শেষ মেট্রো : তৃষ্ণা বসাক

fail

[এই সময়ের উল্লেখযোগ্য কবি ও কথাকার তৃষ্ণা বসাক।
তৃষ্ণার মুক্তগদ্যের ধারাবাহিক, ‘শেষ মেট্রো’, ‘অপরজন’-এর পাঠকের জন্য।]

মহাবিপণিগুলো যেন পুরীর সমুদ্র

একবার পুজোয় নুরী চুড়িদার পেয়ে বেজায় খুশি হয়েছিলাম। সবুজ, ছোট্ট ছোট্ট ফুলছাপ সেই চুড়িদারের বিশেষত্ব ছিল কোমরের বাঁধা দড়ি। ‘নুরী’ সিনেমাটা আজও আমার দেখা হয়ে ওঠেনি। তাই বলতে পারব না, নায়িকা আদৌ ওরকম কোন পোশাক পরেছিলেন কিনা। তাতে কী, আমাকে পেড়ে ফেলবার পক্ষে ওই নামটাই যথেষ্ট ছিল। আসলে আমার এবং আমার মতো অনেকের মফঃস্বলি ছেলেবেলা রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতির সঙ্গে আশ্চর্য রকম মিলে যায়, থাক না তার মধ্যে এক শতাব্দীর বেশি ব্যবধান। ‘কাপড়চোপড় এতই যৎসামান্য ছিল যে এখনকার ছেলের চক্ষে তাহার তালিকা ধরিলে সম্মানহানির আশংকা আছে’।
প্রায় বছর দেড়েক মহা সমারোহে সেই নুরী চুড়িদার (তখনো সালোয়ার কামিজ আর চুড়িদারের তফাত জানা ছিল না, এখনো নেই !!) বুকে হাঁটু দিয়ে পরার পর আবিষ্কার করলাম বাঁ পাটা ডান পায়ের থেকে অন্তত এক হাত লম্বা। এই আবিষ্কারের অভিঘাত সেই প্রথম বাবার ক্রয়দক্ষতা সম্বন্ধে আমার বিশ্বাস টলিয়ে দিল। সেটাই বলা যেতে পারে আমার ফ্যাশন সচেতনতার প্রথম আলো।
আমার ছেলেবেলায় কেনাকাটার ব্যাপারটায় পুরোপুরি ছিল পিতৃতন্ত্রের প্রাধান্য। যদিও তখন অনেক পরিবারেই তুখোড় বাজারু হিসেবে মেয়েরা উঠে আসতে শুরু করেছে, তবুও বাবার প্রাবল্য কিংবা মায়ের অনীহা যে কোনও কারণেই হোক, আমাদের পরিবারে সেই সুবাতাস বইতে শুরু করেনি। কেনাকাটার ব্যাপারে আমাদের সেই সময়ের চোখে বাবার দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। যদিও তিনি মাঝে মাঝে অতি দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা দেখিয়ে ডাবল সাইজের জামা, এমনকি জুতোও কিনে ফেলতেন, যাতে কয়েকটা বছর হেসে খেলে চলে যায়। আসলে সেই সময়টাই ছিল এইরকম। বর্তমানের দাবিটা ধর্তব্যের মধ্যেই নয়, যা করা হচ্ছে সবই ভবিষ্যতের কথা ভেবে। ম্যাড়মেড়ে সরকারি চাকরির কদর যে কারণে, সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ, স্থায়িত্ব। বাবার কেনা জিনিস নিয়ে, বলা বাহুল্য কারো কোন হেলদোল ছিল না। জিনিসটা নতুন তো, তাহলেই হবে। সেসময় পুজোর বাজার করতে যাওয়াটা পারিবারিক উৎসবের মধ্যে পড়ত। ট্রেনে ঝমঝম করতে করতে কলকাতা যাওয়া, দোকানে দোকানে ঠাণ্ডা খাওয়ার আনন্দ, নিজের হাতে সে বছরের ট্রেন্ডি ‘সনম তেরি কসম’ জাতীয় কোন জগঝম্প পোশাক বাছা, তারপর বড় কোন হোটেলে খেয়ে আধো ঘুমের মধ্যে বাড়ি ফেরা।
আমার বৃত্তের মধ্যে সম্ভবত বাবাই শেষ পুরুষ বাজাড়ু। তার পর ‘সেল’আহত সময়ে দোকানে দোকানে মেয়েদের সদর্প উপস্থিতি। শিবকল্প পুরুষটি ভিড় বাঁচিয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ছাড়ছেন কিংবা বাড়িতে বেজার মুখে বাচ্চা সামলাচ্ছেন- এমনটাই ছিল প্রত্যাশিত দৃশ্য। বিপণিগুলো ছিল আক্ষরিক অর্থেই পুরুষবর্জিত। বিশেষ করে নিদারুণ চৈত্রমাসে, যখন পলাশ, কৃষ্ণচূড়ার রাঙা হাসি বাতাসকে চুরমার করে দ্যায়, তখন সেলের শ্যামের বাঁশিতে সাড়া দেন না এমন রমণীরত্ন বঙ্গদেশে দুর্লভ। চৈত্র তাই বঙ্গনারীর জীবনে শ্রেষ্ঠ পরকীয়া ঋতু।
কিন্তু আজকের মহাবিপণির যুগে (মেগামার্টের আর লাগসই বাংলা খুঁজে পাচ্ছি না) হায় নারী, তোমার দিন গিয়াছে। এই অত্যাধুনিক মহাবিপণিগুলি কাঞ্জিভরমের সঙ্গে কিনোয়া, হ্যারি পটারের সঙ্গে হাজার মলম, নারীর সঙ্গে পুরুষকে মিলিয়ে দিয়েছে। না দেখলে প্রত্যয় হবে না, দেশে এত পুরুষও ছিল! তাও আবার খলনলচে পালটে নতুন ব্র্যান্ডে। সেইসব গোমড়ামুখ, গোবেচারা, কুণ্ঠিত পুরুষেরা গেলেন কোথায়? বিপণিতে, বিপণিতে এখন মারকাটারি পুরুষের ছড়াছড়ি। এমনকি সেই বাপরে কি ডানপিটে বাচ্চারাও বাদ নেই। চৈত্রের গরমে এই ঠাণ্ডা ঝলমলে তকতকে মেগামার্টগুলো এখন সেরা পারিবারিক বিনোদন। আধুনিক নারী পুরুষ নাকি সম্পর্কের স্পেসে বিশ্বাসী। এই মহাবিপণিগুলোতে আর যাই হোক, আদ্যিকালের সেই ঘুপচি দোকানগুলোর মতো স্পেসের অভাব নেই। স্ত্রী যখন পছন্দসই শাড়ি বাছতে ব্যস্ত, স্বামী তখন নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে এই গরমে পরবার মতো ফতুয়া বাছছেন, কিংবা বলা যায় না তিনি এই কেনাকাটার সাগরবেলায় ঝিনুক কুড়োতে গিয়ে পেয়ে গিয়েছেন মুক্তো, পুরনো পাড়ায় তাঁদের পাশের বাড়ির সেই রাইকিশোরীকে। আসলে এই মহাবিপণি গুলো পুরীর সমুদ্রের মতোই। নতুন পোশাক কিনতে গিয়ে প্রায়ই পুরোনো প্রেম হাতে ফিরে আসতে হয়।

Facebook Comments

Leave a Reply