চটশিল্প : শ্রমিকদের বধ্যভূমি – চাই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন : অমল সেন

fail

চটশিল্পের শ্রমিকদের উপর নির্মম শোষণ এবং অত্যাচার সম্পর্কেও অনেকেই সঠিক ধারণা নেই এবং অবশ্যই চটকল শ্রমিকদের ষাটের দশকে, সত্তর, আশির দশকে যে ঐতিহাসিক আন্দোলন এবং তার ফলে বহু দাবি আদায় হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে সেগুলি কিভাবে ধ্বংস হয়ে শ্রমিকরা তাদের জমি হারিয়েছেন সে সম্পর্কে কিছু কথা বলার জন্য এই প্রবন্ধের অবতারণা।

পশ্চিমবঙ্গের সর্ববৃহৎ শ্রমনিবিড়, শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শিল্প হল চটশিল্প। এই শিল্প হল কৃষিভিত্তিক পরিবেশ বান্ধব, স্বাস্থ্যকর এবং এর প্রকৃতিবিলীনতা এবং বার বার ব্যবহারযোগ্যতা রয়েছে। এই শিল্পে আড়াই লক্ষ শ্রমিক এবং ৪০ লক্ষ কৃষক পরিবার যুক্ত রয়েছে। পাটজাত বস্তা, কাপড় এবং অন্যান্য দ্রব্যের কোনো বিকল্প নেই অথচ এর বিকল্প হিসাবে অস্বাস্থ্যকর, পরিবেশ দূষণকারী সিন্থেটিক বস্তা এবং অন্যান্য উৎপাদনকে কেন্দ্রীয় সরকার তুলে ধরছে। শ্রমিকদের বহু আন্দোলনের ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৮৭ সালে অত্যাবশ্যকীয় জুট প্যাকেজিং আইন ১৯৮৭ চালু করে খাদ্যসামগ্রী, চিনি ইত্যাদির ক্ষেত্রে (১০০ শতাংশ) চটের বস্তার ব্যবহারকে বাধ্যতামূলক ঘোষণা করে। কিন্তু পরবর্তীকালে সরকার এই অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনকে বারবার শিথিল করে দিয়ে আমাদের দেশের সিন্থেটিক লবির বৃহৎ পুঁজিপতিদের চাপে পলিথিন বস্তাকে বরাত দিচ্ছে। একে রুখতে না পারলে চটশিল্প ধ্বংস হবে এবং কৃষকদের জীবনও বিপন্ন হয়ে পড়বে।

চটশিল্পের বার্ষিক উৎপাদন ১৬ লক্ষ মেট্রিক টন। বিশ্বজোড়া স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য চটশিল্পের রপ্তানি বাজারও ভাল। আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে খরিফ ও রবি শস্যের ফসলকে প্যাকেজিং করার জন্য প্রায় ৭০% উৎপাদনের ক্রেতা’ হল কেন্দ্রীয় সরকার এবং অন্যান্য রাজ্য সরকারগুলি ফলে চটশিল্পের আপেক্ষিক অর্থে একটি সুরক্ষিত বাজারও রয়েছে। চটশিল্পের ভবিষ্যতও খুব উজ্জ্বল । কিন্তু বর্তমানে সিন্থেটিক প্যাকেজিং-এর চাপে এবং চটকলে মালিকদের বেপরোয়া সাসপেনশন অফ ওয়ার্ক এবং শ্রমিক সংকটের কারণে উৎপাদন ১৩ লক্ষ টনের নীচে নেমে গেছে অনেক জুটমিলই বর্তমানে পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে উৎপাদন করছে না।

চটশিল্পের শ্রমিকদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। শোষণ, বঞ্চনা, জুলুম, অত্যাচার, ছাঁটাই, লকআউট, ক্লোজারের এবং অধিকার হরণের অন্য নামও চটশিল্প। কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থা জুট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া’র তেমন কোন ভূমিকা নেই। বর্তমানে কাঁচা পাট, পাটজাত বস্তা ও অন্যান্য দ্রব্যের উৎপাদন, এর বাজার নিয়ন্ত্রণ করা পুরোটাই একচেটিয়া পুঁজিপতিরা নিয়ন্ত্রণ করে। এই বাজারের উপর কোনও সরকারী নিয়ন্ত্রণ নেই, কাঁচা পাট নিয়ন্ত্রণ করে মজুতদার কালোবাজারি এবং একচেটিয়া মালিকদেরই সংগঠন জুট বেলার্স এ্যাসোসিয়েশন। জে সি আই এক ছটাক পাটও কেনে না। ফলে জে সি আই তথা কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষিত কাঁচা পাটের সহায়ক মূল্য MSP অর্থহীন । পাট যদি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হয় তবে কাঁচা পাটের রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু করা দরকার এবং মিলগুলিকে সরকারই সরাসরি সরবরাহ করতে পারে । একমাত্র তখনই কাঁচা পাটের MSP চালু করার কোনও মানে হতে পারে। বর্তমানে চটশিল্পে ন্যূনতম মজুরী হল ৩৭০ টাকা। সর্বোচ্চ মজুরী হল ৫২৯ টাকা। চটশিল্পের শ্রমিকদের গ্রেড এন্ড স্কেল, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং মহার্ঘভাতার একটা অংশ মালিকরা বহু বছর যাবত দিচ্ছে না। বিশেষ করে পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে ১৯৯৮-২০০০ সাল থেকে মালিকী আক্রমণ তীব্রতর হয় এবং শ্রমিকরা ৪ বছরের মহার্ঘভাতা থেকে বঞ্চিত হয়। রাজ্যে মোট ৫৯ টি চটকলের মধ্যে ৫ টি এন. জে. এম. সি. মিল ক্লোজারে চলে গেছে। ৮টি জুট মিল নতুন হয়েছে যারা শিল্পভিত্তিক বেতন দেয় না।
চটশিল্পের শ্রমিকদের মজুরী, বাসস্থান (শ্রমিক কোয়ার্টারের) অবস্থা খুবই খারাপ। কাজের পরিবেশও খুবই অস্বাস্থ্যকর। চটশিল্প আজও অত্যন্ত দুর্ঘটনাপ্রবণ। মাজিক সুরক্ষার আইন গুলি মালিকরা এখানে ঠিকমত মানে না। পি. এফ., গ্র্যাচুইটি, ই এস আই-এর টাকা আত্মসাৎ করার ঘটনা এখানে সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। চটশিল্পে শ্রমিকদের অনাদায়ী বকেয়া গ্র্যাচুইটির পরিমাণ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা — প্রায় ৭০ হাজার শ্রমিক গ্র্যাচুইটি থেকে বঞ্চিত। প্রভিডেন্ট ফান্ড বকেয়ার প্রমাণ প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। ই এস আই বকেয়া ১৫০ কোটি টাকা। হাজার হাজার শ্রমিক বদলী হিসাবে ভর্তি হয় আবার বদলী শ্রমিক হিসাবেই রিটায়ার করে। শ্রমিকদের অবহেলা এবং মর্যাদাহানির বিষয়টিও ভয়ঙ্কর। কথায় কথায় “গেটবাহার”, কাজ থেকে বসিয়ে দেওয়া, ৪০ বছর উৎপাদন কাজে রক্ত-ঘাম ঝরানোর পরও রিটায়ারের পর গ্র্যাচুইটির জন্য ভিক্ষুকের মত হাত পাতা বড় অমানবিক। এছাড়াও মালিকরা কারখানার বিস্তৃত জমিতে প্রমোটিং করে লীজ এবং ভাড়ার মাধ্যমে এমনকি বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার মুনাফা লুটছে। শ্রমিকদের বাসস্থান হিসাবে সারিবদ্ধ ৮” X ১০”-এর ছোট ছোট খুপরির মত ঘর বরাদ্দ করা আছে — ব্রিটিশ আমলে তৈরি এইসব লাইন কোয়ার্টারগুলির ইংরেজরা নাম দিয়েছিল “কুলি লাইন”। এই কুলি লাইন গুলিই এখন মজদুর লাইন হিসাবে অপরিবর্তিত অবস্থায় আছে। এখানে পর্যাপ্ত আলো, জল, বাতাস মেলে না। কমিউনিটি টয়লেট এবং বাথরুম গুলির অবস্থা শোচনীয়। স্যানিটেশন-এর কোন ব্যবস্থা নেই। সভ্যতার নির্মাতা শ্রমিকদের প্রায় পশুর মত জীবনযাপন করতে বাধ্য করা হয়৷ সখঠেয়ে সঙ্কটে রয়েছে মহিলারা।

চটকল শ্রমিকদের জীবনকে পশুর খোঁয়াড়ের মত বাসস্থান, ঘিঞ্জি, কদর্য অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দিয়ে আটকে ফেলা হয়েছে। প্রতিটি কারখানার গেটের বাইরে বা শ্রমিক লাইনগুলিতে ঢালাও দেশী মদের দোকান, জুয়ার বোর্ড, গণিকালয়ের ব্যবস্থা করে মনুষ্যেতর জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। যারা এসব পছন্দ করে না তাদের জন্য কোম্পানি তৈরি করে দিচ্ছে মন্দির, মসজিদ, ভজনালয় – যাতে শ্রমিক তাদের
শোষিত বঞ্চিত দুঃখজর্জর জীবনের জন্য ঈশ্বর বা আল্লার কাছে চোখের জল ফেলতে পারে। কপাল, অদৃষ্ট বা পূর্বজন্মের পাপেই তাদের এই অবস্থা — এই বিশ্বাস নিয়ে আন্দোলনমুখী না হয়।

আরও একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিকদের জীবনের পাশাপাশি গড়ে উঠছে ক্রমাগত যন্ত্রশিল্পের অভাবনীয় বিকাশ। বিজ্ঞানের জয়যাত্রা অপ্রতিরোধ্য ফলে শিল্পপতিদের ধনসম্পদের পাহাড়, অপরিমেয় বিলাসব্যসন, একচেটিয়া মালিকানা বাড়ছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে চটশিল্পে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটছে। বিজ্ঞানের আশীর্বাদকে মালিকরা লাভের অঙ্কে আত্মসাৎ করছে। উৎপাদন বাড়ছে, উৎপাদনে শ্রমিক সংখ্যা ক্রমাগত কমছে — শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে। ধরুন পুরানো তাঁতে (Conventional Loom) একজন তাঁতী দুটি করে পাওয়ার লুম চালাত উৎপাদন হত ৮ ঘণ্টায় ৩ থেকে ৪ কাপড়, বর্তমানে একজন তাঁতি এস/ফোর চায়না লুমে কোথাও ৪টি কোথাও ৬টি করে তাঁত চালায়। উৎপাদন হয় ১০ থেকে ১২ কাপড় ৮ ঘণ্টায়। ফলে উৎপাদন বাড়লো প্রায় ৩ গুণ, কিন্তু শ্রমিকদের মজুরী রয়ে গেল একই জায়গায়। শ্রমিক সংখ্যাও তিনভাগের এক ভাগ হারে কমে গেল। বাকিরা ছাঁটাই হয়ে গেল।Transfer, deployment এর মধ্যে দিয়েও শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে। এভাবেই শুধু তাঁতে নয়, স্পিনিং ফ্রেমও ৮০ ডান্ডি থেকে ১১০/১২০ ডান্ডি (Spindle) হয়েছে — লোডিং আনলোডিং ইত্যাদিতে গাড়ি (Fork Lift) ব্যবহার করা হচ্ছে — ব্যাপকহারে কর্মী সংকোচন হচ্ছে। উঠে যাচ্ছে কপ ওয়াইন্ডিং ডিপার্টমেন্ট। এভাবেই চটশিল্পে দ্রুত কর্মী সংকোচন হচ্ছে আধুনিকীকরণের ফলে – কিন্তু শ্রমিকের জীবনে এই সুফল পৌঁছচ্ছে না। সরকারও উদাসীন।

শ্রম নিবিড় শিল্প চটশিল্প পুঁজি নির্ভর শিল্প হয়ে যাচ্ছে। উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের সাথে উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্ব বাড়ছে।

চটশিল্পে COmplement বা শ্রমিক সংখ্যা বিন্যাসের ক্ষেত্রেও গুণগত পরিবর্তন ঘটছে। ব্যাপকহারে বাড়ছে কন্টাক্ট শ্রমিক, ভাউচার শ্রমিক, ডেইলি পেড শ্রমিকের সংখ্যা৷ যাদের নেই কোন সামাজিক সুরক্ষা, শ্রম আইনের সুরক্ষা, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার প্রবর্তিত শ্রমকোডেও এই ধরনের অধিকারহীন স্বাধীন শ্রমিকের কথাই বলা হয়েছে — যেমন গিগ ওয়ার্কার, প্লাটফর্ম ওয়ার্কার, ডেলিভারি বয়, আপ ক্যাব চালক, সুইগি, জোমাটো, ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্ট — যারা শ্রমিক মালিক সম্পর্কের বাইরে, শ্রম আইনের দায়রার বাইরে থাকবে। কাজের ঘণ্টাও ওদের ১২ ঘণ্টা হতে পারে।এদের Take home or In-hand (হাতে পাওয়া) মজুরী খানিকটা বাড়বে কিন্তু সামাজিক সুরক্ষা, আইনি রক্ষাকবচ থাকবে না। বাস্তবে প্রকৃত মজুরী কমবে। শুধু চটকল মালিকরা নয়, সমস্ত মালিকরাই শ্রম আইন থেকে exit করতে চাইছে। অথচ প্রতিটি শ্রম আইনের পিছনেই রয়েছে শ্রমিকদের সংগ্রামের ইতিহাস। চটশিল্পে এমন ১০টি বড় মিল পাওয়া গেছে যেখানে একজনও পার্মানেন্ট শ্রমিক নেই। সমস্ত জুটমিলেই জুট ডিপার্টমেন্ট, সিলেকশন, ডাস্ট কুলি, পিন বয়, সিকিউরিটি, স্যানিটেশন, সেলাইঘর, ফিনিশিং, ক্যানটিন ইত্যাদি ডিপার্টমেন্টে এধরনের অধিকারহীন কন্ট্রাক্ট শ্রমিক নিয়োগ করছে। অথচ দেশের আইন অনুযায়ী প্রতিটি মিলেই ৯০% পার্মানেন্ট এবং ২০% স্পেশাল বদলী শ্রমিক থাকার কথা।

চটশিল্পের অমানবিক শোষণ ও বঞ্চনা, পেশাগত রোগ ও ঝুঁকি, প্রচণ্ড গরমে কাজের পরিবেশ না থাকা এবং সর্বোপরি স্বল্প মজুরী, কাজের বোঝা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থাকার ফলে দেশে দারিদ্র্য ও বেকারি থাকা স্বত্বেও বেকার যুবকেরা চটকলে সহজে আসতে চায় না। বিগত দু’দশক জুড়ে কারিগরি অগ্রগতি ও আধুনিকীকরণের জন্য শিল্পের আংশিকভাবে অগ্রগতি ঘটেছে কিন্তু এর সমস্ত লাভটাই মালিকরা নিয়েছে — শ্রমিকদের কপালে কিছু জোটে নি।

মহিলা শ্রমিকদের রাতের শিফটে কাজ করানোর বিষয়টি মাননীয় শ্রমমন্ত্রী চালু করতে চাইছেন। এখানে নারী শ্রমিকের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষার বিষয়টি রয়েছে ফলে উপযুক্ত স্বতন্ত্র পরিকাঠামো, শেড এবং মহিলা সুপারভাইজার ও দারোয়ান এবং রেস্ট রুম এছাড়াও বেবি ক্রেশ এবং আলাদা শৌচালয়ও দরকার। না হলে মহিলা শ্রমিকদের কর্মস্থলে যৌন হেনস্থার রিস্ক থেকেই যাবে। সরকারের পক্ষ থেকে নারী শ্রমিকদের সমানাধিকারের কথা বলা হচ্ছে অথচ ষাটের দশক থেকেই নারী শ্রমিকদের ৫৫ বছর বয়সেই রিটায়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছে – অথচ পুরুষ শ্রমিকরা ৫৮ বছরে রিটায়ার করছে। সরকার আগে এই বৈষম্যটি দূর করুক।

বর্তমানে চটশিল্পে শ্রমিকদের মজুরী বৃদ্ধি, গ্রেড এন্ড স্কেল বা কাজের ক্যাটিগরি ঠিক করা এবং শ্রমিকদের বাসস্থান এবং অন্যান্য বিষয়গুলি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য Expert Committee on Jute তৈরি হয়েছে এবং এতে শ্রমিকদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। এক্ষেত্রে আমরা বলতে চাই যে, শ্রমিকদের একেবারে প্রাথমিক প্রয়োজন হল খাদ্য, পানীয়, বাসস্থান এবং বস্ত্র। এই ভিত্তির উপরে দাড়িয়েই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন এগুলিও এসেছে জীবনের প্রয়োজন হিসাবে। চটশিল্লে সেন্ট্রাল ওয়েজ বোর্ড গঠিত হয়েছিল ২৫ শে আগস্ট ১৯৬০ সালে। এই বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন শ্রী এল পি দাভে। শ্রমিক সংগঠনগুলির মধ্য থেকে ছিলেন শ্রী কালি মুখার্জী ও কমরেড ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত। এই দু’জন সদস্য অন্যান্য জুট ইউনিয়নের সাথে আলোচনা করেছেন এবং তাদের মতামত নিয়েছেন। আমাদের ইউনিয়ন BJMWU-র পক্ষ থেকে কমরেড সনৎ দত্ত জীবনের প্রয়োজনের ভিত্তিতে (Need-based wages) মজুরীর পক্ষে কমরেড ইন্দ্রজিৎ গুপ্তের সাথে দেখা করে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। অন্যরাও হয়ত দিয়েছেন। পক্ষান্তরে মালিকরা শিল্প কতটা দিতে পারে বা কোম্পানির কতটা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে (What Trade can bear or company’s capacity to pay)-এর ভিত্তিতে মজুরী নির্ধারণের কথা বলেছিল। এটাই পুঁজিবাদের দৃষ্টিভঙ্গি। তারা শ্রমিকদের ততটুকুই দিতে চায় যাতে শ্রমিক তার পরের দিনগুলিতে মেশিন চালানোর জন্য পেশী সঞ্চালন করতে পারে এবং মালিকের মুনাফা বেশী হয়। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরী থেকে বঞ্চিত না করে মালিকদের এই মুনাফা আসে না। ১৯৬৩ সালে সেন্ট্রাল ওয়েজ বোর্ড জীবনের প্রয়োজনের স্বীকৃতি দিয়েই ঐতিহাসিক সুপারিশ জারি করেছিল।

সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা দুনিয়ায় নতুন বার্তা, মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিল। অজ্ঞ, মূর্খ, ইন্দ্রিয়পরায়ণ শ্রমিকেরাও যে সমাজের উৎপাদনের মালিক হতে পারে সেই অদম্য চেতনার মান চটকল শ্রমিক বস্তির অন্ধকারেও আলো জ্বেলে দিয়েছিল। চটকল শ্রমিকদের ধর্মঘটের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুধীন প্রামাণিকদের মত মানুষেরা । এরপর কমরেড ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, ভবানী
সেন, কমল সরকার, সনৎ দত্তের, মত বামপন্থী নেতারা। তারা এইসব শ্রমিকদের বস্তিতে পড়ে থেকে সংগঠন এবং ইউনিয়ন গড়েছেন এঁরাই।

শ্রমিকদের মধ্যে চেতনার আলো জ্বেলে বললেন মহান মার্ক্সের সেই কথা— সংগ্রামের ইতিহাস সৃষ্টি করে বীরেরা নয়, অলৌকিক শক্তিও নয়, — শ্রমিকরাই। শ্রমিকরা শ্রমের মধ্য দিয়ে যেমন সমাজের সকল সম্পদের স্রষ্টা, সভ্যতার স্রষ্টা- তেমনি এই জনগণই হল যুগে যুগে দেশে দেশে ইতিহাসের স্রষ্টা। তাঁরাই শ্রমিকের ঘরে ঘরে মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন – স্তালিনকে নিয়ে গেলেন। শ্রমিকের ছিন্নভিন্ন অন্ধকার ঘরেও দেখা গেল স্ট্যালিনের ছবি। সংগঠিত ইউনিয়নগুলি শ্রমিকদের জীবন পাল্টে দিয়েছিল — সংগ্রাম, লড়াই, শ্লোগান, ধর্মঘট, হরতাল — শ্রমিকদের জীবনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। তাই দেখা যায় সমস্ত শ্রম আইনগুলির পেছনে রয়েছে শ্রমজীবি মানুবের সংগ্রামের ইতিহাস।সাহিত্যের পাতায়ও চটকল শ্রমিকদের ধর্মঘট সংগ্রাম স্থান করে নিয়েছিল।সংগ্রামই মানুষের জীবনকে সুন্দর করে তোলে।
পরিশেষে বলতে হয় যে, চটশিল্প পশ্চিমবাংলার শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্যমন্ডিত এবং সর্ববৃহৎ শিল্প হওয়া সত্বেও এই শিল্প শ্রমিকদের বধ্যভূমি হিসাবে পরিচিত। চটকল শ্রমিকদের সুদীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে। চটকল শ্রমিক আন্দোলনের কথা বাংলা সাহিত্যের পাতায় পাতায় স্থান করে নিয়েছে। ১৯৩৫ সালে স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ধর্মঘটী শ্রমিকদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুও চটকল শ্রমিক আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য রেখেছেন।এছাড়া স্বাধীনতার পর ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, ভবানী সেন, কমল সরকার, শিশির গাঙ্গুলী, কালি মুখার্জী, সীতা শেঠ, সনৎ দত্ত, প্রমুখ নেতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, বহু ঐক্যবদ্ধ ঐতিহাসিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে শ্রমিকরা বহু অধিকার অর্জন করেছিল। ১৯৬৩ সালে সেন্ট্রাল ওয়েজ বোর্ড বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিকোন নিয়ে শ্রমিকদের শোভন মজুরীনীতি যেমন চারজনের পরিবার ইউনিট ধরে ২৭০০ ক্যালোরি খাদ্যের হিসাবসহ বস্ত্র, বসস্থানের খরচ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার খরচ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ-এর খরচ ধরে এই মাপকাঠিতেই মজুরীনীতি তৈরী করেছিল। শ্রমিকদের গ্রেড-স্কেল, পিসরেটেড ফল ব্যাক ওয়েজেস ইত্যাদির অধিকার সুনিশ্চিত করেছিল। ১৯৭১-এর ত্রিপাক্ষিক চুক্তি বোনাসের অধিকার দিয়েছিল, ৮৪ দিনের ঐতিহাসিক ধর্মঘটের পর ১৯৮৪ সালের ত্রিপাক্ষিক চুক্তি কমপ্লিমেন্টস এর ক্ষেত্রে ৯০% পার্মানেন্ট ২০% স্পেশাল বদলী শ্রমিক রাখার অধিকার দিয়েছিল, ১৯৯৫ সালে ভট্টাচার্য কমিশনের মাধ্যমে পুনরায় হারানো গ্রেড এন্ড স্কেল ফিরে পেয়েছিল শ্রমিকরা। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকের পর থেকেই বিশ্বায়নের নীতির পরিপূরক হিসাবে শ্রমিকদের এই আইনসঙ্গত অধিকারগুলি ধ্বংস হতে থাকে। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে ২০০২ সাল-এর ত্রিপাক্ষিক চুক্তিতে ন্যূনতম মজুরী ১৭২ টাকা থেকে কমিয়ে ১০০ টাকা করা হয়।উৎপাদনভিত্তিক বেতন চালু হয় যদিও বর্তমানে তা তুলে দেওয়া হয়েছে, এবং ৪ বছরের ডি.এ. (মহার্ঘ ভাতা) ফ্রিজ করে দেয় মালিকরা বিশ্বায়নের নীতিতে শুরু হয় ক্রমাগত লক আউট, দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া, ব্যাপকহারে কন্ট্র্যাক্ট শ্রমিক নিয়োগ, আউটসোর্সিং এবং কাজের বোঝা চাপানোর ইতিহাস। আজও সেই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ট্যাডিশনই চলছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কাছে আমাদের দাবী চটকল শ্রমিকদের হারানো অধিকার ফিরিরে দিন। যদিও আমরা জানি, সরকার পরিবর্তন, নির্বাচনী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকের অধিকার ফিরবে না, – একমাত্র ঐক্যবদ্ধ নীতিভিত্তিক লাগাতার শ্রমিক আান্দেলনই পারে শ্রমিকদের জীবনকে স্বমহিমায় ফেরাতে, – যে ট্র্যাডিশন চটশিল্পের শ্রমিক আন্দোলনে ছিল।

[লেখক – সাধারণ সম্পাদক, বেঙ্গল জুট মিল ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন (এআইইউটিইউসি)]

Facebook Comments

Leave a Reply