কাশবনের ভাষ্কর্য : শুভংকর গুহ

fail

[“নিজের কিছু কথা ভোরের পাখির মতো সত্য হয়, এই পড়ে পাওয়া জীবনে অস্বীকার করি কি করে? নিজের স্মৃতিকথার সাথে এক ঝাঁক ছাতারে উড়ে আসার দৃশ্যকে মেলাতে গিয়ে দেখি, সবটাই বাতাসে উড়ে যাওয়া খইয়ের মতো লুটোচ্ছে বসতখানার উঠোন জুড়ে। কিছু কথা তুলে নিলে অনেক কথাই আবার যেন থেকে যায়, বাকি শুধু কল্পনা কৃষিজমি কর্ষণের মতো এক অভ্যাস, আত্মকথাকে ক্রমশ উর্বর করে তোলে।”- কথাসাহিত্যিক শুভংকর গুহের আত্মকথা ‘কাশবনের ভাষ্কর্য’। বাবার কর্মসূত্রে পানাগড়, আগ্রা, লক্ষ্ণৌ, মথুরা, কানপুর, এলাহাবাদ সহ ভারতের বিভিন্ন শহরে বসবাস করেছেন লেখক। সেই যাপনের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি এক সময়ের দলিল নিঃসন্দেহে।]

১৮

বড় হয়ে ওঠার মধ্যে আনন্দ ও বিষাদ আছে কি না, জানিনা। কিন্তু বয়সে প্রবীণ হলে এই বোধ অবশ্যই আক্রান্ত করে, যত বয়স হচ্ছে, ততই বাস্তব নিয়তির দিকে আমরা এগিয়ে যাই। এটি চিরায়ত এক মৌন সনাতনী বৌদ্ধিক বোধ, আমাদের প্রতিনিয়ত আক্রান্ত করে। জীবজগতের প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আরও একটি কথা অবশ্যই জুড়ে যায়, যার বিপরীত অর্থ, অর্থাৎ বিনাশ। ঠিক যেভাবে জুড়ে যায় মানবজীবনের বেড়ে ওঠার স্তরগুলি, কিশোর, যৌবন, তরুণ, মধ্য ও প্রবীণ। সমস্ত স্তরগুলি বা মানবজীবনের পর্বগুলি নিয়েই একটি সম্পূর্ণ মানবজীবন।
আমাদের ছেলেবেলার প্রথম দর্জি কাকু বা উত্তরপ্রদেশে থাকাকালীন আমরা যেমন বলতাম টেলর আঙ্কল তেমনি এক টেলর আঙ্কলের কথা না হয় এই সামান্য অবকাশে বলে ফেলা যাক। হিন্দি ভাষায় গুঙ্গা মানে বোবা। আগ্রা শহরের মিনা বাজারে তেমনি এক বাঙালি টেলর আঙ্কল ছিলেন, তিনি ছিলেন গুঙ্গা। বাবা তাঁকে আবিষ্কার করেছিলেন, চকবাজারে ঘুরতে ঘুরতে। তার কথা মনে হলে সত্যজিৎ রায়ের অনবদ্য সৃষ্ট জটায়ুর কথা মনে পড়ে। সেলুলয়েডে জটায়ু ঠিক যে ভাবে আবির্ভূত, গুঙ্গা টেলর আঙ্কল আমার স্মৃতির ক্যানভাসে ঠিক সেই চেহারা নিয়েই আজও বসবাস করছেন। সামনের দিকে চকচকে তেল মসৃণ টাক, নাকের নিচে গোঁফ ও পুরু লেন্সের চশমা, আকারে খাটো, ঊষা সেলাইয়ের মেশিন চালাতেন ঝুঁকে পড়ে। সেলাই করার সময় অনবদ্য তাঁর মনোযোগকে পাখি শিকারির মতো মনে হত। টেলর আঙ্কলের কাপড় সেলাই বুনে যাওয়ার পদ্ধতিকে মনে হত নদীর ঢেউয়ে শুশুকের পিঠ ভাসিয়ে চলে যাওয়ার মতো। যারা জলের মধ্যে অবিরত তাদের গতির সেলাই করে যায়।
তার একটি দোকান ছিল ভরা বাজার মহল্লার মধ্যেই। দোকানের সামনে একজন সবজি বিক্রেতা কাঠের পাটাতনের ওপরে টিণ্ডার পাহাড় নিয়ে বসতেন। টিণ্ডা উত্তরপ্রদেশের ভীষণ জনপ্রিয় সবজি ফসল, অনেকটা উত্তরবঙ্গের স্কোয়াশের মতো। তিনি ছিলেন টিণ্ডার পাইকারি বিক্রেতা। পাল্লা ছাড়া তিনি টিণ্ডা বিক্রি করতেন না। এক পাল্লা মানে পাঁচ কেজি। আর দুই পাল্লা মানে দশ কেজি। বাবাকে দেখলেই টিণ্ডা বিক্রেতা খুব খুশি হয়ে বলতেন, কেমন আছেন ফৌজি সাহাব? বাবা বলতেন, আপনি কেমন? এরপরেই বাবার সাইকেলে ঝোলানো ব্যাগের মধ্যে টিণ্ডা ভরে দিতেন। ভাবিজিকে বলবেন, গোলমরিচ দিয়ে ঝোল রান্না করতে। সত্যি সত্যি মায়ের হাতের রান্না করে ফেলা, গোলমরিচ দিয়ে টিণ্ডার ঝোলের স্বাদ আজও যেন মুখে লেগে আছে।
বাবা প্রায়ই গুঙ্গা টেলর আঙ্কলের দোকানে ঢুঁ মারতেন। বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতেন। কলকাতার কথা, পূর্ববঙ্গের কথা। টেলর আঙ্কলের আদি বাড়ি না কি পাবনা জেলার অন্তর্গত একটি গ্রামে ছিল। যে ভাবে তিনি উঁ উঁ শব্দ করে ছেলেবেলার গ্রামের কথা ইঙ্গিতে বলতেন, আমি মনে মনে গ্রামগুলির নাম এখন কল্পনা করে বলতে পারি, পাখি রঙ, বাঁধের বাড়ি বা পাতা নিঝুম ও ঐক্যবিহারি। হ্যাঁ, আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া কত গ্রামের নাম কাল্পনিক নামের দ্বারা চিহ্নিত অবচেতনে চিহ্নিত হয়ে যায়। এক একটি হারিয়ে যাওয়া জনপদের নাম যদি কল্পনায় নামকরণ করতে পারি, তাহলে তা খুবই মজার হয়। কল্পনার নামকরণহীন জনপদগুলিকে কেন যে উৎসারিত শব্দ দিয়ে সাজাই না, যদি সাজাই তাহলে, নামকরণের এক গহীন আনন্দ উপলব্ধ হয়।
আমার খুবই অবাক লাগত, বাবা টেলর আঙ্কলের সঙ্গে কত কথা বলতেন অদ্ভুত পদ্ধতিতে। বাবাকে গুঙ্গা আঙ্কল শিখিয়ে দিয়েছিলেন কথা না বলে শুধু ঠোঁট নেড়ে হাতের ইঙ্গিতে তার সঙ্গে কি ভাবে কথা বলতে হবে। এই অদ্ভুত বিষয়টি আবিষ্কার করেছিলাম, অনেক বছর পরে, দূরদর্শনে ঠিক একইভাবে সংবাদ পরিবেশন করতেন সংবাদ পরিবেশক মূক ও বধিরদের জন্য। বাবাকে বলেছিলাম, খবরে উনি যা বলছেন, তুমি কি বুঝতে পারছ? বাবা বলেছিলেন, কিছু কিছু বুঝতে পারি, আগ্রায় সনাতন গুঙ্গা টেলর অনেকটাই শিখিয়ে দিয়েছিল।
যখন আর্ট কলেজে পড়ছি, আমাদের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রবন্ধু যাকে আমরা সবাই অভিজিৎ নামে জানতাম, তার সঙ্গেও আমি বাবার জানা পদ্ধতিতে কথা বলতাম, অভিজিৎ আমার সব কথাই বুঝতে পারত। অভিজিৎ জলে ভেজা হ্যান্ডমেড পেপারের ওপরে চমৎকার জলরঙয়ের কাজ করত। আমি আবার পেপার হোয়াইট ছেড়ে জলরঙে একটু ডিটেলে কাজ করতে ভালবাসতাম। আমাদের দুইজনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল। হেসে হেসে প্যাঁ প্যাঁ করে অভিজিৎ যা বলত আমি অনেকটাই বুঝতে পারতাম।
যাই হোক, টেলর আঙ্কল আমার শরীরের মাপ নিয়ে চমৎকার শার্ট ও হাফপ্যান্ট সেলাই করে দিয়েছিলেন। যেদিন তিনি, ফিতে ধরে শরীরের মাপ নিতে নিতে খাতায় লিখে চলেছিলেন বহর ও লম্বার অঙ্ক, বুঝতে পারছিলাম, আমি বড় হয়ে উঠছি। মানুষের শরীর গাছের মতো, বেড়ে উঠলে বোঝা যায়না। কিন্তু গাছের সাথে সাথে মানুষের শরীরও বড় হয়। মানুষ কেন প্রাণী জগতের সবকিছুই যেন গাছের মতোই। গাছ বড় চুপিসারে বড় হয়, আর মানুষ বড় হয় তার শারীরিক অহংকারে।
বাবা খাদির জামা প্যান্টের কাপড় খুব পছন্দ করতেন। চমৎকার সব পাকা রঙয়ের খাদির কাপড়ের থান। পরে বুঝতে পেরেছিলাম, তখনকার দিনে সাধারণ মিলের কাপড় থেকে খাদির কাপড় অনেক বেশি সস্তা দরে পাওয়া যেত। আমাদের পরিবারে খাদির কাপড় ও বিছানার চাদরের খুবই চল ছিল, মায়ের মানসিকতা কিছুটা বাবার চাইতেও আধুনিক ছিল বলে, অনেক সময় বিষয়টি নিয়ে বাকবিতণ্ডা লেগেই থাকত। বাবা বলতেন, সস্তায় যদি নিজের দেশের কাপড় উচ্চমানের পাওয়া যায় তাহলে ব্যবহার করব না কেন? খাদির কাপড় তখন ভারতবর্ষের গ্রামে গ্রামে প্রস্তুত হত। সেই প্রচলন এখন অনেক কমে এসেছে। এখন খাদির কাপড়ের দামও খুবই উচ্চমানের।
সবার প্রথম জীবনে জামা কাপড়ের সেলাইয়ের মাপের কথা অনেকরই হয় তো মনে থাকতে পারে, বা নাও থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের শরীরের মাপের বৃদ্ধি ও হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে মনের মাপেরও বহর নামে ওঠে।
মিনা বাজারের টেলর আঙ্কলের দোকানের উল্টোদিকে বয়ামে বয়ামে বিক্রি হত, চালকুমড়োর পেঠা যাকে আমরা মোরব্বা বলি, আর ডালমুট। আগ্রা শহরের পেঠা ডালমুট ভারতবিখ্যাত। শুনেছিলাম, পেঠার ইতিহাসের সঙ্গে মোঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসের এক গভীর সম্পর্ক আছে। আগ্রা শহরের বনেদি প্রবীণ জনাবদের অনেকেই মনে করেন, চালকুমড়োর পেঠা সম্রাট শাহজানের বেগম, মুমতাজ বেগম খুবই পছন্দ করতেন। আগ্রা শহরের পেঠার বাজারের আন্তর্জাতিক বাজার আজও আছে। শহরের সমস্ত উপাদান ও উপকরণের সঙ্গে মোঘল ইতিহাসের গভীর সম্পর্ক, আজও স্মৃতিকে অভিভূত করে।
আঙ্কল টেলরের সেলাই করা জামাকাপড় লোহার তোরঙ্গে ভরে উঠতে থাকল। বড় সংসার বাবা মায়ের। সবার একটি একটি করে পোশাক সেলাই হলে তোরঙ্গ ভরে উঠত। খাদির কাপড়ের বাবার কোট প্যান্ট, আমাদের খসখসে হাফ প্যান্ট জামা ও বিছানার চাদরের মধ্যে একপ্রকার স্বদেশী গন্ধ ছিল। পুরুষ ও মেয়েদের ফ্রক ও হাফ প্যান্ট হল শরীরে অতিথির মতো। খুব বেশি বছর ধরে তা থাকেনা। বয়স বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এই সব পোশাকগুলি কোথায় যেন হারিয়ে যায়। বাবা মায়ের সংসারে দুই তিনটি লোহার তোরঙ্গ ছিল। সেই সব তোরঙ্গগুলি কোথায় যে নিরুদ্দেশে চলে গেল কে জানে? প্রতিটি সংসারেই বিভিন্ন গৃহস্থ সামগ্রী কোথায় যে হেঁটে হেঁটে চলে যায়, কে জানে? প্রবীণ বয়সে এসে সেই সব কথা মনে পড়লে খুবই কষ্ট হয়। কেন জানি বাবা মায়ের মৃত্যুর পরে তাঁদের সংসারের ব্যবহৃত চর্চিত উপকরণগুলি কেমন করে যেন ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে ওঠে। আমার শৈশবের কত কিছুই যে কোথায় চলে গেল, চায়ের কেটলির মধ্যে জমানো খুচরো তামার পয়সা, বাবার তোরঙ্গের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলাম বেনেবউয়ের হলুদ পালক, লোহার চকচকে তকলি, আর ব্রিটিশ আমলের পশমের কুল ওয়াটার ব্যাগ। আমরা ট্রেনে করে যখন যেতাম, তখন ওই পশমের কুল ওয়াটার ব্যাগটি খুব কাজে লাগত। পশমের কুল ওয়াটার ব্যাগটি বাবার সংগ্রহে অতি মূল্যবান সংগ্রহ ছিল। বাবা বলতেন, তিনি যখন কর্মজীবনে প্রথম প্রবেশ করেন, তখন তিনি এক ব্রিটিশ অফিসারের কাছ থেকে উপহার পেয়েছিলেন।
দুর্গাপুজো কি ভাবে এসে চলে গেল বুঝতেও পারলাম না। শুধু মনে আছে, রাতারাতি বাঁশের মাথায় লাগানো ইস্পাতের ফলা দিয়ে টানিয়ে দেওয়া হল রং বেরঙয়ের মতো ফুল আলপনা বাহারি লতা গুল্মলতার শামিয়ানা, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তৈরি হয়ে গেল প্যান্ডেল, তারপরে মাটি খুঁড়ে গর্ত করে তার মধ্যে লকরি মানে লম্বা লম্বা কাঠের টুকরো ফেলে দেওয়া হল। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল, লোহার কড়াই চাপিয়ে দিয়ে সামরিক বাহিনীর লঙ্গরখানার পদ্ধতিতে রান্না প্রস্তুত। ক্যান্টনমেন্ট এরিয়ার সমস্ত বাঙালি পরিবার ও অন্যান্য প্রদেশের যারা ছিলেন সবাই এসে ভোজন করে, আর্মি অফিসিলয়াদের গিটার বাজানো আর হিন্দি ফিল্মি গান ও নাচ আর সবার শেষে পরস্পরের আলিঙ্গনের মাধ্যমে সৌজন্য বিনিময় হল। শুরু হল বিজয়ার প্রীতি সম্মেলন। আর্মির ট্রাক এলো, খুলে ফেলা হল সব আয়োজন, উনুনের গর্তে চাপিয়ে দেওয়া হল মাটি, সবকিছুই আগের অবস্থানে ফিরে গিয়ে, সামরিক বাহিনীর পরিবারগুলি ফিরে যেতে থাকল নিজেদের আশ্রয়ে। আমি বাবা মায়ের পিছনে পিছনে হেঁটে যেতাম নতুন জামার কলারের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে।
পরের দিন দুপুরে মা শ্বেতপাথরের চাকির ওপরে সুন্দর করে ময়দা গোলাকার করে বেলে তারপরে ছুড়ির ডগা দিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে কড়াইয়ের ঘিয়ে ছেড়ে দিলেন। ঘর ভর্তি হয়ে গেল ডালডার গন্ধে। সেই গন্ধ বিজয়া দশমী উৎসবের আনন্দ নিয়ে এলো। কাঁচের বয়াম ভর্তি হয়ে যেত নিমকিতে। আমরা চঞ্চল হয়ে উঠলাম। বাবা সকালেই নিজে হাতে বানিয়ে ছিলেন বোঁদে, রসে ফুলে সসপ্যানের মধ্যে ঢোল হয়ে গেছে। বাবার হাতে প্রস্তুত বোঁদের ছিল এক অনন্য স্বাদ। একটু বেশি আয়োজনের মধ্যে মা বেসনের গাঠি ভেজে চিনির রসে চুবিয়ে দিতেন। সাথে আগ্রার সুস্বাদু চালকুমড়োর পেঠা ও ডালমুট। এই সব উপকরণ দিয়ে দেওয়ালি না আসা পর্যন্ত চলত অতিথি আপ্যায়ন।
ক্যান্টনমেন্টের সব বাঙালি পরিবারই পরস্পরের বাড়িতে পরস্পরের বাড়িতে যেতেন। আর প্রতিটি বাড়িতেই কেউ না কেউ রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃতি করতেন, গান গাইতেন, চায়ের কাপে চলত আলোচনার ঝড়। উত্তম সুচিত্রা, প্রমথেশ বড়ুয়া, বনফুল, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠত। মিত্রবাবু যিনি তাঁর অফিসে বিভাগীয় হেডক্লার্ক ছিলেন, তিনি ছিলেন বাঙলা সাহিত্যের একজন নিবিড় পাঠক। কলকাতা কলেজ স্ট্রীট থেকে লোক মারফত কি ভাবে বই সংগ্রহ করে আগ্রায় নিয়ে আসতেন, সেই কথা বলে নিজেই আমোদ বোধ করতেন। আর চমৎকার দুইটি চোখ বড় করে, রবীন্দ্রনাথের সোনার হরিণ চাই আবৃতি করতেন, তা আজও আমার বেশ মনে আছে। সরল মনের মানুষ মিত্র বাবু যখনই আমাদের বাড়িতে আসতেন, আমাদের জন্য কিছু না কিছু উপহার নিয়ে আসতেন। বাঙালি পরিবার একত্রিত হলেই সবাই নিজেদের প্রাণের মাতৃভাষা বলে আহ্লাদ উপভোগ করতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রবাসী বাঙ্গালিদের ক্ষেত্রে এক বড় আশ্রয়। অনেক বাঙ্গালিকে বলতে শুনেছি, আমরা সেই ভাষায় কথা বলি যে ভাষায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্য রচনা করেছেন। প্রবাসী বাঙ্গালিদের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের মনিষী সকল এক বড় আবেগ।

বিজয়া দশমীর পরের পরদিন বাবা আমাকে নিয়ে চললেন সেই পুরানো আস্তানার দিকে, যে রাস্তাটি আগ্রা ফোর্টের সামনে দিয়ে চলে গেছে। আগ্রা ফোর্টের উল্টোদিকে সীমাহীন ধু ধু বালি মাঠ। দুপুরের রোদে বালি মাটির রঙ খোলতাই হলুদ। প্রায় কয়েকশো ঘোড়ার হাট বসে এই মাঠে। কানপুর, ফৈজাবাদ, লখনউ, সুলতানপুর, ফতেহপুর, বালিয়া, বরেলি থেকে ঘোড়া বিক্রেতারা আসে ঘোড়া বিক্রি করতে। গাধার পালও আছে। কয়েকজন ভেড়াও নিয়ে আসে। এই পশুর হাট দিন তিনেক চলে।
আমাদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল সুবেদার মেজর মাথুর সাহেবের সঙ্গে।
বাবা বললেন, প্রায় দুই বছর ধরে আছি, এই পশুর হাটের কথা কখনও শুনিনি। এখন দেখছি দশেরার রাবণের পোড়া কাঠামোর সাথে কয়েকটি ঘোড়া ও গাধা বালির মধ্যে ঘুরে ঘুরে ঘাসের মাথা খুঁজছে। তা এই পশুগুলি একা একা কেন বিচরণ করছে?
পশুর ভুখ, বড়ই একা হয়।
হ্যাঁ। জগত সংসারে ক্ষুধাও বড়ই একাকী হয়। পশু ও মানুষে তার পার্থক্য নেই।
মাথুর সাহেব বললেন, এই হাটের শেষে কয়েকটি পশু দুঃখ নিয়ে পড়ে থাকে। ওরা হচ্ছে সেই দুঃখী গাধা ও ঘোড়া। সারাজীবন মানুষের সমাজে খুনপসিনা এক করেছে। আজ ওরা বেওয়ারিস। যেগুলি আর বিক্রি হয়না, সেইগুলির বেশ কিছু এই মাঠের মধ্যে পড়ে থাকে। বিক্রেতারা ওদের আর নিয়ে যায়না। ওরা বুঝতে পারে, এই পশুগুলি আর বিক্রি হবেনা। এখানকার স্থানীয়রা কেউ কেউ নিয়ে যায়, পালনপোষণ করে, যেগুলি পড়ে থাকে, ওরা আশ্রয়হীন হয়ে কিছুদিন থাকে, তারপরে কোথায় চলে যায় কেউ বলতে পারেনা।
কথা বলতে বলতে আমরা আগ্রা ফোর্টের সামনে প্রশস্ত রাস্তার পাশে দাঁড়ালাম। রাস্তাটির নাম রেড ফোর্ট রোড। আর জায়গাটির নাম রকাবগঞ্জ। পাশেই দেখলাম, একটি পাথরের ঘোড়া আগ্রা ফোর্টের পাথুরে দেওয়াল ঘেঁষে স্থির হয়ে আছে। প্রতিদিন এই পাথুরে ঘোড়ার যত্ন নেওয়া হয়। কারণ, এই পাথুরে ঘোড়া হল, ঐতিহাসিক স্মারক। শত শত বছরের প্রাচীন লাল পাথরের এই ঘোড়া অনেক ইতিহাসকে বহন করে নিয়ে চলেছে।
মাঠের ওপরে দুঃখী অভাগা জীবন্ত ঘোড়াগুলি রোদের মধ্যে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছিল, মৃত পশুর আত্মা। বিক্রির জন্য বিক্রেতারা ঘোড়াগুলি এনেছিল, কিন্তু বুঝতেই পারেনি, রামলীলা ময়দানের শুকনো ঘাসের মতো ঘোড়াগুলিও মানুষের সমাজে খারিজ হয়ে গেছে।

[চলবে…]

Facebook Comments

Leave a Reply