যেভাবে যেতে হয় : তৃষ্ণা বসাক

fail

যখন যেদিন চলে যাবে, সেই যাওয়ার অভিঘাতকে কীভাবে তীব্র করে তোলা যায়, যাতে একটা গভীর দাগ বসে যায় পেছনে পড়ে থাকা মানুষগুলোর মনে, এই বাড়িটার দরজা কোণ, ফ্রিজের পেছন, গ্রিলের নকশার স্তরে স্তরে জমা ধুলো আর শূন্যতাকে হা নগ্ন করে সেই চলে যাওয়া – তা নিয়ে কম প্রকল্প রচনা হয়নি এই ঘরটাতে। মধ্যরাত অব্দি জেগে কল্পনা করেছে সুমিতা আর পরাগ, একটি শিশুর দুপাশে সাবধানে শুয়ে কেউ কারো দিকে না তাকিয়ে মশারির আকাশে যে যার নিজস্ব কুসুমগুলি ফুটিয়ে গেছে। পরাগ বলেছে যাদবপুর, বাঁশদ্রোণী, কি বাইপাসের ওনারশিপ ফ্ল্যাটের কথা, সোনারপুরে তাদের কর্মচারী সংগঠনের সমবায় বাসভূমি, এমনকি কলকাতা ছেড়ে লোভনীয় কোন চাকরি নিয়ে চেন্নাই, মুম্বাই, ব্যাংগালোর কিংবা আরও দূরে যেখানে নিয়োগপত্রের এক ছত্রে সংস্থা তাদের থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। নিশ্চিত, নিশ্চয়তা।কথাটা ওরা কেউই উচ্চারণ করে না। বোধহয় সচেতনেই এড়িয়ে যায়। কিন্তু দুজনেরই মনের আর্দ্র গহনে এই কথাটিই অবিরাম নিজেকে বৃদ্ধি করতে থাকে, নিজেই নিজের জন্ম দ্যায়। পরাগের আত্মকথনে তথ্য বেশি, রঙ কম। রস কম। সে ফাঁক ভরিয়ে দ্যায় সুমিতা। তার সম্ভাব্য বাড়িগুলোতে তাই তাই থাকে, যা যা এই বাড়িতে নেই। প্রচুর রোদ, প্রচুর হাওয়া আর ফেলা ছড়ানো শান্তি। এর প্রত্যেকটিই যে শিশুর বেড়ে ওঠার জন্যে দরকার। একটা ছাদ থাকলে তো কথাই নেই।পিঠোপিঠি বোনের মতো হাতে হাতে কাজ সারা একটি ছাদ। মেয়ের কাঁথা শুকোবে, ভাদ্রের রোদের মতো একটা উৎসব লেগে যাবে ন্যাপথলিনের গন্ধমাখা জামাকাপড়ে, ঘরে না জায়গা হলে অতিথিদের নিয়ে বসাও যাবে সেখানে। সুমিতার কল্পনা এত উত্তেজক রকমের জীবন্ত যে প্রায়ই সে সারারাত জেগে কাটিয়ে দ্যায়। সে দুহাতে অনুভব করতে পারে রোদে মেলা কাঁথাগুলোর শুষ্কতা, কিংবা ছাদের আসরের অতিথিদের চায়ের কাপ থেকে ধোয়া উঠে কেমন সন্ধের তারাগুলোকে ছুঁয়ে ফেলে।
এই তারাগুলোকেই তো ছুঁতে চেয়েছে তারা। সে আর পরাগ। পরাগ যদিও এর মানে বোঝে আরও ভালো চাকরি, ভালো পার্ক্স, নামী ক্লাবের ছাড়পত্র। যদিও সুমিতা জানে পরাগ তার চাহিদার মতো নয় একটুও, হতে পারবে না কোনদিনও। এই ঢিলেঢালা, রংচটা চাকরিটাই তাকে মানায়।এখানে অনেক অবকাশ, সকালটাকে ইচ্ছেমতো এনে লম্বা করা যায়। হঠাৎ দুপুরে ফিরে এসে বউয়ের ভাতঘুম মাটি করা কিংবা মনোহরা কন্যাটিকে বুকে চেপে ধরে তার হৃৎস্পন্দন নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া- একেই তো বেঁচে থাকা বলে। এমনভাবে বাঁচতে বাঁচতেও পরাগ আবার ভূতের কিল খাওয়া চাকরি খোজে।আসলে সে চায় কেবল এই বাড়িটা থেকে পালাতে। বাড়িটা প্রতিদিন রাক্ষসের মতো বাড়ছে। আর তারা, এই তিনটে প্রাণি, তাদের পাখির নীড়ের মতো ঘরটুকু সব ঢুকে যাচ্ছে তার পেটে, রোজ একটু একটু করে। তাই একটা ভয়ানক, পিষে মারার চাকরি চাই তার। কাকভোরে বেরিয়ে গভীর রাতে বাড়ি ফিরবে, যখন দুয়ার এঁটে ঘুমোচ্ছে পাড়া, এমনকি রাস্তার কুকুরগুলোও। হা- ক্লান্ত হয়ে ফিরবে আর সবার অলক্ষে ঢুকে পড়বে নিজের ঘরটায়, বাড়িটাকে কাঁচকলা দেখিয়ে। আচ্ছা, এমন হয় না, ঘরটুকু থাকল আর লোপাট হয়ে গেল বাড়িটা? সেই অ্যালিসের গল্পের মতো, বেড়ালটা নেই কিন্তু হাসিটা লেগে আছে হাওয়ায়? ঘরটাকে পিঠে বেঁধে কিংবা ঘরটায় চেপে চলে যাওয়া যেত যেখানে সেখানে, যখন তখন। তাহলে বেচারি সুমিতাকে সারাদিন দুধের মেয়েটাকে নিয়ে এত আতঙ্কে কাটাতে হত না। পরাগ যখন অফিসে ব্যস্ত থাকত, তখন সুমিতা আর বাচ্চাসুদ্ধ ঘরটা বসে থাকত ভিক্টোরিয়ার বাগানে, গ্যালারিতে ছবি দেখে দেখে, আইনক্সে সিনেমা দেখে দেখে, গড়িয়াহাটে টিপের পাতা কিনে কিনে সময় খরচ করা যেত, নির্ভার, নির্ভয় সময়। ছুটি হলে বাইরে বেরিয়ে পরাগ দেখতে পেত উল্টোদিকের বাসস্টপে দাঁড়িয়ে ঘরটা তাকে হাত নেড়ে ডাকছে, জানলার ফ্রেমে মেয়ে কোলে সুমিতার সুখী সুখী তেলতেলে মুখ।
ঘরটা যতদিন না সেরকম চলন্ত, উড়ন্ত, মডুলার হচ্ছে, ততদিন কি সুমিতাকে তার বাচ্চা নিয়ে এরকম ভয়ে ভয়ে মরে মরে বেঁচে থাকতে হবে হিংস্র এই আবহে?
অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করে সুমিতা। পথও সে বলে দ্যায়- চাকরি নয়, বাড়ি পালটাও আগে, এক্ষুনি।
কথাটা দারুণ একটা উচ্চতা পেয়ে যায়। যেন ক্ষমতার অতিবেগুনি রশ্মির বলয় ঘিরে থাকে তাকে।যেন টেবিলে টেবিলে বিলি হওয়া সার্কুলার – আজই করুন, আজই করুন, এক্ষুনি করুন’ যদিও মশা মারতে হবে না বেড়াল ধরতে হবে তার কোন স্পষ্ট নির্দেশ পৌছয়নি। সুমিতার অনুজ্ঞা অবশ্য দব্যর্থহীন ‘পালটাও, বাড়ি পালটাও, আজ এক্ষুনি’ কিন্তু বাড়ি পাল্টানো মানে তো এই ঘরটাকেও পাল্টানো, ফেলে যাওয়া। ঘরটা তো এখনো তেমন সাবালক, বুদ্ধিমান হয়নি, মডুলারও না যে পর্দা খোলার মতো খুলে নিয়ে যাওয়া যাবে। চিন্তা হয় পরাগের। এই চিন্তাগুলো যখন কথায় অনুবাদ করে , পাগলের প্রলাপ ছাড়া কিছুই মনে হয় না সুমিতার। বাড়িটার হিংস্রতা তাকে উদ্বিগ্ন করে রাখে সারাক্ষণ। মেয়ের ভবিষ্যৎ, একটু রোদ, ভেজা কাঁথাগুলোর চিন্তা-তার ওপর পরাগের পাগলামি শাকের আঁটির মতো লাগে। বুঝি বা বিস্ফোরণই ঘটে যাবে মাথার মধ্যে। এত জট, এত যন্ত্রণা, এত ভার বেঁচে থাকার। মেয়েকে খাওয়াতে হয়, ঘুম পাড়াতে হয়, কাঁথা কাচা, স্নান করানো, আবার খাওয়ানো, পাউডার, ভিটামিন ড্রপ- এই আবর্তে পরিত্রাণহীন ঘুরে চলে অবিরাম।তার ওপর পরাগ, তার এই ঘরের বাতিক।

এই ছোট্ট, ভয়ে কুঁকড়ে থাকা ঘরটায় শুয়ে বিনিদ্রাপন্ন সুমিতার এক এক রাতে ইচ্ছে করে পরাগকে ধরে ঝাঁকায়। রাতজাগা মানুষের পাশে অমন বিবেচনাহীন অচেতন ঘুমে শুয়ে থাকলে এমন ইচ্ছে হতে পারে বৈকি। তবে ঝাঁকালেও বিশেষ ফল হয় না। বরং ‘ব্যবহারের পূর্বে ঝাঁকাইয়া লইবেন’ লেবেল লাগানো ওষুধের মতো পরাগের পাগলামো আরও ভালভাবে দ্রবীভূত হয়ে শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ে, ক্রমে তা সুমিতাতেও সংক্রামিত হয়। শিশু কন্যাটিকে টপকে সুমিতার কাছে চলে আসে পরাগ, তার নির্ঘুম শরীরের স্বাদ নেয়। সে মুহূর্তে ভয়ানক উপদ্রব মনে হলেও পরে ভেবে দেখেছে সুমিতা, এমনটা হয়, হতে পারে বলেই বেঁচে আছে তারা, এখনো, এই বাড়িতে।

বাড়িটা কিন্তু এমন ছিল না বরাবর। আলাদা আলাদা নাম ছিল সম্পর্কগুলোর, সম্পৃক্ত ডাকখোজ।দুপেয়ে, হাত দিয়ে ভাত মেখে খাওয়া প্রাণি সব। একই টেবিলে বাড়া ভাত। শেষে দু মুঠো কম পড়লে শাশুড়ি বউয়ে গল্প করে পুষিয়ে নিত। কবে, ঠিক কবে যে চিড় ধরেছিল, ওরা বোঝেনি। হঠাৎ সেই চিড়টা একটা অতিকায় হাঁমুখ হয়ে গেল আর সেখান থেকে গলগল করে বেরিয়ে এল লাভাস্রোত। ওদের পুরনো জীবনকে উপড়ে ফেলে বোনা হল অন্যতর জীবন। ওদের প্রতিরোধ আর অবসাদ উপেক্ষা করে সে জীবন নিজেকে বাড়িয়ে নিয়ে চলল। এতদিন যে ঘটনাগুলো ছোটোখাটো দৈন্দদিনতার আড়ালে, যাদের চোখেই পড়ত না, সেসব খেয়াল করতে হল বাধ্য হয়েই। প্রতিমুহূর্তের মাথা ঘামানোর বিষয় হয়ে উঠল সেগুলো।এমনকি কী খাবে, কোন পদ চুপিসারে, আকর্ষক গন্ধ না ছড়িয়ে চুপিসাড়ে রান্না করে ফেলা যাবে দ্রুত, এবং কোন খাদ্যসামগ্রী কয়েকদিন ধরে ফ্রিজে রেখে খেলেও জিভ প্রতিবাদ করবে না, এইসব ভাবতে হচ্ছিল সুমিতাকে। পরাগকেও। কারণ তাকে এই পরিকল্পনা মাফিক বাজার করে দিতে হবে। সেখানেই তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যাচ্ছে না। রান্নাঘর ফাঁকা পেলে, সুমিতা যখন বেশ কয়েকদিনের মত রান্না করে ফেলতে যাবে, পরাগ তখন শিশুটিকে ভুলিয়ে রাখবে। এযাবৎ সে যা যা নিয়ে মাথা ঘামায়নি, একটি সুলিখিত ফর্দ নিয়ে বাজারে গেছে আর পুরুষ্টু থলি নামিয়ে রেখেছে বরাবর বাড়ি ফিরে, তেমন ব্যবস্থা আদৌ চলবে না, বোঝা গেল। সহজে সেদ্ধ হওয়া সব্জি, অল্প কিংবা আদৌ খোসা থাকবে না এমন তরিতরকারি, এমন মাছ যার আঁশ , নাড়িভুড়ি ময়লার বালতিতে ফেলে রাখলে উৎকট গন্ধ ছড়াবে না, এবং যেগুলো রান্না অবস্থায় একটা নির্দিষ্ট উচ্চতার বাটিতে, ফ্রিজের নির্দিষ্ট তাকে রাখা যাবে। আসলে ময়লার বালতি, ফ্রিজ এমনকি বাসনকোসন, এগুলোর কোন ভাগবাঁটোয়ারা হয়নি, হতে পারেনি তখনো। কারণ, তার আগেই ওরা ভাগ হয়ে গেছিল, এতদূর যে, একজন আরেকজনকে ফুঁড়ে চলে যেত, যেন সেখানে কিছু নেই, বাতাসের স্বাভাবিক বসতি ছাড়া। কথা থেমে যাওয়ায় তাই কোনদিন ভাগাভাগির প্রশ্ন উঠতেই পারল না, যে যার মত বাসন ব্যবহার করে মেজে দিয়ে চলে যেত, ফ্রিজে অদৃশ বিভাজন রেখা মেনে যে যার খাবার রেখে দিত, ময়লার বালতিতে যে যার নিজস্ব সময়ে ফেলে দিত যা যা ফেলার। সব ব্যাপারটা এমন সুশৃংখলায় চলছিল যে মাঝে মাঝে আফশোস হত আগে কেন এইভাবে চলতে পারেনি। এমন ধারণাও দানা বাঁধতে পারত শান্তির চেয়ে হিংসা বুঝি ঢের বেশি সুশৃংখলাপরায়ণ আর সুস্থির। মনে হচ্ছিল, যা ঘটার, সবই ঘটে গেছে, আর নতুন কিছু ঘটবে না। তবু এইভাবে জীবন কাটিয়ে দেবার কথা ওরা ভাবতে পারে না, বিশেষত সুমিতা। থেকে যাবার নূনতম সম্ভাবনা দেখলেও সে শিউরে ওঠে। সেই রাত, সেই অতর্কিত আক্রমণ প্রতিরাতে অজস্র টুকরো হয়ে তার কাছে ফিরে ফিরে আসে। তাকে জাগিয়ে রাখে। গভীর রাতে তার এই ভয় পাবার অভ্যেস না হয় পরাবাস্তব, কিন্তু বাস্তব সমস্যাও তো আছে। মেয়েটা যে কেবল বড় হচ্ছে। তার হামা দেওয়ার, ক্রমে ক্রমে ছোটার, পড়ে যাওয়ার, আবার ওঠার পর্যাপ্ত পরিসর দরকার, দরকার ঠিক সময়ে রান্নাঘর খালি পাওয়া, যাতে তাকে প্রেশারে ভাত সব্জি, ডাল, মাছের একটা মিলিজুলি খাবার টাটকা রেঁধে দেওয়া যায়। ক্রমশ তার স্কুল হবে, বন্ধু হবে। তার চাই জন্মদিনের উৎসব, মোমবাতি নিভোনর ধুম, বন্ধুদের কলরবের মধ্যে। সেসব তো এখানে এইভাবে জীবনযাপনের মধ্যে হতে পারে না। ওরা না হয় জীবনের সব আনন্দ, যোগাযোগ কেটে ছেঁটে চালিয়ে দিতে পারে, কিন্তু শিশুটি- তার তো একটা গোটা বিশ্ব লাগবে। তাই চলে যেতে হবে, যেতেই হবে। আর যখন যেদিন চলে যাবে, সেই যাওয়ার অভিঘাতটাকে…।

এইখানে একটা বিপজ্জনক লুপ আছে। পাঠক আবার পৌঁছে যায় প্রথম শব্দে। কিন্তু তাতে সুমিতা পরাগের সমস্যা একচুলও কমবে না। ওদের সমস্যা, ওদের জীবনের মতোই সামনের দিকে এগোচ্ছে। তাই আমাদেরও সামনে হাঁটতে হবে। ওরা যখন মশারির ছাদে যে যার নিজস্ব কুসুম ফুটিয়ে যাচ্ছে।
কবে যাবে? কবে? সুমিতা এখন যেহেতু মেয়ের সঙ্গে শরীর জড়িয়ে আছে, তার দুধ খেয়ে বড় হয় মেয়েটি, এই জৈব বন্দিত্বের সুযোগ নিয়ে সে এখন সব প্রশ্নই পরাগের দিকে লেলিয়ে দিতে পারে। পরাগ বাইরে যাক, সে ঘর খুঁজুক। একটা নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করুক তাদের চলে যাবার।কিন্তু পরাগ দেখাই যাচ্ছে, অত পারে না। সে ইতিমধ্যে কিছু বাড়িঘর দেখে ফেলেছে ঠিকই, কিন্তু সবসময়ই পিছিয়ে আসার মতো যথেষ্ট জায়গা রেখে। সুমিতার মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, পরাগ যতটা গল্প করে, যত প্রকল্প রচে-সবটাই তার সরকারি স্থিতিশীল অভ্যাসে।সত্যি সত্যি কোথাও নতুন সেতু তৈরি হচ্ছে না, ট্রেন বাড়ছে না-শুধু কাগজের স্বপ্নগুলোকে মাঝে মাঝে ধুলো ঝেড়ে রোদে দেওয়া হচ্ছে। হয়তো এই বাড়িটার সঙ্গেও পরাগ জৈববন্দি। অর্থে না হোক, তার শ্রমে আর তত্ত্বাবধানে এই বাড়ি, বেড়ে উঠেছে সুমিতার গর্ভের সন্তানের মতো। তবে কি বাড়তে বাড়তে এই একরত্তি মেয়েটাও একদিন সুমিতার আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে? এই বাড়িটার মতো? মেয়ের জীবনযাপন তার কোন নির্দেশের অপেক্ষায় থাকবে না, এমনকি মেয়ের চৌহদ্দি ছেড়ে তাদের চলে যেতে হবে- সুমিতা ভয়টাকে চারিয়ে যেতে দ্যায় না। এমনিতেই সন্ত্রস্ত হবার অনেক কারণ রয়েছে। একটা দিন থেকে আরেকটায় যেতেই অসম্ভব চাপ নিতে হয়, এর ওপর আছে পরাগ ঠিক কী করছে, কতটা এগোল- এসব আকাশপাতাল চিন্তা। এর ওপর আর মেয়ের ভাবনা ভাবতে পারে না সুমিতা। তাছাড়া ঢের দেরি ওর বড় হওয়ার। যতই সে নিশ্চিন্ত হতে চায় এই ভেবে, ততই মেয়েটা অনুপুংক্ষ বাড়তে থাকে। তরল থেকে কঠিন, ক্রমে পুরো কঠিন খাদ্যাভ্যাসে চলে আসে, কথা বলে, টলোমলো পায়ে হাঁটতে থাকে। তখন আবার নতুন সমস্যা তৈরি হয়। নতুন হাঁটতে শেখা একটি শিশুকে কিছুতেই ঘরে আটকে রাখা যায় না, সে বেরিয়ে আসে, কেবলই বাইরে বেরোয়, আর তার হাঁটা এমনই লোভনীয় দৃশ্য যে চোখ ফিরিয়ে রাখা যায় না, হাত গুটিয়ে রাখা যায় না। অদৃশ্য দেওয়ালের ওপারের হাত, চোখ শিশুটিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় প্রায়ই। সে কী টেনশন। সুমিতা অসাড়ে কাজকর্ম করে যায়, মেয়ে ফেরত না আসা পর্যন্ত প্রাণে থাকে না। কথা শিখেই শিশুটি নতুন চেনা মুখগুলোর নাম জেনে নেয়। কী বিড়ম্বনা! সুমিতা না শেখালেও সে ওপর থেকে সব ঠিকঠাক শিখে আসে আর অষ্টপ্রহর ডেকে চলে। বসন্তের কুহু রবের মতো সেই ডাক অস্থির করে তোলে সুমিতাকে। আর কী আশ্চর্য, এসবই হয় পরাগের অনুপস্থিতিতে। পরাগ বাড়ি ফিরলেই সেই হাত-মুখ-চোখ নিমেষে উধাও, শিশুটিও বাবা বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, অন্য ডাকগুলোর কথা তার মনেও থাকে না। পরাগকে এসব জানালে সে অসহায় মুখে বলে – ‘কিন্তু বাচ্চা নিয়ে তো রাজনীতি চলে না’ সুমিতা তার দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকায়, হিসহিসে গলায় বলে ‘এবার আমাদের যেতেই হবে। না গিয়ে আর উপায় নেই। মেয়ে বড় হচ্ছে’
মেয়ে বড় হচ্ছে, মেয়ে বড় হচ্ছে – এই ঘটমান বর্তমানের ঢেউয়ে হাবুডুবু খায় সুমিতা। একসময় তাকে মেয়ের জুতোর ফিতে বাঁধা শিখতে হয়, টাই ঠিকঠাক ঝুলিয়ে দিতে হয় গলায়, নীলসাদা উজ্বলতায় নিজেদের অপারগতা ঢেকে মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে হয় একদিন। যতই হোক, মেয়ের তো একটা ভবিষ্যৎ আছে। মেয়ের ভবিষ্যৎ আর তাদের চলে যাওয়া- এই দুইয়ের মধ্যে কোনটার অনিশ্চয়তা বেশি- তা স্পষ্ট করে না বুঝেই ওদের জীবন চলে। মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যেতে হয়, রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় গেটের সামনে সারাক্ষণ, অবিশ্রান্ত কলকলানির মধ্যে ফিরিয়ে আনতে হয় আবার, পথপ্রান্তের দোকানে ঢুকে পড়তে হয় চকোলেট, কুড়কুড়ে কি একটা সুগন্ধি ইরেজারের জন্যে, বাড়ি ফিরে আবার হোমটাস্ক, এক-দু নম্বরের জন্যে চুলচুলি, ঘুমন্ত চোখে বইখাতা গুছিয়ে রাখা। গুছিয়ে রাখা আর বার করা। বার করা আর পরিবেশন করা। ফ্রিজের খাবার আর মেয়ের বইখাতা। তাদের জীবনধারণ আর মেয়ের ভবিষ্যকিরণ। ঘরের মধ্যে এখন আরও অনেক কিছু। হিটার, মাইক্রোওভেন, ইগনিশন। ইচ্ছে করলে টাটকা খাবার খেতে পারে ওরা। মাঝে মাঝে খায়ও। সেসব দিন অষ্টমীর খিচুড়িভোগের মতো উৎসব কিন্তু আকস্মিকতা নেই। স্বাভাবিক। মেয়েটি কোন প্রশ্ন তোলে না। টাটকা, বাসি, কড়ে আঙুলের মতো তাদের ঘর আর ইয়েতির থাকার মতো এই বাড়িটা- কেন? কী জন্য? এসব প্রশ্ন তো কখনো ওঠে না তার। সেই কলকল করে ঘুম থেকে ওঠে, যা দেওয়া হয় তাই খায়, যা পড়তে বলা হয় তাই পড়ে,নাচতে নাচতে স্কুলে যায়, আর খাওয়া, পড়া, স্কুলে যাওয়ার মতোই সহজে সে ওপরে যায়, লাফাতে লাফাতে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে যায়, নিয়মিত। দোতলা থেকে তার কলহাস্য পাইপ ফাটা জলের মতো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, সুমিতার চোখে ছিটকে আসে সেই জলকণা।
তিনতলার ছাদ থেকে দুদদাড়, দুপদাপের শব্দ আসে। শুধু ছোট্ট দুটি পা নয়, সংসারের নিত্য ব্যবহৃত, ক্ষয়ে যাওয়া, কড়া পড়া পাও থাকে তার পাশাপাশি। ওপর থেকে ভেসে আসা সেইসব শব্দ, হাসি সরাসরি বুকে এসে লাগে। কিন্তু ‘বাচ্চা নিয়ে তো রাজনীতি চলে না’- পরাগের এই ম্যানিফেস্টো বেঁধে রাখে তাকে। পরাগ এমন বলতেই পারে কারণ সে অনেকটা সময়, মানে একটা বাড়ির জেগে থাকার অনেকটাই সময়ই, বাইরে কাটায়। কিন্তু সুমিতার তো তা নয়। ও তরফের ডাইনিং স্পেস পেরিয়ে তাকে বার বার ঘর পেরিয়ে বারান্দায় আসতে হয়। বারান্দার এককোণে কোন রকমে তার কাপড় মেলবার ব্যবস্থা। এখন কাঁথা নেই, কিন্তু মেলবার জিনিস অনেক। গ্রিলের বাঁকাচোরা দিয়ে যেটুকু রোদ আসে, সরে সরে যায়, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাকেও বারবার ভেজা জামাকাপড় সরিয়ে দিতে , উল্টে দিতে বারান্দায় বারবার আসতে হয়। মেয়েকে স্কুলে, আঁকার ক্লাসে, কম্পিউটার সেন্টারে, কারাটে ক্লাসে আনা নেওয়া করতে সেই ডাইং স্পেস পেরোনো, জলজ্যান্ত মানুষগুলোকে নেই মনে করে ফুঁড়ে চলে যাওয়া। এইভাবে তার নীতিবোধ ভোঁতা হয়ে যায়। মেয়ের প্রশ্ন না করার ক্ষমতা তাকে আরও অসাড় করে দ্যায়। যদিও পরাগ তা নিয়ে বেশ গর্বিত। ‘দেখেছ মেয়ে কত বুঝদার, আমাদের অবস্থার সঙ্গে কীরকম মানিয়ে নিয়েছে’ কিন্তু সুমিতা ভাবে, ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে গেলেও এখনো তো সে বাচ্চা, এতটা কৌতূহল অতিক্রান্ত হয়ে সে তাদের জীবনপ্রণালীতে ভেসে যাচ্ছে কী করে। এই নীচ, ওপর, অদৃশ্য দেওয়াল, কঠিন কঠিন মুখগুল-সব এত স্বাভাবিক সহজাত মনে হয় তার? হাতে তেল মেখে কাঁঠাল ছাড়ানর এই পরিপক্বতা- এতখানি কি নিজের সন্তানের কাছে আশা করেছিল, এখনই? সে বরং চেয়েছিল অন্যতর কিছু। মনের গোপনে পুষে রেখেছিল লাল রঙের বাসনা। অমিতাভ বচ্চনের মতো স্বপ্নে বারবার বাবা মার আততায়ীর অস্পষ্ট মুখ দেখে প্রতিশোধের বাসনা আচ্ছন্ন করে রাখবে সমগ্র জীবন- এতটা না হলেও একটা স্বাভাবিক, প্রত্যাশিত ঘৃণাও কি তার মধ্যে থাকবে না? বার করা, গুছিয়ে তোলা, পাঠানো, ফিরিয়ে আনা-অবিরাম এই ক্রিয়াস্রোতের মধ্যে থেকেও সুমিতার ক্ষোভ শেষ হতে চায় না। সে তো এই মেয়ের জন্যেই নতুন করে কাজে বেরোল না। সে তো এইভাবে মেয়ের জন্যে লোক রাখতে পারবে না। যেরকমভাবে তারা বেঁচে আছে, তাতে কোন লোকই কাজ করতে আসবে না, যত টাকাই দেওয়া হোক না কেন। কেউ টিকে যেতে চাইলেও প্রতিমুহূর্তে যে বাক্যবাণ ধেয়ে আসবে রামায়ণ, মহাভারত টেলি-সিরিয়ালের মতো ‘আক্রমণ আক্রমণ’ করে, তাতে লোহাও ক্ষয়ে যাবে। যদি একটা রোবট-টোবট কিছু পাওয়া যেত। পরাগ যেমন ম্যাজিক কার্পেটে চড়িয়ে ঘরটাকে উড়িয়ে যেতে চায় ম্যদানে, সুমিতাও তেমনি একটা যন্ত্রমানবের স্বপ্ন দেখে। যা হোক করে বেঁচে থাকতে গেলেও তো একটা স্বপ্ন লাগে, ন্যূনতম একটা স্বপ্ন।
সেই ন্যূনতম স্বপ্নটাও দিনে দিনে ফিকে হয়ে আসে। পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে এক সময় কী-ই বা থাকে হাতে? সুমিতা যে পরাগের কাছ থেকে স্বপ্নটা ধার করবে তারও উপায় নেই। সুমিতার তাড়নাতেই পরাগ আজকাল প্রচুর টিউশনি করে, ভুলে যাওয়া অংক নতুন করে কষে, ঝালিয়ে নেয় ব্যাঙ্গের পৌষ্টিক তন্ত্রের কাজকর্ম। মেয়েও এমন লাফিয়ে লাফিয়ে ক্লাসে উঠছে যে সুমিতার অচর্চিত বিদ্যা কোন কাজেই লাগে না। পরাগকে দরকার হয়। তাই পরাগের স্বপ্ন দেখার সময় নেই আজকাল।স্বপ্ন না দেখুক, বাড়ি তো দেখতে পারে। আগে যেমন দেখত। হয়তো দেখে, কিন্তু এসে বলে না কিছুই।কিংবা এত অনুচ্চারে বলে যে সুমিতার কানে পৌঁছয় না। আগে পৌঁছত। যখন কয়েক মাসের কন্যাকে মাঝখানে রেখে মশারির চালে বিনি সুতোর ফুল ফোটাতে পারত পারা। মেয়েটি ছিল যেন একটা ভঙ্গুর মুহূর্ত, তাকেই সাবধানে, যত্নে, টানটান তাদের দিন কেটে যেত। চলে যাওয়ার স্বপ্নে টানটান দিনগুলো। শুধু একটা মুহূর্ত। একটু হাসি, একটু তাকানো, পায়ের আঙুল চোষা-মেয়ের ওইটুকু বেঁচে থাকাতেই ধন্য হয়ে যেত তারা। কিন্তু সময়ের সেই ভঙ্গুরতা সময়ই মুছে দিয়েছে। মেয়ের বেঁচে থাকার সেই পলকা ভাবটাও আর নেই। ভবিষ্যৎ- গ্রানাইট পাথরের মতো এই শব্দটা ক্রমে চেপে বসে ওদের বুকের ওপর। চলে যাওয়ার স্বপ্নটা তত উত্তেজক মনে হয় না। সেই বাড়িটা কিংবা ফ্ল্যাটটা, কিংবা কোয়ার্টার যতটা অব্দি হয়েছিল, সেই আধখ্যাঁচড়াই পড়ে থাকে। লাগোয়া ছাদ থাকল কি না, দোতলা না তিনতলা- সেসব খুঁটিনাটি নিয়ে কেউ এখন ভাবে না। বাড়ি নয়, সমস্যাটা যেন বাড়ির রসদ, যেন অনেক অনেক টাকা জমিয়ে ফেলতে পারলেই এই অন্ধকূপ থেকে বেরিয়ে পড়া যাবে। তাই পরাগ অনেক অনেক টিউশনি করে, সুমিতা টিভির রকমারি গেম শো-তে ফোন করে করে ক্লান্ত হয়। লাইন লাগাও আর জিতে যাও- ওর ঘুমের গায়েও বুঝি জড়িয়ে থাকে জিংগল। মেয়েদের পত্রিকার পরামর্শ মতো তাকে সুন্দরীও থাকতে হয়। নিয়মিত ফেসিয়াল, চুলে হেনা, হালকা ব্যায়াম, মাপা খাবার আর প্রচুর প্রচুর জল। এসব করতেও প্রচুর সময় লাগে, যত্ন আর শ্রম। চুলে হেনা লাগাতে লাগাতে সুমিতার কি মনে পড়ে সে একসময় কতরকমভাবে চলে যাওয়ার মুহূর্তটাকে ছকে রেখেছিল? হয়তো মনে পড়ে কিংবা পড়ে না।কিংবা মনে পড়ে বলেই সে প্রতিমুহূর্তে মেয়েকে ফার্স্ট হবার জন্য তাড়া লাগায়। প্রতি ক্লাসে ফার্স্ট না হলে যে সফল হওয়া যাবে না, আর সফল না হলে এখানেই পচে মরতে হবে- একথা সে দিনে দুবার ওষুধ খাওয়ার মতো নিখুঁত অভ্যাসে আওড়ে যায়। মেয়ে অন্ধকূপ শব্দটায় ভয় পাওয়ার কিছু দেখে না। সে তো স্কুলে যায়, তাছাড়া কতরকমের ক্লাস। বাড়িতেও ছাদের স্বাদ জানা আছে তার, আকাশেরও। তার সঙ্গে ছোটাছুটি করা পাগুলোর জোর যত কমে আসে, মনেরও, তত সে বড় হয়ে যাচ্ছে, তত ভয়হীন। মায়ের সতর্ক বার্তায় আমল না দিলেও সে প্রাণপণে ফার্স্ট হবার চেষ্টা করে, হয়ও। বোঝা যায়, শিখরে থাকার অভ্যাস সে বেশ রপ্ত করে ফেলেছে।

নতুন নতুন চিন্তা এসে গ্রাস করে সুমিতাকে। মেয়ের ভর্তির ফর্ম তোলা, সঠিক কেরিয়ার বাছা, তার থেকেও মারাত্মক মেয়ের ত্বকের নিচ থেকে ঠিকরানো ওই অচেনা আলো। এক রাতে মেয়ের পাশ থেকে নেমে পরাগের ক্যাম্প খাটের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে। ফিসফিস করে বলে ‘দেখেছ?’
আচমকা ঘুম ভেঙে বোকার মতো তাকায় পরাগ। সুমিতা কি বাড়ি দেখার কথা বলছে আবার! অপরাধবোধ বুকের নিচে ভারি হয়। সে ভয়ে ভয়ে বলে ‘না’।
‘তা দেখবে কেন? মেয়ে বড় হয়ে গেছে। বইয়ের ব্যবস্থাও কি আমাকে করতে হবে?’
সমস্যাটা এত তুচ্ছ দেখে পরাগ ঘুমের অতলে তলিয়ে যায়। সেই অন্ধকার ঘরে একা জেগে বসে বিলাপ করে সুমিতা। এই রাক্ষুসে বাড়ি, অপদার্থ স্বামী আর মেয়ের বাড়াবাড়ি রকমের বড় হয়ে যাওয়া। বহু বছর পরে তার মনে হয় চলে যাবার কথা। যখন যেদিন চলে যাবে… এখন আর তিনজনের চলে যাবার কথা ভাবল না সে। বরং এই ছাই সংসারের মুখে নুড়ো জ্বেলে যেদিকে দু চোখ যায়, যদি চলে যাওয়া যেত…

তার বিলাপ সুগন্ধি তেলের মতো ফোঁটা ফোঁটা ছড়িয়ে যায় পরাগের ঘুমের মধ্যে। পরদিন ঘুম থেকে উঠে বেশ চনমনে লাগে পরাগের। মেয়ে তখনো ঘুমোচ্ছে। মেয়ের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে কী যেন দেখে সে। তারপর সুমিতার হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে বলে ‘জাস্ট মাস তিনেক সময় দাও’
বাইশ বছর ধরে যে পরাগ একটা ভাড়াবাড়িও ঠিক করে উঠে যেতে পারেনি, সে মাস আড়াইয়ের মধ্যে মেয়ের বিয়ে লাগিয়ে দ্যায়। মেয়ে যেমন নির্বিকারভাবে নিচ থেকে ওপরে গেছে, টপাটপ ফার্স্ট হয়ে ক্লাসে উঠেছে, তেমনি বিয়ে করে নেয়। ওর এই সহজ সম্মতিতে সুমিতা একটু খুশি না হয়ে পারে না। মুখে না বললেও মেয়ে যে এই অন্ধকূপ থেকে বেরোনোর অপেক্ষা করছিল, এটা যেন তারই প্রমাণ।
মেয়ে জামাইকে রওনা করিয়ে সুমিতা কাঁদতে কাঁদতে পরাগকে বলল ‘ও তো বেঁচে গেল, আমার কী হবে?’
‘ছিঃ’ না বলে ওর পিঠে হাত রাখল পরাগ।
অষ্টমঙ্গলায় ওরা আবার এল। যেমন নৃত্যচঞ্চল পায়ে নিচ থেকে ওপরে যেত তেমনি। মেয়ের মুখে কেবল দক্ষিণ খোলা বারান্দা, হাওয়া, রোদ আর আকাশের গল্প। মেয়ে জামাইয়ের জন্যে রাঁধতে রাঁধতে অন্যমনস্ক হয়ে যায় সুমিতা। পরাগ একেকবার চোরের মতো এসে বলে ‘ তাহলে মেয়ে খুব সুখী হয়েছে বলো। প্রতিম একেবারে হীরের টুকরো ছেলে’
সুমিতার যেন কেবলই মনে হয় এ সুখ স্কোয়ার ফুটের সুখ। রাতে মেয়ে জামাইকে ঘরে শুইয়ে শতরঞ্চি আর বালিশ নিয়ে বারান্দায় আসে ওরা। প্রতিম আপত্তি করে। মেয়ে বলে ‘একটা রাত তো আমরা ওপরেও শুতে পারি। ঠাম্মা বলছিল কত ঘর খালি পড়ে আছে’
সুমিতা চোখে ধিকিধিকি আগুন আর গলায় হিসহিসে খুশি নিয়ে বলে ‘আজ এ ঘরেই শুতে হয়’
বারান্দাত শতরঞ্চি বিছোতে গিয়ে থেমে যায় সুমিতা। জ্যোৎস্না জাজিম পেতে রেখেছে যে। ফাল্গুনের রাত বাড়ে, চাঁদ ছড়ায়, হাওয়ার উদ্দেশ্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়। চুপচাপ সিগারেট শেষ করে সুমিতার চোখে চোখ রাখে পরাগ। সুমিতার বুক ধকধক করে। যখন যেদিন চলে যাবে…
‘আজই কি সেই সময় নয়?’
‘আজই সময়’
‘এখন?’
‘এখনই’
শতরঞ্চি, বালিশ বারান্দায় পড়ে থাকে। ফাল্গুনের নিশুত রাতে রাক্ষুসে বাড়ি ঘুমোয়। রাক্ষুসে বাড়ির কড়ে আঙুল ঘরে মেয়ে জামাই ঘুমোয়। সুমিতা আর পরাগ এক মুহূর্ত সেই বন্ধ দরজার দিকে তাকায়। কেমন একটা খলখলে হাসি ওদের শরীরে বেজে ওঠে। তারপর বারান্দার গেট খুলে, উঠোনের দরজা খুলে ডানহাতে মাধবীলতার ঝাড়, বাঁহাতে কৃষ্ণচূড়া ফেলে ওরা ঊর্ধবশ্বাসে চলে যায়। হ্যাঁ, এভাবেই ওরা, শেষ পর্যন্ত চলে যেতে পারে।

Facebook Comments

Leave a Reply