্রা ঠিক আছে কিনা বলে দেবে কান। কানে না বাজলে, কোথাও বেতাল না শোনালে বুঝতে হবে সব ঠিকঠাক।
ছন্দ হচ্ছে সাবলীললতার অপর নাম। সুর আর স্বরের সুষমা। খাবারে কাঁকর থাকলে খেতে বসে যেমন দাঁতে লাগে, তেমনি ছন্দে ত্রুটি থাকলে তা ধরা পড়ে কানে। তাই কানে শোনাকে আমি বেশি গুরুত্ব দিতে চাই। মূল কথা হল, ছন্দের কান তৈরি হতে হবে।
নীচে আমার লেখা যে কবিতাটি দিলাম, সেটিতে অক্ষরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত দুটো ছন্দই পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলেছে। কবিতাটায় আমি দিতে চেয়েছি এক মাত্রাক্ষরিক আবহ ।

মৌতালি ওই নদীর পাড়ে

আমার অপেক্ষা থাকে শুধু
পারানির আশায় আশায়

নিষ্ক ভিক্ষা চেয়ে এই লেখা
তুমি ঢালো রাত্রি অগাধ

চূর্ণ রথে পড়ে আছে ধুলো

কী অখিল বেদনা বিছানো
রুবাইয়াৎ মিশে আছে জলে

হাওয়া হয়…খুব খুব

অতুল এ হাওয়া-কোলাহলে
একলা দুপুর শুয়ে থাকে

আকাশ-সম্ভবা যত ধ্বনি
পথিমধ্যে ঘরকে দিল ডাক

আমি তবে চাঁদকে খুলে দেখি
ঘরের ভেতর অন্য কোনো ঘর

যতই তুমি কপাট বন্ধ করো
আমি শুধু চাঁদকে ধরে রাখি

পূর্ণিমা-চোর অক্ষরেরা জানে
আমি ও চাঁদ জল সইতে যাই

ঘাটে তখন দারুণ অবরোধ
পদ্মটিও নড়ে বসছে না

ব্রহ্মা জানেন জলশব্দকথা
চায়ের কাপে দারুণ চামচ নাড়া

মৌমাছি তার গুটিয়ে নিচ্ছে ডানা
ফুলের কাছে ঘুমের কাছে

বেপাড়ার সে-রঙিন পালক
কারোর কাছে ঋণ ছিল না কোনো

এ-ভুলভাল কমল-দল খোলা
আঠার ভারে নুয়ে পড়ছে জমিন

একেই বলছ জ্বরের কাতরতা
শব্দ এবং কথার জ্বরে ভুগে

নৌকা আমার সূর্যে গিয়ে ঠেকে
তর্ক থেকে পিছল পায়ে হেঁটে

চোখ ফেরালাম অনেক কাছে-দূরে
খাগের কলম তালপাতার পুঁথি

আমিও লিখি কূটতন্ত্রকথা
শঙ্খে তখন কাঁটা লাগার ছলে

কুণ্ডলিনী আড় ভাঙছেন সবে
বাঁশের বনে ভূতের ভোজবাজি

তুমিও সেদিন জিভ ঢেলেছ নুনে
হঠাৎ এসে বললে: জল দাও

আমার তো এই ছোট্ট গাগরি
জল ঢালব সাধ্য তেমন কই

আমার দুপুর একলা পড়ে থাকে
জোয়ার দিনে বিষ ছিল কি
হয়তো ছিল শামুকপোড়া চুন

তোমার হাতে গ্রহণলাগা শাঁখ
আমি তখন হাত রেখেছি তারে

তীব্র নিষাদ কড়ি-মধ্যম ছুঁয়ে
মীড় বেজেছে মেঘ বেজেছে

এইভাবে কি সাপটি কথা বলে

কলোসিয়াম; প্রতিস্পর্ধী দু-জন
রক্ত এবং নুনের কথা বলে

সারেঙ্গিতে পাথর ভাঙার গান
খুন হব এই শপথ নিয়ে আসি

এ-খঞ্জরে ইচ্ছে ঠাসা ছিল
আমি শুধু যজ্ঞবেদিমূলে
খুলছি ধীরে অলীক স্বপ্নঝুলি

ঘুমের ছলে তারার গল্প শুনে
আকাশ সেদিন বাগান হয়ে ওঠে
জল ঢেলেছি মোমের শামাদানে

নিজেই বলি, হতচ্ছাড়ি যা
এমন করে ভ্রমর নিয়ে হাতে
অন্ধ চোখে জলের দিকে হাঁটে
নিজেই এমন জমিয়ে তুলছি কাদা

এখন তো এই খাঁচামাত্র সার
পাখি আদৌ ডানা নাড়ছে না

আদৌ পাখি ছিল কি এই ঘরে
ঠোঁটের থেকে গল্পদানা নিয়ে

ছিটোচ্ছি এই সফেদ ক্যানভাসে
কাগজ কোথায়, হাওয়ায় লেখা খাতা
শূন্য এই গোলাঘরের ভেতর

গহিন দেশে স্বপ্ন পড়ে থাকে
লেপতোশকের অনেক অনেক নীচে

লুকিয়ে রাখা তামাদি সিম্ফনি
কাঁথার ফোঁড়ে এসব লেখাজোখা

গল্প বলো ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমি
গাছের থেকে লাফিয়ে নামছে হাওয়া

আলখাল্লা দীঘল তার গায়ে

বলো তবে, ফকির, কথা বলো
কেমন করে গড়িয়ে যাচ্ছে বালি
কেমন করে এই মরুঝড় ভাঙে
কেমন করে করছ মনের আবাদ

আউলা-ঝাউলা কান্নাভাষাতলে
এসব খবর বাউদিয়ারা জানে

আমি তো স্রেফ সরল অনুবাদক

ফটক-আঁটা চা-বাগানের ভেতর
হঠাৎ কোনো শেড-ট্রি এসে দাঁড়ায়

সেই কি কোনো তারার লোকগাথা
এ-অঘ্রাণে মাস-পয়লার দিনে
আমিও কেমন ধান কুড়োলাম দ্যাখো
ধান্য থেকে ঝরিয়ে ফেলছি খোসা

ভাত ফুটছে আকাশহাঁড়ির ভাপে

সেদিন শুধু বৃষ্টি-ভাষায় লেখা
সেগুনপাতায় অযথা ফুলঝুরি

তরঙ্গ তার খুলে ধরছে পাখা
মরুক তবে মরুক ইচ্ছেপোকা

আমার যত ঝিনুকফাটা রাত
মুক্তো কোথায়; উলিরাজের বাড়ি

দিচ্ছে উঁকি অনেক বাচ্চা উই

ভল্ল ছুড়ে খুন করেছ ময়ূর
তবুও মেঘ মেঘের মতো আসে

কাসিদ আসে গূঢ় খবর নিয়ে
কোন মহুয়ায় মৃত্যু লেখা ছিল

আকাশ থেকে গড়িয়ে নামছে অ্যাসিড
তাকেই তুমি বৃষ্টি ভেবে বসো
এ-ক্ষুৎকাতর রৌদ্রচাপা দিনে

খেলনাবাড়ির রাতের খাঁজে-ভাঁজে
সে ছিল এক লুকোনো তক্ষক
হৃদয়ঘড়ির কাঁটার শব্দে অ্যালার্ম
বাজছে; জাগে ফসফরাস–ক্ষত

ক্ষত তো নয়; সরলগাছের ঘাম
গন্ধক আর অম্লরসের স্বাদ
রিংমাস্টার চাবুক চালান সপাং

বাগ-এ-এরাম; পারিজাতের দিন
বৃষ্টি-তিরে ব্রহ্মকমল কাঁপে

আয়না ভাঙা। দুপুর। লৌহফেনা
কী অপরূপ হারাকিরির দেশ

জার্সিবদল; কপট হাড়ের পাশা
তুমিও এমন চাল দিয়েছ অমোঘ
কারবালাতে খড়্গ শানায় সিমার

করাতকলে চেরাই চলছে চেরাই
এ কোন ইঁদুর স্নায়ুতন্ত্রে বসে
কাটছে আমার ইড়া ও পিঙ্গলা

মৌতালি ওই নদীর অন্য পাড়ে
এখনও কি জ্বালিয়ে রাখব শিখা

রাতমশালে পুড়ছে আকাশ, তারা
অরন্ধনের মন্ত্র বলো এবার

মৌতালি, ওই নদীর পাড়ে পাড়ে
অহোরাত্র ভেকের কলরব

Facebook Comments

Leave a Reply