ছন্দ একটা শক্তি : শুভ্র চট্টোপাধ্যায়

fail

এ কালের কবিতাচর্চায় অবশ্য কেউ কেউ ছন্দকে ব্রাত্য করে রাখতে পছন্দ করেন। এঁদের বিচারে ছন্দ একটি বন্ধন। কবিতার মুক্ত বিচরণে বন্ধন কাম্য নয়। কেউ আবার আরেক ধাপ এগিয়ে ঘোষণা করেছেন যে, কবিতা থেকে ছন্দকে পুরোপুরি নির্বাসন দেওয়া হয়েছে। এঁদের বিচারে ছন্দোবন্ধ কবিতা মানেই দুর্বল রচনা। যদিও এমন কোন নিয়ম প্রমাণিত হয় নি। কবিতায় ছন্দ থাকলে তা দুর্বলতার লক্ষণ, এটা একদিকে যেমন ব্যক্তিগত অভিমত, অন্যদিকে কিছুটা একপেশে দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। ছন্দের দুর্বলতা আর কবিতার দুর্বলতা নিশ্চই এক জিনিস নয়।
এটা ঠিক যে সাধারণ-হালকা বিষয় (যা বাঙালির বিবেচনায় ‘সিরিয়াস’ নয়) যাকে তুচ্ছ বিষয়ও বলা যেতে পারে, ছন্দের ডানায় ভর করে আকর্ষণীয় রূপে পরিবেশিত হতে পারে। সেই তুচ্ছ বিষয়টা হয় তো ছন্দ-মিলের কারণে গেঁথে যেতে পারে মগজে। যেমনঃ
হাতি ঘোড়া গেল তল।
মশা বলে কত জল।।

এ থেকে একটা জিনিস সহজে বুঝতে পারা যায়। সেটা হলোঃ ছন্দের একটা শক্তি আছে এবং তুচ্ছ বিষয়কে সে মনোগ্রাহী করে তুলতে ওস্তাদ।
এটা এক ধরনের মোহিনী শক্তি। মায়াবি শক্তিও বলা যায়। একটা সময় পর পর বাংলা আধুনিক কবিরা ধরতে পেরেছিলেন যে, ছন্দের এই মোহিনী শক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সব্বোনাশ! সেই চেষ্টা করতে গিয়ে তাঁরা ছন্দকে বিসর্জন দেন নি, ছন্দের প্রচলিত ছকগুলো অস্বীকার করেছিলেন। তাঁদের কানে ধরা পড়েছিল যে, আমরা যাকে অক্ষরবৃত্ত (অন্য নামও আছে) বলি সেটার সাথে বাংলা গদ্যের দূরত্ব খুব সামান্য।
এ বিষয়ে ছান্দসিক ও বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা আলোচকগণ আলোচনা করেছেন। তাঁদের কথাই আমার মত করে তুলে ধরছি। মনে করুন কৃত্তিবাসের লাইনঃ
চিত্রকূট অযোধ্যা হতে নয় বহুদূর।
ভরত ভ্রাতার ভক্তি আমাতে প্রচুর।।
এই ছন্দকে আমরা চোদ্দমাত্রার অক্ষরবৃত্ত বা পয়ার বলি। কৃত্তিবাস যদি এই যুগে ফেসবুকে কথাটা পোস্ট করতেন, তবে হয় তো এ ভাবে লিখতেনঃ “চিত্রকূট অযোধ্যা থেকে বহুদূর নয়। আমাতে ভরত ভ্রাতার প্রচুর ভক্তি।”
শব্দ সজ্জায় সামান্য অদল-বদল করলেই অক্ষরবৃত্ত হয়ে যায় বিশুদ্ধ গদ্য। মধ্যযুগের বাংলা কবিদের কানেও ধরা পড়েছিল এই মহারহস্য। গোটা মধ্যযুগে, সেই কারণেই, অক্ষরবৃত্তে বড় বড় কাহিনী রচনা করতে কোন সমস্যা হয় নি চন্ডীদাস-মুকুন্দরাম-ভারতচন্দ্রদের। চোদ্দমাত্রার অক্ষরবৃত্ত এক আশ্চর্য বস্তু। এটা যতটা পদ্য, ততটাই গদ্য। সুর-তাল-অভিনয়ের দ্বারা উপস্থাপন করা যায় এই গদ্য।
মধ্যযুগে ‘সাহিত্য’ পড়ার বদলে শোনা হত বেশি। এটা এই কালের অডিওবুক শুনলে বুঝতে পারবেন। পড়ার জিনিশকে শ্রাব্য করে তুলতে হলে তার মধ্যে সঙ্গীত ঢুকবেই। সেটা যিনি পড়ছেন তাঁর গলাতেও ঢুকবে, আবহ হিসেবেও ঢুকবে।
গদ্য সাহিত্য আসার পরে পয়ারের দায়িত্ব অনেক কমে গেছে। আধুনিক কবিতা অর্থাৎ ব্যক্তিগত অনুভবের কবিতা বিচিত্র পথে বিকশিত হয়েছে এবং আমাদের মুগ্ধ করেছে। মাত্রাবৃত্ত ছন্দের উপযোগী ভূমিও উর্বর হয়েছে আধুনিক কবিতা চর্চার কারণে। এই অবস্থায় কবিতার সাথে ছন্দের সম্পর্ক আদায়-কাঁচকলায় হওয়া উচিত নয়।
মধ্যযুগের পয়ার সাহিত্যে ‘মিল’ দেওয়ার একটা ব্যাপার ছিল। মিল-কে অলংকারের ভাষায় বলে অন্ত্যানুপ্রাস। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায় যে ছন্দকে যখন কবিতার ক্ষেত্রে ‘বন্ধন’ বলে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তার জন্য দায়ি আসলে ‘মিল’। কিন্তু মিল-কে তুলে দিয়ে ছন্দকে রেখে দেওয়ার চর্চা আধুনিক বাংলা কবিরা প্রচুর পরিমাণে করেছেন। এই চর্চার মাধ্যমে শক্তিশালী কবিতা রচিত হয় নি, এটা বলাও অসম্ভব।
তবে মিল ছাড়া ছন্দকে ব্যবহার অনেক পুরোন রীতি।
ছন্দের সাথে ছড়ার একটা সম্পর্ক আছে। কবিতা নিশ্চই বিশুদ্ধ গদ্যে লেখা সম্ভব, কিন্তু গদ্যছড়া লেখা খুবই মুশকিল। অন্ততঃ এখনো কেউ লিখে উঠতে পারেন নি। ছড়া জিনিশটা বহুকাল পর্যন্ত তুচ্ছ-এলেবেলে বস্তু ছিল। আধুনিক যুগে এটা বিস্ময়কর উৎকর্ষ লাভ করেছে। ইংরিজি ভাষায় ছড়ার ভান্ডার অতিশয় সমৃদ্ধ। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মত ছড়ার ক্ষেত্রটিও নিশ্চই এই ভান্ডারের সংস্পর্শে আসার পর সাবালক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়েছে। মধ্যযুগে শিশু-কিশোর সাহিত্য বলে কিছু ছিল না। এটা আধুনিক যুগের সৃষ্টি। ছোটদের জন্য কবিতা রচনা করতে গিয়েই ছড়ার মানোন্নয়ন ঘটাতে হয়েছিল। সুকুমার রায় এসে বিষয়টিকে একটা আশ্চর্য উচ্চতায় তুলে নিয়ে যান।
আমাদের লোকমুখে প্রচলিত ছড়াগুলির মধ্যে ছন্দের ঢিলেমি লক্ষ্য করা যায়। অন্নদাশঙ্কর রায় ইচ্ছে করেই তাঁর ছড়ায় এই ঢিলে ভাবটি বজায় রাখতেন। আধুনিক ছড়ায় অবশ্য এই শৈথিল্য গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয় না। ছড়ার ছন্দে দলবৃত্ত প্রাধান্য পেলেও মাত্রবৃত্তের ব্যবহারও প্রচুর। পয়ারেও ছড়া লেখা যায় কিন্তু একটা চোদ্দমাত্রার রচনা পয়ার নাকি দলবৃত্ত, সেটা নির্ভর করবে পড়ার ওপর। যেমন উক্ত কৃত্তিবাসীয় লাইন দুটি যদি এভাবে পড়া যায়ঃ
চিত্রকূটঅ/ যোধ্য থেকে/ নয় বহু/ দূর,
ভরতভ্রা/ তার ভক্তি/ আমাতেপ্র/চুর।
তাহলে আমরা এটাকে ছড়ার মতই পড়ব এবং ছন্দ বিচারে একে বলব দলবৃত্ত। বস্তুতঃ পয়ারে পড়লে দুই পর্বে মাত্রা বিভাজন হত ৮+৬ = ১৪। ছড়ার মত পড়লে সেটাই একটু বদলে হবে ৪+৪+৪+২ = ১৪।
তা হলে, যেটা ছিল গদ্য, সেটাই হয়ে গেল চোদ্দ মাত্রার অক্ষরবৃত্ত, আবার সেটাই ছড়া! এই জন্যই বলে যে, ছন্দটা আসলে গদ্যেই লুকিয়ে থাকে। এর কারণ, মানুষ রোবট নয়। তাঁর কবিতায় প্রাণের স্পর্শ থাকে। প্রাণ কখনোই ছন্দোবর্জিত অভিব্যক্তি নয়।
ছন্দকে আমি প্রাণের একটি শক্তি বলেই ধরে নিয়েছি।

প্রেমিকোবাচ

আমার প্রেমিকা ছিল নামিবিয়া
ঠিক ছিল করবই আমি বিয়া।

নতুন রমণী এলো গ্রিস থেকে
চাইছে না তাঁর সাথে মিশতে কে?

আবার কে কথা বলে ফরাসিতে?
রূপ দেখে ঘেমে যাই কড়া শীতে!

কন্যে ও কোথাকার, ইতালির?
হায়! প্রাণে সাধ জাগে মিতালির!

সকলে আমায় ভালোবাসত।
ওরা কারা? কী দারুণ স্বাস্থ্য!

বয়ফ্রেন্ডের দল? থামি গিয়া।
আমার প্রেমিকা থাকে নামিবিয়া।

ভ্রমণ

আমি এবং হা – বা
ঘুরতে গেলাম লা – ভা
যেতে যেতে পড়ল পথে
একটা দারুণ ধা – বা!

ধাবায় ছিল বি – যার
ঘুরব বলো কী আর?
ধাবার মালিক বলল হেসে
এসো হে মাই ডি – যার!

আমি এবং হা – বা
গেলাম না আর লা – ভা
পরস্পরে জিজ্ঞাসিলাম
“একটুখানি খা – বা?”

Facebook Comments

Leave a Reply