বামফ্রন্ট পতন পরবর্তী বাংলার শ্রম রাজনীতির হাল-হকিকত: শত্রুঘ্ন কাহার

fail

বাংলার ইতিহাসে ২০১১ সাল চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। দীর্ঘ ৩৪ বছরের তথাকথিত শ্রমিকদরদী বামফ্রন্ট সরকারের পতন কোন আকস্মিক ঘটনা ছিল না। ইতিহাসে সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে বিবেচিত হলেও, কৃষক-শ্রমিকদের ব্যাপক সমর্থনে গড়ে ওঠা বামফ্রন্ট সরকারের পতনকে প্রাথমিক ভাবে একটি প্রশাসনিক (সিস্টেম) ব্যবস্থার পতন বলেই মনে হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল, শীঘ্রই বামফ্রন্ট কৃষক-শ্রমিকদের জনসমর্থন আদায় করে আবার সরকারে ফিরে আসবে, তা কিন্তু হয় নি। পরবর্তী একের পর এক নির্বাচনে বামফ্রন্ট শরিক দলগুলির জনসমর্থন ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে। ২০২১-এর সাধারণ নির্বাচনে বাংলার ইতিহাসে প্রথম বার বিধানসভা নির্বাচনে বামপন্থীরা একটাও আসন দখল করতে পারেনি। প্রশ্ন হল মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে একটি শক্তিশালী পার্টির এই দুরবস্থা কেন? প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে যে পার্টির তীব্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার কথা, সেই আজ প্রান্তিক পার্টিতে পর্যবসিত হচ্ছে, কেন?

২০১১ সালে নতুন সরকার তৈরি হলেও, শ্রমজীবীদের জীবনে মৌলিক কোন পরিবর্তন ঘটে নি। আজও ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল জুড়ে একের পর এক চটকল বন্ধ হচ্ছে। শাসক শ্রেণি শ্রমিকদের যে সমস্ত দাবি দাওয়া নিয়ে একদা বাম বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, সেই সমস্ত দাবী দাওয়া আর তাদের মুখে শোনা যায় না। চটকলের সংগঠিত শ্রমিকরা পেটের টানে সান্তরাশ, কুলি, মুঠে, ফেরিওয়ালা, রাজমিস্ত্রি প্রভৃতি কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। কাজের অনিশ্চয়তা তাদের প্রত্যহ জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। তবু তাদের এই অবস্থাকে কেন্দ্র করে কোন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা যাচ্ছে না। তাহলে কি তারা এই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে? নাকি এতদিন যে পার্টির ওপর আস্থা রেখে তারা লড়াই সংগ্রাম করে এসেছে, সেই পার্টির প্রতি তাদের আস্থা আর নেই? উত্তর খুঁজতে হলে ২০১১-এর পর তাদের জীবন ফিরে দেখতে হয়।

২০১১ সালে মা-মাটি-মানুষের শ্লোগান নিয়ে নতুন সরকার তৈরি হল। তবে এই পরিবর্তন আকস্মিক কোন ঘটনা ছিল না। ১৯৯০-এর দশক থেকেই এই পরিবর্তনের ভিত প্রস্তুত হতে থাকে। বামপন্থী আন্দোলনের সাথে চটকল শ্রমজীবীদের ক্রমদূরত্ব, বিরোধী শক্তির কাছে শ্রমজীবীদের জীবনে প্রবেশের পথ ক্রমশ প্রশস্ত করতে থাকে। ১৯৯৩ সালে সি আই টি ইউ সদস্য ভিখারি পাসোয়ানের অন্তর্ধান তৎকালীন বিরোধী নেত্রীর রাজনৈতিক উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ভিখারি পাসোয়ানের অন্তর্ধানকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতি উত্তপ্ত ছিল পরবর্তী কয়েক বছর। শুধু তাই নয় তৎকালীন বিরোধী নেত্রী এই বিষয়টিকে নিয়ে আদালত পর্যন্ত যান। এর পাশাপাশি ১৯৯৩ সালে কানোরিয়া জুট মিলে শ্রমিক আন্দোলনের যে তরঙ্গ তৈরি হয় তা বামপন্থীদের শ্রমিকদরদী চরিত্রকে ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু করতে থাকে।
কানোরিয়া জুট মিলের শ্রমিক আন্দোলনের অনেক নেতা পরবর্তীকালে পরিবর্তনের যুগে শাসক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী হন। চটকল শ্রমজীবী অধ্যুষিত অঞ্চলে তৃণমূলের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। অন্যদিক ২০১১ সালের পরিবর্তনের মূল ভিত্তি রচিত হয় নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরে বামফ্রন্ট সরকারের শিল্পনীতির বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে। স্বাভাবিকভাবে এই সরকার শিল্প নীতির চেয়ে ভোটের রাজনীতিতেই বেশি আগ্রহী ছিল। এমতাবস্থায় এখনও সরকারী নীতি নির্ধারণে শিল্প তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। তৃণমূল কংগ্রেসের একটি ট্রেড ইউনিয়নের খাতায় কলমে অস্তিত্ব থাকলেও শিল্প সম্পর্কিত বিষয়ে তাদের অবস্থান তেমন নজরে পড়ে না।

২০১৪ সালে কেন্দ্রে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পনীতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসে। শ্রম আইনে পরিবর্তন আনা হয়। শ্রমিকদের দীর্ঘদিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত অনেক অধিকারই এই শ্রম আইনে হরণ করা হচ্ছে। কাজের সময় থেকে শুরু করে, বেতন, স্থায়ী শ্রমিকের জায়গায় ঠিকা শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি একাধিক উপায়ে ফাঁকি দেওয়া হয়েছে ফ্যাক্টরি আইনকে। শুধু তাই নয় লে-অফ, ছাঁটাই প্রসঙ্গেও মালিককে দেওয়া হয়েছে অবাধ অধিকার। অন্যদিকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে শ্রমিকদের ন্যূনতম প্রতিবাদের অধিকারটুকু। এতদ্বসত্তেও বাংলার সাংসদরা পার্লামেন্টে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন, খুব বেশি হলে সভাগৃহ ত্যাগ করেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে রাজ্য জুড়ে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার কোন প্রয়াসই শাসক দল করেনি। উল্টে বামপন্থীদের সংগঠিত আন্দোলন ধর্মঘটকে শক্ত হাতে দমন করেছেন বর্তমান শাসক দল। এক্ষেত্রে বর্তমান শাসকদলের শিল্পনীতি অনেকটাই দায়ী। শাসকদলের কোন নির্দিষ্ট শ্রমিক নীতি না থাকায় চটকল শ্রমজীবীরা বর্তমানে আরও বেশি অবহেলিত।

অন্যদিকে ২০১৪ সালে কেন্দ্রে বি জে পি সরকারের গঠনের পর ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল জুড়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজন চরম আকার নেয়। ২০১৬, ২০১৭ পর পর হাজিপুর, গারুলিয়া, টিটাগড় প্রভৃতি শ্রমিক অধ্যুষিত অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আবহ শ্রমিকদের শ্রেণি আন্দোলনকে ক্রমশ দুর্বল করে তোলে, তাদের প্রত্যহ জীবনে ধর্মীয় বিভাজন লক্ষ্য করা যায়। হিন্দু মুসলিম শ্রমজীবীদের মধ্যে একে অপরের প্রতি এই অনাস্থা, অবিশ্বাস ক্রমশ শাসক শ্রেণীকে শ্রম বিরোধী আইন তৈরি ও বিনা বাঁধায় তা পাশ করাতে সাহায্য করেছিল। এরই মাঝে করোনা নামের এক নতুন সমস্যা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে।

২০১৯ থেকেই বিশ্ব জুড়ে করোনার প্রকোপ লক্ষ্য করা গেলেও, ভারতে এর প্রভাব অনুভূত হয় ২০২০ সালের প্রথম দিক থেকে। ২২ শে মার্চ প্রধানমন্ত্রীর একদিনের জন্য ‘জনতা কার্ফু’ ঘোষণার দিনও কেউ ভাবতে পারেনি এই জনতা কার্ফু অদূর ভবিষ্যতে এক দীর্ঘ লকডাউনের রূপ নিতে চলেছে। ২৩ শে মার্চ জনতা কার্ফুর পরপরই ২৪ শে মার্চ প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন দেশ জুড়ে ২১ দিনের জন্য সম্পূর্ণ লকডাউন যা পরবর্তীকালে যথাক্রমে ১৯, ১৪, ১৪ দিনের জন্য বৃদ্ধি করা হয়। টানা দুমাস সম্পূর্ণ লকডাউন পর্বে ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলও স্তব্ধ হয়ে পড়ে। এরপর আনলক পর্বে শুরু হয় জুন মাস থেকে। এই আনলক পর্বে আংশিক চটকল গুলি খুললেও সকলের কাজের ব্যবস্থা হয়ে ওঠে না। এই অবস্থা চলতে থাকে পরবর্তী মাস দু’য়েক। স্বাভাবিক ভাবে এই পরিস্থিতিতে ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন জীবন এক চরম সঙ্কটের সম্মুখীন হয়।

চটকল শ্রমজীবীদের জীবনে অনিশ্চয়তা নতুন কোন বিষয় নয়। চটকলে লকডাউন, ছাঁটাই, ধর্মঘট, কর্মবিরতি ইত্যাদি তাদের এই অনিশ্চিত জীবনে অনেকটাই অভ্যস্ত করে ফেলেছে। এই রকম পরিস্থিতিতে তবুও তারা বিকল্প কাজে যোগ দিয়ে বা গ্রামে ফিরে গিয়ে নিজের জীবনধারণের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হত। কিন্তু দেশ জুড়ে সম্পূর্ণ লকডাউন তাদের জীবনে এই বিকল্প পথও বন্ধ করে দেয়। সম্পূর্ণরূপে তারা আবদ্ধ হয়ে পড়ে বস্তি অঞ্চলে। শারীরিক দূরত্বের ন্যূনতম বিধি এই বস্তি অঞ্চলে মেনে চলা সম্ভব ছিল না। ১০ ফুট বাই ১০ ফুটের এক একটি কোয়ার্টার বা বস্তির ঘর গুলিতে সপরিবারে ৫ থেকে ৬ জনের বসবাস, সেই ঘরেই মহিলাদের স্নান, রান্নাবান্না যাবতীয় কাজ, সর্বসাধারণের জন্য পাবলিক টয়লেট, পাড়ার টাইম কলে জামাকাপড় কাচা ও পুরুষদের স্নান প্রভৃতি এই অতিমারির স্বাস্থ্য বিধির সাথে বড়ই বেমানান ছিল। যদিও সরকারের লকডাউন ঘোষণার পর পরই এই সমস্ত বস্তি জুড়ে পুলিশি নজরদারি বৃদ্ধি পায়। বস্তি অঞ্চল থেকে এক পা বেরোলে খেতে হয় পুলিশের লাঠি।

লকডাউন এত দীর্ঘ হবে সেটা সাধারণের জানা ছিল না। চটকল শ্রমিকরা তাদের যৎসামান্য আয়ের সমস্তটাই খরচ করে তাদের ভরণপোষণে। তাদের হাতে যা সঞ্চিত টাকা ছিল তাতে মেরেকেটে এক সপ্তাহ অতিবাহিত করা সম্ভব ছিল। তারপর বস্তি জুড়ে দেখা যায় এক হাহাকার। শুরু হয় আধ পেট খেয়ে, কখন কখন না খেয়ে দিন কাটানো। এই সময় কিছু স্বেচ্ছাসেবী দল এগিয়ে আসে তাদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য। চটকলের এই খেটে খাওয়া মানুষ কোন দিন স্বপ্নেও ভাবেনি পেটের দায়ে তাদের হাত পাততে হবে, ভিক্ষে করতে হবে। লকডাউনের মাসখানেক পর সরকার রেশনিং ব্যবস্থা ঘোষণা তাদের জীবনে অনেকটাই স্বস্তি নিয়ে আসে। এই সময় পর্বেই মিল মালিকেরা দু’ থেকে চার হাজার টাকা স্থায়ী শ্রমিকদের অগ্রিম দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। যদিও মিলের শ্রমিকদের এক বৃহৎ অংশ অস্থায়ী, বদলি কর্মী, তারা কিন্তু বঞ্চিতই থেকে যায়।

আর্থিক সমস্যার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরণের সামাজিক সমস্যাও নজরে পরে এই লকডাউন পর্বে। বাড়ির পুরুষ সদস্য কাজের সূত্রে এক দীর্ঘ সময় ঘরের বাইরে থাকত, কিন্তু এই লকডাউন তাদেরকে বাড়িতেই থাকতে বাধ্য করে। আর্থিকভাবে সম্পন্ন বাড়ি হলে হয়তো বাড়ির কর্তাকে পাশে পেয়ে সময়টা মধুরই হত, কিন্তু এক্ষেত্রে চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ উলটো। বাড়ির কর্তার কাজ হারিয়ে নিঃস্ব, অন্যদিকে বাড়ির মহিলারা কোন না কোন কুটির শিল্প বা অন্য কাজের সাথে যুক্ত থাকায় তারাই তাদের যৎসামান্য আয় থেকে ঘরের প্রয়োজন মেটাতে থাকে। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে এই পরিস্থিতি মেনে নেওয়া ছিল কঠিন। ফলে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় কলহ। এই পর্বে এই অঞ্চল গুলিতে নারীদের ওপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সবচেয়ে করুণ পরিস্থিতি হয়েছিল বাড়িতে থাকা অল্প বয়স্ক ছেলেমেয়েদের। বাড়ির বাইরে খেলাধুলা ছিল নিষেধ। দিনের ২৪ ঘণ্টা সেই ১০ বাই ১০ ফুট ঘরেই আবদ্ধ থেকে তাদের জীবন একঘেয়ে হয়ে পড়ে। তাদের দৈনন্দিনে চাহিদা মেটানো মা বাবার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কোন প্রিয় জিনিসের জন্য এই শিশুরা কান্নাকাটি করলেই তাদের কপালে জুটত বেধড়ক মার। তার ওপর অনেক সময় পারিবারিক কলহের শিকার হতে হয় বাড়ির এই নাবালক-নাবালিকাদের। এই সময় পর্বে একাধিক দৈনিক পত্রিকায় শিশু নির্যাতন বৃদ্ধির কথা উঠে আসে। বৃদ্ধি ঘটে শ্রমজীবী পরিবারে স্কুলছুটের সংখ্যাও।

প্রায় দুমাস পর আনলক পর্বে ধাপে ধাপে চটকল গুলি খুলতে আরম্ভ হয়। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই পাটের মজুতদারি হেতু মিলগুলির উৎপাদন ধাক্কা খায়। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার চটকল গুলি তাদের চাহিদা অনুযায়ী বস্তা দিতে অপরাগ এই অজুহাতে ক্রমশ তাদের বস্তার বরাদ্দ সিনথেটিক লবিকে দিতে শুরু করে। ফলে চটকল গুলিতে ৩ শিফটের জায়গায় ২ শিফট কাজ শুরু হয়। ফলে চটকল জুড়ে শুরু হয় শ্রমিক ছাঁটাই। আবার কিছু মিলে শ্রমিকদের সপ্তাহে নির্দিষ্ট ২ বা ৩ দিন কাজ দেওয়া হয়। আশ্চর্যের বিষয় এই সব বিষয়ই শ্রমিকরা বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল জুড়ে এই সমস্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোন আন্দোলন সংগ্রাম পরিলক্ষিত হয় না। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের এই সমস্ত শ্রমিক বিরোধী কার্যকলাপের পরও ২০২১-এর সাধারণ নির্বাচনে বাম দলগুলি শ্রমজীবীদের সমর্থন তাদের পক্ষে আনতে ব্যর্থ হয়। এক দুটো টোকেন ধর্মঘট ছাড়া শ্রমজীবীদের সংঘবদ্ধ করার কোন উদ্যোগ বাম দল গুলি দেখায় নি। কেন্দ্রীয় সরকারও সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে, একের পর এক শ্রমিক বিরোধী আইন পার্লামেন্টে বিনা বাধায় পাশ করিয়ে চলেছে।

যদিও ১৯ নভেম্বর ২০২১-এ প্রথমবার মোদী সরকারের অজেয়, অপরাজেয় ভাবমূর্তি সাময়িক ধাক্কা খেয়েছে। কৃষকদের তীব্র আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রী তিন কালা কৃষি আইন বাতিল করছে। যদিও কৃষকরা তাদের অন্যান্য দাবী যেমন ন্যূনতম সহায়ক মূল্য, বিদ্যুৎ বিল বাতিল, শহীদ কৃষকদের ক্ষতিপূরণ ইত্যাদিতে আজও অনড়। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে পার্লামেন্টে কার্যত বিনা বাধায় পাশ হওয়া কৃষি বিল, কৃষকদের দীর্ঘ একবছরের একরোখা সংগ্রামের ফলে রদ হয়েছে। তাহলে কি এবার শ্রম আইন বাতিলের জন্য শ্রমিকদের পথে দেখা যাবে? প্রশ্নটি রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে বিদ্বজ্জনের মাঝে বহুল চর্চিত। জনৈক শ্রমিক নেতার মতে, “শ্রম বিধি বাতিলে সরকারকে বাধ্য করতে হলে কৃষকদের ধাঁচে দেশ জুড়ে আন্দোলন করতে হবে। কৃষক আন্দোলনে যেমন ৫০০ সংগঠন সংযুক্ত হয়েছিল, তেমনই এই আন্দোলনেও ছোট-বড় সমস্ত শ্রমিক সংগঠনকে যুক্ত করতে হবে।” শ্রমিক সংগঠনগুলি একত্রিত হয়ে গেলেই কি কেল্লা ফতেয় হয়ে যাবে? বোধ হয় নয়। কৃষক আন্দোলনের সাফল্য শুধু কৃষক সংগঠনগুলি ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের জন্য হয়েছে ভাবলে ভুল হবে। এই সংগ্রামে জয়ের ভিত তৈরি করেছিল কৃষকদের সংঘবদ্ধ চেতনা। পার্লামেন্টে আইন পাস হওয়ার বহু আগে থেকে কৃষক নেতারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে এই বিলের অপকারিতা কৃষকদের বোঝানো শুরু করেছিল। কৃষি বিল পাস হওয়ার বহু আগে আমরা দেখেছিলাম কৃষকদের মহারাষ্ট্রের লং মার্চ। আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী প্রায় প্রত্যেক কৃষক (স্বাক্ষর- নিরক্ষর) কৃষি বিলের প্রত্যেক আইন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল, তাঁরা স্বচ্ছন্দে দেশের নাগরিকদের কাছে তাদের দাবী বলতে পারছিল। পক্ষান্তরে লেবার কোড খায় না মাথায় দেয় এ সম্পর্কে শ্রমিক শ্রেণী প্রায় অজ্ঞাত। ২০১৪-এর পর বাংলায় প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চল জুড়ে একাধিকবার সফল ধর্মঘট লক্ষ্য করা গেলেও, শ্রমিক শ্রেণীর এক বৃহৎ অংশ লেবার কোড-এর নামই শোনে নি, আইনে কি বলা হয়েছে সেটা দূরের বিষয়। বস্তি বস্তিতে গিয়ে, শ্রমিক মহল্লায় শ্রমিকদের একত্রিত করে তাদের ধরে ধরে লেবার কোড বোঝানোর মত ধৈর্য বোধ হয় লিডেরশিপের নেই। তবে এছাড়া শ্রমিক আন্দোলন সংগঠনের অন্য কোন উপায় আমি দেখতে পারি না। প্রশ্ন হল কেন এত অনীহা শ্রমিকদের মাঝে গিয়ে তাদের সচেতন করার বিষয়ে? উত্তর খুঁজতে হলে এবার চলে আসে বামপন্থীদের প্রসঙ্গ। এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে শ্রমিকদের মধ্যে গিয়ে কাজ করার ধৈর্য ও মানসিকতা বামপন্থীদের মধ্যেই দেখা যায়। অথচ দীর্ঘ ৩৪ বছরে শাসনের ভূত তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। শ্রমিক ও বামপন্থীদের দূরত্ব সেই ৯০ এর দশক থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। মধ্যবিত্ত সুলভ নেতৃত্ব ক্রমশ সামন্ততান্ত্রিক ধাঁচে শ্রমিক আন্দোলনকে পরিচালনা শুরু করে। শ্রমিকদের মধ্যে লিডারশিপের প্রতি ক্রমশ অনীহা তৈরি হতে থাকে। শ্রমিকদের এও বলতে শোনা যায়, নেতারা বনধ ডাকে শুধুমাত্র মালিকদের কাছ থেকে কমিশন খাওয়ার জন্য। শ্রমিকের লিডারশিপের প্রতি এই অবিশ্বাস কি পারবে তাদেরকে সম্মিলিত ট্রেড ইউনিয়নের ছত্রছায়ায় মোদীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে? রাকেশ টিকায়েতের অশ্রুধারা মৃতপ্রায় কৃষক আন্দোলনে এক নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছিল, নিজ প্রাণ হাতে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল লক্ষ লক্ষ কৃষক সিংঘু বর্ডারে। এমন বিশ্বস্ত শ্রমিক নেতা কি আছে? যার অশ্রু শত শত শ্রমিককে বেপরোয়া করে তুলবে, একরোখা ভাবে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বে?

শ্রমিকদের মধ্যে বিভাজন শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এক বড় অন্তরায়। বিশেষত সরকারী কর্মচারী ও মিল শ্রমিকদের মাঝে পার্থক্য বিস্তর। তাই বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে ব্যাঙ্ক কর্মী বা বি এস এন এল-এর কর্মীরা পথে নামলেও কারখানার শ্রমিকদের তাদের পাশে দাঁড়াতে দেখি না, আবার মিল শ্রমিকদের আন্দোলনে সরকারী বাবু কর্মীদের দেখা যায় না। এই শ্রমিক বিভাজন শ্রমিক আন্দোলনকে মারাত্মক ক্ষতি করছে। লেবার কোডের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রাম সংগঠিত করতে চাইলে এই বিভাজিত শ্রমিকদের একটি সূত্রে বাঁধতে হবে। তাদের একে অপরের ভাল মন্দের সাথে সকলের ভাল মন্দ জড়িত এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। বি জে পি বিধায়কেরা প্রায়শই বলে থাকে পেট্রোল ডিজেল এর দাম বাড়ানোর সাথে গরিবদের কোন সম্পর্কই নেই, কারণ তারা গাড়ি চালায় না, এই মূল্যবৃদ্ধি ধনীদের স্বার্থে আঘাত হানছে। আর বিশ্বাস করুন, এক বৃহৎ শ্রেণীর নিরক্ষর শ্রমজীবী মানুষ বি জে পি নেতাদের এই তত্ত্বে বিশ্বাসী। স্বাভাবিকভাবে ৬০-৭০-৮০-এর দশকে মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন লক্ষ্য করা গেলেও বর্তমানে ব্যক্তিস্বার্থের বেড়াজাল সংগঠিত আন্দোলনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আগামী ২৮ ও ২৯ শে মার্চ দেশ জুড়ে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ১০ টি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই ধর্মঘটও পূর্বের ধর্মঘটগুলির মতই সাফল্য লাভ করবে। তবে শুধু ধর্মঘটে আবদ্ধ থেকে গেলে হবে না, সরজমিনে লেবার কোডের কুফলগুলি প্রচার করতে হবে, বেসরকারিকরণ ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শ্রমজীবীদের জীবনে কি, তা তাদের বোঝানোর দায়িত্ব ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে কাঁধে নিতে হবে। দুনিয়ার মজদুর এক হোক, শ্রমজীবী সংগ্রাম সফল হোক।

[লেখক – সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ডেবরা থানা শহীদ ক্ষুদিরাম স্মৃতি মহাবিদ্যালয়।]

Facebook Comments

Leave a Reply