রাষ্ট্র : শুভংকর গুহ

সাদা কাগজের ওপরে যত ক্ষুদে ক্ষুদে অক্ষরে এলোমেলো করে লেখা যায় ঠিক ততটাই। ফাউনটেন পেনের চোখা নিব দিয়ে। প্রতিটি বাক্যের সঙ্গে যুক্ত ও সম্পর্ক থাকে এমন কোনো পরের পর বাক্য নয়। অনাত্মীয় ও সম্পর্কহীন বাক্যগুলি সব। কথা ও বাক্যের পিঠে বাক্য চাপিয়ে দিয়ে, উদাসীন বলদযানের গাড়োয়ানের মতো শব্দ ব্যবহার। অর্থহীন বাক্য ও কথালেখার পাশে অবচেতন কথা চাপিয়ে দেওয়াকে আর যাই হোক পালিশ করা নিটোল আখ্যান বলা যায় না।
বরং কথার স্বৈরাচার বলা যেতে পারে।
তবে গোলকধাঁধার মতো কথার পরে কথা গড়ে তুলে আখ্যান নির্মাণ করাও যে মস্ত শিল্প এ কথা তাকে কে বোঝাবে?

শুরুতেই যা লেখা হল,- তা ঘটনার মধ্যে প্রবেশের চেষ্টা মাত্র।
গল্পের নামে গল্প না লেখার একটি বাহানা মাত্র।

আর ঘটনার মধ্যে প্রবেশ করলেই যে, পরের পর কথাগুলি ঘটনার কাহিনি গড়ে তুলবে, এ সত্যকে অস্বীকার করবে এমন সাহস কার আছে?
হ্যাঁ। ঘটনার মধ্যে প্রবেশের চেষ্টাকে একটি যাত্রার সূচনা বলা যেতে পারে। আর যাত্রার আগে যেভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়, সে ঠিক তাই তাই করছে।
যেমন,- একটি নোটপ্যাড, কলম, ক্যামেরা, স্নানের তোয়ালে, সেভিং ক্রিম, ইলেকট্রিক কেটলি ও নানা টুকিটাকি জিনিসগুলিকে আবার দেখে নিয়ে, কিছু নিতে ভুল হল কি না? পুনরায় ভাবছে।
দুই হাতের তালুতে উষ্ণ ঘষতে ঘষতে নিজেকে সেইইই ভাগ্যবান মনে করা, যার জন্য মহেশলাল ভগত একটি ঘোড়ার গাড়ি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পাঠিয়ে দেবে।
মহেশলাল ভগত যার ক্ষমতা ও আস্ফালন প্রশ্নাতীত।
তাকে আমন্ত্রণ করেছে মহেশলাল ভগত, বিশেষ কাজে, তার স্টেট ও মহল ভিসিট করে একটি নথি তৈরি করে দিতে হবে। একটি নথি বা রিপোর্ট। মহেশলাল ভগতের স্টেটের যাবতীয় ইতিহাসের মতো। তার জন্য খুশি মতো অর্থ সে দাবি করতে পারে। মহেশলাল ভগতের পক্ষ থেকে এই লোভনীয় প্রস্তাব সে উপেক্ষা করতে পারেনি।
সে মহেশলালকে প্রশ্ন করেছিল,- রিপোর্ট না কাহিনির মতো কোনো কিছু?
মহেশলাল বলেছিল,- আমার মহলের ভিতরে ও বাইরে বাগিচায় বাগানে ও মাইলের পর মাইল জুড়ে যে চাষের জমি, ফসলের বিবরণ, আমার জমি জুড়ে যেসব গাছপালা, পশু পাখি এই সব কিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। অবশ্যই সাহায্য করার জন্য, দুই চারজন লোক সাথে থাকবে। থাকবে প্রহরীও।
কতদিন থাকতে হবে?
আপনি যখন মনে করবেন, আপনার কাজ শেষ হয়ে গেছে। তখন আপনার কাছ থেকে আমি কাজ বুঝে নেব। আপনার লেখা নথি পরীক্ষা করে নেব।
কিন্তু আপনাদের সম্পর্কে আমার অনেক কিছু জেনে নেওয়ার আছে। আপনাদের পূর্বপুরুষ ও স্টেটের ইতিহাস এমন অনেক কিছু।
গাড়ি আপনি পাঠিয়ে দেবেন?
অবশ্যই। সে সব ভাবনা আমার লোকের। আপনি শুধু আসবেন, নিজের কাজ করবেন। তারপরে আপনার কাজটি আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে নিজের বাসখানায় ফিরে যাবেন।

কালো পিচের রাস্তার ওপর থেকে শুকিয়ে আসছিল ভোরের বৃষ্টির চিত্রনাট্য। কোনো কোনোদিন সব ঘটনাই প্রায় নাটকের মতো হয়। ভোরের জল বৃষ্টির পরে একপ্রকার কাঁপুনি থাকে। কাঁচা রোদ উঠে এলে উষ্ণতা ছড়ায়ে নিম দাঁতনের তেঁতো ভারি মোলায়েম হয়। না, রাস্তার পাশে সাধারণ ও সর্বজনপ্রিয় বিবরণ,- না কোনো নদী নেই। একটি নৌকাও নেই। নেই কোনো পাখির গুঞ্জনের উপস্থিতি। মেঘ ছিল, বৃষ্টির পরে ঝরে গিয়ে, আকাশের বিবরণকে উদার নীল করেছে। চোরকাঁটা ও বিষফলের গুল্মলতা। বৃষ্টিতে জংলি তুলো ফুলের ভিজে যাওয়ার ওপরে বিরক্তিকর জলদাগ।
সামনেই রাস্তার দিকে তাকালে, দিঘির কালো জলের রঙ চুলপ্যাঁচার মতো জটিল।
দিঘির পারেই, দাঁড়িয়ে আছে, মহেশলাল ভগতের পাঠানো দুই ঘোড়ায় টানা চার চাকার এক্কা। খানিকটা সাদা ও বাদামি বাকিটা কালো রঙয়ের সংমিশ্রণে এক্কা হয়েছে তিনরঙা।
এক্কার গাড়োয়ান বৈশাল পাঠান অপেক্ষা করছিল আরোহীর জন্য। আরোহী না কি বিশেষ একজন মেহমান। একজন অতি সম্মাননীয় নথি লেখক। তার যাতে কোনোপ্রকার অসুবিধা না হয়, বৈশাল পাঠানকে মহেশলাল ভগত বারে বারে বলে দিয়েছে।
বৈশাল পাঠান নাকে কেমন বুনো বুনো গন্ধ পাচ্ছিল। জংলা বিষাক্ত উদ্ভিদের গন্ধ। শ্বাস প্রশ্বাসের পক্ষে খুবই ক্ষতিকারক। দিঘির মৃদু ঢেউয়ের ওপরে ভাসছিল হাওয়া ভরা একটি পেটফুলো ভারি ট্রাকের টায়ার। টায়ারের ওপরে কালো রঙয়ের প্রজাপতি উড়ে উড়ে রাবারের টোকা দিচ্ছিল। ফড়িঙগুলি বৃষ্টিতে ভেজা জংলা ডগার ওপরে ঘুরে ঘুরে। বৈশাল পাঠানের কাছেই, একটি বুড়ো নিমবৃক্ষ। গাছের ডালে ছুতোরের মতো ঠুক ঠুক করছিল ঠোকরা পাখি। বৈশাল পাঠান অজান্তেই কপালে হাত ছুঁইয়ে বির বির করে কি যেন বলল। লোহা পোড়ালে না কি, এই পাখি লোহাপোড়ার গন্ধে উড়ে চলে যায়।
একজন খোঁড়া পথচারী হাঁটতে হাঁটতে ক্র্যাচ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল প্রায়। ভাগ্যিস বৈশাল পাঠানের এক্কার চাকা ধরে নিজের টাল ও পতন সামলেছিল। চোরকাঁটার ঝোপের ওপাশ থেকে, দুইটি গিধড়ের শাবক রাস্তা পার করে, সামান্য দূরেই কাঠের বাড়িটির দিকে চলে গেল।
ওই কাঠের বাড়িটিই সেই আরোহীর, এই এক্কার খাস মেহমান।
আর কতক্ষণ, বৈশাল পাঠানকে অপেক্ষা করতে হবে, কিছুই বুঝতে পারছিলনা। পথনির্দেশক যে ভাবে তাকে যে জায়গায় অপেক্ষা করতে বলেছিল, সে ঠিক ঠিক সেইভাবেই, সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। সাদা পাথরের স্তূপের পাশেই একটি ঢালু পথ, সেখানেই দুই ঘোড়ায় টানা এক্কাকে দাঁড় করিয়েছে বৈশাল পাঠান।
আরও পাশে একটি ঢালু পথ, সবুজ ঘাসের জমি বরাবর। বৈশাল পাঠানের মনিব মহেশলাল ভগত কি যেন…কি যেন, নাম বলেছিল, আরোহীর বা নথি লেখকের… হ্যাঁ… হ্যাঁ… পেটের ভিতরে নামটি আসছে। কিন্তু মুখে আসছে না।
কি যেন… কি যেন… রাধিকা ওয়াচবেরি।
বৈশাল পাঠানের খুব অস্বস্তি হচ্ছিল, চারদিকের পরিবেশ এতই বিরক্তিকর, সহ্য হচ্ছিল না তার। কোথায় কিছু একটার ছেঁদ হয়েছে…ফুঃ… বাতাসের শব্দ থমথমে থেমে থাকা শূন্যতার মধ্যে গড়িয়ে যাচ্ছিল।
সাদা পাথরের স্তূপের পাশে চোখ রাখলে, ঘাসের ওপরে একটি পথের দাগ, সেই দাগ গিয়ে থেমেছে, একটি কাঠের কুটিরের সামনে। বৈশাল পাঠান সেই পথের ওপরে চোখ রেখে বসেছিল। অপেক্ষা করছিল কখন রাধিকা ওয়াচবেরি হেঁটে আসবে, তার কাছে। সেই সকাল থেকে যখন গাড়ির টায়ার ভাসছিল, দিঘির জলের ওপরে, এখন সেই টায়ারটিকে আর দেখা যাচ্ছেনা। বৈশাল পাঠান বুঝতে পারছিল, এখানে খুব দ্রুত সময়ের পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। বৈশাল পাঠান অস্থির হয়ে উঠছিল।
পথ নির্দেশক ঠিক যে ভাবে তাকে বলেছিল, ঠিক ঠিক চিহ্ন ও বিবরণ ধরে সঠিক স্থানেই সে অপেক্ষা করছিল বৈশাল পাঠান।
অপেক্ষারও ধৈর্য থাকে, কিন্তু সেই বাঁধেও ফাটল ধরতে শুরু করেছে।
বৈশাল পাঠানের মনের ভিতরে বিস্তর বিভ্রম তাড়া করে চলেছিল। ঠিক… ঠিক কি… সেই স্থানে… পশ্চিম কোণে মেঘের গর্জন, ঘন কালো মেঘের জমাট সম্মেলন, ওই কোণে অন্ধকার ফেলেছিল।

বৈশাল পাঠান বসে থেকে থেকে হাঁপিয়ে উঠছিল।
অপেক্ষা যখন অনুশাসনহীন, সীমাহীন, ধৈর্যের সমস্ত বাঁধ ভেঙ্গে দেয়।
অস্থির হয়ে হয়ে, গুনগুনিয়ে নিজের মনেই কি সব বলে যাচ্ছিল।
বলতে বলতে গড়িয়ে এলিয়ে গেল এক্কার ফোমের গদির ওপরে। আছন্ন হল, ঘুম জড়িয়ে এল। কিছুক্ষণ পরে, গভীর ঘুমের মধ্যে তলিয়ে গেল, ফিরে গেল মনিবের প্রাসাদে। স্থির দাঁড়িয়ে এক্কার দুইটি ঘোড়া লোমশ ভারি লেজ দুলিয়ে দুলিয়ে মাটির ওপরে নাল ঠুকে চলেছিল।
ঠিক সেই সময়েই নিজের ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় কিছু হাতে নিয়ে উপস্থিত হল, রাধিকা ওয়াচবেরি। বৈশাল পাঠান, ঘুমের গভীরে তলিয়ে প্রায় এক্কা থেকে গড়িয়ে যাচ্ছিল। রাধিকা ওয়াচবেরি গলা খাঁকারি দিল, বারকয়েক। কিন্তু বৈশাল পাঠান অচৈতন্য। রাধিকা ওয়াচবেরি বেশ কয়েকবার ডাকল। বৈশাল পাঠান তবুও যেন বাস্তব জগতের মধ্যেই নেই। রাধিকা ওর গায়ে স্পর্শ করে, ঝাঁকানি দিল বারকয়েক।
বৈশাল পাঠান হকচকিয়ে দুই চোখে আঙ্গুল ডলে ডলে… কতক্ষণ !!! ছিঃ। আমি লজ্জিত।
রাধিকা ওয়াচবেরি বলল,- আমি যতক্ষণ না এসে পড়লাম।
আপনি নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ এসেছেন?
আমরা এবার কথা না বাড়িয়ে যাত্রা শুরু করতে পারি?
অবশ্যই। আমি একটু গুঁড়ো তামাক দাঁতের গোঁড়ায় না ফেললে, ঘুম ছুটবে না।
কতক্ষণ লাগবে মহেশলাল ভগতের স্টেটে যেতে?
সাকাল অনেকটা গড়িয়ে গেল, মধ্যরাত্রি পার হয়ে প্রায় ভোররাত্রি হয়ে যাবে। আমি গতকাল ভোর রাত্রে রওনা দিয়েছিলাম, আজ সকালে এসে পৌঁছলাম।
এ ছাড়া তাড়াতাড়ি যাওয়ার উপায়?
সামনে একটি রেলস্টেশন আছে জানি, ট্রেনে চরলে, তাও সন্ধ্যে বেলা তো হবেই। ঘোড়া দুটোর ওপরে জোর করতে পারি না, যতটা গতি নেবে।
আপনারা পশুকে জানোয়ার বলেন।
আপনি কি করে জানলেন?
মহেশলাল ভগত এবং তার স্টেট সম্পর্কে সামান্য কিছু জানি বলেই।

ভোররাত্রি পার করে, দিনের প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়ল। ঘোড়া দুইটির মুখ থেকে ফ্যানা উগরচ্ছিল। মহেশলাল ভগতের এস্টেটে প্রবেশে পথের ওপরেই রঙ্গিন বড় সাইনবোর্ডে, “ভগত স্টেট আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে”। পাখির ভাঙা ডানার মতো, উড়ে এল অদ্ভুত প্রাচীন সব ঘরবাড়ি মহল প্রাসাদের মতো। বাগিচার মধ্যে প্রস্তরের মূর্তি। ভগত স্টেটের পূর্বপুরুষদের।
ভাঙা ফোয়ারার যন্ত্র বিকল। রোমান আদলের ভাঙা বাতিস্তম্ভ। কয়েকটি ধ্বংসপ্রায় উপাসনা কেন্দ্র। আর জায়গায় জায়গায় সামান্য দূরে দূরে খাজনা আদায়ের কাছারি।
মহেশলাল ভগতের প্রাসাদের আকার অদ্ভুত ও অসাধারণ বিন্যাসের। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, সাদা পাথরের বড় বড় সিগারেটের মতো থাম, থামগুলির পাশে গ্রে রঙয়ের ছায়া পড়ে এমন বিন্যাস এনেছে, মনে হতে পারে, এই প্রাচীন বাড়িটির ভিতরে কেউ আদি অনন্তকাল ধরে বসে বসে লিখে চলেছে প্রাগৈতিহাসিক দানবীয় জন্তুদের নিয়ে একটি রহস্য উপন্যাস। বড় বড় ঘরগুলির প্রথম ঘরটিতে, মনিব মহেশলাল ভগত, রাধিকা ওয়াচবেরিকে নিয়ে ঢুকে গেল বাগিচার পাশে আধো অন্ধকার, আধা আলো ঘরটিতে। ঘরটির মধ্যে সামান্য আলোর ছটা অনেকটা অন্ধকারের আঁশের মতো।
এই ঘরটির দেওয়াল ত্রিকোণ বিশেষ। যে কোনো কোণে দাঁড়ালে ঘরটিকে ত্রিভুজের মতো দেখতে লাগে। রাধিকা ওয়াচবেরি একটি চেয়ারে বসল। সামনে টেবিল।
উল্টোদিকের একটি চেয়ারে মহেশলাল ভগত।
টেবিলের ওপরে উষ্ণ টিপট, কাঁচের প্লেটের ওপরে ভাজা কাজু বাদাম। জলের জগ।
রাধিকা ওয়াচবেরি নোটপ্যাডে খস খস করে লিখে চলেছিল। মহেশলাল ভগত বলতে থাকল,- পৃথিবীর অনেক শহরে, অনেক বাড়িতে ঘরের দেওয়ালে পূর্বপুরুষদের ছবি টাঙ্গানো থাকে, শহরের বাড়িগুলির দেওয়ালে বিশেষ করে পূর্বপুরুষদের ছবি যেমন, তেমনিই আমার এই ঘরে পূর্বপুরুষদের ছবি আছে। ডানদিকের দেওয়াল থেকে প্রথম ছবিটি ধরলে, সাতপুরুষ আগের ছবি।
রাধিকা ওয়াচবেরি বলল,- আমি মোট ষোলোটি ছবি দেখতে পারছি।
হ্যাঁ। ঠিক। কিন্তু একটি বিশেষত্ব কি লক্ষ করেছেন?
হ্যাঁ। দেওয়ালে কোনো আপনার পূর্বমাতার ছবি নেই।
পূর্বমাতা !!!!!
হ্যাঁ। পূর্বমাতা। জীবজগতে জন্মের ক্ষেত্রে মায়েদের ভূমিকা অধিক। পুরুষের পৌরুষ ধরে রাখেন যিনি, তিনি নারী। জগতসংসারে ধারণের গুরুত্ব অপরিসীম। ধারণ না থাকলে সৃষ্টির ফল শূন্য। আপনার ঘরের দেওয়াল পুরুষের ছবি ধারণ করে আছে বলে, এই দেওয়ালের চরিত্র আপনাদের ইতিহাসের মতোই সন্দেহজনক হয়ে উঠেছে।
কিন্তু ঘরের ভিতরে ছায়া ছায়া অন্ধকারে আপনি সবকিছু ডিটেলে দেখতে পারছেন কি? আসলে ধূসর রঙের আলো দেওয়ালের সব বিবরণকে ম্লান করেছে।
ঘরের ভিতরে শীতকালের ঘন কুয়াসা ঘনীভূত হয়ে আসছিল। বাইরের বিষণ্ণ প্রকৃতির গন্ধ ঘরের ভিতরে ছড়িয়ে পড়ছিল। ফুরিয়ে যাওয়া দিনের আলো জানালার কপাট থেকে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছিল।
রাধিকা ওয়াচবেরি অপেক্ষা করছিল মহেশলাল পরবর্তী সময়ে কি বলবে?
মহেশলাল নিজের শরীরের অভ্যন্তরে কিছু কাজ করছিল। নিজের স্মৃতিকথার মধ্যেই মনে মনে অনেক কথাই সম্পাদনা করছিল। অনাচারী ও স্বৈরাচারী কথাগুলিকে পরের পর বাদ দিয়ে, স্টেটের ও পূর্বপুরুষদের আধিপত্যের মনে রাখা কথাগুলির মধ্যে মাহাত্ম্য ও উজ্জ্বলতার কৃত্তিম নির্মাণ করছিল। ভগত স্টেটের চারদিকের বাউন্ডারি ওয়ালের আশেপাশে শিকারি ও প্রহরী বিদেশি কুকুরগুলি ঘুরঘুর করছিল, মাঝে মাঝে চিৎকার করছিল, ঘরের ভিতরে বাইরের শব্দগুলি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
দিনের আলো যখন ঢাকা পড়ে গেল, মহেশলাল ভগত আবার বলতে শুরু করল, পূর্বপুরুষদের ছবিগুলি সম্পর্কে। প্রতিটি ছবির নিচে একটি করে কাঠের বার্ণিশ করা, ডেস্ক আছে। ডেস্কের ওপরে একটি নোট খাতা আছে, সেই নোটবইয়ে লেখা আছে ছবিটির পরিচিতি। মহেশলাল রাধিকা ওয়াচবেরিকে জানিয়ে দিল, ছবিগুলিকে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, নোটবইয়ের লেখার সঙ্গে মিলিয়ে ডিটেল প্রস্তুত করতে হবে। এই কাজটি করতে অনেক সময় লেগে যাবে। এই ঘরে প্রতিদিন আলোর ব্যবস্থা করে দেবে কঠোরভাবে যে আপনাকে নজরে রেখেছে। সেই প্রহরীই আপনার দেখভাল করবে। যা যা প্রয়োজনীয় সবকিছুই ও যুগিয়ে যাবে। আপনি ওকে আপনার সব অসুবিধার কথা জানাবেন। প্রহরীই সব সমাধান করে দেবে। আশা করছি, এখানে কাজ করে আপনি খুবই আনন্দ পাবেন।
মহেশলাল ভগত ঘরের বাইরে গিয়ে উচ্চ গলায় চেল্লাল, কতকগুলি পোষা হরিণ ছুটে এসে তার শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার পোশাক হাতে ঝোলানো টুপি চাটতে থাকল।
কঠিন ও কঠোর চাহনির প্রহরী চিৎকার করে উঠে বলল,- ওয়াহিদ প্রেতগুলিকে সরিয়ে ফেল।

বেশ কয়েকদিন পরে, মহেশলাল ভগত রাধিকা ওয়াচবেরির কতটা কি কাজ হয়েছে তা পরীক্ষা করতে এল। সকাল অনেকটাই পার হয়ে গেছে বলেই ঘরের ভিতরে পর্যাপ্ত আলো। বেলা বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকের আলো ও রোদ ঝকঝক করছে। রাধিকা টেবিলের ওপরে ঝুঁকে পড়ে কাজ করছিল। বারো নম্বর ছবির নিচে বসে তার ডিটেল লিখছিল। ঝুঁকে নিবিড়, গভীর মনোযোগে প্রতিটি শব্দ অতি যত্নে বুনে চলেছিল। প্রায় শতবর্ষের অতীতের ঘটনাগুলিকে একজন ঐতিহাসিকের মতো সাদা পাতার ওপরে খোদাই করে চলেছিল।
মহেশলাল ভগত একটি ফুলদানির গায়ে নোখের টোকা দিল। চিনামাটির তীক্ষ্ণ টুং শব্দ ঘরের মধ্যে সামান্য গড়িয়ে আবার স্থির হয়ে গেল। রাধিকা ওয়াচবেরি একবার মুখ তুলে চাইল, তারপরে নিজের কাজে বুঁদ হয়ে গেল।
মহেশলাল ভগত তাকে বলল,- কেউ কি এসেছিল? অনেকটাই আমার মতো দেখতে?
রাধিকা ওয়াচবেরি লেখার কাগজের পাশে, টেবিলের ওপরে টুকরো কাগজে কিছু টুকে রাখছিল। টোকা হয়ে গেলে কলম কাগজের ওপরে রেখে অবাক হয়ে বলল,- আপনার মতো দেখতে !!!
হ্যাঁ। আমার মতো। আমাদের মতো দেখতে।
আপনার মতো? আপনাদের মতো !!!!
মানে যা বলছিলাম, ছবিগুলি দেখে আপনার নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে, সবারই ডিটেল একই রকমের হওয়ার কথা। আর আপনাকে নিশ্চয়ই এই বলে ধরিয়ে দিতে হবেনা, আমি এবং আমার পূর্বপুরুষদের সবারই চেহারার খুবই মিল আছে। বিশ্বাস করুন, এদের মধ্যে আমিই একমাত্র জীবিত।
ডান পাশের কোণের দিকে ছবিটি তেল রঙয়ের মনে হচ্ছে না। অভিব্যক্তির মধ্যে অদ্ভুত গ্লোরি।
ওটি হিস্তার সুখেরের আলোকচিত্র।
দেখে মনে হচ্ছে, কোনো একজন বিখ্যাত চিত্রকর প্রতিকৃতি তেল রঙে এঁকেছেন।
এটিই এই ছবিটির বিশেষত্ব। হিস্তার সুখের আমাদের স্টেটের গুণমুগ্ধ ছিলেন।
ইনিই কি আপনার পিতৃদেব?
মাত্র একমাস আগে মারা গেছেন।
জানি। মৃত্যুর তারিখ লেখা আছে। জন্মের তারিখও। লাখোয়াল ভগত। আপনার পিতার নাম।
মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল, একশো তেইশ বছর, নয় মাস, বারোদিন।
তাও জানি। শোষকের ও অনাচারীর দীর্ঘায়ু মানব সভ্যতার পক্ষে মঙ্গল নয়।
বুঝতে পারলাম না?
বিদ্যুৎ চমকের চেয়েও দ্রুত বুঝে নিতে হয়।
একমাত্র ইনিই পূর্বপুরুষদের সবার চরিত্র নিজের মধ্যে আত্মস্থ করেছিলেন।
সেই জন্যই তিনি নিখুঁত নির্ভাজ স্বৈরাচারী ছিলেন।
কি করে বুঝলেন? আপনি ছবিটির ডিটেল কিছু লিখেছেন?
আর কিছুক্ষণের মধ্যেই লেখা শুরু করব। লাখোয়াল ভগতের মানে আপনার পিতার ডিটেল লিখলেই আমার কাজ প্রায় শেষ হয়ে আসবে। তবুও দুইচার দিন আমার আরও লাগবে।
এরপরেই আপনাকে অস্ত্রের ঘর দেখাব। বল্লম, ভোজালি, চাকু, রিভলবার, বন্দুক, হাতকামান সে আপনি দেখে বুঝতেই পারবেন। বিস্ফোরকগুলিকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে।
আমি আগে গুমঘরটি দেখতে চাই। প্রায় প্রত্যেকের ডিটেল থেকে বুঝতে পারছি, গুমঘরের ভিতরে যাদের হত্যা করা হয়েছিল, প্রায় সবারই কঙ্কাল এবং হাড়গোড় এখনও ছড়িয়ে আছে হয় তো।
আপনার অনুমান ভুল নয়। গুমঘরের ভিতরে কারও যাওয়ার অনুমতি নেই। আপনি কিন্তু গুমঘর সম্পর্কে কিছুই লিখবেন না। কিন্তু অস্ত্রের ঘরটি আপনাকে দেখাব, স্টেটের নিরাপত্তার কারণে।
গুমঘর সম্পর্কে না লিখলে নথির মধ্যে অনেক মিথ্যে থেকে যাবে। এই ঘরের ভিতরে কাগজপত্রে যা ডিটেল আছে, তা থেকে গুমঘরের কথা বারে বারে উল্লেখ আছে। আমি কতকগুলি নাম বলব। আপনি নিশ্চয়ই শিউরে উঠবেন না,- রাধেশ্যাম চৌবে, নৈনিহাল পান্নিকর, যমুনাবাঈ, আকাশ হরিজন…পরের পর নামের তালিকা,… শেষ হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী আছেন পওয়ন তুকা……তিনি তার রিপোর্টে জানিয়েছেন লাখোয়াল ভগত মানে আপনার পিতা নয়ালক্ষ যাদবকে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিলেন। পওয়ন তুকা সেই হত্যাকাণ্ড দেখেছিলেন। রাষ্ট্র যেমন ফসলের ঋণের পুরো ফায়দা সুদে আসলে তুলে নেয়, সেই কথাটাই নয়ালক্ষ যাদব জানতে চেয়েছিল আপনার পিতা লাখোয়াল ভগতের কাছে। আপনার পিতা ভেবেছিলেন, সে আপনাদের স্টেটের কৃষিঋণের বিষয়ে ফায়দার কথা জানতে চাইছে। ঋণ গ্রহীতা এই কথা জানতে চাইতেই পারে। এতে অপরাধের কিছুই নেই। দুইজনের মধ্যে বিস্তর কথা কাটাকাটি হয়। নয়ালক্ষ যাদব আপনাদের স্টেটের ও পূর্বপুরুষদের অনেক খুন খারাবির কথা জানতে পেরেছিল। আপনার পিতা বুঝতে পারছিলেন, সব কথা প্রকাশ্যে এলে, স্টেটের অনেক বিপদ হতে পারে।
এই কথাগুলি আপনি আপনার নথিতে লিখবেন না। আমি দয়া করে, কথাটি বিশেষ ভাবে উল্লেখ করছি। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। কেন বলছি? দ্বিতীয়বার হয় তো বলব না।
আপনাদের স্টেটের নথি বা ইতিহাস লিখিয়ে নেওয়া কি খুব জরুরি ছিল?
আমাদের উজ্জ্বল গৌরবের ইতিহাস অবশ্যই। সেই জন্যই আপনাকে আমি নিয়োগ করেছি।
নিয়োগ কথাটি যথেষ্ট অভব্য বলে আমি মনে করছি।
করতে পারেন। আপানার কাজের বিনিময়ে, আমি আপনাকে অর্থ প্রদান করছি।
সেটি আমার সাম্মানিক। কারণ আপনি আমাকে আমন্ত্রণ করে এনেছেন। যদি জানতাম আপনি আমাকে নিয়োগ করছেন, তাহলে এই কাজের দায়িত্ব নিতাম না। কারণ, নিয়োগ কথাটির মধ্যে, বশ্যতার ব্যাধি আছে। আমি খুব সতর্ক ভাবেই বশ্যতাকে ব্যাধি বলছি। আপনার আমন্ত্রণ কথাটিকে গ্রহণ করছি, কিন্তু নিয়োগ কথাটিকে অবশ্যই নয়।
কেন বলছেন?
কারণ আপনি স্টেট, আপনি রাষ্ট্র, আপনি একটি গুমঘরের বর্তমান অধিনায়ক।
আবার বলছি চুক্তি অনুযায়ী আপনাকে যা লিখতে বলা হয়েছে আপনি তাই লিখবেন। এর বাইরে একটিও শব্দ লিখলে আপনার বিপদ হতে পারে।
আমি একজন নথি লেখক। বাস্তব ও সত্য লিখি। আমি আমার কাজের প্রতি নির্ভেজাল সততা অবলম্বন করি। এটাই আমার পেশা। আপনারা যেমন স্বৈরাচারী হিসেবে সৎ এবং হত্যাকারী হিসেবে আদর্শবান, আমিও ঠিক তাই। নিজের পেশার প্রতি গভীর দায়বদ্ধ। আমার কাজের ওপরে আপনার আস্থা নাও বা থাকতে পারে, কিন্তু আমি নিজের বিশ্বাস থেকে সব কাজ করি।
আপনাকে আমি ডেকে এনেছি, তাই আপনাকে গালি দিতে পারছি না।
আপনাকেও আমিও গালি দিতে পারছি না। কিন্তু আপনাকে খুবই সচেতনভাবে রাষ্ট্র বলছি।

রাধিকা ওয়াচবেরি ঘরের দরজা অতিক্রম করে বাইরে আসার আগে ভগত স্টেটের প্রথম পুরুষ, যার ছবির নিচে লেখা আছে, তার নাম – ভৈরবলাল ভগত, সেই নামটির ওপরে বাদাম গাছের ছায়া পড়েছে, সব ছবির নিচে যেমন একটি ডেস্ক, তেমনি একটি ডেস্কের ওপরে রাধিকা ওয়াচবেরি একটি কগাজের ওপরে লিখল,- “ প্রতিটি ছবির নিচে প্রাগৈতিহাসিক জন্তুর মতো উপাদেয় হিংসা আছে। গল্প আছে, যে গল্প এবং কাহিনির মধ্যে ভগত গোষ্ঠী আসল সত্যটি আড়াল করে এসেছে। হ্যাঁ, মাননীয় মহেশলাল ভগত, এই টুকরো কাগজটির পড়ার পরে আপনি অবশ্যই এই ছবিগুলির নিচে দাঁড়াবেন, আর পরের পর ঘরগুলি অতিক্রম করতে করতে বুঝতে পারবেন, আপনাকে প্রথম অন্ধকার জড়িয়ে ধরছে, দ্বিতীয় অন্ধকার আপনার চলার গতিকে থামিয়ে দেবে। তৃতীয় অন্ধকার আপনাকে গভীর অন্ধকারের মধ্যে নিক্ষেপ করবে। আপনি চিৎকার করে উঠবেন। কারণ, গুমঘরের ভিতরে অন্ধকারের মধ্যে নিজেরা নিজেদের হত্যা করে এসেছেন প্রতিদিন। আমি জানি, আমাকেও হত্যা করার জন্য আপনি অভিনব কৌশল অবলম্বন করছেন। আমাকে হত্যা করা মানে আপনি আপনাদের ইতিহাসকেই হত্যা করবেন। এই ভাবেই আপনারা নিজেদের দায়িত্বের প্রতি সবসময় যত্নবান থেকেছেন। আমি যা কিছু লিখেছিলাম, আপনার হাতে সমর্পণ না করে, নিজেই ছিঁড়ে ফেলে পুড়িয়ে দিলাম। আমি আপনাদের বিনাশ চাই না। কারণ আপনাদের অনুপস্থিতি মানে, সঠিক গালির পরিবর্তে রাষ্ট্র… রাষ্ট্র…বলতে পারব না। আপনারা যুগের পর যুগ ধরে জেনে এসেছেন রাষ্ট্র মানেই এক অভিনব মুগ্ধকর স্বৈরাচার…

যতটা সম্ভব গোপনীয়তা অবলম্বন করে, প্রসাধনী কক্ষের পিছনের দরজা অতিক্রম করে, হাজারো ফুল ফুটে আছে, এমন একটি বাগিচা অতিক্রম করে, ভগত স্টেটের মূল প্রবেশদ্বার পার হয়ে, মহাসড়কে উঠে এল রাধিকা ওয়াচবেরি। মহাসড়কের পাশে বড় বড় বৃক্ষের নিচে পাখির বিষ্ঠা ও সারমেয়র বমি পড়ে আছে। বিষ্ঠা ও বমিকে জীবজগতের পরিত্যক্ত ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। দ্রুত হেঁটে ফিরে যাচ্ছিল রাধিকা ওয়াচবেরি। দায়িত্বজ্ঞানহীন কাপুরুষ নথি লেখক নিজের ফেরার লক্ষ্যস্থল যেমন ভুলে যায়, রাধিকা ওয়াচবেরিও তার ব্যতিক্রম ছিলনা।
স্টেশনে দাঁড়াল। খুব শীত করছিল রাধিকা ওয়াচবেরির। তীক্ষ্ণ বরফের মতো ঠাণ্ডা বাতাস তার শরীরের গভীরে যেন ছেঁদ করছিল।

Facebook Comments

1 thought on “রাষ্ট্র : শুভংকর গুহ Leave a comment

  1. স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এরকমই একটা গল্পের প্রয়োজন আছে। আপনাকে কুর্নিশ। নির্মাণ কৌশল আর কল্পনা গল্পের রাজনীতির সঙ্গে ভীষণ ভালো করে যাচ্ছে। গল্পটাকে কখনো আমার রূপকথাও মনে হয়েছে। চরম বাস্তব অথব বাস্তবোচিত ভঙ্গিতে এগোয়নি আর এটাই এর সবচেয়ে বড়ো প্লাস পয়েন্ট। সাংঘাতিক রাজনীতি। সাহস। প্রজ্ঞার বিচ্ছুরণ গল্পকে অনেকদূর নিয়ে যায়।

Leave a Reply