সে : রাণা রায়চৌধুরী

fail

একটা হাসি শোনা যাচ্ছে, শোনা যাচ্ছিল কোনোখান থেকে। হাসিটা কোত্থেকে আসছে বোঝা যাচ্ছে না। হাসিটা একটা মেয়ের, নাকি মহিলার। হাসি। হাসিটা খুব কাছে নাকি একটু দূরে সে বুঝতে পারছে না। হাসিটা একনাগাড়ে নয়। মাঝেমাঝে। হঠাৎ কল খুললে যেমন ঝপঝপ করে জল পড়ে, সেরকম।

সে মানে সে, সে একটু ভীতু। ভয় পাচ্ছে। জীবনে যা কিছু সুঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটে তা হঠাৎই। ফলত ‘হঠাৎ’ বা ‘আচমকা’ আমাদের জীবনে একটা ব্যাপার। আচমকা রোদ এল মুখের ওপর, বা আমাদের ক্যারাম বোর্ডের ওপর, বা আমাদের প্রিয় আধার কার্ডের ওপর হঠাৎ বৃষ্টি এল। সেরকমই আচমকা হাসিটা সমুদ্র যেমন ঝাপিয়ে পড়ে পাড়ে কিনারে সৈকতে, তীব্র আওয়াজে। ঠিক সেরকম হাসিটা হঠাৎ ঝাপিয়ে পড়ল তার মনের ওপর।

সে কোথাও যেতে চেয়েছিল, কিন্তু হাসির ভয়ে বেরোতে পারছে না। মাঝেমাঝে হাসিটা খুব মিষ্টি মনে হচ্ছে। তখন সে একটু রিলিফ পাচ্ছে, একটু আনন্দ হচ্ছে মনে। মন। মন তার কোথায় সে জানে না। আছে নিশ্চয় এই শরীরের ভিতর। হয়তো জামার পকেটে। সে হঠাৎ মিষ্টি হাসি শুনে, তার ভালোলাগা মনটাকে খোঁজে, জামার পকেটে হাতড়ায়। মিষ্টি হাসিটা ওই পেয়ারা গাছের ডালে পাতায় লেগে আছে, দুলছে। এবার কী তবে সে বেরোবে? বেরোক, বেরিয়ে পড়ুক। মিষ্টি হাসিটা কোনো বাচ্চা মেয়ের। শিশু বালিকা।
সে বেরোবার জন্য তৈরি হচ্ছে। মনে জোর পাচ্ছে। এমন সময়ে একটা বিচ্ছিরি পোড়া গন্ধ তার নাকে এল। কী পুড়ছে? পৃথিবী পুড়ছে? বসন্তকাল পুড়ছে? কোকিল পুড়ছে কী কোথাও? নাহ চুল পোড়ার গন্ধ! এ চুল কার? সেই বালিকার কি? নাকি কোনো তরুণীর?
পুরনো দিনের রোদের কমলা আভা এসে লাগে তার গায়ে, রোদকে তার ফাঁসের মতো লাগে। চুল পোড়া গন্ধ। মা। মায়ের চুল পুড়ে গিয়েছিল। মিষ্টি হাসির সঙ্গে আসা, চুলের পোড়া গন্ধ, মায়ের কথা, মনে পড়ে তার। মা পুড়োটা পুড়ে গিয়েছিল। মা যখন পুড়ছে তখনও সে, সেই বালক বয়সে দূর থেকে ভেসে আসা হাসির শব্দ পেয়েছিল। মেয়েলি হাসি।

হাসিটা ছোট নৌকোর মতো দূর থেকে কাছে থেকে যেন জলে ভেসে ভেসে আসছিল। জলে নয়, জল যেন আগুন, আগুনজলে হাওয়া লেগে হাসিটা আরো তীব্র মনে হচ্ছিল। মা চাঁদনি রাতে পুড়ে যায়, ঘুমের মধ্যে।

তরণী ভেসে যায় কার? আগুনতরণী ভেসে যায় কী ওই মিষ্টি হাসির বালিকার? নাকি সে কোনো তরুণী?
সে কাছে কোথাও যাবে ভেবেছিল। মনে মনে সে দূরে যাওয়ার কথা ভাবলেও, যায় কাছেই। ফিরে আসে। যেমন সেই চাঁদনি রাত – চাঁদ পোড়া রাত – নদীর জলে আগুন লেগে যাওয়া সেই হাসিনৌকো – ছেঁড়া মাংসের নৌকো – এখনো মাঝেমাঝে ফিরে আসে যেন!

হাসিটা থেমেছে। এখন আর কোনো মেয়েলি হাসি সে শুনতে পাচ্ছে না। হাসিটা ভয়ের নাকি রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো, রমা মণ্ডলের গানের মতো হাসি, সে ঠিক বুঝতে পারে না। কীভাবে সে এই ভেসে আসা হাসি নিয়ে বাঁচবে, বেঁচে থাকবে, সে বুঝতে পারে না।

পাশের ক্লাবে ছেলেরা ক্যারাম খেলছে, কেউ কেউ টেবিল টেনিস খেলছে, দু’চারজন তাস পিটছে। একটা গুঞ্জন একটা সামান্য হল্লা হুল্লোড় আনন্দের ধারা জানলা দিয়ে ভেসে আসছে। রাস্তা দিয়ে ফেরিওয়ালা যাচ্ছে হেঁকে, সাইকেলের ক্রিং ক্রিং বেলের আওয়াজ, একজন কীর্তন গেয়ে গেয়ে বাড়ি বাড়ি তোলা আদায় করছে। এইসব শব্দ আওয়াজ তার কানে আসছে। এইসব শব্দ আওয়াজ বেঁচে থাকতে গেলে শুনতেই হবে। হয় সবাইকেই।
জয় নিতাই বলে – কীর্তন গায়ক বা তোলা আদায়কারী তার দরজায় করতাল বাজাতে ঢুকে পড়ল। তার পকেটে বা কাছে খুব অল্প টাকা আছে, যা দিয়ে তাকে আরো বারোদিন চালাতে হবে। বারোদিন বাদে তার বিদেশে থাকা দিদি তাকে টাকা পাঠাবে। সেই বিদেশ থাকা আসা টাকা যা সে গত বেশ কয়েকবছর ধরে দিদির কাছ থেকে তোলা আদায় স্বরূপ পাচ্ছে। অর্থাৎ সেও একপ্রকার তোলা আদায়কারী। বাইরের তোলা আদায়কারী গাইছে, খুব ভক্তিভরে, কৃষ্ণের নাম।
তোলা আদায়কারীর কাছে আরেক তোলা আদায়কারী! সে মনে মনে হাসে। তার হাসির সঙ্গে বাতাসে ভেসে আসা মেয়েলী হাসিটি আবার মিশল। এই হাসিটি ক্রুরতার নয়, এই হাসিটি আনন্দের। কোনো অল্পবয়সী মেয়ের হাসি। সে বাতাসে ভেসে আসা হাসিটিকে বিছানার এক ধারে খুব যত্নে রেখে কীর্তনিয়াকে দেখতে দরজা খুলল। দরজা খুলতেই বাইরের একঝলক রোদ তার চোখমুখকে ভিজিয়ে দিল।

তার একটা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে। বিদেশ থেকে দিদি তাকে সেই অ্যাকাউন্টে টাকা দেয়। তার ভাবতেই অবাক লাগে যে তারও ব্যাঙ্কে একটা খাতা আছে। অ্যাকাউন্ট নম্বর তার মুখস্থ। সে মুখস্থ করেছে, কারণ ওই কটা সংখ্যাই তাকে বেশ কয়েক বছর বাঁচিয়ে রেখেছে। ঘুমের ঘোরে রাতে সে, গুঙিয়ে গুঙিয়ে সেই নাম্বার আওড়ায়। সেই সংখ্যাগুলোর গায়ে তার লালা থুতু মিশে, সেইসব ঘুমন্ত সংখ্যা জাগ্রত হয়ে, সারা ঘরময় আরশোলা টিকটিকিদের সঙ্গে দেওয়ালময় হাঁটে। সংখ্যাগুলো বেঁচে থাকে জগতে শুধু তারই জন্য।

দরজা খুলতেই কৃষ্ণের নামগান করা তোলা আদায়কারী তাকে বলল, জয় নিতাই! প্রত্যুত্তরে সে তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মুখস্থ করা নাম্বার বমির মতো হড়হড় করে কীর্তনিয়ার সামনে উগরে দিল। কৃষ্ণভক্ত সেইসব ভিন্ন ভিন্ন, বিভিন্ন ও সংসারী, সংখ্যার আক্রমণ থেকে বাঁচতে, তার কাছ থেকে দ্রুত দূরে সরে গেল। সংখ্যাগুলো কৃমির মতো, কুমীরের মতো, হাজার হাজার জীবাণুর মতো নড়ছে চড়ছে, ফণা তুলছে, শুঁড় বের করছে, আবার পরপর সংখ্যাগুলো নিজেরাই ঠিকঠাক বসে পড়ে, তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর হয়ে যাচ্ছে। কৃষ্ণ নামধারীর এই সংখ্যার বিষয় আশয়ে মন নাই। ফলত সে অন্য বাড়ির দিকে চলে যায় করতালের হাসি ছড়িয়ে। করতালের হাসিতে বিদ্রুপ ছিল মনে হয় তার!

করতালের হাসি সে নতুন শুনল। মেয়েলি হাসিটা আর আসছে না। কিন্তু আসবে ফিরে সে হাসি। সে অপেক্ষা করে। ভয় আনন্দ মিশিয়ে একটা বাক্স থেকে যেন উঠে আসা সেই হাসি শোনার জন্য সে অপেক্ষা করে।
বৈশাখের ঠা ঠা রোদের হাসি, প্রবল বৃষ্টির হাসি, শীতের হাসিতে তার গরম লাগে। হেমন্তের হাসিতে তার কান্না পায়। সে কাঁদে একা একা। মাঝরাতে যখন শিয়াল ডাকে তখনও মাঝেমধ্যে শৃগালের ডাকের সঙ্গে সেই মেয়েলি হাসি ভেসে আসে। মনে হয়, অন্ধকারের সমুদ্র থেকে ভেসে আসছে, উঠে আসছে সেই হাসি। সে তখন ঘরে চুপ করে একা একা সেই হাসি শোনে, উপভোগ করে। আগে ভয় পেত। তার ভয় শেয়ার করার লোক নেই। তাই সে মধ্যরাত্রির হাসিকে এখন যাপনের অঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেছে। মিষ্টি হাসি – সে কোনো অল্পবয়সী মেয়ের হোক বা মধ্য বয়স্কা রমণীর হোক, স্নেহ মাখানো – আরোগ্য বা শুশ্রুষা মাখানো – সে হাসি শুনলে তার আগুনে অর্ধপোড়া মায়ের কথা মনে পড়ে। মায়ের কথা মনে পড়লেই, সে আনন্দে ব্যাঙ্কের খাতাকে জড়িয়ে ধরে, ব্যাঙ্কের খাতার সঙ্গে সে গল্প জুড়ে দেয়। ব্যাঙ্কের খাতাই তার মা, ব্যাঙ্কের খাতাই তার বিদেশে থাকা দিদি। ব্যাঙ্কের খাতাই তার শ্রাবণের ধারা, তার আপনজন!

আবেগে তার মাঝেমাঝে চোখে জল আসে। কিন্তু অশ্রুধারা দেখবার কোনো লোক বা মানুষ নাই। সে করতলে অশ্রুধারা মোছে। গাল তার মসৃণ। দাড়ি গজায় নাই তার। ফলে অশ্রুধারা, কোনো বাধা ছাড়া, তার মুখে জিভে জিভের লালায় চলে আসে। তার নোনতা স্বাদ লাগে।
পঁয়ত্রিশ বছর বয়সেও তার দাড়ি গজায়নি। পাড়ার ছেলেরা তাকে মাকুন্দ বলে। একটু মেয়েদের মতো হাঁটে বলে পাড়াবাসী নগরবাসী সমাজবাসী বা সহনাগরিকগণ তাকে ‘বৌদি’ বলে, তীব্র ঢিল বা শব্দবাণ বা শাণিত তীর বা বন্দুকের গুলি ছোড়ে। সে প্রথম প্রথম খুব এতে দুঃখ পেত। বন্দুকের গুলি তার বুক এফোঁড় ওফোঁড় করত।
কেন এমন মেয়েদের মতো হাঁটে সে? সে পুরুষ-হাঁটাকে নকল করেও, পুরুষের মতো তীব্র জলদগম্ভীর হেঁটেও সে ‘বৌদি’ ডাক থেকে রেহাই পায় না। তার ভয় করে।

রেহাই সে চায় ঐ মেয়েলি হাসিকে নিজের দুঃখের কথা বলে। কিন্তু নিরাকার সে হাসি ভেসে আসে শুধু। সে হাসিকে চোখে দেখা যায় না। হাসি দূর থেকে আসে, কাছ থেকে আসে। হাসি রোদের সঙ্গে তীব্র হয়ে তার বারান্দা – তার ঘর – তার মনকে ছুঁয়ে আবার আরো রোদে মিলিয়ে যায়। সে, সেই ভেসে আসা হাসিকে ধরতে পারে না। সে হাসির পিছন পিছন দৌড়োয়, সে আকুল হয়ে পেতে চায় তাকে। আবার চায়ও না মাঝেমাঝে। মেয়েলি ওই হাসিকেও তার ভয় করে।
মেয়েলি হাসি ঢেউয়ে ঢেউয়ে দূর সমুদ্র থেকে গর্জন হয়ে ভেসে এলে তাকে তার আর নিজের মনে হয় না। সে বুঝতে পারে না, এই মেয়েলি হাসি তার সুখ না যন্ত্রণার।

পাড়ার – সমাজের ছেলেপুলেদের – ‘বৌদি’ ডাক শুনে সেও মেয়েলি করে কাঁদে। সে পুরুষ নাকি সে নারী, নাকি সে অর্ধনারীশ্বর সে বোঝে না। সে আসলে একটা ব্যাঙ্কের খাতা। কতগুলো সাজানো সংখ্যার সে একটা আলমারি। তার থাকে থাকে, তার গোপন দেরাজে অনেক সংখ্যা। অনেক আগুন নির্মিত সংখ্যা সাজানো। এলোমেলো সাজানো। সে নিজেকে আলমারি থেকে পুরুষ মানুষে অনুবাদ করে। অনুবাদ মাঝেমাঝে আটকেও যায়। সে জলের ধারার মতো কাঁদে! আকাশে বিমান ওড়ে। পাখি ওড়ে। আকাশে আকাশ ওড়ে, চাঁদ ওড়ে। তারও উড়তে ইচ্ছে করে। আগুনে পুড়ে যাওয়া, কুড়ি বছর আগে আত্মহত্যার অনুবাদে পুড়ে যাওয়া মায়ের কাছে উড়ে যেতে ইচ্ছে করে তার।

কিন্তু সে উড়তে পারে না, মাসের প্রথমে ব্যাঙ্কে গিয়ে দেখে বিদেশ থেকে দিদির পাঠানো টাকা আসেনি। ব্যাঙ্কের খাতা দেখে তার ডানা খসে পড়ে। ব্যাঙ্কময় তার পালক ছড়ানো। পালকে মনখারাপের রক্তমাখা দাগ! সে ফিরে আসছে।

রাস্তায় একদল মেয়ে তাকে দেখে হাসছে। তার হাঁটা দেখে হাসছে। এই মেয়েদের হাসির মধ্যে সে যে দূর থেকে ভেসে আসা মেয়েলি হাসি শুনতে পায়, এই দলবদ্ধ হাসি তা নয়। সে যা শুনতে পায় তা একজনের একার। এবং তা কোনো দমবন্ধ বাক্স থেকে বা পুড়ে যাওয়া বইয়ের র‍্যাক থেকে আসা হাসি। ঝঞ্ঝা-বিধ্বস্ত সমুদ্র সৈকত থেকে শূন্যতা মেশানো হাসি। অথচ সে পূর্ণতার হাসি শুনতে চেয়েছিল কোনো মেয়ের কাছেই। সে পূর্ণ হতে চায়।
মেয়েগুলো তাকে দেখে হাসতে হাসতে হোঁচট খেল। কোনোক্রমে উঠে দাঁড়িয়ে আবার জোরে – মুখ টিপে – স্তব্ধতা মিশিয়ে – অন্ধকার মিশিয়ে তারা হাসতে হাসতে, রেললাইন পার হয়ে, মিলিয়ে গেল শালবনের ছায়ায়। সে দূর থেকে শালবনের দাঁড়িয়ে থাকা দেখে। অনাদিকাল থেকে শালগাছেরা দাঁড়িয়ে আছে এই ভূবনে, এই হাসির জগতে।

সে খালি হাতে ফিরে আসছে। কাছে টাকা নেই। খালি হাত মানে, খালি মন। নানারকম ভয় তার ভিতর কাজ করে। সেই ভয়কে আরো বাড়িয়ে দেয় হঠাৎ হঠাৎ রাজনৈতিক শ্লোগানের মতো তীব্র মেয়েলি হাসি। তার নিজেকে বড় কোণঠাসা লাগে। সমাজের তাকে দেখে ‘বৌদি’ বলে ডাকাটাও তার ভয়কে বাড়িয়ে তোলে, তার খুব মনখারাপ লাগে।
তার কেন জানি, খুব বাঘের ডাক – সিংহের ডাক – তীব্র ছুটে যাওয়া ঘোড়ার ডাক – শুনতে ইচ্ছে করে। নিজের মনেমনে সে বাঘের ডাক ডাকে। তার খুব সিংহের মতো, সমুদ্রের আকাঙ্ক্ষার মতো তীব্র গর্জন করতে ইচ্ছে করে। বাঘের মতো তীব্র গর্জন শিশু বয়স থেকে শিখলে তার মা আগুনে আত্মহত্যা করত না। সিংহের মতো তার কেশর থাকলে তাকে আর কেউ ‘বৌদি’ বলে ডাকত না! তার খুব বাঘ সিংহের মতো তীব্র অহংকারী জন্তু দেখতে ইচ্ছে করছে।
অথচ সে কোনোদিন চিড়িয়াখানায় যায়নি। যায়নি আফ্রিকার জঙ্গলে, নিদেন পক্ষে সুন্দরবন! জঙ্গলের প্রাণীরা কত ভালো! তার মনে হয় এইরকম। সে মনে মনে বিড়বিড় করতে করতে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু রাস্তা পার হতে ভয় হয়। প্রবল বেগে ছুটে আসছে অটো মোটরগাড়ি ওলা উবের, ভিন্ন ভিন্ন রকমের ক্যাব দাঁত নখ বের করে ছুটে আসছে তার দিকে, অনেকটা সেই মধ্য রাত্রির কবর থেকে উঠে আসা মেয়েলি হাসির মতো!
সে রাস্তা পার হতে পারে না। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে স্থির!

ব্যাঙ্কে বিদেশ থেকে দিদি টাকা পাঠায়নি। সে স্থির হয়ে রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে চিড়িয়াখানায় গিয়ে বাঘ দেখার স্বপ্ন দেখে। সে মত্ত হাতির মতো নিজের ভিতরটাকে তছনছ করে। তার ভিতরের কলাগাছ, তার ভিতরের তুলসীগাছ, তার ভিতর শুয়ে থাকা একটা শান্ত গ্রামকে সে তুলে উপড়ে ফেলে। তবুও সে রাস্তা পার হতে না পেরে স্থির দাঁড়িয়ে দেখে মানুষের গাড়ি কত প্রাণময় ও দ্রুতগতির বিদ্রুপ!

বাঘ! বাঘেদের কেউ ‘বৌদি’ বলে ডাকে না। সিংহরা কোনোদিন মধ্য সমুদ্র থেকে উঠে আসা মেয়েলি হাসি শোনে না।

সে আফ্রিকার গভীর জঙ্গলে বাঘ সিংহ ভাল্লুকদের সঙ্গে গল্প করতে শুরু করে। সে আফ্রিকার জঙ্গলে দাঁড়িয়ে, সূর্যকে দেখবে বলে আকাশের দিকে নীরব তাকিয়ে থাকে।

ঐ সূর্যের আলো গভীর জঙ্গলে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে। সূর্যের আলোয় এইবার সে হঠাৎ কীভাবে যেন রাস্তা পার হতে পারল! শিকারী বাঘ যেমন শিকারের খোঁজে এ- জঙ্গল থেকে ওই জঙ্গলে প্রবেশ করে ধীরে নিঃশব্দে, ঠিক সেইরকম জঙ্গলের রাস্তা পার হয়ে সে ধীরে চুপে আরেক গভীর অরণ্যে প্রবেশ করল।

তার খিদে পেয়েছে, তাকে ধূর্ততায় পেয়েছে, ক্রুর মেয়েলি হাসি ঝোপের ওইদিক থেকেই আসছে। সে হাসির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে প্রস্তুত হল। জঙ্গলের পুরুষ ময়ূর জঙ্গল কাঁপিয়ে ডেকে উঠল কাছেই, কাছের সমাজেই! পুরুষ ময়ূরের ডাক আকাশ চিড়ে রক্ত ঝরিয়ে দিচ্ছে।

Facebook Comments

Leave a Reply