সকল ছন্দের মধ্যে… : তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়

fail

দুনিয়ায় এত অকাজ-কুকাজ থাকতে হঠাৎ কবিতাই যে কেন লিখতে শুরু করলাম, এখনও তা সম্যকভাবে বুঝে উঠতে পারিনি। তবে ছন্দের প্রতি আমার পক্ষপাতিত্বের কারণটি অবশ্য এমন ধোঁয়াশায় আবৃত নয়। তা নিতান্তই সহজ: ছন্দে লিখতে পারার কারণে আমি এক বিশেষ আনন্দ ভোগ করার অধিকার পাই। আমার কাছে ছন্দ কখনও কোনও বদ্ধতার দ্যোতক হিসাবে প্রতিভাত হয়নি, বরং ছন্দকে স্বীকার ক’রে বহু অগ্রজ কবি কী নিপুণভাবে একের পর এক কালজয়ী কবিতা লিখে ফেলেছেন, ভাবলেই বিস্মিত হই। বঙ্গীয় কবিতার গীতিময়তার একটি ইতিহাস ও ধারাবাহিকতা আছে। যদিও তা থেকে বিভিন্ন দশকে বহু কবি স্বীয় লেখা সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস করেছেন, অনেকে তা সফলভাবে করেওছেন, কিন্তু তারপরেও গীতিময় ধারাটি তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে শুধু সক্ষমই হয়নি, বরং বিভিন্ন আঙ্গিকের কবিতাপ্রয়াস তাকে প্রত্যক্ষ না হোক, পরোক্ষভাবে পুষ্ট করেছে। ছন্দ স্বীকার করার চেষ্টা ও ছন্দের জগৎটি চিনে নেওয়ার ইচ্ছা কবিতাপ্রয়াসের শুরুর দিনগুলি থেকেই আমার মধ্যে ভরপুর ছিল। প্রথমে ভাবতাম শুধু অন্ত্যমিল দিলেই বুঝি ছন্দোবদ্ধ কবিতা হয়ে যায়, পরে অবশ্য এই ভ্রম সম্পূর্ণ দূর হয়েছে। ছন্দ জানার আগ্রহ বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘কবিতার ক্লাস’ খুব বড় ভূমিকা পালন করেছিল। স্বাদু গদ্যে লেখা বইটি পড়তে পড়তে একসময় টের পাই ছন্দকে অস্বীকার করতে গেলেও আগে তা সম্বন্ধে ধারণা পোক্ত করার দরকার আছে। তাই বোধহয় পরবর্তীকালে প্রবোধচন্দ্র সেন প্রণীত ‘ছন্দ জিজ্ঞাসা’, অমূল্যধন মুখোপাধ্যায় প্রণীত ‘বাংলা ছন্দের মূলসূত্র’, নীলরতন সেন প্রণীত ‘আধুনিক বাংলা ছন্দ’ বারবার পড়ার চেষ্টা করেছি। চর্যাপদের সময়কাল থেকে এই আজ অবধি ছন্দ গড়েপিটে নেওয়ার, ছন্দের ঘেরাটোপ (তর্কের খাতিরে নাহয় ধরেই নিলাম, তেমন কিছু সত্যিই আছে। যদিও নিজে তা খুব-একটা বিশ্বাস করি না।) মেনেও ছন্দকাঠামোর আকার-আকৃতি কবিতার প্রয়োজনে সুনিপুণভাবে ‘modify’ করার অজস্র নমুনা ছড়িয়ে রয়েছে। ইংরেজি ছন্দকে বাংলা ভাষায় মিশিয়ে দেওয়ার তো ভুরিভুরি উদাহরণ পাওয়া যায়। সংস্কৃত ছন্দ নিয়ে সত্যেন্দ্রনাথের পরীক্ষা-নিরীক্ষা আজ সর্বজনবিদিত। ছন্দচর্চার আশীর্বাদ এই— শব্দের প্রয়োগ ও শব্দের অন্দরে লুকিয়ে থাকা বিপুল সম্ভাবনা এক অনুসন্ধিৎসু কবির মাধ্যমে ভাষাকে সমৃদ্ধ করার প্রয়োজনীয় কাজটি সুন্দরভাবে সংঘটিত করায়।
ছন্দচর্চার অভিশাপ এই— গয়নার আতিশয্যে অনেকসময় অন্দরের রূপটি চাপা পড়ে যায়।
আর গদ্যকবিতা? তার ভেতরেও তো অনেক সময় হঠাৎ আবিষ্কার করি ছন্দের মাধুরী। বিশেষত অক্ষরবৃত্তের স্থিতিস্থাপকতা এত মারাত্মক, একটি নিপাট গদ্যের ভিতরেও তার গোপন উপস্থিতি মাঝেমাঝেই টের পাওয়া যায়।
শেষে শুধু এটুকুই বলার, কে কীভাবে লিখবেন, কী লিখবেন তা তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। ছন্দ মানতেই হবে, এমন বাধ্যবাধকতা আরোপ করার যেমন কোনও অর্থ হয় না, ঠিক তেমনই ছন্দ জানার সামান্যতম প্রয়াস না করেই তাকে দূরে ঠেলে দেওয়ার মধ্যে বিশেষ কোনও বীরত্ব নেই। শেষমেশ কবিতা হয়ে উঠল কি না সেটাই বিবেচ্য। অবশ্য ‘কবিতা হয়ে উঠল কি না’ সেই প্রতর্কও বড় বেশি আপেক্ষিক।

আয়ু

হল মৃত্যু আয়ুমগ্ন, ধাতু মুণ্ড জ্বেলে দিল ভয়ে।
ধাতুকুম্ভে ডুবে যাচ্ছি, এ কী সর্বনাশ! ঠেলে তোলো
জরাপ্রান্ত, যোনিমণ্ড… উত্থানে বছর চোদ্দো-ষোলো
পেরিয়ে গিয়েছে, তবু প্রয়াস-জাগানো বরাভয়ে
সারা গঞ্জে মেঢ্রপূজা; বিকট আনন্দে বাহু, পদ
উল্লাসে কাঁপাচ্ছি, ঘণ্টা সজোরে দিনের রন্ধ্রে বাজে।
দিন, রন্ধ্র ফুলে যাচ্ছে—এ-ই মাতৃপেট? কৃষিকাজে
গর্ভের বিকল্প নেই। শস্য ভেঙে সহস্র বিপদ
তুলে আনে যে-সন্তান, তার শিশ্ন-যোনি মাটিময়।
আয়ুমগ্ন, বায়ুমগ্ন অর্ধনারীশ্বর হয়ে তার
যৌবন উচ্ছন্নে গেছে, গেছে অস্ত দুধেল সংসার।
কাঁচা পিণ্ড মাথা তার, স্বমৈথুনে বিষয়-আশয়
চূর্ণ করে দিতে দিতে কেঁদে উঠল? নড়ে উঠল জল?
জলের ভিতরে স্বপ্ন ডুবে যাচ্ছে… সংযোগ হারাল।
সন্ধানে নেমেছে কারা? কৃষ্ণ স্রোতে কাঁপা কাঁপা আলো
ভেঙে অভ্র হয়ে গেছে। অন্য কোনও সহায়-সম্বল
নেই। স্বপ্নহারা দেশ; দ্বেষের প্রভুত্ব মেনে নিয়ে
নক্ষত্রবাহিত জরা পোষ্য করি দেহের অন্দরে।
শুভাশুভ অবলুপ্ত। মেঢ্রমূর্তি প্রেমে নষ্ট ক’রে
সঙ্গীত জাগাল গঞ্জ। তামসিক প্রেতযোনি বেয়ে
ধাতুকুম্ভ নামে ফের। মনে পড়ে স্বমাংস পোড়ানো।
মনে পড়ে আয়ুমগ্ন শিশ্নে ছিল মৃত্যুগামী গতি।
উত্থানে শতাব্দী শেষ। পতনে তলিয়ে যাচ্ছে রতি…
এ-ই স্বপ্ন, এ-ই শোক, এ-ই স্থিতি হারিয়ে পালানো।
ছিল শিশ্ন আয়ুমগ্ন, আজ জড়… মানো বা না-মানো।

ভ্রম

ক’গাছা চোখে ছিল চোখের ভ্রম;
দৃশ্য ভেঙে গেল শোকে।
বিবিধ মুখ ছিল টালমাটাল,
স্থিতি কি লেখা হবে শ্লোকে?
‘না’ শুনে ফিরে গেছে অযুত হাত,
সে-হাতে ছিল বন্ধুতা।
না কি আঙুলে ছিল বৈরীবিষ,
স্পর্শে ভয়, আকুলতা!
কে তুমি গাছ হতে চাইছ এই
শিকড় খসে যাওয়া রাতে?
কে তুমি মেনে নাও নিজের পাপ
আয়না ঘেরা সাক্ষাতে?

ক’গাছা ভয়ে ছিল দৃষ্টিপাত,
দৃষ্টি হল অমিতায়ু।
মাথায় ফেঁপে ওঠে নিজের শব,
চমকে জেগে ওঠে স্নায়ু।
স্নায়ুকে বোধি দিতে কৃচ্ছ্রতপ
আদপে স্ব-দহন, জরা…
যে-যার ঈশ্বরে ক্ষয় মাখায়,
এটুকু আদি মস্করা।
খুব কি লঘু এই অস্তিবোধ?
স্বেচ্ছাচার জেগে থাকা?
ত্রাণের সন্ধানে পাই যে পথ,
সে-পথে অপলাপ রাখা।

Facebook Comments

Leave a Reply