পাটের গণিত আর অচেনা সংকেত : অজয় ভট্টাচার্য

fail

আমাদের রাজ্যের চট শিল্পের তিন বছর আগের চুক্তির মেয়াদ ফুরোলো এই মার্চে। শ্রম দপ্তরের মধ্যস্থতায় সমস্ত ট্রেড ইউনিয়নের সাথে মালিক সংগঠনের প্রারম্ভিক আলোচনা শুরু হবে এবার। এই দশকের প্রথম দাবি সনদ পেশ হবার পরের থেকে নতুন চুক্তি সই করা পর্যন্ত দু’তরফেই পাওয়া, না পাওয়ার অঙ্কের হিসেবের খাতা মিলিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত সময়কালের অনেক অভূতপূর্ব ঘটনার অভিজ্ঞতা, অজানিত তথ্য-পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা আর আইনি পর্যালোচনায় এবারের বৈঠককে অনেক আকর্ষণীয় করে তুলবে আশা করা যায়।

২০১৯-এর মার্চে চটকলের ত্রিপাক্ষিক চুক্তি হয়। তারপরেই লোকসভা নির্বাচনের পরবর্তী দেড় বছরের মধ্যেই শ্রম আইনের আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে পার্লামেন্টে পাস হয়ে যায় চারটে লেবার কোড। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পরে একে একে কেন্দ্রীয় বিধি গুলি প্রকাশিত হতে থাকে শ্রমমন্ত্রকের ওয়েব পোর্টালে ২০২০-র শেষ অব্ধি। সেই মডেলের অনুসরণ করে যাতে ২০২১-এর এপ্রিল থেকে রাজ্যের এখতিয়ারে থাকা বিধি গুলি অনুরূপ ঢংয়ে চালু হয়ে যায় সেজন্য রাজ্য সরকার গুলিকে তৎপর হবার পরামর্শ ঘন ঘন আসতে থাকে কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রকের তরফে। এই বিষয়ে মত বিনিময়ের জন্যে রাজ্যের মাননীয় শ্রমমন্ত্রী ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দের সাথে একাধিক বৈঠকে বসেন। বিভিন্ন স্তরে আরও পর্যালোচনার জন্যে রাজ্য সরকারের তরফে এই শ্রম বিধির প্রয়োগের বিষয়টি এখন মুলতুবি রাখা আছে। পাটশিল্পের পরবর্তী চুক্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার প্রস্তাবিত নতুন চারটে লেবার কোড কেমন প্রভাব ফেলতে পারে সেটা দেখার। অন্য বহু রাজ্যের তুলনায় আধা ইচ্ছার সংকট এ রাজ্যে নেই – এটা মঙ্গলের।অভ্যস্ত ছন্দে পরিচিত আইনের পরিধিতে নতুন চুক্তির বুনট তৈরি হতে চলেছে সেটা পাটশিল্পের পক্ষে সন্তোষজনক। শ্রম সংস্কারপন্থীদের অপরিপক্ব জ্ঞানের দুর্বিপাকে সাধারণ শ্রমিক এই অস্থির, অব্যবস্থিত পরিস্থিতির শিকার হবে না এইটা স্বস্তির। কৃষি আইনের প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেবার পরে এবার মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস-এর বিষয়ে পরবর্তী কেন্দ্রীয় পদক্ষেপে কি প্রভাব পড়ে এই রাজ্যের পাট চাষে বা আগামী জুট ইয়ার গুলিতে জুট কমিশনের ভূমিকাতে সেটাও পর্যালোচনা হবে হয়তো।

২০২০ সালের মার্চ, অর্থাৎ চলতি চুক্তি যখন মাত্র এক বছরে, তখন থেকে ২০২২ অব্ধি তিন তিনটে করোনা অতিমারীর ঢেউ ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল এই চটকল গুলোকে। লক ডাউনের প্রটোকল বন্ধ করেছিলো চটের বস্তার উৎপাদন, কর্মহীন হয়েছিলেন লাখ লাখ শ্রমিক। রাজ্য সরকারী নির্দেশিকা মোতাবেক করোনা পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চটকলগুলিতে শ্রমিক উপস্থিতির হার ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়। কিন্তু ২০২০-২১-এ কেন্দ্রের চাহিদা মেটানোর মতো যথেষ্ট পরিমাণে চটের বস্তার উৎপাদন না করতে পারার জন্যে মিলগুলোতে ভীষণ সমস্যা তৈরি হয়। ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়লেও রোজগার হারানো শ্রমিক পরিবারের আর্থিক, মানসিক দুর্দশার ক্ষোভ এখনও রয়ে গেছে। আবার যদি নতুন কোনো অতিমারি ঢেউ আছড়ে পড়ে তার মোকাবিলা কিভাবে করা যায় সেটা এই চুক্তিতে থাকতেই পারে।
২০২২-এ মহামান্য কলকাতা হাইকোর্টে মালিক সংগঠন ইজমা একটি মামলা দায়ের করেছেন কেন্দ্রীয় সংস্থা জুট কমিশনার এর অফিসের থেকে প্রকাশিত কাঁচা পাটের সংগ্রহ মূল্য সংক্রান্ত সাম্প্রতিক এক নির্দেশিকার প্রতিকার চেয়ে। মামলাটির গতি প্রকৃতি এবং তার তথ্য, যুক্তি-পরিসংখ্যান কতোটা গুরুত্ব দিয়ে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে আলোচিত হবে সেটা সময়ই বলবে কিন্তু পাটশিল্পের আজ কালের হদিস এই অভূতপূর্ব মামলার নথিতে লিপিবদ্ধ থাকলো। মামলায় অংশগ্রহণকারীরা ভবিষ্যতের চিন্তা ভাবনার উপযোগী উপাদান ওখানে নিশ্চয়ই রেখে যাবেন, সেই নথি শ্রমিক স্বার্থে কতোটা কাজে লাগানো যেতে পারে চুক্তি বৈঠকে যুক্তি-তর্কের অবতারণা করার সময় সেটা দেখার। পাটের ফসল উৎপাদন থেকে বাজারী কেনা-বেচা-মজুদ রাখার, খাদ্যশস্য পরিবহন, গণ বণ্টন ব্যবস্থা চালু রাখা ইস্তক রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় বস্তার ক্রম বর্ধমান চাহিদা পূরণের অঙ্কের হিসেব মেলানো, জুট কর্পোরেশন এর দায়িত্ববহন ইত্যাদির জটিল অঙ্ক সহজ মনে হতে পারে তখন জন পরিসরের আলোচনায়।

শতাব্দী প্রাচীন একদা রাজ্যের গৌরবের এই চটকলগুলির পরিচালন ব্যবস্থায় শ্রমিক সংক্রান্ত সমস্যা বহুবিধ। ২০১৯ এর চুক্তির পরে এই নিয়ে বোঝাপড়া ও সমঝোতার সূত্রসন্ধানে উপর্যুপরি দুটি কমিটির গঠনের মাধ্যমে রাজ্য সরকার অগ্রণী হয়েছেন। প্রথমে তিন সদস্যের কমিটি তাঁদের সমীক্ষা রিপোর্ট সরকারের মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন এবং মালিক পক্ষের সামনে পেশ করেছেন। ২০২২ এর জানুয়ারিতে ১১ সদস্যের ‘এক্সপার্ট কমিটি’ তৈরি হয়েছে। এই কাজে উপযুক্ত একটি গবেষণা সংস্থাকে নিয়োগ করার পরে সদ্য একটি নমুনা ক্ষেত্র সমীক্ষায় ১৫ টি চটকল এর শ্রমিকদের কাছে প্রশ্নমালা নিয়ে গিয়ে সকলের অভিমত চাওয়া হয়েছে। সার্বিক আলোচনা, আরও তথ্য সংগ্রহ চলবে নির্দিষ্ট নির্ঘণ্ট মেনে।এখন রাজ্য সরকার এই এক্সপার্ট কমিটির সুপারিশে কি কি সমাধান গৃহীত হতে পারে তার অপেক্ষায় আছেন। এভাবেই সোশ্যাল ডায়ালগের নতুন ধারা শুরু হয়েছে। বিবদমান দু পক্ষের নানা বিষয়ে কথা বলার, তথ্যের আদানপ্রদানের এই ধারাবাহিকতায় এবার যে চুক্তি সম্পাদন হবে সেই বয়ানে কয়েক দশকের জমে থাকা বিষাদ- বিরোধের মীমাংসা সূত্রের সন্ধান আর ঘটমান বর্তমানের নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার রসদ থাকবে সেটা আশা করাই যায়।

২০১৯-২০ তে ‘আই এল ও’ শতবার্ষিকীতে শ্রমিক স্বার্থে আঘাত রুখতে কি কি ঘোষণা হল সেটার দিকে চোখ ফেরানো যেতে পারে। ইন্সপেকশন এর ধরণ বদলাতে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘ইজ অফ ডুইং বিজনেস’ নীতির প্রচলন শ্রমিকদের বিপদে আপদে সরকারী প্রশাসনকে অবলম্বনের উপায়কে শেকল পড়িয়েছে। ‘শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজ’ নেবার জন্যে ট্রেড ইউনিয়ন হয়তো তৎপর হচ্ছেন। ‘ই- গভর্নেন্স’এর জন্যে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগে সরকারী দপ্তর এর কাছে প্রত্যাশা বেড়েছে। “গ্রিভান্স” বা অভিযোগের সুরাহা করতে পোর্টালের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। আধার সংযোগ, নমিনেশন জমা করা, ক্লেম এর টাকা পাওয়া, পি এফের পাসবই দেখা, ই এস আই এর চিকিৎসায় আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা ইত্যাদি ব্যবস্থাপনায় শ্রম দপ্তরের তৎপরতায় এখনও কোনো ফাঁক আছে কিনা সেটাও আগামী বৈঠকের আলোচ্য সূচিতে থাকতেই পারে। কর্মী সংখ্যার কমা বাড়ার মাপকাঠিতে ই পি এফ্ এর পে রোল ডাটা মেনে চলছেন কেন্দ্রীয় সরকার।এখন দেখার যে চট কলের কর্মী সংখ্যার ঊর্ধ্বগতি না নিম্নগতি? ডিফল্ট এর পরিমাণ বেড়েছে না কমের দিকে?
কতগুলি মামলা চলছে নিয়ম বহির্ভূত চলা কোম্পানি গুলির বিরুদ্ধে? সরকারি রেকর্ডের খতিয়ান দেখে সব ট্রেড ইউনিয়নের মধ্যে বাস্তব অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেবার সুযোগ মিলবে এই বৈঠকের মাধ্যমে এটাও আশা।

১১ সদস্যের কমিটি গঠনের সরকারী বিজ্ঞপ্তি থেকে এটা পূর্বানুমান করাই যায় যে সব ক্যাটাগরির শ্রমিকের মজুরীর বিষয়ে একটা সর্বসম্মত উন্নত মানের কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে এবারে তিন পক্ষের আলোচনা চলবে। চিরাচরিত ধাঁচে কলকাতা সিরিজ( ভিত্তি বর্ষ ১৯৬০=১০০) দিয়ে মহার্ঘ্য ভাতা প্রতি তিন মাসে কতো বাড়বে কমবে সেটা হিসেব করা হয়। এর পরিবর্তে প্রচলিত সর্বভারতীয় সিরিজ( ভিত্তি বর্ষ ২০১৬=১০০) এর সাহায্যে অঙ্ক কষে সেই ভাতা কি টাকার অঙ্কে চটকল শ্রমিকদের রোজগার বাড়াতে পারে? অন্য শিল্পক্ষেত্রের শ্রমিকদের দৈনিক মজুরীর হার এর সাথে একটা তুলনামূলক সমীক্ষা করার সুযোগ এসেছে এবার। চটকলে কাজ করতে স্থানীয় কর্মপ্রার্থীদের মধ্যে ইচ্ছুক, আগ্রহী দের সংখ্যা বাড়াতে, অনুপস্থিতি কমাতে এই বিশ্লেষণের এখন প্রয়োজন হয়েছে সেটা সব পক্ষই বুঝেছেন। অন্য জেলার থেকে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে এ শিল্পে কাজে যোগ দেওয়ার রাজ্য সরকারী উদ্যোগেও এই নতুন মজুরী কাঠামো উৎসাহ যোগাবে, সেটাও লক্ষ্য।

এই রাজ্যের পাট চাষে ছোট-বড়ো জমি মালিকদের উৎসাহ বাড়াতে, কাঁচা পাটের মূল্য নির্ধারণে ফিল্ড সার্ভে পদ্ধতি অবলম্বন করায়, মজুদ নিয়ন্ত্রণ, গুদামজাত পণ্যের কেনা বেচা, বস্তা কেনার পরিমাণ ও মূল্য ( মিল শ্রমিকের মজুরী সমেত) নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারী নানা দপ্তর তথা জুট কমিশনারের বিজ্ঞপ্তি জারি করার গোড়ার কথা নিয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পাট গবেষণা কেন্দ্র( কলকাতা, ব্যারাকপুর) থেকে তথ্য পরিসংখ্যান আদানপ্রদান ও বিশ্লেষণ করতে পারলে ভবিষ্যতের পথ চলার ছবিটা অনেক স্পষ্ট হবে শ্রমিক মালিক উভয়ের কাছেই।

চটশিল্প ও শ্রমিকের উন্নতির লক্ষ্যে এই দশকের উপযোগী একটা নতুন মডেলের খোঁজ পেতে তিন পক্ষ এখন চেষ্টা চালাচ্ছেন। সুসংহত ধারাবাহিক এই চেষ্টা মহামারী, নির্বাচনী রাজনীতি আর আইনি অস্থিরতার টানা পোড়েন পেরিয়ে এগিয়ে এসেছে অনেকটাই। একমাত্র দাবিসনদ নিয়ে বৈঠকি তর্ক বিতর্কের মধ্যে আটকে না থেকে, মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে, মনের আড়ালে যে জীবনযাত্রার গণিত আর সংকেত সেটা বোঝার চেষ্টা চলেছে। এখন এটাই বাংলার ঐতিহ্যবাহী অন্যতম বৃহৎ শিল্পের উন্নতিসাধনের সম্মিলিত প্রয়াস।

[লেখক – প্রাক্তন অতিরিক্ত শ্রম কমিশনার।]

Facebook Comments

Leave a Reply