চটশিল্পে পুনর্জাগরণের দায়িত্ব আজ তুলে নিতে হবে বামপন্থীদেরই: অতনু চক্রবর্তী

fail

আর কতো রঙ্গই না দেখতে চলেছে আমাদের এই বাংলা!
রাজ্যে শিল্পায়নের মরা গাঙে প্রবল তুফান তোলার এক নীল নকশা তৈরি করেছেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী কিছুদিন আগে শিল্প-বৈঠকের মঞ্চ থেকে৷ পশ্চিমবাংলা নাকি হবে আগামী দিনে বিনিয়োগের গন্তব্য স্থল। “দেশীয় শিল্প”-ই তাঁর লক্ষ্য। কিন্তু, বাস্তবে চা ও চট—এই দু’টি শ্রম ঘন শিল্পই গভীর সংকটের গহ্বরে। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের অপরাধ সম অবহেলাকে সাক্ষী রেখে ।

কম মজুরী প্রধান প্রতিবন্ধকতা

এই দু’টো সাবেক শিল্পের শ্রমিকরা খুবই কম মজুরীতে বছরের পর বছর কাজ করে আসছেন। শিল্প বৈঠকের মঞ্চ থেকে “দেশীয় শিল্পই সরকারের লক্ষ্য” হিসাবে ঢাক পেটালেও সরকারের আচরণে তা প্রতিফলিত হচ্ছে না। প্রথমে চা শিল্পের কথাই ধরা যাক। ঠিক যে সমস্যা আজ গোটা চটশিল্পকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছে, চা শিল্পেও আজ তার হুবহু প্রতিফলন। গত ৪ ফেব্রুয়ারি শিলিগুড়িতে চা শিল্পের অ্যাডভাইজারি কমিটির ১৭ তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পৌরোহিত্য করেন শ্রম দপ্তরের প্রধান সচিব। সেখানে তিনি স্পষ্ট করেই জানান, চা শিল্পের মজুরী একেবারেই আকর্ষণীয় না হওয়ায় দলে দলে চা শ্রমিকরা অন্যত্র পাড়ি দিচ্ছেন, যেখানে অধিক মজুরী পাওয়া যায়। দার্জিলিং পাহাড়ে এখন চা শিল্পগুলো চলছে ৩২ শতাংশ কম শ্রম শক্তি নিয়ে, আর ডুয়ার্সে তা প্রায় ৩০ শতাংশ কম। হ্রাসপ্রাপ্ত শ্রমিক সংখ্যার ফলে উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়ছে, পুরুষ শ্রমিকরা অন্যত্র চলে যাওয়ায় চা বাগিচাগুলোতে মহিলা শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়ছে, যাঁদের সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে কম মজুরী নিয়ে। আর কী অদ্ভুত মিল রয়েছে চা মালিকদের সাথে চট মালিকদের মধ্যে! বাইরে থেকে তাঁরা শ্রমিক নিয়োগ করে চা বাগিচায় নিয়ে আসছেন অধিক মজুরী দিয়ে – আর বলাই বাহুল্য, সমস্ত বিধিবদ্ধ সুযোগ সুবিধা ছাড়াই। ঠিক যেমনটা ঘটে চলেছে চটকলগুলোতে। অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের মত বছরের পর বছর ধরে রাজ্য সরকার প্রশ্রয়সূচক নীরব সম্মতি দিয়ে দেখে চলেছে এই শিল্পগুলোকে জাহান্নামে পাঠানোর সর্বনাশা খেলা। প্রতি তিন বছর অন্তর চা-চট শিল্পে মজুরী চুক্তির চলে আসা রেওয়াজ ও আজ থমকে রয়েছে। বা বলা ভালো, ভেঙে ফেলা হয়েছে পরিকল্পিত ভাবেই। ২০১৫ সাল থেকে চা শিল্পে ন্যূনতম মজুরী নির্ধারণের আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ সাত বছরের অনন্ত সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও এখনো মজুরী নির্ধারণের কোন হদিশ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

ফিরে দেখা

কৃষি ভিত্তিক চট শিল্পে প্রায় ৪০ লক্ষ গ্রামীণ পরিবার কাঁচা পাট উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত। ২.৫ লক্ষ শ্রমিক প্রত্যক্ষ ভাবে নিয়োজিত চট শিল্পের সাথে। আর, এরই অনুসারী শিল্পে যুক্ত ১.৪ লক্ষ শ্রমিক। সেই আবহমান কাল ধরেই, চট শিল্পের গোড়া পত্তনের সময় থেকেই কম মজুরী, মধ্যযুগীয় – পশ্চাৎপদ কাজের পরিবেশ, অবাসযোগ্য কুলি লাইন, সামাজিক সুরক্ষা না থাকা প্রভৃতি দাবিতে চটকল শ্রমিকেরা বার বার আন্দোলনে ফেটে পড়েন। চটশিল্পে প্রথম শিল্প ভিত্তিক ধর্মঘট পালিত হয় ১৯৩৬ সালে, যা তিন মাস ধরে চলে। স্বাধীনতার পর সেন্ট্রাল ওয়েজ বোর্ড প্রথম গঠিত হয় ১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে। ট্রেড ইউনিয়ন ও নিয়োগকর্তাদের মধ্য থেকে দু’জন করে প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত এই বোর্ড তার সুপারিশ পেশ করে ১৯৬৩ সালে, যার সময়সীমা বা ভ্যালিডিটি ছিল তিন বছর পর্যন্ত। কিন্তু তারপরও এই শিল্পের শ্রমিকরা বারে বারে ধর্মঘটের পথে পা বাড়াতে বাধ্য হন মজুরী কাঠামোর দাবিতে। চটকল শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস এটাই প্রমাণ করছে যে ধর্মঘটই ছিল তাঁদের দাবি আদায়ের এক এবং একমাত্র পথ। আর, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই ছিল দাবি আদায়ের মূল শক্তি।
কেন্দ্রীয় সরকার এই শিল্পের গায়ে পরিয়েছে অনেকগুলো সংস্থার অলঙ্কার – জাতীয় জুট পলিসি বা ন্যাশনাল জুট পলিসি কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করে ২০০৫-এর এপ্রিল মাসে। কতই না গালভরা লক্ষ্য উদ্দেশ্য ঘোষিত হয় সেই জাতীয় পলিসির মাধ্যমে। কিন্তু, এই শিল্পের সুদিন ফিরে এলো না।
মজুরীর ও মজুরী কাঠামো নির্ধারণের প্রশ্নটি চটকল শ্রমিক আন্দোলনে কেন্দ্রবিন্দু হিসাবেই ছিল সেই সুদূর অতীত থেকে। ৪ আগস্ট, ১৯৬৯ সালে চটকল শ্রমিকেরা শিল্প ভিত্তিক ধর্মঘট শুরু করেন মজুরীর প্রশ্নেই। ৮-৯ আগস্ট, ১৯৬৯, কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী, বাংলার শ্রম মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রীর উপস্থিতিতে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর সাথে যে আলাপ আলোচনা শুরু হয় তার ফলশ্রুতিতে স্বাক্ষরিত হয় এক ত্রিপাক্ষিক চুক্তি, ১১ আগস্ট, ১৯৬৯ সালে। সেই চুক্তির প্রথম পয়েন্টেই ছিল – শিল্প ভিত্তিক মজুরী কাঠামো সংশোধনের বিষয়টি সুপারিশ করা হবে উপযুক্ত এক ব্যবস্থাপনার কাছে, যার গঠন বিন্যাস, টার্মস অফ রেফারেন্স, ও সময়সীমা নির্ধারিত করবেন শ্রমিক ও নিয়োগকর্তা মিলে।
এর ভিত্তিতে ১২ আগস্ট, ১৯৬৯ ধর্মঘট প্রত্যাহৃত হয়।
মজুরী কমিটি সংক্রান্ত আগেকার গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো কার্যকরী না হওয়ায় ট্রেড ইউনিয়নগুলো ৮ মে, ১৯৭২ থেকে আবার লাগাতার ধর্মঘটের নোটিশ দেয়। কিন্তু, সরকার দ্রুত হস্তক্ষেপ করে, ৭ মে এক বৈঠক ডাকে, ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় ধর্মঘটের নোটিশ প্রত্যাহার করা হয়।
মাসিক ন্যূনতম মজুরীর মধ্যে মূল বেতন হয় ১৬০ টাকা আর ডি এ বাবদ ৭৫ টাকা। ১৯৩৯ কে বেস বা ভিত্তি ধরে ৮১৭ পয়েন্টের উপর মূল্যসূচক পর্যন্ত ডি এ অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এই প্রথম, বোনাস- গ্রাচুইটি – পি এফ খাতে তহবিলকে মজুরীর অংশ হিসাবেই গণ্য করা হল।
সেই সময়ে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে আলাপ আলোচনার সময়ে কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী, কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রীর পাশাপাশি বাংলা, বিহার, উত্তর প্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ-এর শ্রমমন্ত্রীরাও সক্রিয় ভাবে উপস্থিত থাকতেন। বোঝাই যায়, তখন চট শিল্পের ছিল এক সর্বভারতীয় চেহারা ও অস্তিত্ব। যত দিন যায়, ততই সর্বভারতীয় অবস্থান থেকে তা ক্রমে ক্রমে নীচের দিকে গড়াতে গড়াতে পশ্চিম বাংলা কেন্দ্রিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যে উৎপাদিত কাঁচা পাট খরিদ করা, মর্জিমাফিক জুট কমিশনার বা বস্ত্র মন্ত্রকের তরফ থেকে কাঁচা পাটের সহায়ক মূল্য ঘোষণা, কত শতাংশ চটের বস্তা প্যাকেজিং-র আওতায় থাকবে – হাতে গোনা এই কয়েকটি কাজ ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের আর কোন দায় নেই এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের প্রতি।
১৯৭৪ সালে ১৪ জানুয়ারি থেকে লাগাতার ধর্মঘটের মুখে কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী, কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রী, বাংলা-উত্তর প্রদেশ-বিহার-অন্ধ্র প্রদেশের শ্রমমন্ত্রীদের নিয়ে পর পর বেশ কয়েকটি ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হয়। ১৩ জানুয়ারি, ১৯৭৪ ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় তারপর দিন থেকে ডাকা ধর্মঘট প্রত্যাহৃত হয়। এই চুক্তিতে ক্লার্ক-মিস্ত্রি-ওয়াচ অ্যান্ড ওয়ার্ড-কোয়ালিটি কন্ট্রোল-এর বেতন স্কেল সংশোধন করা হয়। নিয়োগকর্তারা অন্যান্য টাইম রেটেড কর্মীদের জন্য গ্রেড অ্যান্ড স্কেল চালু করতে সম্মত হয়, আর যতদিন না তা হচ্ছে, ততদিন ১৯৭৪-৭৫ পর্যন্ত সেই সমস্ত কর্মীদের মূল বেতন বা বেসিক এ প্রতি মাসে এক টাকা বাড়াতে সম্মত হয়।
কিন্তু বার বার বেতনক্রম সংক্রান্ত চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও মালিক পক্ষ তা মানেনি। রাজ্য শ্রম দপ্তর ও চুক্তি রূপায়নে মালিক পক্ষকে বাধ্য করাতে পারেনি। এর ফলে চটশিল্পে গভীর অসন্তোষ থেকেই যায়, আবার ১৯৭৯-এর ৫ জানুয়ারি থেকে চটকল শ্রমিকরা সর্বাত্মক ধর্মঘট শুরু করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯ ফের স্বাক্ষরিত হয় ত্রিপাক্ষিক চুক্তি, আর ধর্মঘট প্রত্যাহার করে চটকলগুলোতে কাজ শুরু হল ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে। কি বলা হয়েছিল ওই চুক্তিতে?
“নিয়োগকর্তারা নীতিগত ভাবে সমস্ত বর্গের শ্রমিক – কর্মচারীদের জন্য গ্রেড অ্যান্ড স্কেল চালু করতে এবং বিদ্যমান গ্রেড অ্যান্ড স্কেল সংশোধন করতে রাজি হয়। সরকার বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে পরামর্শক্রমে নিরপেক্ষ সদস্যদের (ইন্ডিপেন্ডেন্ট) নিয়ে একটা কমিটি গঠন করবে, এবং কমিটি গঠনের ছ’মাসের মধ্যে তারা সেই সংক্রান্ত যথোপযুক্ত সুপারিশ প্রস্তুত করবেন, যা পাঠানো হবে উভয় পক্ষের কাছে। শ্রমমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে আলাপ আলোচনা ক্রমে গ্রেড অ্যান্ড স্কেল চূড়ান্ত করবেন”। ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৮১ পর্যন্ত এই ত্রিপাক্ষিক চুক্তির মেয়াদ ছিল।
চুক্তি রূপায়িত না হওয়ায়, উক্ত মেয়াদের শেষে, ট্রেড ইউনিয়নগুলো ১৯৮২ এবং ১৯৮৩ সালের বিভিন্ন তারিখে ফের দাবি সনদ পেশ করে। ১৯৮৩ সালের ৫ই মে-র ত্রিপাক্ষিক বৈঠক ব্যর্থ হওয়ায়, আবার চটকল শ্রমিকদের ধর্মঘট শুরু হয় ১৬ জানুয়ারি, ১৯৮৪ থেকে। বারংবার ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হয় সমাধান সূত্র বার করার লক্ষ্যে। অবশেষে ৭ এপ্রিল ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ধর্মঘটে ছেদ পরে। মিলগুলো আবার চালু হয় ৯ এপ্রিল থেকে। এই চুক্তিতে গ্রেড-স্কেল সম্পর্কিত কমিটির সুপারিশ এবং শ্রমমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত সাপেক্ষে সমস্ত পক্ষই একমত হন যে, কেন্দ্রীয় ওয়েজ বোর্ডের সন্তোষ ভট্টাচার্য কমিটি যে ৩৭টি বেসিক ওয়েজ রেট-র সুপারিশ করে, তা সাতটি গ্রেড স্কেলে মিশিয়ে দেওয়া হবে। টাইম ও পিস রেট সহ সমস্ত বর্গের শ্রমিকদের মজুরী কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী গ্রেডের কাঠামোতে অবিলম্বে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
১৯৮৪-র ত্রিপাক্ষিক চুক্তি অনেকগুলো বকেয়া সমস্যাকে সমাধানের দিকনির্দেশ রাখলেও, চুক্তিকে অমান্য করার দুষ্ট পাপচক্রে পড়ে যায়। চটকল শ্রমিকেরা যে তিমিরে ছিলেন, সেই তিমিরেই থেকে গেলেন।

চটশিল্পের অধোগতি

৯০ দশকের শুরু থেকে চটশিল্পে শ্রম সম্পর্ক বারুদের স্তূপের উপর দাঁড়াল। রুগ্নতার তকমা ঝুলিয়ে বেশ কিছু চটকল বি আই এফ আর-র শরণাপন্ন হল। কার্যকর মূলধনের সংকটের অজুহাতে, মিল বন্ধ হওয়ার জুজু দেখিয়ে শুরু হল “কাটৌউতি” – শ্রমিকদের মজুরি থেকে টাকা কেটে মালিককে কার্যকরী মূলধন জোগানো – চটকল শ্রমিকরা চিরদিন এই কুখ্যাত কাটৌতিকে মনে রাখবে। বি আই এফ আর এই চরম শ্রমিক বিরোধী পদক্ষেপকে শিলমোহর দিল। ৮০-র দশকের মাঝামাঝি থেকে চটশিল্পে মালিকানা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে লিজ/সাবলিজ/ভাড়া চালু হওয়ার পর থেকে আর্থিক ও শ্রমিক – মালিক সম্পর্ক চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের বেতন থেকে শুরু করে পিএফ-ইএস আই-গ্রাচুইটি সবই আত্মসাৎ করতে থাকে। বিভিন্ন মিল চত্বরে বাড়তে থাকে শ্রমিক অসন্তোষ ও উত্তেজনার পারদ, যা ৯০-র শুরু থেকে বিস্ফোরণের রূপ নেয়। শ্যামনগরের গৌরীশঙ্কর জুটমিলে অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের বকেয়া পাওনার লড়াইয়ে কারখানার ভেতরেই পুলিশের গুলি চলে। নিহত হন শ্রমিক রাজেশ্বর রাই (২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৯০)। জুট মিলের শ্রমিক ভিখারি পাসোয়ানকে পুলিশ গুম খুন করে, লক আউট বিরোধী সংগ্রামের সময়ে। উত্তর ২৪ পরগনার টিটাগড়ে মাঠকলের হাজার হাজার শ্রমিক কারখানা খোলার দাবিতে তুমুল বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। ওই সময়েই আগরপাড়া জুটমিলের শ্রমিকেরা বন্ধ কারখানা খোলার দাবিতে ৬ ঘণ্টা বি টি রোড অবরোধ করেন। ১৯৯৩-৯৪ তে কানোরিয়া জুট মিলের ব্যতিক্রমী নজর কাড়া লক আউট বিরোধী সংগ্রাম এক জল বিভাজিকা টেনে দিল, যা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ঘেরাটোপ ভেঙে জন্ম দিল বিরাট এক সামাজিক আন্দোলনের। বরানগর জুটমিলে মিল কর্তৃপক্ষের গুলিতে ভোলা দাস নিহত হওয়ায় উত্তেজিত শ্রমিকরা তৎক্ষণাৎ কর্তৃপক্ষের ২ জনকে পুড়িয়ে মারেন। হুগলীর গ্যাঞ্জেস জুটমিলে পুলিশের গুলিতে সোমেশ্বর রাও নিহত হন। প্রতিষ্ঠিত ট্রেড ইউনিয়ন গুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে এসে ঠেকে, আর চটশিল্পের মালিক পক্ষ-আমলাতন্ত্র ও শাসক রাজনৈতিক দলের নেতাদের অশুভ আঁতাতের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যেই শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত জঙ্গি বিক্ষোভ ফেটে পড়তে দেখা যায় বিভিন্ন মিল চত্বরে। তবে এই আন্দোলনের মেজাজ ও রূপ যতই জঙ্গি থাকুক না কেন, স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের পরিণতি যা হওয়ার তাই হয়। সেই সময় বাম শাসনের একাধিপত্য বজায় থাকা সত্ত্বেও কেন এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটেছিল, তা গভীর আত্মসমীক্ষার দাবি জানায়।
দেখা যাচ্ছে, ১৯৯৮ থেকে ৬ বছর কোন ইনক্রিমেন্ট শ্রমিকেরা পাননি। ১৯৯৯ – ২০০৩ পর্যন্ত বেসিক দাঁড়িয়ে ছিল ৫৫৭ টাকায়। আর এই ৬ বছর শ্রমিকদের ক্ষতির পরিমাণ ৬৪৮ টাকা। ৩,৫০০ টাকা সিলিং থাকার জন্য ২০০০ সালের পর কেউ বোনাস পাননি। রাজ্য সরকারের এক্তিয়ার ভুক্ত ক্ষেত্রগুলোর সমস্যা কেন সমাধান করা গেল না, তার স্পষ্ট সদুত্তর তখন পাওয়া যায়নি।

২০০২ সালের চুক্তি – বিরাট এক পশ্চাদমুখী যাত্রা

শুরু করা যাক বেঙ্গল চটকল মজদুর ইউনিয়ন (বি সিএম ইউ)-র তদানীন্তন সাধারণ সম্পাদকের এক উদ্ধৃতি থেকে। উল্লিখিত ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ৩-৪ এপ্রিল, ২০০২-এ বি আই এফ আর-কে এক চিঠিতে তিনি জানান, “৫ জানুয়ারি, ২০০২ তারিখে চটশিল্পের জন্য স্বাক্ষরিত চুক্তি এই শিল্পের সমগ্র আর্থিক চিত্রকেই পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। উক্ত চুক্তিতে, প্রতিটি মিল-এ নয়া ভর্তিদের ন্যূনতম মজুরী (এমলুমেন্ট) মাথাপিছু ১০০ টাকা ধার্য করা হয়েছে। এর ফলে, মজুরীর পরিমাণটা বিরাট মাত্রায় কমে যাবে। পাশাপাশি, চুক্তি অনুযায়ী, ৩৩.৩৩ শতাংশ মজুরী উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
এই দু’টো দিককে একসঙ্গে রূপায়িত করলে এন জে এম সি সহ সমগ্র শিল্প পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠবে এবং প্রতিটি মিল মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হবে”। ওই চুক্তির ফলে, সেই সময়ে, একই কাজে একই শ্রম দিয়ে “নবাগত শ্রমিক”, যাদের ১০০ টাকা মজুরী ধার্য হয়েছিল, ঘর ভাড়া বাদ দিয়ে পেয়েছিলেন ২,৮২৪.২০ টাকা। ফলে, এরা প্রতিমাসে ১৭৯৪.৭৫ টাকা ক্ষতির শিকার হন।
শ্রমিকদের রক্ত জল করা মজুরীর বিনিময়ে “প্রতিটি মিলকে মুনাফা অর্জনের” রাস্তা করে দেওয়ার ওই চরম শ্রমিক বিরোধী চুক্তির বিরুদ্ধে শ্রমিকরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। অধিকাংশ মিল-এ উৎপাদন ভিত্তিক মজুরী কার্যকর করতে ব্যর্থ হয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু জন্ম নিলো, কম মজুরীর বিনিময়ে নতুন এক বর্গ – নিউ এন্ট্রান্স নামে যা আজ ও টিকে রয়েছে।
এর পরের বেশ কয়েক বছর ধরে, বারে বারে চটশিল্পে ধর্মঘট, ত্রিপাক্ষিক চুক্তি, চুক্তি রূপায়নের দাবিতে ফের আন্দোলন এক ধারা হিসাবে সামনে আসে। ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত পাঁচ বার লাগাতার ধর্মঘট করে চটকল শ্রমিকরা, যা দেশে অন্য শিল্পে বিরল। সমস্ত ইউনিয়ন একসাথে ধর্মঘটের পথে পা বাড়ালেও সম্পাদিত ত্রিপাক্ষিক চুক্তিকে ঘিরে মতপার্থক্যের কারণে শ্রমিক ঐক্যে বিভিন্ন সময়ে ফাটল ধরে। বেশ কিছু ইউনিয়ন আলাদা হয়ে যায়। শ্রমিকদের ডি এ ফ্রিজ করা হয়। শ্রমিকদের বকেয়া ডি এ ৬ কিস্তিতে দেওয়ার যে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি ২০১০ সালে স্বাক্ষরিত হয়, তা এমনকি বেশ কিছু বামপন্থী কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নও মেনে নিতে পারেনি। সর্বশেষ সম্পাদিত ত্রিপাক্ষিক চুক্তি কোন বামপন্থী কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন স্বাক্ষর করে নি।

উপসংহারের বদলে

এক অদ্ভুত বিরোধাভাসের মুখে রাজ্যের চটশিল্প। গত বছর কাঁচা পাটের রেকর্ড ফলন হওয়া সত্ত্বেও, এবার কাঁচা পাটের “অভাবে” একের পর এক চটকল বন্ধ অথবা শিফট কমানোর পথে হাঁটে। আর, পরস্পরকে দোষারোপ করে রাজ্য-কেন্দ্র হাত গুটিয়েই বসে থাকে। বাস্তবে, এই শিল্পটি চটমালিকদের কাছে আদিম পুঁজি সঞ্চয়ের এক ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এই শিল্প থেকে অতি অল্প সময়ে দ্রুত মুনাফা অর্জন করে অন্যত্র বিনিয়োগ করাটাই দস্তুর হয়ে থেকেছে। কেন্দ্রীয় বস্ত্র মন্ত্রক এক রিপোর্টে জানিয়েছে, চটকলগুলোতে বার্ষিক টার্ন ওভার দশ হাজার কোটি টাকা হলেও কারখানার আধুনিকীকরণ বা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য নিয়োগকর্তারা বার্ষিক টার্ন ওভারের মাত্র ২.৭ শতাংশ খরচ করে। শিল্পপতিদের বদলে, এই শিল্পটিতে কার্যত আজ ফাটকা মালিক-কাঁচা পাট সরবরাহকারী-সাময়িক লিজ নেওয়া লোকজনের দৌরাত্ম চলছে। রাজ্য শ্রম দপ্তরও জানে না কোন চটকলের মালিক আসলে কে! এখানে মানা হয় না ন্যূনতম শ্রম আইন। পি এফ-গ্রাচুইটি’র পর্বতপ্রমাণ বকেয়া রেখে দিব্যি চলছে তাদের ব্যবসা – দেশের কোন আইনই তাদের টিকি ছোঁয়ার মুরোদ দেখাতে পারে না। বহুদিন বাদে, কয়েক বছর আগে কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রকের অধীন ন্যাশনাল জুট বোর্ড এই প্রথম চটকল শ্রমিকদের সামাজিক-আর্থিক অবস্থা নিয়ে এক তথ্য সম্বলিত সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। এই সমীক্ষায় চটকল শ্রমিকদের নিদারুণ দুরবস্থা, ক্রমে ক্রমে ঋণের দায়ে জড়িয়ে পড়া, প্রভৃতি অনেক করুণ তথ্য উঠে এসেছে, যা সরকারের রাঘব বোয়ালেরা আদৌ পড়ে দেখেছেন কিনা সন্দেহ রয়েছে। ওই সমীক্ষায় পাট শিল্পকে আরও উন্নত, আধুনিক ক্ষেত্র হিসাবে গড়ে তুলতে ও বেশ কিছু ইতিবাচক সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু, এই শিল্পকে রুগ্ন শিল্পের চশমায় দেখার জন্য আজ পর্যন্ত কোন ইতিবাচক গঠনমূলক ভাবনা ও পদক্ষেপ কোন পক্ষের তরফ থেকেই দেখা গেল না।
অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে আধুনিক ভিত্তিভূমির উপর পুনর্গঠন করতে হলে আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও চিন্তার কাঠামোতে আমূল বদল। কাঁচা পাট উৎপাদন, তার বাজারজাতকরণ, ফড়ে ফাটকাবাজদের কব্জা থেকে পাটচাষিদের মুক্ত করার জন্য দরকার প্রশাসনিক নজরদারি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান। আরও বৃহত্তর পরিসরে কাঁচা পাট উৎপাদনের জন্য সরকারি উৎসাহদান, স্যাকিং নির্ভরতা কাটিয়ে বৈচিত্রকরণের দিকে পা বাড়ানো, সর্বোপরি শতাব্দী প্রাচীন এই শিল্পকে আধুনিক এক শিল্পের গড়নে সংগঠিত করাটাই পরিস্থিতির দাবি। আর, একমাত্র বামপন্থীরাই পারে এই কঠিন চ্যালেঞ্জ হাতে নিতে। অতীতে জনপ্রিয় সর্বজনগ্রাহ্য বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন নেতারাই এই শিল্পে বড় বড় নজরকাড়া সংগ্রামের জন্ম দিয়েছিলেন। তাদের শুরু করা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই চটকল শ্রমিকরা চিনতে শিখেছিলেন তাঁদের প্রাপ্য অধিকার। আজ, ক্রমে লুপ্ত হওয়া সেই সমস্ত অধিকারকে আবার কেড়ে নিতে বামপন্থীদেরই কাঁধে তুলে নিতে হবে কাণ্ডারির ভূমিকা। নতুন কল্পনাশক্তি – দৃঢ় সংকল্প ও প্রত্যয় নিয়ে ব্যাপকতম ঐক্যের ভিত্তিতেই আগামী দিনে সংগ্রামের সেই নব জাগরণের পথ চেয়ে রয়েছে চটকল শ্রমিক আন্দোলন।

[লেখক – সাধারণ সম্পাদক, বেঙ্গল চটকল মজদুর ফোরাম (এ আই সি সি টি ইউ)।]

Facebook Comments

Leave a Reply