ক্ষমতার হেড-টেল : সাধন চট্টোপাধ্যায়

fail

দেশসেবার এমন সাফল্যের সংবাদে কোথায় দু-চারজন বিশ্বস্তদের নিয়ে ফুর্তি-টুর্তি করবেন, তা নয় সর্দি-কাশি ও ফ্লুতে আক্রান্তর সম্ভাবনায় সুশান্ত ঘোষ প্যারাসিটামল টেবলেটটি খেয়ে নিয়ে পার্সোনাল বেড রুমে ঢুকে পড়লেন। শেষ বিকেল থেকে প্রথম রাত – ঘণ্টা তিন-চার যে কোথা থেকে চলে গেল, উঠে চরম একটা বদলা নেয়ার বিমূর্ত আনন্দে মাথাটা হাল্কা । নীচে নামতেই চ্যালাচামুন্ডা ও অন্যান্য সমর্থকরা ঘিরে ধরতেই সুশান্তর মাসতুতো বোন মালতী ধমকে উঠল। ‘একটু রেহাই দে তো!…. তুমি ভেতরের ঘরে এসো!’ সুশান্তর নির্দিষ্ট কফির কাপটি এগিয়ে দিয়ে, ‘প্যারাসিটামলে কাজ দিয়েছে?’ বলে অভ্যস্ত ভঙ্গিতেই খবর দিল, কাইজার ফোন করেছিল।
‘তোকে?’
মালিনীর ঘাড় কাত দেখে সুশান্ত ঘোষ ফোঁস করেন, ‘এরা থানা চালাবে? আস্ত গাড়ল!’ তৃপ্তির আবেশে থানার বড়বাবুটাকে কড়কালেন না। নইলে মোবাইল টিপে বদলির থ্রেট্ শুনিয়ে বলতেন, পার্সোনাল কিছু বলার থাকলে, গোপন নাম্বারটা তো চার্জ নেয়ার দিনই পাঠানো হয়েছিল। কচি খোকা নাকি?
সুশান্ত ঘোষ হাল্কা স্বস্তি নিয়ে বলল ‘দারুণ করেছিস কফিটা!’
চোখের বিশেষ হাসিতে বোন বলে, ‘আর ধাপ্পা দিওনাতো!’
শুনে সুশান্তও ম্যাজম্যাজে শরীরে অর্থপূর্ণ হাসি দিল। বহুদিনের বিপত্নীক তিনি। সংসারটা এখন মালিনীর তৎপরতায় নিখুঁত চলছে।
আজই দুপুরে পেল্লায় বাড়িটায় ফোনে খবর এসেছে আসন্ন মন্ত্রীসভা রদবদলে সুশান্ত ঘোষ রাষ্ট্রমন্ত্রী হতে চলেছেন। দলে আপন লবির বড় এক নেতার কনফার্ম মেসেজ।
সব লাইনেই সাকসেস বলে কথা থাকে।
‘একবার বটা…? কথাগুলো মুখ থেকে ফসকে যাচ্ছিল সুশান্তর। পোষ্য মোটা হলদে বেড়ালটা কোনা থেকে ম্যাঁও করে উঠল – বটা শীল তো আট বছর আগে ভোটে বোমা বাঁধতে গিয়ে….।
ভাগ্যিস পুরোটা মুখ ফুটে জানতে চায়নি তখন মালিনীর কাছে।
হঠাৎ বটার প্রসঙ্গ কেন? খুঁটিয়ে অতটা পেছন তাকানোর মানে হয় না আজ।
নীচের ঘরে তখন ভক্তদের গুঞ্জন আওয়াজ হয়ে উঠেছিল।

সে-সবতো কবেকার কোন অতীত। ‘একে চিনি না আমি? দেশ সেবা করবে? হু: আগাপাশতলা অসৎ!
সিতিকণ্ঠ স্যার মন্তব্য করেছিলেন। আট ক্লাস অবধি স্কুলটায় পড়লেও, সিতিকণ্ঠ স্যার ভূগোল পড়াতেন। পড়া না পাল্লেই ঠ্যাঙ্গানি !
সেদিন স্যার টের পাননি তাঁর কথাটা মুখে মুখে শিকলি হয়ে বান্ডিল ঘোষের কানে পৌঁছে গেছল। সবে অপরাধজগৎ ছেড়ে সে দেশসেবায় নেমেছিল।
খুবই দাগা খেয়েছিল মনে। রক্ত টগবগাচ্ছিল। ঘনিষ্ঠ সাগরেদ, কলোনির বটা শীল তক্ষুনি গুমকাচ্ছিল বদলা নেয়ার পক্ষে। তার মটকা চব্বিশ ঘণ্টাই গরম। ওয়ান সাটার পকেটে নিয়ে ঘোরে।
বান্ডিল ঘোষ দেশসেবায় ঢুকে বুঝেছিল, সিতিকণ্ঠ মাষ্টার। কিছু উল্টোপাল্টা বিরুদ্ধে ঘটলেই পাবলিক সেন্টিমেন্ট জমবে। বটাকে রুখে দিলেও, চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল, যদি এক-বাপের পয়দা হয়ে থাকি, একদিন সিতি, তোর মুখ থেকে বার করবোই আমি সৎ!
সিতিকণ্ঠর তখন তরুণ বয়স।ও-রকম কতশত মন্তব্যই তো মানুষের ঠোঁটের দরজা পেরিয়ে ঘোর সুদূরে হারিয়ে যায়। স্মৃতির অধরা। তাছাড়া, শিক্ষকটির বয়স বাড়তে থাকলে নানা বিশ্বাস ঘিরে ধরে। জীবনটা মনে হয়, চলতি কোনো শতরঞ্জির ধুলো ঝেড়ে এগিয়ে চলা। কত শব্দের ডামাডোল ক্রমে থিতিয়ে যায়। ভূগোল স্যার থেকে, সহকারী প্রধান এবং একদিন বড় স্কুলটার হেডস্যার । ঢেউখেলানো চুল ক্রমশ হাল্কা হতে হতে টাক।
বান্ডিলও কি দেশসেবায় বান্ডিলই থাকে! সুশান্ত ঘোষ । চারপাশে সমর্থক। তারপর, ওয়ার্ড কাউন্সিলার হয়ে কি আতসবাজি ফাটানো!
দরজায় তখন প্রার্থীরা আসে। সুশান্ত ঘোষকে সই করে সার্টিফিকেট লিখে দিতে হয়। প্রিয় বান্ডিলদা হতে হয় কখনও । অনুরাগী ছোড়ার দল বাড়ে।
তবে, ঘাড়ে–গর্দানে লাগতে, পৌরপ্রধান হলে বাড়ির আশেপাশে বাজি ফাটেনি। গলায় মালা নেয়া অবস্থায় অনেকেই পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলেছিল।
প্রার্থী হিসেবে চেম্বারে ঢুকে এটা-ওটা-সেটার জন্য, ‘বান্ডিলদা’-র পুরনো লব্জ–সম্বোধনে, গুঁতো খেয়েছে ‘এটা অফিস! দা-ফা নয়! ‘স্যার’ বলতে হয়।
এ-ভাবে সুশান্ত ঘোষ শহরের এক নম্বর নাগরিক হয়ে জঞ্জাল, জল নিষ্কাশন বা রাস্তার জন্য আড়ালে খিস্তি খেলেও, চলতি মন্তব্যে পথেঘাটে শোনা যায় ‘ওনার শহর’ ‘ওনার পৌরসভা’, ‘ওনার রাজত্ব’ ইত্যাদি।
সুশান্ত ঘোষ অতিথি হিসেবে পৌরসভার গাড়িতে আসেন, দাঁড়িয়ে যান, গেট দিয়ে স্কুলে ঢোকেন না। সিতিকণ্ঠও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজের চেয়ার ছেড়ে যাবেন না। মঞ্চে উঠলে তবেই ডায়াসের দিকে রওনা দেবেন। কিন্তু অতিথি অভ্যর্থনা তো গৃহস্বামীর। বিদ্যালয় গৃহটির ঐ-কাজ প্রধান শিক্ষকের। চলো অবশেষ ধীরে এগোতেই, সুশান্ত ঘোষ তড়িঘড়ি নেমে, সিতিকণ্ঠর মালাইচাকি অবধি ঝুঁকে ‘আপনি কেন স্যার!… আমি ছাত্র…..নিজেই মঞ্চে যাব!’ ইত্যাদি ইত্যাদি! দুজনে দুজনের মনের কথা শোনে না, বাক্যগুলো কানে ধরে রাখেন।
তারপর ক্যালেন্ডারের পাতা খসতে থাকলে, সুশান্ত জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে, পুরনো পদটি ছেড়ে দেন। আর সিতিকণ্ঠকে নিয়মচক্রেই অবসর নিতে হয়। তিনি জমানো অর্থে পাশের ওয়ার্ডে সুন্দর বাড়ি বানান। সেও প্রায় সুশান্ত ঘোষের তিন-তিনটে টার্ম জেতা হয়ে গেল। অবশেষে আজ রাষ্ট্রমন্ত্রীর……

……কালো গাড়িটা – সম্ভবত বোলেরো – ভেজা ভেজা বিকেলে খচ করে সিতিকণ্ঠ সান্যালের দরজার মুখে এসে থামল। ‘খ-চ্’ বললে দাপটের ইঙ্গিত বোঝায়। এ যেন পুরনো কালের বান্ডিল ঘোষ, হালকা কোনো খেলার মুডে হঠাৎ গাড়িটাকে থামবার হুকুম দিলেন। স্টিয়ারিংটা বটা শীলের হাতে। অনেকক্ষণ ধরে বান্ডিলের নির্দেশ শুনে ঝটাং শব্দে দরজা বন্ধ করে, দ্রুত এগিয়ে একটা গেটের বাইরের কলিং বেলটা ঘনঘন কয়েকবার বাজিয়ে দিল। যেন দমকল ঘণ্টি বাজিয়ে যাচ্ছে।
একটু পর পায়জামা আর গেঞ্জিতে একটা বুড়ো শরীরের জীবন্ত ছায়া নিয়ে পুরনো হেডস্যার দরজা খুললেন। অচেনা মানুষ দেখে সামান্য ভ্যাবাচ্যাকা। নতুন মুখে দৃষ্টি ফোকাস করে বললেন, কি ব্যাপার ভাই! থামস্ আপ আঙ্গুলের নির্দেশে গাড়িটা দেখিয়ে দিতে, বুড়োর দৃষ্টি ছুটল কালো বোলেরোর দিকে। জানলায় প্রোফাইলটাকে বুঝে নিতে একটু সময় লাগল বটে – বহুদিনের পুরনো দৃশ্যত – বিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর গেটেঢোকাস্থগিত স্থির গাড়ির জানলায় প্রোফাইলটা চটপট ফ্ল্যাশ মারে। তবে, বৃদ্ধর জানার কথা নয়। আজ কি কি সতর্কবাণী শিখিয়ে পড়িয়ে দুটাকার রেশনের ফ্রি চালের চেহারার ছোকরাটাকে পাঠানো হয়েছে। কোনো পাবলিক সিন ক্রিয়েট হবে না, ‘সব কিছু মোলায়েম ভঙ্গিতে, রিটায়ার্ড হলেও বড় স্যারদের একটা ভাবমূর্তি থেকেই যায়। নিশ্চিহ্ন হয় না। যেমন ভূঁইলিলির মূল।
বটা সব ইন্সট্রাকশন গুলিয়ে ফেলে, পকেটে একসাটার রাখা মেজাজে বলে, ‘উনি কিন্তু সৎ?’
জীবনের কিছু অঙ্ক আছে, সময় কিংবা স্মৃতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে না। দ্রুত সমীকরণ হিসেবে সেজে মনের স্ক্রিনে ফুটে ওঠে। সিতিকণ্ঠ হেসে, মিহি গলায় বললেন, ‘তাতো ভাই মানছি!’
‘ভাই-ফাই বলবেন না ছার!… কী মানছেন বলুন?’
‘ঐ যা তুমি বল্লে!’
বৃদ্ধের জবাব বটা শীলের মেজাজে কিচাইল ঠেকল, তেতে উঠল চট করে।
‘মানছি মানছি বলে যাচ্ছেন? বলুন কী মানছেন?’
‘তোমার বক্তব্য !………. যা এখন বল্লে ভাই!’
‘চালাকি করবেন না স্যার।‘
‘চালাকি কোথায়?’
‘মটকা গরম করাবেন না। …. সুশান্ত ঘোষের নাম মুখে এনে আপনাকে বলতে হবে … ভীষণ সৎ!… তিন তিনবার।’
এবার বড় মাষ্টার প্রমাদ গুনলেন। বিরক্ত হন ভেতরে ভেতরে। ছেলেটি যেন ছোবল দেবে সিদ্ধান্ত নিয়েই এসেছে। দুর্বল কাঁপা গলায় বল্লেন, ‘কৈ, আমি তো তোমার বিরোধিতা করছি না!’
‘বুদ্ধিজীবীদের ওসব ঘোৎ ঘোৎ বুঝি ছার!’
‘তোতো ঠিকই বলছ!’
‘কথা ঘুরিয়ে দিচ্ছেন! … নাম মুখে এনে বলুন সৎ! তিনবার !
সিতিকণ্ঠর ফের দেঁতো হাসি।
‘কোনো সন্দেহই নেই তাতে।‘
‘সন্দেহ? সন্দেহর কথা উঠছে কেন?’
‘বললাম তো রে ভাই, মানছি! …….তর্কে যাচ্ছি না।‘
‘তক্ক? বান্ডিলকে নিয়ে কি তক্ক? বটা শীল চেঁচাতে থাকে।
উনি, ভাবি রাষ্ট্রমন্ত্রীর আবেগে, পুরনো জীবনে গিয়ে হালকা মজা ভোগ করেছিলেন। পেছনে বসা ছোকরাটাকে পাঠিয়ে বটাকে ডাকা করালেন।
বটা চুল পেছনে ঠেলতে ঠেলতে আঙুল চালিয়ে বল্ল এসে, ‘একটা আস্ত মাল, বুঝলি? খালি পিছিল মারছে।’
‘আস্ত একটা গান্ডু তুই! …. বুড়ো মানুষকে মন খুলে বলতে দিতে হয় না?’
‘তোকে নিয়ে যা খুশি বলবে? ছাড়না ওকে … বটা শীলকে তো চেনে না!’
‘পা-গো-ল! সিন ক্রিয়েট হবে। শোন এদিকে!’
পকেট থেকে একটা কয়েন বার করে বল্লেন, ‘ভোটের বাজারে গায়ের জোর খাটানো যায় না…. নে! …. এটা দিয়ে ওনাকে হেড-টেল করা গিয়ে …. বলবি, কপালে যা পড়বে তুই মেনে নিবি, স্যারকেও মানতে হবে।”
বটা শীল পাক্কা লাইনের ছেলে। খেলা হওয়াটা ধরে ফেলে। পাইপগান টানে তো পাকা নিশানা।
ফিরে এসে, শান্ত মেজাজে, ডেকে বলে বটা, যা বলেছি ছার, মনে রাখবেন না! …. এবার বলুন, হেড না টেল?’
সিতিকণ্ঠ বিনয়ে হাত জোড় করে বটার উদ্দেশ্যে, বাবু, হেডে কি আছে আর টেল-এ কি আছে, বলবে তো আগে!’
‘হেড পড়লে বুঝে নেব, আপনি বলছেন সুশান্ত খুব সৎ!’
‘টেল পড়লে ?’
‘কিছু বলতে হবে না। আমি বুঝে নেব।’
টসের কয়েনটা ডিগবাজি খেয়ে বটার তালুতে পড়তে, সিতিকণ্ঠ আজন্ম অপমানের একটি একটি কাঁটাগাছ হয়ে হাঁকড়ালেন, ‘টেল!’
বটা শীল মুঠো খুলে দেখাল, হেড! … আর তিনটা চান্স নেবেন?’
সিতিকণ্ঠর ঘাম ছুটছিল। তিনি হাসেন। ‘হেড’ বলা উচিত ছিল, তালেই বোধহয় টেল পড়ত।
তার ভাগ্যে এমন ধারাই ঘটে।
বটা গিয়ে গাড়িতে কয়েনটা তুলে দিতে, বর্তমান বিধায়ক, ভবিষ্যতের রাষ্ট্রমন্ত্রী সযত্নে পকেটে রেখে দিলেন। একমাত্র, তিনিই জানেন, কয়েনের দু-পিঠেই হেড খোদাই ছিল।
… আজ দুপুরে, সাফল্যের খবরে, বান্ডিল থেকে সুশান্ত ঘোষে ফুটে ওঠার দিনে স্বপ্নটা কেন দেখলেন তিনি?

Facebook Comments

Leave a Reply