ছন্দঃ শিশুমন থেকে কবিমন – উমাপদ কর

fail

“দেখ্ বাবাজি দেখ্‌বি নাকি দেখ্‌রে খেলা দেখ্ চালাকি,
ভোজের বাজি ভেল্কি ফাঁকি পড়্ পড়্ পড়্‌বি পাখি— ধপ্!

লাফ দি’রে তাই তালটি ঠুকে তাক ক’রে যাই তীর ধনুকে,
ছাড়্‌ব সটান ঊর্ধ্বমুখে হুশ্ ক’রে তোর লাগবে বুকে— খপ্!” (‘ফসকে গেল’/ সুকুমার রায়)

ছেলেবেলায় এই কবিতা আবৃত্তি করতে গিয়ে বড়ো মজা পেতাম। এই মজার কারণ যতটা না ঘটনাক্রম, তারও চেয়ে বেশি এর দুলকি চালের চলন। মুখ থেকে বেরিয়ে সোজা কানে গিয়ে ধাক্কা দিত, আর এর ধ্বনি-বিচিত্রতা অদ্ভুতভাবে নাড়া দিত। এর পেছনে যে ছন্দের একটা বিশাল ভূমিকা আছে, তা জেনেছি আরও অনেক পরে। এই কানে ধাক্কা খাওয়ার ব্যাপারটা এর প্রাথমিক সূত্র।

এরও আগে, বাড়িতে জোরে পড়ার রেওয়াজ থাকায় দাদাদের কিছু কবিতা পড়া শুনতাম আর নাকি দুলতাম, তালে তালে। যেমন, “ছিপখান তিন-দাঁড়—/ তিনজন মাল্লা/ চৌপর দিনভর/ দ্যায় দূর-পাল্লা!” বা, “চুপ চুপ ওই ডুব/ দ্যায় পানকৌটি/ দ্যায় ডুব টুপ টুপ/ ঘোমটার বৌ-টি!” ইত্যাদি শুনে হাত-পা নেড়ে দুলতাম। তখন একদমই শিশুবেলা। এখন বুঝি সেই দোলার কারণ। শিশুমনের ওপর ছন্দের এক প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। আর বাংলা কবিতায় এই সুকুমার রায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, রবীন্দ্রনাথ এঁরাই আমার কবিতা শোনার কান তৈরি করে দিয়েছেন। ছন্দের ক্ষেত্রে কানে শোনার ক্ষমতা আজও আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নয়তো গোটাটাই রসকষহীন এক ব্যাকরণ মাত্র।

শব্দের মূলত দুটি গুণ। এক ছবি সৃষ্টি, দুই ধ্বনি সৃষ্টি। যদিও আদিতে ধ্বনিই ছিল; যা থেকে শব্দের উৎপত্তি। শব্দ দিয়ে সৃষ্ট কবিতারও বৈশিষ্ট্য মূলত দুটি দৃশ্যতা আর শ্রাব্যতা। তো এই শ্রাব্যতার ক্ষেত্রে ছন্দের ভূমিকা। শ্রাব্যতায় কবিতা কীরকমভাবে মননে একটা মাত্রা সৃষ্টি করছে, যা ভাবকে বহন করে চলে, তা বিচার্য। কবিতায় ব্যবহৃত শব্দ সমূহ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতীকী বা চিহ্নপ্রধান। একে অর্থবোধকতা হিসেবে বোঝাতে চাইলেও, বস্তুত শব্দ কোনোকিছুকে রেফার করে মাত্র। এই সমস্ত শব্দই কমবেশি ধ্বনিগুণ সম্পন্ন। আবার কিছু শব্দ কবিতায় ব্যবহৃত হতে পারে, যা সেভাবে চিহ্নায়নের কাজটি করতে পারে না, কিন্তু তার ধ্বনিময়তার দিকটি উজ্জ্বল। বাংলা কবিতায় এই সন্নিবেশিত ধ্বনিময়তাকে মাত্রা দিয়ে ছন্দোবদ্ধ করাই ছন্দের উদ্দেশ্য। কবিতার স্ট্রাকচার নির্মাণেও এর ভূমিকা অস্বীকারের নয়।

আমরা সবাই জানি মাত্রাভিত্তিক এই ছন্দ কবিতায় প্রযুক্ত হয় মূলত তিনটি পদ্ধতি মেনে। না, আমি এখানে সেই নামকরণ (যা আবার বিভিন্ন নামে চিহ্নিত) ও গ্রামার নিয়ে বসব না, যা প্রায় সবাই জানেন। আমি একটা বিতর্কের বিষয় উত্থাপন করতে চাই। একদল যখন মনে করেন ছন্দ কবিতায় শৃঙ্খল পরায়, অবাধ হতে দেয় না। আবার একদল মনে করেন, ছন্দ ছাড়া কবিতাই হয় না, ছন্দছুট কবিতা নান্দনিকতায় খাটো, সৌষ্ঠবহীন। এখন এই তর্কের শেষ হবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ যার যা বিশ্বাস। তবে অনেকসময়ই হাঁসফাঁস থেকে বেরোবার জন্য যুগেযুগে কবিরা যে মেনেও মানেননি কিছু ছন্দ-ব্যাকরণ, তার প্রচুর উদাহরণ আছে। তাতে ছন্দগুণ সমৃদ্ধই হয়েছে। অনুশাসন থাকলেই সেই অনুশাসনের মডিফিকেশন থাকবে, এটা কিছু শুদ্ধবাদীরা মানতে চান না; এটা গোঁড়ামি বলে অন্তত আমার কাছে মনে হয়। আবার ছন্দে যারা লেখেন না কবিতা, তারা যে ছন্দটা জানেন না, তাদের যে ছন্দের কান নেই, এ-কথা ঠিক নয়; ছন্দ জেনেই ছন্দের আওতা থেকে বেরোন অধিকাংশরা। তাতে কবিতার বৈশিষ্ট্য ও নান্দনিকতা হারিয়ে যায়— এ কথায় আমার অন্তত বিশ্বাস নেই। সেখানেও কান-নির্ভর একটা ছন্দ থাকে, যা হয়তো ব্যাকরণসিদ্ধ নয়।

আমার নিজের ক্ষেত্রে বলতে পারি, শুরু ছন্দের কবিতা লিখেই। কিন্তু বেশিদিন তা কন্টিনিউ করিনি। আবার গত বছর ছন্দে একটা গোটা সিরিজ লিখেছি। নাম দিয়েছিঃ ‘চতুর দশপদী’। এখানে সেই সিরিজ থেকে তিনটি রাখলাম। ছন্দে লেখার চেষ্টা করলেও এই সিরিজ কবিতায় কোনো অন্ত্যমিল ব্যবহার করিনি। অন্ত্যমিল ছন্দের আরেকটি বৈশিষ্ট্য নিঃসন্দেহে। কিন্তু অন্ত্যমিলহীন ছন্দেরও আলাদা এক বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলেই মনে করি। বাকিটা পাঠকের দরবারে—

চতুর দশপদী

পায়ের সরষেগুলো গড়াতে ভুলেছে
বড়জোর ব্যালকনি, তাই চরাচর—
গ্রিলে মাথা ঠুকে তবে চিলতে আকাশ।

কালপুরুষের রেত কোভিড উনিশ
ফোঁটা ফোঁটা পড়ে বিশ্বজুড়ে ড্রপলেট,
মেঘ আসে, বলে, ওগো মাথাটা সরাও।

ভ্যাপসা মাথাটা বালিহাঁস, ডোবে ভাসে,
পিটপিটে চোখ, শুধু ছোঁয়াচ বাঁচায়।
ভাত ফোটে, মাড় গলে, খেতে হয় রোজ
ঘুম আসে স্বপ্নভর, সরষের হাঁস।

________________

একরত্তি উৎকণ্ঠা লালুম-লুলুম
পরিযায়ী শব্দটার পতগ উড়িয়ে—
হাঁটাতে হাঁটাতে রাস্তা শবের পিরেন।
কোথাও তো যাবে, মাইটানা শিশুচারা!

বেদম কাশছে আকাশের ধ্রুবতারা।
ধ্বনি-চিরকুট ফিরি করছে বাতাস,
পেটের দুনিয়া নাচে সরকারি ডোলে।
নিলাজ কোকিল ডাকে গণতন্ত্র-কুহু।

ছটফটে ব্যালকনি ঘুমোবার আগে
রোজ-নামচায় এটুকুই লিখে গেছে।

________

একান্নটা সিঁড়ি টপকালে সমতল।
আমারটার বাঁদিকে সুইচ্‌, পিয়ানো,
গলাব্যথা জ্বর নিয়ে সামান্য কাশছে…

মুখোশ দাঁড়ায় এসে দরজায়, আহা,
ধুলো জমে ফিংগার-প্রিন্ট সহায়ক
লক্‌-আনলক্‌ রুবি-কিউব খেলছে…

কে এল, আসল মেকি না সো-কল্ড হিরো!
কী খবর নিয়ে এল বেহালাবাদক!
একান্নটা ধাপ নেমে গেলে সমতল
বাঁয়ে রাস্তা, আর ডানে কুড়িটা কফিন।

Facebook Comments

Leave a Reply