বর্ণাশ্রম, অপর, সমাজ এবং দুটি রামায়ণ কেন্দ্রিক সংস্কৃত নাটক : রাম চরিত্রের বিবর্তন তথা রামায়ণের বহুপাঠ – শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

অষ্টম পর্ব

তৃতীয় অঙ্ক

এবারে শুরু হয় তৃতীয় অঙ্ক। এই অঙ্কটি নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আগের অঙ্কের মতনই এই অঙ্কও ইদানীং প্রচলিত রামায়ণের চাইতে অনেকটাই পৃথক। সেই পার্থক্যটি আগে বলে নিই এখানে। পণ্ডিতপ্রবর শ্রী পঞ্চানন তর্করত্ন কৃত যে অনুবাদ বাল্মীকির রামায়ণ বলে প্রচারিত হয় সেই অনুবাদে তাঁর সংগৃহিত রাম-পরশুরাম দ্বন্দ্বের স্থান জনকের গৃহে নয়। সেখানে রাজা দশরথ, চার পুত্রের বিবাহ সম্পন্ন হতে যাত্রা করেছেন অযোধ্যার পথে। সে পথে পক্ষীগণ চিৎকার করে দশরথদের মাথার উপরে উড়ছে। মৃগগণ নীরবে দশরথকে প্রদক্ষিণ করছেন। বশিষ্ঠকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানাচ্ছেন, পক্ষীরা জানাচ্ছে ভয়ের কারণ আছে ইত্যাদি এবং মৃগরা অভয় দিচ্ছে।
এমন সময় পথিমধ্যে ভয়ঙ্কর পরশুরাম আবির্ভূত হলেন। রামের হরধনু ভঙ্গের কথা শুনে এসেছেন ক্রুদ্ধ হয়ে। মাল্যবান, শূর্পণখা তাঁকে উত্তেজিত করেছে এ সব কাহিনীও সেখানে নেই। পরশুরাম সেখানে নিজ পরশু নিয়েই শুধু আবির্ভূত হয়েছেন এমন নয়, সঙ্গে একটি বিকট দর্শন বিশালাকায় ধনু-ও আছে। সে ধনুর গল্পটি ভবভূতির নাটকে একেবারেই অনুপস্থিত।
সে গল্পটিও লিখি। সেখানে পরশুরাম এসে বলছেন তাঁর হাতে যে ধনুটি সেটি হরধনুর সমতুল্য। এই দুটি ধনুই নির্মাণ করেছিলেন বিশ্বকর্মা। তার মধ্যে একটি ধনু ত্রিপুরবিনাশার্থে উদ্যত শিবকে দিয়েছিলেন সুরগণ। অন্যটি বিষ্ণু লাভ করেন। তার মহিমা বড় কম নয়। একদা শিব এবং বিষ্ণুর মধ্যে কে বড় তার মীমাংসা জানতে দেবগণ গিয়েছিলেন ব্রহ্মার কাছে।
ব্রহ্মা দেবতাদের উদ্দেশ্য বুঝে শিব ও বিষ্ণুর মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগিয়ে দিলেন। প্রবল যুদ্ধ হল। শেষত বিষ্ণুর হুঙ্কারে শিব স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর হাতে হরধনুও শিথিল হয়ে গেল। তখন দেবতারা, চারণদের নিয়ে শিব ও বিষ্ণু দুই দেবতাকেই স্তব করে প্রসন্ন করলেন। বিষ্ণুর বল যে শিবের সমধিক তা প্রতিষ্ঠিত হল। তা প্রতিষ্ঠার পরে মহাদেব প্রসন্ন হয়ে এ ধনু দান করলেন ইত্যাদি।
পরাজিত হয়ে প্রসন্ন কেন এ প্রশ্ন আমরা করছিই না! বরং আশ্চর্য বোধকরি, তর্করত্ন মহাশয়ের অনুবাদের থেকেই হরধনু সংক্রান্ত গল্পটি একেবারে ভিন্ন ভাবে পেয়েছি, এই ভেবে। এই লেখার আগের অংশেই জনকের হাতে হরধনু আসার কাহিনীটি লিপিবদ্ধ করেছি তর্করত্ন মহাশয়ের সংস্করণ থেকেই। তাহলে কি এই দুই কাহিনীর বৈসাদৃশ্য তাঁর নিজের চোখে পড়েনি? অথবা বৈষ্ণব মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠার ব্যাকুল আগ্রহের জন্য এই ভেদকে অগ্রাহ্য করেই রেখে দিয়েছেন?
মাহাত্ম্য এতে প্রতিষ্ঠা হয় কী না জানি না, তবে সাধারণ পাঠক, যিনি পাঠে যুক্তি-বুদ্ধি ব্যবহার করেন, নিতান্তই ভক্তিতে চোখ ঝাপসা করে পাঠ করেন না, তাঁদের বিস্তর অসুবিধে হয়। যা হোক, প্রসঙ্গক্রমে ফিরি। ভবভূতি তাঁর নাটকে হরধনু কেমন করে এল জনকের ঘরে এ প্রসঙ্গেই আসেননি। পরশুরামের ক্ষেত্রেও বৈষ্ণবধনু আনয়নের প্রসঙ্গও উত্থাপন করেননি। ভবভূতিও কিন্তু নাটকের শুরুতেই বিষ্ণুর অবতার স্বরূপ রামের মহিমা প্রকাশের জন্য যে সমগ্র আয়োজন এবং তিনি যে দৈত্য অরি সে কথা জানিয়েই দিচ্ছেন।
তাহলে এমন একটি বিষ্ণু মহিমা প্রকাশের কাহিনী নেই কেন? নাটকের স্থান সংক্ষিপ্ত বলে? নাকি সে সময়, অন্তত তাঁর অঞ্চলে প্রচলিত থাকা রামায়ণে এই কাহিনী সংযুক্তই হয়নি? সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আমাদের পক্ষে দুষ্কর। আমরা আপাতত ভবভূতির কাহিনী এবং তর্করত্ন মহাশয় কৃত বাল্মীকি রামায়ণ বলে কথিত পাঠ দুটির তুলনামূলক আলোচনাতেই থাকি।
তর্করত্নের অনুবাদে প্রচলিত পাঠে, পরশুরাম বৈষ্ণব ধনু তাঁর বংশ সূত্রে পেয়েছেন বলে জানালেন। তারপরে রামকে বললেন সে ধনুতে বাণ সংযোজন করতে। যে ধনুতে বিষ্ণু বাণ সংযোজন করেন তাতে যদি রামও পারেন বাণ ছুঁড়তে তাহলে রূপক প্রয়োগের মাধ্যমে রামই যে বিষ্ণু তাও প্রমাণিত হয়ে যাবার সুযোগ দিলেন যেন। বললেন, যদি রাম এ কাজ পারেন তাহলে তিনি তাঁর সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রবৃত্ত হবেন। রাম পারলেন এবং পরশুরাম পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে, রামকে মহিমান্বিত করে ফিরে গেলেন মহেন্দ্রাচলে।
ভবভূতি সে পথও মাড়াননি। তিনি পরশুরামকে সোজা মিথিলায় এনে ফেলে দিয়েছেন বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্র-অঙ্গিরা বংশজ শতানন্দ এবং জনক-দশরথের জোটের সামনে। এই অঙ্কে আমরা দেখি ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণে, ব্রাহ্মণে-ক্ষত্রিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। শুরুতে বশিষ্ঠ দেবরাজ ইন্দ্রের বন্ধু এবং যজ্ঞকারী ইত্যাদি বলে দশরথের গুণগান করে পরশুরামকে কলহ বন্ধ করতে বলছেন। এও বলছেন দোয়ানে বকনা, অর্থাৎ দু-বছরের গরু বধ করা হচ্ছে এবং ঘি-ভাত রান্না হচ্ছে। কলহ না করে আতিথ্য গ্রহণ করার কথা বলছেন।
আজকের মতই একদা দোয়াব ভূখণ্ডের রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল পশুবলি তথা গোবধকে কেন্দ্র করে। সেই সময় তথাকথিত অবৈদিক-অপৌরাণিক ধর্মীয় মতপ্রস্থান, দার্শনিক মতপ্রস্থানগুলি ছিল পশুবলির বিরুদ্ধে। কৃষিক্ষেত্রে পশুর সংকট থেকে নানা কারণ তাঁদের এই অবস্থান নিতে বাধ্য করেছিল। গরু মাতা জাতীয় উদ্ভট কথা বলে নয়, জনজীবনের অর্থনৈতিক অসুবিধের কথা ভেবেই তাঁরা এ প্রস্থানে গিয়েছেন।
ভবভূতির বৌদ্ধাদি বিদ্বেষের কথা প্রভূত আলোচিত। তিনিই যখন তাঁর নাটকে দু বছরের গরু বধের প্রসঙ্গ রাখেন, বৈদিক-পৌরাণিক পক্ষ থেকে, যাজ্ঞিকদের পক্ষ থেকে সে নিরীহ বক্তব্যই থাকে না, ধর্মীয়-দার্শনিক যুদ্ধের একটি সুনিশ্চিত অবস্থান হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে বশিষ্ঠের মত চরিত্রকে দিয়ে, রামকে কেন্দ্র করে রচিত নাটকে এ কথা বলানোর অর্থ মহাকাব্যিক পরিসরে এ বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া, যার মাধ্যমে জনমনে পরিস্কার হয়ে যায় অবস্থান।
বেদাদি সকল বর্ণের জন্য ছিল না। কিন্তু মহাকাব্য ও নাট্যের সৃষ্টিই হয়েছে বর্ণ-নির্বিশেষে ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থার অবস্থানকে জানিয়ে ও শিখিয়ে পড়িয়ে নেবার জন্য। সেখানে ভবভূতির অবস্থান আজকের হিন্দুত্ববাদীদের হজম করতে বেশ কষ্টই হবে। বিশেষ করে গোমাতার নামে ভিন্ন ধর্মী পিটিয়ে মেরে তাদের পশুবধ বা মৃত পশু চামড়ার ব্যবসাকে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যর বেলুন চুপসে গেলে খুবই বিপদ। অতএব এই নাটকের এই অংশের কথা কদাচিৎও আজকের রাজনৈতিক তর্কে উদ্ধৃত হয় না তাদের পক্ষ থেকে।
ফিরে আসি নাট্যকাহিনীতে। পরশুরাম উত্তরে জানাচ্ছেন তিনি রামের অপমানের পরেও এতক্ষণ তাঁকে বধ করা থেকে বিরত আছেন বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্রাদি গুরুজনদের কথা ভেবেই। জানাচ্ছেন রাম অতি বলবান না হলে তিনি ক্ষমাও করতে পারতেন। বশিষ্ঠ তাঁকে বেদবিদ্‌ ব্রাহ্মণের উপযুক্ত কর্তব্য স্বরূপ কাজ করতে বলছেন। মৈত্রী, করুণা, মুদিতা (আনন্দ) ও উপেক্ষার মাধ্যমে শোকহীন জ্যোতিষ্মতী-যোগবৃত্তিতে সিদ্ধ হতে বলছেন। সে পথে চলে যেন পরশুরাম বেদ্‌বিদ ব্রাহ্মণের মতন অন্তর্জ্যোতি দর্শন করেন। অস্ত্রাদি, কলহ এ সবে কেন সময় নষ্ট করছেন? নিজেকেও অন্যপথে নিয়ে যাচ্ছেন পরশুরাম? বশিষ্ঠ জানাচ্ছেন উপস্থিত সকলেই অহিংসক। তাঁরাও শান্তি প্রার্থনা করেন পরশুরামের থেকে।
পরশুরাম, হর-পার্বতীর সামনে রামবধ না করে যাবেন না। বিশ্বামিত্র চেষ্টা করলেন তাঁকে বোঝাতে। বললেন – বশিষ্ঠ, ভৃগু এবং অঙ্গিরা তিনজনই হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মা জাত। অতএব ভৃগুপুত্র হয়ে তিনি বশিষ্ঠের শিষ্যস্থানীয়। অঙ্গিরা পৌত্র শতানন্দের সঙ্গেও তাঁর অচ্ছেদ্য সম্পর্ক। এ কথাও বোঝালেন বিশ্বামিত্র।
এখানে ভবভূতি দুটি সমস্যা সৃষ্টি করেছেন। একটি হল ভৃগুর ব্রহ্মার থেকে উৎপন্ন হওয়া। এ নিয়ে পৌরাণিকদের মধ্যেও বিতর্ক আছে। পরবর্তীতে বোরি’র মহাভারতের ক্রিটিকাল এডিশনের প্রথিতযশা সম্পাদক সুথংকর-ও এই ষড় ঋষি সপ্তঋষি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। দ্বিতীয় সমস্যা হল, ব্রহ্মার সন্তানের বংশ এই যুক্তিতে যদি পরশুরামকে কলহ মেটানোর কথা বলা যায় তাহলে পৌলস্ত্য বংশীয় রাবণের সময় এই পরামর্শ-ই তো এঁরা দিতে পারতেন? রাম বনবাসে গিয়েছে, তার অর্থ তো এই নয় যে তার সঙ্গে এঁদের বা রাবণের সঙ্গে এঁদের সম্পর্ক থাকতে পারে না? সেখানে কলহ মেটানোর পরামর্শ এলো না কেন? বিশ্বামিত্রের পরিকল্পনায় শুরু থেকেই ছিল, দণ্ডকারণ্যে রামকে দিয়ে রাক্ষস দমন, বা সমগ্র রাক্ষসকূলের সর্বত্র দমন। সে জন্যই কি সেখানে ব্রহ্মার পুত্র বলে সম্পর্কের ভাবনাই এল না? অজানিতেই ভবভূতি এ প্রশ্ন রেখে গিয়েছেন।
যা হোক, পরশুরামকে শান্ত করতে বিশ্বামিত্র আসরে। কিন্তু পরশুরাম বিশ্বামিত্রকেই ঘুরিয়ে বীরাচারের পুরাণ গুরু বলে অস্ত্রধারণ নিয়ে নিদান দিতে বললেন। বশিষ্ঠরা ব্রহ্মে লীন, বিশ্বামিত্র তো ক্ষত্রিয়ই ছিলেন। তিনি তো জানবেন অস্ত্রের মহিমা। এখানে আমরা বীরাচারের প্রসঙ্গটিকে খানিক বিস্তারে বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে পরশুরাম কেন দ্বন্দ্ব থেকে নিবৃত্ত হতে পারছেন না, সে কথাটির অর্থও আরেকটু স্পষ্ট হবে। ভবভূতির নাটকের মধ্যে পরশুরাম আর বাকীরা ভিন্ন ভিন্ন তান্ত্রিক ধারার যে প্রতিনিধিত্ব করছেন তার কথা না বুঝলে সেই সময়কালের বিরোধগুলোকে চেনা যাবে না।
‘বীরাচারী’ শব্দটি প্রয়োগের মাধ্যমে যখন বিশ্বামিত্রকে চিহ্নিত করা হচ্ছে তখন প্রাথমিকভাবে মনে হবে বিশ্বামিত্র রাজা এবং ক্ষত্রিয় ছিলেন বলে বুঝি বীরত্বের কথা বলা হচ্ছে। তন্ত্রের সঙ্গে অপরিচয় বীর-কে বীরত্বের দিকে নিয়ে যাবে বলেই মনে করাবে। এই-ই স্বাভাবিক। সেই জন্য একটু বিশদে এই অংশের আলোচনা করছি।
আচার কাকে বলে? শাস্ত্রে যে কার্যগুলি বিধেয় বলে নির্দিষ্ট এবং যার অনুষ্ঠান অবশ্যই করতে হবে, তাকে আচার বলে। আবার শাস্ত্রবিধি-বিগর্হিত কার্যকেও আচার বলে, কিন্তু তা কদাচার। অতএব আচার বলতে শাস্ত্রবিধিবিহিত অনুষ্ঠেয় কার্যসমষ্টিকেই বুঝিয়ে থাকে। তন্ত্রে এই আচারের বিভাজন কেমন সে সম্পর্কে আমরা জেনে নিই এখানে।
নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বক্তব্য – ‘তন্ত্রে সাতটি আচারকে স্বীকার করা হয়, কুলার্ণব মতে সেগুলি হল বেদ, বৈষ্ণব, শৈব, দক্ষিণ, বাম, সিদ্ধান্ত ও কৌল। প্রথম তিনটি পশুভাবের মানুষদের জন্য, চতুর্থ ও পঞ্চমটি বীরভাবের মানুষদের জন্য, ষষ্ঠ ও সপ্তমটি দিব্যভাবের মানুষদের জন্য। প্রথম আচারটি হল দেহ ও মনের শুচিতার জন্য, দ্বিতীয়টি ভক্তির জন্য, তৃতীয়টি জ্ঞানের জন্য, চতুর্থটি প্রথম তিনটির সমন্বয়, পঞ্চমটি ত্যাগের জন্য, ষষ্ঠটি ত্যাগের উপলব্ধির জন্য এবং সপ্তমটি মোক্ষের জন্য নির্দিষ্ট। পরশুরামকল্পে বলা হয়েছে প্রথম পাঁচটি ক্ষেত্রে গুরুর সাহচর্য ও নির্দেশ লাগে, কিন্তু শেষ দুটি ক্ষেত্রে সাধক স্বাধীন। আচারের এই সাতটি স্তরকে অন্যভাবে বলা হয় আরম্ভ, যৌবন, প্রৌঢ়, প্রৌঢ়ান্ত, উন্মনী ও অনবস্থা। সৌন্দর্যলহরীর টীকাকার লক্ষ্মীধর আবার অন্যরকম উপাসক ভাগ করেছেন– সময়াচার, মিশ্রাচার এবং কৌলাচার।’- (ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট/ পৃষ্ঠা-১৬৮)
এখানে পশ্বাচার, বীরাচার এবং কৌলাচারের পার্থক্য এসে দাঁড়াচ্ছে। তান্ত্রিক সাধনা ক্রিয়াকলাপ প্রধান হলেও তত্ত্বজ্ঞান এর প্রাধান্য সমধিক। শাব্দজ্ঞান বা তর্ক-বিতর্কমূলক পরোক্ষ জ্ঞান নয়, প্রত্যক্ষ ও সাক্ষাৎ তত্ত্বজ্ঞানেই মোক্ষ মেলে। এই কুলার্ণবতন্ত্রের দাবী। পশ্বাচারী ও বীরাচারী এই দুই বিভাজন অর্থ হল, তত্ত্বজ্ঞানী মানুষ, তত্ত্বজ্ঞানহীন হল পশু বা পাশবদ্ধ মানুষ।
‘নিদ্রাদিমৈথুনাহারাঃ সর্বেষাং প্রাণিনাং সমাঃ।
জ্ঞানবান্‌ মানবঃ প্রোক্তো জ্ঞানহীনঃ পশুঃ প্রিয়ে।।’ -কুলার্ণবতন্ত্র
সকল প্রাণীর মধ্যেই আহার, নিদ্রা, মৈথুন দেখতে পাওয়া যায়। শিব, পার্বতীকে বলছেন এ কথা। সঙ্গে বলছেন, জ্ঞানবান পশুই হল মানুষ আর জ্ঞানহীন প্রাণী হল পশু। অর্থাৎ আহার, নিদ্রা, মৈথুনাদি অতিরিক্ত জ্ঞানই এখানে বিভাজক। সুতরাং, পশ্বাচারী ও বীরাচারী তান্ত্রিকদের এই বিভাজন, বৈদিক ভাবনার সঙ্গে সঙ্গতি স্থাপনে অগ্রণী কুলার্ণবতন্ত্রও স্বীকার করছে। আবার আমরা দেখছি বেদ, বৈষ্ণব ও শৈব – এই তিনটি পশ্বাচার বলে বর্ণিত হচ্ছে। অর্থাৎ জ্ঞানহীন দশা রয়েছে এই তিন তান্ত্রিক পদ্ধতিতেই। দক্ষিণ ও বাম, এদের চাইতে উন্নত দশা বলে বর্ণিত। বীরভাবের মানুষদের জন্য। যদিও এঁরা আবার কুলার্ণবের মতে দিব্যভাবের মানুষদের জন্য নয়। অর্থাৎ আরো উন্নত দশায় যাওয়া যায়।
আলোচ্য নাটকে পরশুরাম, যখন বিশ্বামিত্রকে বীরাচারী বলছেন, তখন তিনি দক্ষিণ ও বাম ধারার সাধক বলে ধরা চলে। কুলার্ণবতন্ত্র, অন্তত কমন এরার প্রথম শতকের নির্মাণ। আর ভবভূতি অন্তত অষ্টম শতকের মানুষ। কুলার্ণব ব্যতীত বেদগ্রাহ্য নয়, এমন তন্ত্রাদির সূত্র থেকে ভবভূতির মত কঠোর ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক তাঁর সূত্র সংগ্রহ করবেন না বলাই চলে। কারণ সেক্ষেত্রে সে সব সূত্রকে মান্য করে তোলা হবে। অতএব এখানে বিশ্বামিত্রকে বীরাচারী বলার অর্থ আমরা এরূপই নিষ্কাশন করলাম।
পরশুরাম বলছেন, ‘ভগবান্‌ কুশীনন্দন! মাননীয় বশিষ্ঠ প্রভৃতি বস্তুত ব্রহ্মে লীন হয়ে আছেন। আপনি কিন্তু বীরাচারের পুরাণ গুরু। তাই আপনিই বলুন – ভৃগুর পবিত্র বংশে জন্মগ্রহণ করে এক্ষেত্রে আমার অস্ত্রগ্রহণ যুক্তিযুক্ত কি না!’ এর উত্তরে বিশ্বামিত্র খানিক সংকটেই পড়ছেন। ফলে স্বগতোক্তিতে বলছেন পরশুরাম গুণে সত্যিই মহান, কিন্তু স্বভাবে অসুর। কেন না সব বিষয় নিজ উৎকর্ষের জন্য তিনি সর্বদা গর্বিত। এইখানেই ভবভূতির কন্ঠস্বর আবার ফিরে আসে বিশ্বামিত্রের মধ্যে দিয়ে। সুরাসুরের বিভাজন থেকে অহিংসা-হিংসা দ্বন্দ্বে তাঁর দ্বিচারিতাগুলিও প্রকট হতে থাকে।
সে কথায় আমরা পরে আবার আসব। এখন দেখার বিষয় বৈষ্ণব ও শৈব তান্ত্রিক ক্ষেত্রেও বিরোধ কেমন প্রকট এখানে। কুলার্ণব তন্ত্র অনুযায়ী বৈষ্ণব তন্ত্র, শৈব তন্ত্রের চাইতে নিকৃষ্ট। দুটিই পশ্বাচারী বলে চিহ্নিত হলেও, শৈবরা তখনো এগিয়ে। শৈব পরশুরাম এবং বিষ্ণু অবতার রামের যে দ্বন্দ্বের দিকে নাট্য ক্রমে এগিয়ে চলেছে সেখানে কারা শ্রেষ্ঠ সেটিও নির্ধারিত হবে। হবে বলেই ভবভূতি শুধুমাত্র ‘বীরাচার’ শব্দটি প্রয়োগ করে তার সূচনা করে রাখলেন। বুদ্ধিমানের জন্য ইঙ্গিত যথেষ্ট – এ কথাটি এই সংলাপ এবং দৃশ্যাংশের অনুধাবনের জন্য মনে রাখা তাই প্রয়োজন। পরের পর্বে আমরা বৈষ্ণব এবং শৈব তন্ত্রের মধ্যেকার পার্থক্যগুলি এবং সামগ্রিক ভাবে অবৈদিকদের প্রতি ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির অসহিষ্ণুতার কারণসমূহ আরো কিছুটা আলোচনা করে নেব।

Facebook Comments

Leave a Reply